লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ জানুয়ারী ১৯৭৩
গল্প/কবিতা: ৫০টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭৫

বিচারক স্কোরঃ ২.৪৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftভালবাসি তোমায় (ফেব্রুয়ারী ২০১৪)

মাইশার ভালোবাসার গল্প
ভালবাসি তোমায়

সংখ্যা

মোট ভোট ২৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭৫

মিজানুর রহমান রানা

comment ৬  favorite ২  import_contacts ৩,৬৪৫
মাইশা আজ তার জীবনের এক কঠিন সময় পার করছে।
সে ভাবেনি এভাবে তার সামনে এই অগ্নিপরীক্ষা চলে আসবে। তবে সে জানতো জীবনের এই পঙ্কিল আবর্তে কখনও কখনও গুটি গুটি পায়ে বিপদ ঘনিয়ে আসবে। চারদিকে যখন সূর্যের আলোর ছিটেফোঁটাও নিভে যাবে, তখন পৃথিবীর নানা কদাচার রাহুগ্রাস করবে জীবনের এই সুন্দর গোধূলিকে।
সে তার নিজের অবয়ব আয়নায় ভালো করে দেখে আর ভাবে, এই শরীর! শরীটা ফর্সা, মুখমণ্ডলে মণিময় দ্যুতি। কিছু কিছু মানুষ একে নিয়েই অহংকার করে, আর কিছু মানুষ পতঙ্গের মতো ছুটে আসে এই সকল ইহজাগতিক রূপ আর লাবণ্যের তীব্র আকর্ষণে।
তবে কিছু কিছু পুরুষ এর ব্যতিক্রম। তারা যেনো কোনো কিছুতেই মোহিত হতে চায় না। এই ক্ষেত্রে লোকটি ব্যতিক্রম। লোকটিকে সে তার জীবনের সবকিছু দিতে চেয়েছে, ভালবাসতে চেয়েছে। জীবনের পরম কাছের মানুষ হিসেবে সারাজীবন পাশে পাশে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু লোকটি এসব কিছুতে আকর্ষণ বোধ না করে চলে গেছে দেশের মায়ায়। দেশকে ভালোবেসে চলে গেছে দেশের সব প্রাঙ্গণ থেকে পাক হানাদার বাহিনীকে খতম করতে। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সময়ের প্রয়োজনে এমন মানুষ এই দেশে খুবই প্রয়োজন।
হঠাৎ ভাবতে ভাবতে লোকটির মধ্যে মাইশা এক নতুন পৃথিবী আবিষ্কার করে। যে পৃথিবীতে মাইশার কোনো ওজন-ভর নেই। সে লোকটির হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে-অলিন্দে ভেসে বেড়ায় সারাদিন, সারাক্ষণ। আর হাতড়ে বেড়ায় প্রেম-ভালোবাসার এক গভীর মায়াচ্ছন্ন অধ্যায়।
লোকটির বুকের জমিনে কী আছে মাইশা স্পষ্টত দেখতে পায় না, তবে অনুভব করে লোকটির বুকের কোনো কোনো জায়গা থেকে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটছে, আর কোনো কোনো জায়গা একদম অস্পষ্ট, অন্ধকার। সেখানে কোনো আলো নেই। আর আলো ফেললেও সেখানে সে কিছুই দেখতে পায় না। অন্ধকার, একদম অমাবস্যা রাতের মতো।
মাঝে মাঝে তার মনে হয় সে লোকটির মাঝে মিশে গেছে। সে তার একান্ত আপনজন। কিন্তু লোকটির আচরণ ওই সময় তাকে মর্মাহত করে। এ কেমন যেনো এক ঘোরলাগা অস্পষ্ট মানুষ। দূরে সরে থাকলে কাছে টানতে চায়, আর কাছে গেলে বিকর্ষণ বোধ করে।
অনেকদিন ধরে সে লোকটিকে দেখেনি, তার শূন্যতা মাইশাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

