লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ জানুয়ারী ১৯৭৩
গল্প/কবিতা: ৫০টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭৩

বিচারক স্কোরঃ ২.৫৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftআমি (নভেম্বর ২০১৩)

আমি একজোন স্বার্থবাজ মানুষ!
আমি

সংখ্যা

মোট ভোট ৩৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭৩

মিজানুর রহমান রানা

comment ১৩  favorite ৩  import_contacts ১,৩০৭
কক্সবাজারের অদূরে হিমছড়ির পাহাড়ের পাদদেশে সাগরের উত্তাল ঢেউ সাদা তরঙ্গমালারূপে এসে আছড়ে পড়ে। সেই তরঙ্গমালার উত্তাল নৃত্যের দিকে চেয়ে চেয়ে তিনি এখন জীবনের হিসাব কষেন।
কুকুরটি পর্যটকদের দেখে মাঝে মাঝে ঘেউ ঘেউ করে। কিন্তু তার ভাবনায় ছেদ ঘটাতো পারে না। তিনি ভাবেন আর ভাবতে থাকেন। এমন সময় তার মুঠোফোনে মেসেজ আসে। ধ্যানমগ্ন হয়ে মেসেজটি পড়েন। তার নাম রাশেদ। তিনি লিখেন, ভাইয়া, আপনার গল্পটি পড়লাম। পড়ে অনেকদিন পরে কাঁদলাম। তবে একটি অনুরোধ, ওই গল্পটির মতো যেনো আপনার জীবন না হয়।
তিনি মেসেজটি প্রায় তিন-চারবার পড়েন। তিনি ভাবেন, জীবনে অনেক গল্প লিখেছেন। এভাবে তাকে কেউ মেসেজ বা ফোন দেয়নি। গল্প তো গল্পই। সেখানে লেখকের জীবনের কোনো অংশ থাকতে পারে বা নাও থাকতে পারে। গল্প কি কখনো সত্যি হয়? কিন্তু পাঠকরা একেই তার জীবনের অংশ ভাবতে শুর“ করেছে।
প্রকৃতির নিয়মে পৃথিবীতে সময় বদলায়। সূর্যের হাসিমুখ নত হয়ে মেঘের আনাগোনা শুর“ হয় আকাশের বুকে। ক্রমে ক্রমে ঝড়ো বাতাস বয় সমুদ্রের বুকে। ঢেউগুলোও উঁচু থেকে উঁচুতর হয়।
একটু পর তার মুঠোফোনে কল এলো। লোকটির নাম মহসিন মিজি। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, গল্পটি তার জীবনের অংশ কি-না। তিনি ভাবেন কী বলবেন তিনি। সত্যিই তো এই গল্পটি তার জীবনেরই কিছু অংশের রূপায়ন। কীভাবে পাঠককে মিথ্যা বলবেন তিনি। তিনি জানালেন, হ্যাঁ তার জীবনের কিছু অংশ রয়েছে তাতে। এভাবে গল্পটি সম্পর্কে মেহেদী, ঋষি এ¯ে—বান সহ বেশ কিছু পাঠক-শুভাকাক্সি¶র ফোনকল পেতে থাকেন তিনি।
ভাবতে বসলেন কেনো এই গল্পটির বিষয়ে এমন হলো। কেনো গল্পটি পাঠকের অš—রে সাড়া জাগালো। কোন্ বিষয়টি পাঠককে নাড়া দিতে স¶ম হয়েছে?
এই সময় প্রিয় কুকুরটি আবার ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। তিনি ঘাড় ফেরালেন পেছনের দিকে। ক’জন পর্যটক। মনে হয় পুরো ফ্যামিলি। বাবা-মা ও সাথে একজন ২০/২২ বছরের যুবতী।
কুকুরটির ঘেউ ঘেউ থামেনি। হঠাৎ করেই সে তাড়া করলো পর্যটকদের। তাদের সাথে থাকা যুবতী ভয় পেয়ে দৌড়ে তার নিকট চলে এলো। কাছে আসামাত্রই তার মনে হলো তিনি এই যুবতীকে চেনেন। কিন্তু কোথায় দেখেছেন তা’ আঁচ করতে পারছেন না।
যুবতী তার দিকে চেয়ে হাসে। তারপর বলে, ‘কেমন আছেন আপনি?’
তিনি কিছুই বুঝতে পারেন না। তাকিয়ে থাকেন নির্বিকারে। যুবতী তার নাম ধরে ডাকে। তারপর বলে, ‘আমায় চিনতে পারছেন না! আমার নাম মাইশা।’
কুকুরটির ঘেউ ঘেউ থামে। মাইশার পিতা-মাতা তার কাছে আসে। তারপর তার সাথে কথা বলতে দেখে বুঝতে পারে লোকটি মাইশার পরিচিত কেউ।
তারা মাইশাকে রেখে একটু দূরে সাগরের পাড়ে চলে যান। তিনি বসে পড়েন সেই আগের যায়গায়। জায়গাটি সমুদ্রের কিনার থেকে সোজা উপরের দিকে চলে গেছে। বেশ খাড়ি। নিচে সমুদ্রের ফেনায়িত জলরাশি আছড়ে পড়ছে।
মাইশা তার পাশে বসে। তারপর বলে, ‘আপনাকে আমি অনেক খুঁজেছি; পাইনি। প্রায় দু’বছর হলো আপনার সাথে আমার দেখা নেই। আসলে ছোট্ট একটি দুর্ঘটনা আপনার কাছ থেকে আমাকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে। আপনার ফোন নাম্বারটিও আমার কাছে ছিলো না। আপনি এখানে কী বসে করছেন?’
তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মাইশার কথার কোনো উত্তর দিলেন না।
দীর্ঘ¶ণ নীরবতা। সাগরের তরঙ্গমালা ক্রমে ক্রমে আরো উত্তাল হচ্ছে। মনে হচ্ছে এখন সাগরের মাঝে জোয়ার বইছে। এক সময় তরঙ্গমালা জোরে আছড়ে পড়লো সৈকতে, সেই জলরাশির বিন্দুগুলো তার পায়ের কাছে এসে পড়লো। ভিজে গেলো দু’জনের শরীরের কিছু অংশ।
মাইশা উঠে বসলো। তারপর বললো, ‘আপনি কি আমায় চিনতে পারছেন না? নাকি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না?’
তিনি এবার মাইশার চোখে চোখ রাখলেন, তারপর তার কাছে গিয়ে নির্বিকার কণ্ঠে বললেন, ‘শুনো মাইশা, তোমাকে অনেকদিন পর পেয়ে আমি খুব খুশি হয়েছি। কারণ কথাগুলো তোমাকে বলা দরকার। আসলে তোমার সাথে আমার যে বন্ধুত্ব ছিলো তাতে আমার একটা ¯^ার্থ ছিলো। আমি একজন লেখক মানুষ। লেখালেখিতে একটু বৈচিত্র্যতা ও রোমাঞ্চ আনতে এবং জীবনের একটি দিকের রহস্যভেদ করতে তোমার খুব কাছে চলে গিয়েছিলাম আমি। আসলে কোনোকালেই তোমার বন্ধু অথবা প্রেম-ভালোবাসার পাত্র ছিলাম না আমি। আমার আর তোমার বয়সে অনেক পার্থক্য। তোমার বড়জোর ২০ হবে, আমার ৪২ চলছে। আমি মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ। তোমাকে একটা কথা বলি, এসব কথা কেউ ¯^ীকার করবে না। কিন্তু আমি করছি, আর করছি এই জন্যে যে, আমি আমার বিবেকের দংশনে যেনো কোনোদিন হাহাকার না করি। আমার মধ্যে পুরোটাই ছিলো একটা ¯^ার্থের খেলা। আমি আমার ¯^ার্থকে বড়ো করতে গিয়ে তোমার সাথে বন্ধুত্বের ভাণ করে জীবনের অন্ধকার দিকটা পরিপূর্ণ করতে চেয়েছিলাম। আর তা সফলও হয়েছে। তুমি আমার জীবনে আসার আগে আমি যতো গল্প লিখেছি তাতে তেমন কোনো সাড়া পাইনি। কিন্তু তুমি আমার জীবনে আসার পর যে গল্পটি লিখেছি তাতে আমার নিজের কাছেও মনে হয়েছে যে এতোদিনে একটা গল্প বলা হয়েছে। আর তাতে পাঠক সাড়াও পেলাম প্রচুর। আমার জন্যে এটা কম পাওয়া নয়। আমি আমার এই ¯^ার্থকে পূরণ করার জন্যেই তোমার সাথে বন্ধুত্ব করেছিলাম।’
মাইশা কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলো। তিনি ভাবলেন, মাইশা হয়তো কথাগুলো শুনে নীরবে অশ্র“ বিসজর্ন করবে অথবা ¯^ার্থপর বলে তাকে গালাগাল করবে। কিন্তু সে তার কোনোটিই করলো না। সে শুধু তার দিকে চেয়ে চেয়ে হাসলো।

তিনি অবাক হলেন। কারণ এই বয়সী একটি মেয়ে এতো ধৈর্য কোথা থেকে পেলো। এমনটি তো হবার কথা নয়। একটা প্রতিক্রিয়া তিনি আশা করেছিলেন, এবং সেই প্রতিক্রিয়া নিয়েও গল্প লিখবেন বলে স্থির করেছিলেন।
কিন্তু জীবনের অসমাপ্ত গল্পটি ইউটার্ন নিলো। মাইশা হাসতে হাসতে উচ্চ¯^রে বললো, ‘আমার ভালো লাগছে যে, আপনি মিথ্যা কথা বলে নিজকেই প্রতারিত করতে চাইছেন। আপনি একজন লেখক মানুষ। আপনার মধ্যে ব্যক্তিগত ¯^ার্থ, দ্বেষ, হিংসা-ক্রোধ, কাম-রিপু সবই থাকতে পারে। আমার কাছে এটা অ¯^াভাবিক বিষয় নয়। কিন্তু আপনি সত্য কথা শোনাতে গিয়ে আমাকে বরং মিথ্যা কথাটিই বলেছেন। কারণ আপনার মনের মধ্যে যা আছে আপনি তা’ বলেননি। বরং আপনি যা করেননি তাই বলে ফেলেছেন। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো আপনি ¯^ার্থবাজ হলে আমার কাছ থেকে কোনো অনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে পারতেন, যা অনেক পুর“ষ মানুষই করে থাকে।’
তিনি মাইশার কথায় আরো অবাক হলেন। তিনি বললেন, ‘সত্যি মাইশা, প্রথম থেকেই তোমার সাথে বন্ধুত্বের পেছনে আমার ¯^ার্থ ছিলো। আর আমি আমার ¯^ার্থকে বজায় রাখতে গিয়েই তোমার সাথে দীর্ঘদিন সময় কাটিয়েছি। আমি চাই তুমি বুঝতে পারো যে, আমি একজোন ¯^ার্থবাজ মানুষ। ¯^ার্থের এ পৃথিবীতে সবাই ¯^ার্থ নিয়েই কাজ করে। নিজের ¯^ার্থের বাইরে কোনো মানুষ কাজ করে না। আমার এ লেখক জীবনেও আমি অনেক ¯^ার্থ হাসিল করেছি, কিন্তু সেইসব মানুষদের কোনো প্রতিদান দিতে পারিনি। যেমন ধরো এই কুকুরটি, যে আমার দেহ ও জীবনটা সাগরজলের হাবুডুবু খাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে তারও কোনো ঋণ শোধ করতে পারিনি। তুমি আমার জীবনে এসেছিলো, আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছিলে, দিয়েছিলো অনেক অনেক গল্পের কাঠামো। কিন্তু আমি তোমারও ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবো বলে মনে হয় না। একদিন তুমি আবারও চলে যাবে দূর পরবাসে, আমি পড়ে থাকবো এই হিমছড়ির সাগর-পাহাড়ের প্রাšে—। নিঃ¯^ এই মানুষটি কুকুরটিকে সাথে নিয়ে দিনের পর দিন ঘুরে বেড়াবে খেয়ে না খেয়ে। তারপর হয়তো সে মৃত্যুবরণ করলে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম তার লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করবে।’
মাইশা এবারও তার ¯^াভাবিক নিয়মে হাসে। তারপর বলে, ‘কোনো মানুষই জানে না সে কীভাবে কখন কোথায় মৃত্যুবরণ করবে। আপনিও তো চেয়েছিলেন সাগরজলে নিজকে বিসর্জন দিতে, কিন্তু পারেননি। আমার একটি প্রশ্ন, যদি আপনি ¯^ার্থবাজ হতেন তাহলে কেনো নিজকে সাগরজলে বিসর্জন দিতে চেয়েছেন। কোনো ¯^ার্থবাজ মানুষ নিজকে শেষ করে দিতে পারে না। ¯^ার্থবাজ মানুষরা চায় অর্থ-বিত্ত ও সম্পদের পাহাড় গড়ে নিজকে অট্টালিকার মাঝে সমাসীন করতে। চায় খ্যাতির সুউচ্চ চূড়ায় আরোহণ করতে, আপনি তো তা চাননি।’
তিনি কোনো কথা বলতে পারলেন না। তার মনে হলো এই মেয়েটির কাছে কথায় তিনি পরাজিত হলেন। নিজকে মাইশার কাছে ¯^ার্থবাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তার প্রতিক্রিয়া চাইছিলেন তিনি। কিন্তু সব বুমেরাং হয়ে গেলো। মাইশা তাকে ¯^ার্থবাজ হিসেবে মানতে নারাজ। বরং তিনি যে মাইশার জন্যেই নিজকে সাগরজলে বিসর্জন দিতে চেয়েছেন সেটাই সে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলো।
মাইশার দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। কুকুরটি বসে বসে তার দিকে চেয়ে অশ্র“ বিসর্জন করছে। এমন সময় মাইশা ডান হাতটি বাড়ালো তার পানে। বললো, আপনার যদি সত্যিই ¯^ার্থ থেকে থাকে তাহলে চলে যান, আর যদি না থাকে তাহলে আমার হাতে হাত রাখুন।
তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কী করবেন তিনি, একজন ভবঘুরে, নিঃ¯^ মানুষ কি করে মাইশার মতো যুবতীর হাত ধরে জীবনের গÊিতে বিচরণ করবে? এ তো অসম্ভব।
ভাবতে ভাবতে সাগরের বুকে প্রচÊ ঝড় ওঠে। অস্থির বাতাস বয়। হঠাৎ করেই এক ঝড়ো হাওয়া গল্পের পরিণতির দিকে মোড় করিয়ে দেয়। মাইশা সেই ঝড়ে হঠাৎ করেই পড়ে যায় সাগরের বুকে। দূরে দাঁড়ানো মাইশার বাবা-মা দৌড়ে এসে দেখে মাইশা গভীর জলে ডুবে হাবুডুবু খাচ্ছে।
কুকুরটি সাথে সাথেই ঝাঁপ দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু সাগরের কিনারা এতো খাড়ি যে, সে ভয় পেয়ে গেলো। পারলো না ঝাঁপ দিয়ে মাইশাকে উদ্ধার করতে। মাইশার বাবা-মায়ের কান্না ও চিৎকারে অনেক মানুষ জড়ো হলো। এ সময় তিনি বোধশক্তি ফিরে পেলেন। সাগরজলের সাথে ভাসতে থাকা মাইশার আকুতি তিনি সহ্য করতে পারলেন না। সাথে সাথেই ঝাঁপ দিলেন সাগরের জলতরঙ্গের বুকে।
ভয় ও দ্বিধা ত্যাগ করে কুকুরটিও সাথে সাথে ঝাঁপ দিয়ে পড়লো তার সাথে। তিনি আর তার প্রিয় কুকুরটি ক্রমে ক্রমে এগিয়ে গেলো সাগরজলে হাবুডুবু খাওয়া মাইশার পানে। মাইশা তার একটি হাত বাড়িয়ে দিলো। তিনি সেই হাতে ধরে ক্রমে ক্রমে মাইশাকে সৈকতে নিয়ে আসতে লাগলেন। এই সময় মাইশা তার কানে কানে চুপিচুপি বললো, ‘¯^ার্থবাজ মানুষরা কখনোই নিজের জীবন বিপন্ন করে অন্যকে সাহায্য করতে ছুটে আসে না। আপনি কেমন ¯^ার্থপর মানুষ যে নিজের জীবনকে বিপন্ন করতেও কুণ্ঠিত হন না?’
তিনি জীবনে যা করেননি, আজ তাই করলেন। হা হা হা করে হাসলেন। সেই সাথে কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। আর মাইশা তার ¯^াভাবিক নিয়মে হাসতে হাসতে তার চোখের পানে তাকালো, দেখলো সেই চোখে কী এক অপার্থিব আনন্দের দ্যুতি খেলা করছে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement