বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ২৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৯০

মেঘলা সমীকরণ

  • advertisement

    চাঁদের সাথে সে রাতে আড়ি দিয়েছিলাম।

    দূর আকাশের তারারা বিন্দু বিন্দু আলো হয়ে জ্বলেছিল সে রাতে। সবুজের বুক ছুয়ে শিশিরভেজা রঙ্গীন ঘাসফুলগুলো অপেক্ষায় ছিল নতুন ভোর দেখার। আমি আর পিয়া তখনও বিভোর ভালবাসার মোহে। আমার বুকের খাঁচায় পিয়ার জড়ানো দুবাহু, পিয়ার অধরে আমার ঝাঁঝালো চুম্বন। আমাদের দুজনার সেই মধুর মুহূর্তটিকে আরো মধুরতর করার জন্য প্রকৃতির আয়োজনও কম ছিলনা। দখিনা বাতাস বইছিল তিরতির করে। অনেক দূরের কোন কৃষাণির উঠোন থেকে ভেসে এসেছিল হাসনাহেনার সুমধুর ঘ্রাণ। শুধু চাঁদ আড়াল করে রেখেছিল নিজেকে ধোয়াটে মেঘেদের ভিড়ে। নির্জন নিশীথ রাতে কীর্তনখোলার ঘোলা জ্বলে ভেসে ভেসে জ্যোৎস্না-স্নান হলনা আমাদের।

    অথচ আজ পৃথিবীর সকল জোছনারা যেন নেমে এসেছে আমাদের ঘরে। আমাদের বিছানা-বালিশ, টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা ভারি ভারি বই সবকিছুতেই যেন রূপালি জোছনার একচেটিয়া আধিপত্য। পৃথিবীর রূপ দেখার জন্য বারান্দার গ্রীল ধরে আমি আনমনে তাকিয়ে রইলাম বাইরে।

    পিয়া যে চুপিসারে আমার পেছনে এসে দাঁড়াল টেরই পাইনি। ওর দিকে ফিরে তাকাতেই একটা ভাললাগার পরশ ছুঁয়ে গেল আমায়। পিয়া দেহে জড়িয়েছে কালো পাতলা শাড়ি। কাঁধের দুপাশ দিয়ে চুলগুলো ছড়িয়ে রেখেছে বুকের উপর। তারই ঠিক নিচে দুবাহু জড়িয়ে রেখে দেহকে দিয়েছে অবলম্বন। ঘাড় একদিকে হেলানো। ঠোঁটের কোণ আর সারা গালে হাসি ছড়িয়ে সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি যেন অবশ হয়ে যেতে লাগলাম। কী তীক্ষ্ণ ওর চাহনী আর প্রচন্ড মাদকতায় ভরা চোখদুটো। ওকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছেটা বহুকষ্টে দমন করে বললাম, আমার কাছে যদি একটি যাদুর কাঠি থাকত কি করতাম জান?

          জানি বৈকি। খুব ভাল করেই জানি। তোমাদের গ্রামের বাড়িতে পুকুরঘাট ঘেঁষে দাদুর কবরের পাশে একটি চালতে গাছ। আষাঢ় এলে সে গাছে ফুল ফোটে । সাদা সাদা ফুল। তার মাঝে আবার ম্লান হলুদ বর্ণের একটুকরো পরাগ ছড়ানো। আমার খোপায় সেই চালতে ফুল পড়িয়ে দেয়া তোমার অধরাই থেকে গেল আজ পর্যন্ত। যাদুর কাঠি পেলে তুমি.....

          হলোনা। তোমার খোঁপায় চালতে ফুল দিবো ঠিকই, তবে এ বেলায় নয়। যাদুর কাঠি থাকলে বিশাল কিছু দিতাম তোমাকে।

          কি গো সেটা?

          তোমার জন্য একটা ঘর বানাতাম অনেক দূরে। ঠিক চাঁদের দেশের কাছাকাছি। অমাবস্যারা যেখানে ডানা মেলতে পারেনা  রূপালী জোছনারা জেগে থাকে বলে। সেখানে গিয়ে প্রতিদিন একটি করে মালা গাঁথব তোমার জন্য। সদ্য কুড়িয়ে আনা জোছনার ফুলের মালা।  আমাদের বিশাল বারান্দা। বারান্দায় পায়চারি করতে করতে তুমি চুল শুকাতে দিয়েছো রোদেলা জ্যোৎস্নায়। বাতাসের মৃদু প্রলাপে তোমার  আধাভেজা চুলগুলো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে শুন্যে। আড়ালে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্যটুকু যে কতটা উপভোগ্য হতে পারে তা মনে হয় জগতের খুব কম পুরুষই আবিষ্কার করতে পেরেছে । রোজ রাতে কিছু মোম জ্বালিয়ে একটা স্বপ্নময় মুহূর্ত সৃষ্টি করব তোমার চারপাশে। চাঁদের আলোর সীমাহীন প্রাচুর্যে দীপ জ্বালানো যদিও বিলাসিতা তবে তোমার ভালবাসার কাছে এ তত্ত্ব নিতান্তই তুচ্ছ।  রূপকথার গল্পের রাজকন্যাদের মত বেশ আয়েশ করেই কারুকাজ করা বিশাল আয়নার সামনে নিজেকে সাজাতে বসেছ তুমি। শাড়ি পড়েছ সুচিত্রা সেনের মত। আমার পছন্দের নীল শাড়িটি। হাতে রেশমী চুড়ি। চুলে বেণী করেছ অনেক যত্ন করে। তোমার সামনেই হরেক প্রকার প্রসাধনী আর বিলাসী অলংকার। আগেই বলে রাখি তোমার কপালে টিপটি কিন্তু আমিই পড়িয়ে দিবো। রাত গভীর হলে দক্ষিণের জানালা মেলে তুমি শীতল করবে নিজেকে। খুব কাছ থেকে তখন দেখব তোমাকে। ভোর হব হব রাতে কিছু মায়াবী স্বপ্ন আঁকব তোমার চোখে, ভালবাসা আর মমতার বুননে লিখে যাব অজস্র কবিতা। শুধু তোমার জন্য।

         বউয়ের জন্য শুধু কবিতা লিখলে কি চলবে মহাশয়! বউ যে রাক্ষসপুরীর বাসিন্দা। কবিতায় পেট ভরবেনা।

         দিলে তো ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আমার রোম্যান্টিক কল্পনার মাঝে একটা কর্কশ কাক ঢুকিয়ে। ছলনাময়ীর ছলনা সর্বদা সুখকর নয়। কী সহজে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনল আমায়।

         কল্পনাগুলো বিবসনা-বিমূর্ত মানবীর মত। তাই এত মধুর মনে হয়। বাস্তবতায় মিথ্যের ফাঁদ পেতে রাখা কষ্টের।  তাই আমাদের বাস্তবিক হওয়াটাই কি জরুরী নয়?

         বেশ। যাক গে আমার শূন্যে গড়া বিশাল বারান্দা। স্বর্ণখচিত বিশাল দর্পণে চন্দ্রমুখীর মুখ দেখবোনা আর। বিষাদ জোছনা কি তারাভরা রাতে কারো মুখপানে চেয়ে লিখবনা ছন্দ-মাত্রাহীন সস্তা কোন কবিতা। এখন থেকে তুমি শুধুই পরম বাস্তবতা। লোকাল বাসে দুলে দুলে অফিসে যাব প্রতিদিন। পল্টনের মোড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভয়াবহ জ্যাম। কাঠপোড়া রোদ আর কালো ধোঁয়াকে সাথী করে পায়ে হেঁটেই চলে যাব মতিঝিল। রাস্তায় হাজারো অচেনা মুখের ভিড়ে তোমার মুখটি মনের পর্দায় ভেসে উঠবে বারবার। বসের ধমক সামলিয়ে অফিসের কাজ করতে করতে শেষ বিকেলে অনেক ক্লান্ত হয়ে যাব। খুব ইচ্ছে হবে তোমার কাঁধে একটু মাথা রাখি। অথচ তখন সবুজ রঙা কোন সেলফে ফাইলবন্দী আমার কর্পোরেট ভালবাসা। বাসায় ফিরার পথে সপ্তাহে অত্যন্ত দুটো দিন শাহবাগ নেমে যাব। ফুলের দোকানগুলোতে জোছনার ফুল পাবোনা জানি। তবে একগুচ্ছ গোলাপ, কয়েকটি চন্দ্রমল্লিকা কিংবা বেলী ফুলের মালা নিতে ভুল হবেনা। শুধুমাত্র বিশেষ রাতগুলোতে মোম জ্বলবে আমাদের ঘরে। অনেক সেজেগুজে এলোচুলে তুমি বসবে আমার কবিতার টেবিলে। মোমের আবছা আলোয় তোমাকে লাগবে প্রতিমার মত। খুব দূর থেকে তোমাকে দেখব আমি। কি চলবে তো?

    পিয়া কোন উত্তর দিলোনা। শুধু একটা রহস্যের হাসি হাসল। সে হাসির অর্থ বুঝার সাধ্য আমার নেই। শুধু ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম অপলক দৃষ্টিতে। আমার ভেতরে ভেতরে যে একটা পরিবর্তন হচ্ছে সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি। পুরো পৃথিবীটাকে এই মুহূর্তে কেন জানি অনেক মায়াবী মনে হচ্ছে। মায়ার খেলা খেলতে ইচ্ছে করছে আমার, কাউকে ভালবাসতে ইচ্ছে করছে খুব। পিয়াকে বললাম,  এমন রাতে এত দূরত্ব বজায় রেখে চলতে নেই। চল দূরত্ব গোচাই।

        ভয় হয়। যদি আগলে রাখতে না পার!

    হঠাৎ করে আমার রুমে আলো জ্বলে উঠল। নিয়ন আলোর ঝলকানিতে জোছনাগুলো হারিয়ে গেল নিমেষে। সেই সাথে পিয়াও। আমি পাগলের মত হন্ন হয়ে খুঁজতে শুরু করলাম ওকে। বাহিরের দিকে চোখ যেতেই চোখে পড়ল অন্ধকার নগরীতে আলোর ফোয়ারা নেমেছে। জোছনাগুলো তাই ছন্নছাড়া। বিষাদ ভর করেছে ওদের উপর। যেন এতিম হয়ে গেছে ওরা। চোখে পড়ল অনেক দূরে দুটি চোখ মিইয়ে যেতে বসেছে। দূরে সরে যাচ্ছে কেবল। আমি কান্না জুড়ে দিলাম।

        কী দোষ করেছিলাম পিয়া তোমার কাছে? তোমাকে তো আগলেই রাখতে চেয়েছিলাম। তবে কেন আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছ তুমি?

    চোখ দুটো মিইয়ে গেল একসময়। আবার একা হয়ে গেলাম আমি।

    ওয়ারড্রোবে পিয়ার শাড়িগুলো খুব যত্ন করে রাখা আছে। সেগুলোতে লেগে আছে ওর শরীরের গন্ধ আর গেঁথে আছে খন্ড-বিখন্ড অসংখ্য মধুর কিংবা বিরহী স্মৃতি। পিয়াকে তাই ভুলতে পারিনা। সবসময় মনে হয় খুব কাছেই আছে। 

advertisement