মাইশার এসব ভাবনাকে ছাপিয়ে বাড়ির অদূরে কিছু মানুষের ভারী জুতার শব্দ আর কোলাহল ভেসে আসে। মাইশা জানালা খুলে দেখতে পায় সাদা-জলপাই রঙের ডোরাকাটা পোশাক পরে কিছু মানুষ এদিকেই আসছে। তাদের সামনে আরো দু’জন মানুষ। যাদের পরনে পাঞ্জাবি এবং মাথায় টুপি।
তারা খুব কাছে আসলে তার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। সাত-আটজন পাক সেনা। তাদের সাথে রয়েছে পাশের বাড়ির তার পরিচিত গোলাম হায়দার এবং আজম কাকা।
মাইশা দ্রুত জানালা বন্ধ করে। লোকগুলো দরোজায় এসে দরোজা খোলার জন্য আওয়াজ করে। মাইশার মা নূরজাহান বেগম দরোজা খুলে দেয়, মাইশা মায়ের পিছে এসে দাঁড়ায়।
মাইশাকে দেখে পাকসেনাদের চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে। কাম-লালসায় বুকে, শরীরে প্রচন্ড আলোড়ন শুরু হয়। তারা কিছু বলার আগেই আজম কাকা মাইশার মাকে প্রশ্ন করে, ‘তোমার স্বামী কোথায়?’
‘ঢাকায়।’ ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয় নূরজাহান।
‘ঢাকায়, না যুদ্ধে গেছে?’ প্রশ্ন করে গোলাম হায়দার।
‘আমাদেরকে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন কোথায় আছে জানি না।’
‘তোমার স্বামী তো ছিলো গোয়েন্দা বিভাগের লোক। সরকারের কর্মচারী। কিন্তু সে নিরুদ্দেশ হয়েছে। আমাদের কাছে খবর আছে, সে যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। শোনো, তোমরা আমাদের কথা ছাড়া এই বাড়ি থেকে এক পা-ও নড়বে না। তোমার স্বামীর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত তোমরা আমাদের বন্দী এবং এই বাড়িতেই। যদি পালাবার চেষ্টা করো, তাহলে...।’ আর বলে না গোলাম হায়দার।
পাক আর্মি সেনারা এসব কথা শোনার চেয়ে মাইশার দিকে তাকিয়ে থাকতে এবং তার শরীরটা নিয়ে ব্যবচ্ছেদ চিন্তা করতে বেশি মগ্ন। তারা উর্দুতে গোলাম হায়দারকে বলে, এই দু’জনকে ক্যাম্পে নিয়ে যেতে। কিন্তু গোলাম হায়দার বলে, এখন নয়, ক্যাম্পের খাদ্য শেষ হয়ে গেলে তখন এই দু’জনকে নিয়ে যাওয়া যাবে।’

অনিচ্ছা সত্ত্বে¡ও রাজি হয় পাকসেনারা। আরো কিছু কথা বলে তারা একে একে যে পথে আসছিলো সেই পথেই বিদায় হয়।

নূরজাহান বেগম বুঝতে পারেন বিপদ অত্যাসন্ন। তারা আবার যে কোনো সময় আসবে, এবং মা-মেয়েকে ধরে নিয়ে যাবে ক্যাম্পে। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন।
মাইশা নির্বিকার। তার পঞ্চম ইন্দ্রিয় সাড়া দিয়েছে। সে পাকসেনাদের চোখের চাহিনী দেখে স্পষ্টতই বুঝতে পারছে এরা শেয়ালের মতো ধীর-স্থির পায়ে আবার রাতে আসবে খাবার শিকার করতে এবং তাদেরকে কিছু বুঝতে না দিয়েই ধরে নিয়ে যাবে নিজেদের আস্তানায়।
তবে এসব নিয়ে মাইশা তেমন একটা ভাবে না। সে জানে জীবন একটা উপত্যকার মতো। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু- আবার কোথাও সমান্তরাল। উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দিয়েই সমান্তরাল পথে এগুতে হয়।
সে তার মাকে বলে অস্পষ্টভাবে, ‘এই পাকিস্তানি কুত্তাদের ভয় পাও তুমি মা?’
মা নূরজাহান এবার কান্না থামান। মাইশার কথা শুনে তিনি অবাক হন। ভাবেন, কী বলছে মেয়েটা? এরা আজ বলে গেছে, তার স্বামী যুদ্ধে গেছে। সেই অপরাধে তারা দু’জন বন্দী। কাল হয়তো আসবে ধরে নিয়ে যেতে। আর মেয়েটা বলে কি-না ওদের ভয় পাবার কিছু নেই!
তিনি কান্না বন্ধ করে মাইশার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকেন। তারপর প্রশ্ন করেন, ‘তোমার ভয় করে না?’
‘না।’ নির্লিপ্ত উত্তর মাইশার।
‘কোনো?’
‘এই দেশটা ওদের নয়, এটা আমাদের দেশ। ওরা যদি আমাদের মেরে ফেলতে চায় ফেলুক। একদিন তো আমাদের মরে যেতেই হবে, না হয় বাবা যুদ্ধে যাবার অপরাধে কিছুদিন আগেই মরলাম। আমার দেশের প্রতি বাবার এই ভালোবাসাকে আমি স্যালুট জানাই মা। আমি ছেলে হলে আরো আগেই চলে যেতাম যুদ্ধে, দেশের প্রয়োজনে, মায়ের প্রয়োজনে, মায়ের ভালোবাসার প্রয়োজনে। আমি আমার দেশে- আমার মায়ের কোলে মরতে পারলে এর চেয়ে আর সুখের কী হতে পারে?’
মাইশার কথা শুনে মায়ের চোখের কোণে সমস্ত অশ্রুজল নিমিষেই শুকিয়ে যায়। ওই দু'চোখ দিয়ে আর জল বেরোয় না। তার বদলে ওই চোখে বের হতে থাকে আগুনের ফুলকি, বাংলার এসব মায়ের চোখের আগুনের ফুলকিই হয়তো একদিন জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেবে পাক-হানাদারদের। সেই সাথে পুড়বে তাদের সহায়তাকারী এই দেশের বিশ্বাসঘাতক নরাধম রাজাকাররা।

মাইশা ভাবতে থাকে, এখানে আর বেশিদিন থাকা যাবে না। এরা আসবে এবং আসবেই। এরা যুগ যুগ ধরে এসেছে, আসতেই থাকবে। পৃথিবীর লয় না হওয়া পর্যন্ত এসব মানুষরূপী শয়তানদের বিনাশ হবে না।
মাইশা ত্বরিৎ উঠে সিদ্ধান্ত নেয়, এখানে আর বেশিক্ষণ থাকবে না। সে বেরিয়ে পড়বে মাকে নিয়ে, তারপর খোঁজ করতে থাকবে তার, যাকে সে ভালোবাসে। হয়তো সেই ভালোবাসা দেশমাতৃকার বা তার প্রিয়তমের অথবা দেশের মৃত্তিকার ...।

গভীর রাত। চারদিকে অন্ধকার। মেঘনা নদীর পাড়ে একটি নৌকা। সেই নৌকায় অনেক মানুষ বসা কিন্তু তাদের মুখে কোনো শব্দ নেই। অজানা আতঙ্ক আর ভয়ে সবার মুখে কুলুপ আঁটা।
নৌকার মাঝি যেনো কারো জন্য অপেক্ষা করছে। মাইশা তার মাকে নিয়ে ধীরস্থিরভাবে সেই নৌকায় ওঠে। ওঠার সাথে সাথেই নৌকার মাঝি বৈঠা চালায় প্রায় নিঃশব্দে। ধীরে ধীরে নৌকাটি জলের ওপর ভর করে এগিয়ে যায় এক সীমাহীন অজানার পথে ...।
নৌকায় বসা মানুষগুলোর বুকের জমিন থেকে গভীর নিঃশ্বাস বের হয়। তারা ভাবে কোথায় যাবে, আর কীভাবে কখন ফিরে আসবে তাদের জন্মভূমির বুকে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement