লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ জানুয়ারী ১৯৭৩
গল্প/কবিতা: ৫০টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৭৯

বিচারক স্কোরঃ ২.০৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৭১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftক্ষোভ (জানুয়ারী ২০১৪)

নিরুদ্দেশ যাত্রা
ক্ষোভ

সংখ্যা

মোট ভোট ২০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৭৯

মিজানুর রহমান রানা

comment ১৪  favorite ১  import_contacts ১,৯৭৭
সময়! হ্যাঁ সময়। সময় চলতে থাকে। মানুষও তার যাত্রাপথের কাঁটা সরিয়ে চলতে থাকে। কেউ চলে জানা পথে আর কেউ হাঁটে অজানা গন্তব্যে।
মিজানুর রহমান এখন বরং জানা ও অজানা এই দুয়ের মাঝে হাঁটছেন। তার সাথে চলছে তার প্রিয় কুকুরটি। তিনি ভাবেন এই কুকুরটির একটা নাম দেওয়া যেতে পারে। কী নাম দেয়া যায়, ভাবেন তিনি।
‘লাইকা’_ হ্যাঁ এই নামটাই দেয়া যেতে পারে। কারণ মহাশূন্যে প্রথম কুকুর নভোযাত্রীরও এই নাম ছিলো। সেই কুকুরটি বিখ্যাত হয়েছে। কিন্তু সে জানতো না কোথায় এবং কী কাজে যাচ্ছে। তাকে দিয়ে মানুষ তার স্বার্থসিদ্ধি করেছে মহাশূন্যে পাঠিয়ে। কিন্তু তার এই প্রিয় কুকুরটি কোনো প্রকার স্বার্থের মোহে আবদ্ধ নয়। সে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মানুষের উপকার করে, কেউ তাকে কিছু বলে দিতে হয় না।
‘লাইকা’। তিনি উচ্চারণ করলেন।
কুকুরটি মুখ তুলে তাকালো। তিনি আবারও উচ্চারণ করলেন, ‘লাইকা’। সে ঘেউ ঘেউ করে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলো।
নামটা তার পছন্দ হয়েছে। তাই এই নামটাই তাকে দেয়া যেতে পারে। মনে মনে ভাবলেন তিনি।

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে লাইকাকে তিনি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে হাজির হলেন তিনদিন পর। মা তাকে পেয়ে অনেক কাঁদলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, মায়ের চোখের নিচে কালি পড়েছে। ছেলের জন্যে দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনায় হয়তো তিনি ব্যাকুল ছিলেন। তাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কিছুটা হাল্কা হলেন।
তাকে নিয়ে মায়ের অনেক চাপা ক্ষোভ, অভিমান জমে ছিলো এতদিন বুকের গহীনে। তিনি প্রায় আধ ঘণ্টা গ্রামের বাড়িতে কাটিয়ে মায়ের ক্ষোভ অভিমান সাঙ্গ করে পরিবারের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লাইকাকে সঙ্গী করে তিনি আবার হাঁটা শুরু করলেন।
হাঁটেন আর ভাবেন তার জীবনের গণ্ডী সীমাবদ্ধ নয়। তিনি কখনও পুকুরের বদ্ধ পানির মতো এক জায়গায় থিতু নন। যখন যেখানে যা মন চেয়েছে তিনি তাই করেছেন। নদীর দু’টি কূলেই তার গন্তব্য। এক ক‚লে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে অপর ক‚লের দীর্ঘশ্বাসের পাল্লা ভারী করেননি তিনি।
এতে তার অনেক সময় সুবিধা হয়েছে, আবার অসুবিধাও হয়েছে। তিনি এসব সুবিধা- অসুবিধা পার হয়ে সঠিক গন্তব্যে চলার পক্ষপাতী।
পৃথিবীর কোনো মানুষ তাকে এক জায়গায় আটকিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি জানেন, এক জায়গায় আবদ্ধ থাকা মানে নর্দমার বদ্ধ-গন্ধ পানির মতো হয়ে যাওয়া। তিনি তা হতে চান না।

মানুষ অমর নয়। তবে মানুষের কিছু কিছু কর্ম মাঝে মাঝে অমর হয়ে যায়। তিনি অমর হতে চান না এবং অমরাবতী সৃষ্টি করতেও চান না, তবে জীবনের সব পঙ্কিল বাঁকে বাঁকে ঘুরে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে তার ভালো লাগে।
এই যে দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, বাঙালির সার্বিক মুক্তির জন্যে যুদ্ধ- এটা তার কাছে ভালো লাগে। দীর্ঘদিন ধরে পদে পদে বঞ্চিত বাঙালি জাতি এখন আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠেছে সব ভয়কে পাশ কাটিয়ে। বাঙালি জাতি বুঝতে শিখেছে একটা মরণপণ যুদ্ধ ছাড়া সঠিক গন্তব্যে পৌঁছা যাবে না।
তিনি ভাবেন পৃথিবীতে যুদ্ধ ছাড়া, ত্যাগ-তিতিক্ষা ছাড়া কোনো মানুষ বা কোনো জনপদের আপামর জনতার দাবি পূরণ হয় না। পৃথিবীর কোনো স্বৈরশাসকই ‘ছেলের হাতের মোয়া’র মতো সহজে গদি আঁকড়িয়ে থাকা ক্ষমতা হস্তান্তর অথবা জনতার দাবিকে গ্রাহ্য করে না।
বাঙালি দীর্ঘদিন ধরে নিজ দেশে পরবাসী হয়ে থেকেছে। দস্যু, তস্কর, ডাকাত, লুটেরাদের নির্যাতন ভোগ করেছে। ওরা অন্যদেশ থেকে এদেশে এসে দেশীয় মীরজাফরদের সাথে আঁতাত করে এই দেশের মানুষকে করেছে ক্রীতদাস। বাঙালি ক্রীতদাস হয়ে নিজ দেশে লুটেরাদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভে ফুঁসছিল। দীর্ঘদিন ধরে কামনা করছিলো এমন একজন হ্যামিলিনের বংশীবাদক যার ডাকে জেগে ওঠবে বাংলার মানুষ।
কোনো জনপদের সাধারণ মানুষের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্যে দরকার হয় বলিষ্ঠ কণ্ঠ অথবা যুদ্ধ এবং জীবন-সম্পদ ক্ষয়। পেতে হলে দিতে হবে এটাই জগতের নিয়ম। তিনি যদিও সব নিয়মনীতিকে তুচ্ছ করেন তবে প্রকৃতির নিয়মকে কখনো অস্বীকার করেন না। কারণ প্রকৃতির নিয়মকে লঙ্ঘন করার কোনো জো কারো নেই।

প্রকৃতির নিয়মেই পৃথিবীতে বৃষ্টি হয়, পর্বতের কঠিন শিলা ভেদ করে চির উত্তপ্ত লাভার কুণ্ডলী পৃথিবীর বাতাসে বেরিয়ে আসে, সাগর কেড়ে নেয় দ্বীপ-উপদ্বীপÑ এসব রোধ করার সাধ্য মানুষের নেই। আবার যখন মাটি ভেদ করে সুপ্ত বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়, পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখে সদ্যপ্রসূত শিশু কেঁদে উঠে এদেরকে নিবারণ করাও মানুষের জন্যে সহজসাধ্য বিষয় নয়। মানুষ কখনো প্রকৃতিকে দমিয়ে রাখতে পারে না, পারবেও না।
মানুষ তার অজ্ঞানতার জন্যে মাঝে মাঝে বীজের অঙ্কুরোদ্গম এবং সদ্যপ্রসূত শিশুর কান্না রোধ করতে চায়। মানুষের মধ্যকার জমে থাকা ক্ষোভকে তুচ্ছ করে তাকে তুরুপের তাসের মতো উড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু সব সময় সে তা পারে না। তার অগোচরে অনেক বীজ অঙ্কুরোদগম হবে, কলি থেকে ফুল ফুটবেই এবং ফেরাউনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মুসার মতো শিশুর আগমন হবে শান্তির বার্তা নিয়েÑ এটাই জগতের নিয়ম। মানুষ যতোই ফাঁকিবাজি, ফন্দি-ফিকির করে প্রকৃতির নিয়মকে উপেক্ষা, রোধ অথবা পরিবর্তন করতে চায় সে কামিয়াব হয় না। বরং নিজেই নিজের সৃষ্ট কর্মের জন্যে মাঝে মধ্যে ফ্যাসাদে পড়ে যায়।

সন্ধ্যা সমাগত। সূর্যের আলো নিভু নিভু। ক্রমে ক্রমে পৃথিবীর বুকে অন্ধকার নেমে আসছে। তিনি এসব কথা ভাবতে ভাবতে মাটির রাস্তা ছেড়ে মাত্র পীচঢালা রাস্তায় পা রাখলেন।
লাইকা এ সময় ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। তিনি লক্ষ্য করলেন পাক-বাহিনীর কয়েকটা জীপ এদিকেই এগিয়ে আসছে। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই জীপগুলো এসে তার সামনে থামলো। মেজর গোছের একজন এসে তাকে প্রশ্ন করলো, ‘আপকা নাম?’
‘মিজানুর রহমান।’
‘বহুত আচ্ছা নাম হ্যায়! রহমানকা মিযান’। পাক মেজর উৎফুল্ল­ হলো। তার সাথে করমর্দন করলো। মিজানুর রহমান নামের একজন ‘মুসলমান’ পেয়ে তাকে গাড়িতে উঠার ইঙ্গিত করলো।
তিনি জানালেন তার সাথে লাইকা নামক একটি কুকুর আছে। তাকে তিনি সঙ্গে নিতে চান। মেজর প্রথমে কিছুটা বিরক্ত বোধ করলেও পরে সায় দিলো।

তিনি মেজরের কথায় তাদের সঙ্গে না যাবার কোনোপ্রকার অজুহাত দেখালে তারা তাকে তাদের প্রতিপক্ষ ভাববে। হয়তো সঙ্গে সঙ্গেই গুলি করে মেরে ফেলবে। তাই তিনি একটা কৌশলের আশ্রয় নিলেন।
গাড়ি চলতে চলতে কিছুদূর যেতেই মেজর প্রশ্ন করলো, ‘আপ কিধার জায়েগা?’
তিনি উত্তরে কৌশল করে জানালেন, তিনি একজন বেকার, বাউণ্ডুলে কবি মানুষ। কোনো কাজকর্ম তার নেই। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফিরে কবিতা, গান রচনা করা তার পেশা। কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য তার নেই। নিরুদ্দেশ যাত্রাই তার লক্ষ্য।
মেজর তার কথায় বেশ খুশি হলো। সে ভাবলো এমন একজন বেকার লোকই তাদের প্রয়োজন, যার কোনো পিছুটান নেই। একে দিয়েই হয়তো তাদের সব কাজ পূরণ করা যাবে। সে খুশিতে বগল বাজাতে বাজাতে আওয়াজ তুললো, ‘এই গাড়ি রুখ, রুখ। কুচ খানাপিনা জরুরত হ্যায়।’
মেজরের কথায় গাড়ি থামলো। সেই সাথে পেছনের দুটি গাড়িও ব্রেক কষলো জোরে।
চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে। সেই অন্ধকারের মধ্যে গাড়ি থামার আওয়াজ পেয়ে লাইকা ‘গরর গরর’ করে মনের ক্ষোভ ঝেড়ে নিল।
মেজর নামার সাথে সাথে সবাই নেমে পড়লো। তিনিও নামলেন, সাথে লাইকাও নিঃশব্দে নেমে পড়লো।
ব্যাপক খানাপিনার আয়োজন করা হলো মেজরের নির্দেশে। তারপর মেজর তাকে যা করতে নির্দেশ দিলেন তাতে তিনি বিস্মিত হয়ে গেলেন।
মনে মনে ভাবলেন, সময় আসুক তারপর দেখা যাবে তাকে প্রকৃতপক্ষে দেশের জন্যে কী করতে হবে। তিনি কুকুরটিকে নিয়ে ক্ষোভ ও দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ধীর পদক্ষেপে মেজরের সামনে এসে দাঁড়ালেন আর ভাবলেন, আমি বাঙালি, আমি কখনোই আমার মায়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না, এবং পারবোও না। পাকিস্তানি মেজর, তুমি সময়মতো দেখবে, এই মিজানুর রহমান তোমাকে কোথায় নিয়ে যায়! তুমি তখন তোমার অস্তিত্ব নিয়ে ....।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement