বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৭১

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

আর্তনাদ

সালেহ মাহমুদ

  • advertisement

    [ অনেক বছর আগে লেখা গল্প, 1996-1998 সময়ের লেখা। ]

    ক.সুত্রপাত
    বিরান এক প্রান্তরে আমি গুলিবিদ্ধ হই।
    ফেলে রেখে যায় ওরা আমাকে।
    আমি বুঝতে পারছি না আমি কি মরে গেছি না বেঁচে আছি।
    গায়ে চিমটি কাটার চেষ্টা করি। না পারি না।
    সমস্ত শরীর যেন পাথর হয়ে আছে।
    তবুও পাশ ফেরার চেষ্টা করি। পারি না।
    পিঠের নিচে ভেজা আঠালো পদার্থ জব জব করছে।
    আমি অনুভব করছি, তীব্রভাবে আমার ভেতর একটা অস্বস্তি চাউরে উঠছে।
    তাহলে কি আমি মারা যাই নি?
    একজন মৃত মানুষ কি কোন কিছু অনুভব করতে পারে?
    মৃত মানুষের কি কোন বোধশক্তি থাকতে পারে?
    আমার হাসি পায়। তা আমি কি করে জানবো?
    আমি তো আগে কখনো মারা যাই নি!
    তাহলে কি মৃত্যুর পর এ রকমই বোধ এসে ভর করে মানুষের ভেতর!
    কিন্তু কি করে জানবো?

    খ.দ্বিধা

    আমার সামনে দু’জন ফেরেশতা আসে।
    আমার ধারণা ওরা কেরামান কাতেবাইন।
    আসলে ওরা যে কেমন আমি বলে বোঝাতে পারছি না।
    কোন রকম তুলনা দেয়া চলে না।
    তাদের নিজস্ব একটা অবয়ব আছে অবশ্যই, সেটা আমি দেখছিও।
    কিন্তু বলে বোঝানোর মতো কোন আকার নেই ওদের।
    তবে তাদেরকে একটা শক্তি বলা যায়।
    অনেকটা কম্পিউটারের প্রোগামের মতো।
    দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।
    আউটপুট পাওয়া যায়।
    আমি ওদেরকে দেখছি।
    ওরা আমার কাছে এসে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়।
    হয়তো ওদের ইনফরমেশনে কোন গ্যাপ রয়ে গেছে।
    না হলে ওরা দ্বিধাগ্রস্ত হবে কেন?
    আমি ভাবছি এই বুঝি আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে।
    কিন্তু না, তারা একজন আরেকজনের দিকে তাকায়।
    কিন্তু বোঝার চেষ্টা করছে যেন।
    কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে না পেরে স্থির হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে কোন কিছুর।

    গ. মালাকুল মওত

    এমন সময় হঠাৎ করে একটা প্রবল গর্জন কিংবা হুংকার কিংবা একটা সর্বনাশা শব্দ ভেসে আসে কোথা থেকে যেন।
    মনে হচ্ছে সব কিছু ভেঙ্গেচুড়ে ছুটে আসছে কিছু একটা।
    আমার ভেতর প্রচণ্ডভাবে ভয় এসে ভর করে।
    আমি থরথর করে কেঁপে উঠি।
    আমার শরীর কি সত্যি সত্যি কেঁপে উঠলো।
    আমি চোখ মেলে দেখতে চেষ্টা করি।
    কিন্তু পারি না।
    কিন্তু খেয়াল হয় আমি সব কিছুই দেখতে পাচ্ছি।
    আশ্চর্য! আমি দেখতে পাচ্ছি কি করে?
    আমার চোখ তো বন্ধ!
    আমি দেখতে পেলাম-একটা ভয়ানক শক্তি যেন আমার সামনে এসে অপেক্ষা করছে।
    কে এই শক্তি?
    তাহলে কি মালাকুল মওত!
    হবে হয়তো বা।
    আমি এতক্ষণে বুঝতে পারছি আমি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত পৌঁছে গেছি- মৃত্যুবরণ করি নি।

    ঘ. ফ্লাশ ব্যাক

    ওরা বেশ কয়েকজন আমাকে ধরে নিয়ে এলো।
    তখন কেবল সন্ধ্যা হয়েছে।
    আমি বন্ধুর বাসা থেকে একটি ডকুমেন্টরী ছবি দেখে বাসায় ফিরছিলাম।
    এজিবি কলোনি থেকে আমার বাসার দূরত্ব মাত্র মাইল দেড়-দুই হবে।
    রিকশা খুঁজতে খুঁজতে কমলাপুর রেল ষ্টেশনের দিকে যাচ্ছিলাম।
    মাঝখানে একটু আলো-আঁঁধারি মতো একটা জায়গা ক্রস করছি।
    এমন সময় আমার ঠিক সামনে এসে একটা সাদা মাইক্রোবাস থামল।
    গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামলো চারজন।
    আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওরা আমাকে টেনে নিয়ে তুললো গাড়িতে।
    আম চিৎকার করার কথাও ভুলে গেলাম ঘটনার আকস্মিতায়।
    যখন বুঝতে পারলাম কিডন্যাপ হয়েছি-
    তখন ওরা আমাকে নিয়ে চলে এসেছে বহুদূর।
    তারপর এই নির্জন প্রান্তরে এসে আমাকে গুলি করে ফেলে চলে যায়।
    কিন্তু কেন তারা আমাকে গুলি করল?
    আমি কিছুই জানি না।
    আমাকে তার কিছুই বলেনি।
    শুধু ধরে নিয়ে এলো আর গুলি করে ফেলে চলে গেলো
    অনেকটা গরু জবাই করার মতো।
    যেন এটাই স্বাভাবিক।
    একজন মানুষকে অকারণে খুন করে ফেলে রাখাটা যেন কোন ব্যাপারই নয়।

    আচ্ছা, আমি কি আমার হত্যাকারীদের মুখোমুখি হতে পারি না!
    হ্যাঁ, সম্ভবতঃ পারি!
    সম্ভবতঃ আমি এখন সব জায়গায় যেতে পারি।
    একটু চেষ্টা করে দেখি না কেন!
    হয়তোবা পৃথিবীর যে কোন জায়গায় মুহূর্তের মাঝে চলে যাওয়া আমার জন্য কোন বিষয়ই নয় এখন।
    আমি আমার দেহ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম।
    আশ্চর্য, কোন রকম কষ্ট হলো না আমার।
    তাহলে আমার দেহটা কি শুধুই খোলস?
    পরিধেয় বস্ত্রের মতো?
    ঠিক তাই হবে।
    ঠিক কাপড় পাল্টানোর মতো দেহের খোলস থেকে বেরিয়ে এলাম আমি।
    তাকিয়ে দেখলাম আমার দেহটা এখনো নিশ্চল পড়ে আছে- সেই নির্জন প্রান্তরে।
    আচ্ছা, আমার হত্যাকারীদের আমি কি করে চিনবো?
    যে চারজন আমাকে টেনে গাড়িতে তুলেছিল- তাদেরকে আমি চিনতে পারবো।
    কথাটা ভাবতেই ওদের চেহারা আমার সামনে ভেসে উঠতে শুরু করে জলতরঙ্গের ভেতর থেকে।
    মনে হয় যেন অনেক দূর থেকে অষ্পষ্ট ছবিগুলো ভাসতে ভাসতে আমার সামনে এসে হাজির হলো।
    আমি অবাক হলাম।
    না চাইতেই সবকিছু আমার সামনে এসে হাজির হচ্ছে কিভাবে?
    তাহলে কি আমি যা দেখতে চাইবো তাই দেখতে পারবো এখন!
    ভাবলাম, পরীক্ষা করে দেখি না কেন!
    ড্রাইভারের চেহারাটা দেখতে চাইলে কি দেখতে পারবো!
    আমি তো তার পিছন দিকটাই দেখেছি শুধু।
    ভাবতেই একটা ছবি আমার সামনে আগের মতোই জলতরঙ্গের ভেতর থেকে ভেসে উঠলো।
    আমি যুগপৎ আনন্দ এবং রোমাঞ্চে শিহরিত হই।

    ঙ. পোস্ট মর্টেম

    অনেক মানুষ এসে জড়ো হয়েছে আমার চারপাশে।
    এরা কখন এলো?
    আমি খেয়ালই করতে পারিনি।
    অথচ জনা পঞ্চাশেক লোক ইতিমধ্যেই আমার দেহকে ঘিরে ধরেছে।
    তারা ফিসফিস করে কথা বলছে।
    কেউ আমর দেহ স্পর্শ করে দেখার চেষ্টা করছে না।
    সবার মুখে কেমন একটা আতঙ্ক।
    আমার কৌতুহল হলো।
    ওরা এত আতঙ্কিত কেন?
    আমি ওদের ভিড়ে মিশে গেলাম।
    কেউ একজন বলছে, মনে হয় লোকটার সাথে ওদের কোন শত্রুতা ছিল।
    অপরজন বলছে, না এ রকম রেষারেষি থাকলে তো চেহারায় একটু হলেও রুক্ষ্মতার কিংবা ভয়ের ছায়া থাকে। অথচ দেখো, লোকটার চেহারা কি নিষ্পাপ!
    পিছন থেকে কে একজন ফিসফিস করে বলে উঠল এসব হচ্ছেটা কি আজকাল। বলা নেই কওয়া নেই, যেখানে সেখানে লাশ পড়ে থাকবে! দেশটা যাচ্ছে কোন দিকে?
    জবাবে কে একজন ততোধিক ফিস ফিস কণ্ঠে বলে উঠল, আসলে স...ব ঐ ডাইনীটার কাজ। ড্রাকুলা পড়েছেন, ড্রাকুলা? সেই ড্রাকুলার প্রেতাত্মা এসে ভর করেছে ঐ ডাইনীটার কাঁধে।
    পাশ থেকে ভয়ে কম্পমান কে একজন বলে উঠল ফিসফিসিয়ে আসেত্ম বলুন। নিশ্চয়ই এখানেও ডাইনীটার অনুচর রয়ে গেছে।
    আর একজন বলে উঠল থাক না তাতে কি? যদি ব্যাপারটা সত্যি হয়, তাহলে ডাইনীটাকেই আগে খতম করা হোক।
    তার কথা শেষ হতে না হতেই একটা বলিষ্ঠ তরুণ কণ্ঠ গগনবিদারী শব্দে চেঁচিয়ে উঠলো, অপমৃত্যুর বিচার চাই।
    সাথে সাথে অন্যরা সুর মেলালো, বিচার বিচার বিচার চাই অপমৃত্যুর বিচার চাই।

    লোকগুলোর কথা সূত্র ধরে আমি ডাইনীটাকে দেখতে চাইলাম।
    ঐ তো সে বসে আছে তার আপন কামরায়।
    তার হাতে কিছু কাগজপত্রসমেত একটা ফাইল।
    সে ফাইলটা উল্টে পাল্টে দেখছে আর ক্রুর হাসছে।
    হঠাৎ কি ভেবে উঠে দাঁড়ালো সে।
    স্বগতোক্তি করলো, ওদেরকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। যাই, ওদের অপারেশনের খোঁজ-খবর নিয়ে আসি একটু।
    সে উঠে তার ষ্পেশাল ড্রয়িং রুমে এসে ঢুকলো।

    আরে, এ যে দেখছি আমার হত্যাকারীগণ।
    তাহলে কি সত্যি সত্যি ডাইনীটার ইশারায় আমাকে হত্যা করা হয়েছে?
    আমার হাত নিশপিশ করে উঠলো ওদের দেখে।
    কিন্তু আমার তো কোন কিছু করার ক্ষমতা নেই।
    আমি শুধু দেখে যেতে পারি!
    আমি এক কোণে সরে গেলাম।
    সবার দিকে তাকালাম।
    হ্যাঁ, পুরো গ্রুপটাই আছে এখানে।
    ডাইনী এসে নেতা গোছের ছেলেটার পাশে বসল।
    চশমা খুলে শাড়ীর খুঁট দিয়ে মুছতে মুছতে বলল, বল দেখি তোমাদের আজকের অপারেশনের খবরাখবর।
    নেতা গোছের ছেলেটা গলা সামান্য খাকারি দিয়ে শুরু করল।
    আজ আমাদের টার্গেট ছিল চারটা ষ্পট।
    কমলাপুর এরিয়া, সংসদ ভবন এরিয়া, মিরপুর এবং মোহাম্মদপুর।
    এর মধ্যে একটা ছাড়া বাকী সবকটি ব্যর্থ হয়েছে।
    শুধুমাত্র কমলাপুর এরিয়ার কাজটা শেষ হয়েছে।
    কেন? বাকীগুলো হলো না কেন?
    প্রচণ্ড রাগের সাথে বললো ডাইনী।
    আমরা চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সুযোগ পাইনি।
    নগরীর মানুষজন আজকাল বেশ সচেতন হয়ে গেছে। রাস্তাঘাটে সাধারণতঃ একাকী কেউ চলে না।
    তাতে কি হয়েছে? রাস্তার মোড়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে পারলে না?
    সাহস পাইনি। ভয়ে ভয়ে বললো গ্রুপ লিডার।
    সাহস পাওনি, নাকি টাকা কম পড়েছে? যাও আজকে থেকে মাথা প্রতি পাঁচ লাখ টাকা পাবে। তবু আমি রক্ত চাই। লাশ চাই। বুঝেছো। লাশ না হলে আমার মুখে খাবার রোচে না। যাও আজকের মতো তোমরা চলে যাও। আর গোপাল, তুমি ওদের বিদায় করে দিয়ে আমার কামরায় চলে এসো, কথা আছে।
    বলে ভিতরে চলে গেলো ডাইনী।
    আমি এতক্ষণে জানতে পারলাম ঐ লোকটার নাম গোপাল।
    সবাইকে বিদায় করে গোপাল এসে ঢুকলো ডাইনীর খাস কামরায়।
    দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে দিলো সে।
    ডাইনী তার অপেক্ষাতেই ছিলো।
    ডাইনী বিছানায় শুয়ে পড়ে চশমাটা খাটের প্রান্তে রাখতে রাখতে বললো,
    আয় আকাটা আয়, তাজা রক্তের ঘ্রাণ নাকে এলে আমার ক্ষুদাটাও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। নে আমার ক্ষুধাটা মেটা আগে, তারপর অন্য কথা।

    আমি সেখান থেকে চলে এলাম।
    এ রকম দৃশ্য দেখতে আমার ইচ্ছে হলো না মোটেও।
    কিন্তু এখন আমি কি করি।
    সবাইকে তো সতর্ক করা দরকার।
    তা না হলে প্রতিদিন আমার মতো নিরপরাধ মানুষের অপমৃত্যু সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।
    কি করি আমি, কি করি!
    আমার অস্থির লাগছে।
    আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো।
    আমি চলে এলাম বাইতুল মোকাররম মসজিদে।
    মসজিদের ছাদে উঠে দু’হাত মুখের সামনে একত্রিত করে সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলাম,
    শোন নগরবাসী।
    এক ভয়াবহ ডাইনীর বিষাক্ত ছোবলের শিকার হতে যাচ্ছো তোমরা....। শোন...

advertisement

  • তানি হক
    তানি হক একদমই ভিন্নরকম উপস্তাপনার একটি গল্প পড়লাম..অনেক অনেক ভালো লাগলো ভাইয়া গল্পটি ..আরো বেসি বেশি ভালো লাগলো যে ..আপনার বাড়ি এসে খালি হাতে ফিরতে হলনা তাই ..সুভেচ্ছা আর ধন্যবাদ
    প্রত্যুত্তর . ২ নভেম্বর, ২০১২
    • সালেহ মাহমুদ ধন্যবাদ তানি হক। কিছু লিখতে পারি নি এই সংখ্যায়ও, সেই তাড়নায় এ কাজটা করলাম। পুরনো গল্প ব্লগে চালিয়ে দিলাম। পাঠ ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
      ২ নভেম্বর, ২০১২
  • লুতফুল বারি পান্না
    লুতফুল বারি পান্না মৃত্যুপরবর্তী জীবনের হাইপোথিসিসটা ভাল লাগল। দুর্দান্ত লেখা।
    প্রত্যুত্তর . ৩ নভেম্বর, ২০১২
  • নৈশতরী
    নৈশতরী আমি পুরা গল্পটি পড়লাম, আসলে কবিতা বলতে মন চাইছে না তাই গল্পই বললাম ! আর আমার মনে হয়েছে, লেখক রূপক ভাবে বা কোনো এক দুস্কৃতি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নির্মমতা গল্পের অদলে আড়াল করে বোঝাতে চেয়েছে ! বলা যায় সে ক্ষেত্রে লেখক পুরোপুরি সার্থক ! আমার অনুমান ভুলও হতে পারে....  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৫ নভেম্বর, ২০১২
    • সালেহ মাহমুদ ধন্যবাদ নৈশতরী। আসলে এটা গল্পই, কোথাও কোথাও কবিতার মত মনে হয়, এই আর কি। এটা একটা সময়ের সাক্ষী। বাংলাদেশ যে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে হয়তো এর সামান্য স্বরূপ তুলে ধরতে পেরেছি।
      ৬ নভেম্বর, ২০১২