সংঘবদ্ধ লেখকশক্তি ও সমসাময়িকতা

আহমাদ মুকুল
১৩ ফেব্রুয়ারী,২০১২

সমসাময়িকতা থেকে একটু পিছিয়ে থাকলে খুব একটা ক্ষতি নেই। বরং পিছিয়ে পড়া মানুষরা অবক্ষয়টা টের পায় আগে ভাগে। প্রতিটি পরিবর্তন কিংবা এগিয়ে যাওয়ার ধাপগুলো তারা তৃতীয় কোণ থেকে দেখতে পায়। এক দৃষ্টিতে তাদেরকে সমাজ পরিবর্তনের ‘ওয়াচ ডগ’ বলা যায়।

 

সমসাময়িক (contemporary) মানুষরা সময়ের স্রোতে ভেসে চলেন। তারা হাওয়ার পক্ষে পাল তোলেন। পাল তোলার অবশ্য এটাই নিয়ম। হাওযার বিপক্ষে পাল তুললে হয় পাল ছিড়বে, নতুবা ইচ্ছার বিপরীত পথে যাত্রা হবে। যাই হোক, সমসাময়িক আধুনিক মানুষরা খুব একটা সৃস্টিশীল হন না, কারণ তারা নবসৃষ্টির ভোক্তামাত্র, কিংবা অনেক ক্ষেত্রে প্রণোদনা।……। তাই লেখকদের খুব একটা সমসাময়িক স্রোতের মানুষ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

 

অনেক দিন পর প্রিয় শিক্ষকের নাতিদীর্ঘ বক্তব্য শুনলাম। আজকাল যা শোনার, তা গিলতে হয়, মধ্যরাতের টক-শোতে। কারো ঘুম নষ্ট হয় তিক্ততা অবলোকনে, কারো নিদ্রার সূত্রপাত হয় একঘেয়ে বচনের সূরলহরীতে। সভা সমিতিতে মানুষ বক্তব্যকে ভয় পায়। অনেকেই চশমার আড়ালে প্রয়োজনীয় নিদ্রাটি সেরে অবসন্নতা কাটিয়ে নেন।

 

সেদিন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্তাব্যাক্তি বলে রেখেছিলেন, “স্যার অসুস্থ, কিছু বলবেন না। শুধু মোড়ক উন্মোচন করেই হয়তো চলে যাবেন।”

 

টুকটাক কথাবার্তা হল। কাজের কাজটি শেষ হল। স্যার ফটোসেশনে সাগ্রহে অংশ নিলেন। মুখে খোলামেলা হাসি। তরল মনের সুযোগে, কানে কানে বললাম, ‘‘স্যার, আমাদের একটু আশির্বাদ দেবেন না?” সেকেন্ডের ভগ্নাংশের দৃষ্টি বিনিময়ে স্যারের মনকে পড়ে ফেললাম। হোক শত সহস্র স্রোতা নেই, তবে সামনে যারা আছে তারা শুনতে চায়! তারাও হৃদ্ধ মানুষ।

 

প্রথম দুটি প্যারা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর বিশ মিনিটের বক্তব্যের একটি সূর। তিনি বলেলেন সাধনা ও বিকাশের কথা, ভার্চুয়াল জগতের কথা। ….সাধনা করতে হবে একা। জীবনে একাকিত্ব খুব প্রয়োজন। নিজের আত্মিক উন্নতির জন্য নিভৃতচারণ প্রয়োজন। কিন্তু বিকাশের জন্য দল প্রয়োজন। সামষ্টিক শক্তি প্রয়োজন। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) নির্জন হেরা গুহায় ধ্যান করেছেন। তারপর আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান-উপলব্ধি মানুষের কাছে নিয়ে এসেছেন। গৌতম বুদ্ধ ধ্যান করেছেন। কিন্তু ঠিকই তার বাণী সাধারণ মানুষকে বিলিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে কর্মের জন্য সমষ্টি প্রয়োজন।

 

প্রত্যককে আত্মিক বিকাশ ঘটাতে হবে, নিভৃতে। কিন্তু সেটা হবে সামগ্রিক বিকাশ, উচ্চ স্বরে প্রয়োগ করতে হবে দলে, গোষ্টিতে, সংঘে।….গৌতম বুদ্ধ চিরদিনই বোধিদ্রুমের নিচে বসে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাঁর জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে সাধারণের কাছে এসেছিলেন। তাঁর উপলব্ধি সমাপ্ত হলে কর্মযজ্ঞের প্রয়োজনেই তিনি বেরিয়ে এসেছিলেন।…‘‘বুদ্ধং স্মরণং গচ্ছামি’’, ‘‘ধর্মং স্মরনং গচ্ছামি’’ এই দুইয়ের পরই আসছে ‘‘সংঘম স্মরণং গচ্ছামি’’। সব মিথ্যা হয়ে যায় যদি সংঘবদ্ধ শক্তি সৃষ্টি না হয়। অর্থাৎ কর্ম কিংবা সাফল্যের পূর্বশর্ত হলো ‘সংঘ’। অনেকগুলো ‘একা’র শক্তি যখন সংঘে বা দলে গতিময়তা আনবে তখনই বিপ্লব আসবে।

 

কয়েকজন লেখক একাকী লিখতে লিখতে একটি লেখক সংগঠণে চলে এলো। গোপনে গোপনে লিখতে লিখতে পারস্পরিক একটি নিরব প্রতিযোগিতাবোধ সৃষ্টি করতে হবে, যার নাম ‘প্রফেশনাল জেলাসি’। তাহলেই দলের মধ্যে গতি আসবে।….‘‘ওপাড়েতে পাটা নাই পুতা নাই, মরিচ বাটে কালে, ওরা খেলো তাড়াতাড়ি আমরা মরি ঝালে’’ অর্থাৎ আরেকজন আমাকে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে এই বোধটা প্রয়োজন!

 

‘পেশাদারী ঈর্শা’ মানে কাদা ছোড়াছুড়ি নয়। এটা হতে হবে নিজের ভেতরের চালিকাশক্তি।

 

ভার্চুয়াল জগতে বন্ধু হওয়া সম্ভব। কিন্তু স্পর্শ উষ্ণতা ছাড়া ওটা টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই ভার্চুয়াল জগতের লেখকরা এক হয়ে স্পর্শের শক্তিতে স্থির বায়ুতে টর্নেডো সৃষ্টি করবে।

 

                                                                                                                      চলবে…..

 

(১১/০২/১২ খ্রি. তারিখে ‘সংকাশ’ এর প্রথম প্রয়াস ‘নৈঃশব্দ্যের শব্দযাত্রা’র মোড়ক উন্মোচন সভায় অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বক্তব্য হতে কিছুটা দুর্বল স্মৃতি, কিছুটা মোবাইল রেকর্ডিংয়ের সহায়তায় তৈরি নিবন্ধ)

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
ম্যারিনা নাসরিন সীমা চমৎকার লিখেছেন মুকুল ভাই ! সত্যি আফসোস হচ্ছে সায়ীদ স্যার এর এত কাছে যাওয়ার সুযোগ পেলাম না :(
অদিতি স্যারের যে কথাগুলো বললেন তা পড়ে একটা তন্ময়তার, একটা ভাল লাগার সৃষ্টি হলো। আসলেই বড়র বড় গুন। শ্রদ্ধা রইল সায়ীদ স্যারের প্রতি।
মামুন ম. আজিজ <a href="http://blog.bdnews24.com/mamunmaziz/66984" target="_blank" rel="nofollow">http://blog.bdnews24.com/mamunmaziz/66984</a>
সালেহ মাহমুদ আহমাদ মুকুল ভাই, খুব ভালো লাগলো। আমারো মনে হচ্ছিল, স্যারের কথাগুলো লিপিবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। হোক তা স্যারের নিজের ভাষায়, হোক তা অন্যের উপলব্ধিজাত নিবন্ধে। আপনি সেই চমৎকার কাজটি করে ফেলেছেন দেখে ভালো লাগলো। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
Lutful Bari Panna এখানকার ব্লগেও যে এক আধটু পদচারণা চালাতে হয়- সেটা বেশ বুঝতে পারছি। নয়ত এমন লেখাগুলোও কেমন চোখে ধুলো দিয়ে কালান্তরে হারিয়ে যাচ্ছে। মুকুল ভাই সত্যগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে সবাই দেখাতে পারে না। আপনার স্যাটায়ারগুলো পড়েই জেনেছি- সে ক্ষমতা আপনার আছে। আপনার কলম সচল থাকুক। কিছু দেখি কিছু উপলব্ধি তৈরী হোক। আরো কিছু লেখা পড়লাম। কখন সেগুলো দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে টের পাইনি। ডন কুইক্সোট যে এমন সমসাময়িক হয়ে উঠতে পারে সেটা পড়ে হাসি সামলাতে পারিনি। আর এ লেখাটার মত ঋদ্ধ লেখা চলতে থাকুক। স্যারের বাণী শুনে মন ভরে গেল।
পাঁচ হাজার ভাল লাগল নিবন্ধটা পড়ে। সায়ীদ সারের সাহচার্য পাওয়ার সৌভাগ্য সবাই কামনা করে। আপনাদের সেটা হয়েছে জেনে বেশ হিংসে হচ্ছে। আপনাদের নৈ:শব্দের শব্দযাত্রা গল্প সংকলনটা সংগ্রহ করেছি।
মামুন ম. আজিজ শুনে আনন্দিত হলাম। পাঠের পরে কেমন লাগলো জানাবেন।
ভালো লাগেনি ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১২
Azaha Sultan মুকুল দা, অসাধারণ বক্তব্য....ধন্যবাদ খুব কম হবে......ভালবাসা....এফ আই জুয়েল ভাইয়ের মতো....হা হা হা--অট্টহাসি--
sakil আপনার এই লেখা আমাদের অনেক সাহস যোগাবে , বুঝতে শিখাবে আমি তাই মনে করি . বাকি অংশের অপেক্ষায় রইলাম .
এফ, আই , জুয়েল # আ---মুকুল ভাই । দরুন উপলদ্ধি-----অপুর্ব নিবেদন -----,সুন্দর কথামালা-----মানে না ব্যাকরণ । আপনি অনেক সত্য ও সুন্দরকে এখানে তুলে নিয়ে এসেছেন । = আপনি এত কিছু বোঝেন---- অথচ এই Love you টাই বুঝতে চান না কেনো ? --এইটা আমার মাথায় ঢোকে না ।। তাহলে কি আমার সাথে আপনার জেলাসি আছে ?
আহমাদ মুকুল সারাক্ষণ ভালবাসি চিৎকারেই যেমন ভালবাসা পাওয়া যায় না, তেমনি একটি বার না উচ্চারেও সর্বোচ্চ ভালবাসা মেলে। কাল ভালবাসা দিবস। কাল একটি দিন সরবে ভাল না বেসে আসুন, সারাটি বছর নিভৃতে ভালবাসি।...আপনাকে ঐ শব্দটি সরবে বলবো না- না জানি কে কোন অর্থ করে। বললে আপনি না হয় মিত্রতায় এলন, আর কোন মুখ যদি নয়া সিন্ডিকেটের রব তোলে?(উচ্চকিত হাসি)
ভালো লাগেনি ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১২
Dr. Zayed Bin Zakir (Shawon) হা হা হা! দারুন বলেছেন মুকুল ভাই!
ভালো লাগেনি ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১২
আসন্ন আশফাক জীবনে চলার পথে স্মরণ রাখার মত কিছু কথা, পেশাদার ঈর্শা খুব ই গুরুত্বপূর্ণ .........
আহমাদ মুকুল কৃতজ্ঞতা প্রণয়ে পিড়িত আশফাক।
ভালো লাগেনি ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বাবা”
কবিতার বিষয় "কষ্ট”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ মে,২০২২

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

এপ্রিল ২০২২ সংখ্যার বিজয়ী কবি ও লেখকদের অভিনন্দন!i