কয়েকটি কুকুর অথবা মানুষ

সালেহ মাহমুদ UNION ALL SELECT NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL#
০৪ ফেব্রুয়ারী,২০১২

মাঝ রাতে হঠাৎ বেজে উঠল টেলিফোন। আমরা তখনও ঘুমাইনি। শুয়ে শুয়ে গল্প করছিলাম। কি সব আজগুবি আজগুবি গল্প। মাঝে মাঝেই আমরা এমন করি। বিবাহিত জীবনের এই একটা ব্যাপার বেশ উপভোগ করিছ আমরা। কোন প্রসঙ্গ ছাড়াই ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করি। এক আশ্চর্য মুগ্ধতায় তরতর করে কেটে যায় সময়গুলো। মনে হয় রাত এত ছোট কেন?

সেদিনও আমরা তেমনি গল্প করছিলাম। ডিম লাইটের নীলাভ আলো ঘরময় এক স্বপ্নের আবেশ রচনা করেছিল। বউ আমার গলা জড়িয়ে ধরে আবৃত্তি করে উঠল, ‘এমন পিরিতি কভু দেখি নাই শুনি, পরানে পরান বান্ধা আপনা-আপনি’।

আমি কণ্ঠ মিলালাম, ‘দুহু কোঁড়ে দুহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া, আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া’।

এমন সময় বেজে উঠল টেলিফোন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম একটার কিছু বেশী বাজে। এ সময় আবার ফোন করলো কে? বড্ড বেরসিক তো বেটা? এই রাত দুপুরে টেলিফোনটা না করলেই কি নয়? ভাবতে ভাবতে বিছানা ছেড়ে উঠলাম আমি। রিসিভার কানে তুলতেই ওপর থেকে ভেসে এলো একটা পুরুষ কণ্ঠ, ‘হ্যালো, এটা কি ....নাম্বার?’

বললাম, ‘হ্যাঁ। কে বলছেন?’

‘আমাকে আপনি চিনবেন না। আপনি কি মিস্টার রাজিব?’

‘জ্বি, কিন্তু আপনি কে বলছেন? কোথেকে?’ লোকটার কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারলাম একে আমি চিনি না। এই রাত দুপুরে একজন অপরিচতি লোক আমাকে খুঁজতে যাবে কেন? আমার মাথার ভেতর চিন্তার ঘুর্ণিপাক বয়ে যায়।

‘আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি ঢাকা মেডিক্যাল থেকে বলছি। রওশনকে চিনেন আপনি?’

‘হ্যাঁ চিনি। ও আমার বন্ধু। দেখা নেই বেশ কিছুদিন। কিন্তু কেন, কি হয়েছে?’ একটা অজানা আশঙ্কায় আমার মন কেঁপে ওঠে।

লোকটা এবার খুব ব্যস্তভাবে বলে ওঠে, ‘উনি এ্যাকসিডেন্ট করেছেন। ঢাকা মেডিক্যালে আছেন এখন।’

আমার বুকটা ধড়াস করে ওঠে। উঁচু গলায় বলে উঠি, ‘কি এ্যাকসিডেন্ট করেছে? কোথায়? কিভাবে? এখন অবস্থা কি?

‘রোড এ্যাকসিডেন্ট। অবস্থা খুব ভালো না। প্লিজ তাড়াতাড়ি আসুন। ওয়ার্ড নাম্বার...’

বলেই টেলিফোন ছেড়ে দেয় লোকটা। তাড়াহুড়ার ভিতর লোকটা ওয়ার্ড নাম্বার যে কত বললো খেয়াল করতে পারলাম না। তার নামটাও জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেলাম। আমরা কেমন অস্থির লাগতে লাগলো। মুনিয়াকে বললাম, ‘কি করি বলতো! রওশন নাকি এ্যাকসিডেন্ট করেছে!’

মুনিয়া উঠে এল বিছানা থেকে। আমার কাঁধে হাত রেখে বললো, ‘কোন রওশন? তোমার সেই ভার্সিটি ফ্রেন্ড?’

‘হ্যাঁ।’ মাথা দুলিয়ে সায় দিলাম আমি।

‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কি করবো? এ রকম সংবাদে ঘর থেকে বেরুনোই উচিত। কিন্তু রাত তো কম হলো না। কি যে করি!’

মুনিয়া বললো, ‘এই রাতে বেরিয়ে কাজ নেই। এখন ঘুমাও, সকালে যেয়ো।’

মুনিয়ার কথা শুনে আমার ভীষণ খারাপ লাগলো। এ কেমন কথা বলছে সে! আমার বন্ধু হাসপাতালে নিঃসঙ্গ অবস্থায় গড়াগড়ি যাবে আর আমি সব কিছু জেনেও চুপ করে ঘরে বসে থাকব? ভাবতেই আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। ভাবি, কি জঘন্য চিন্তা! এখন যদি আমি না বের হই তবে সারা রাত আমার ঘুম হবে না, তাও জানি আমি। তারপরও বউয়ের কথা শুনে আমি থমকে গেলাম। তাৎক্ষণিক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না।

মা’র রুমের দরজায় শব্দ হলো। বেরিয়ে এলেন মা। আমাদের দরজার সামনে এসে বললেন, ‘কার ফোন রে রাজু?’

‘আমার ফোন মা।’

‘কে করলো? কোন খারাপ খবর-টবর না তো?’

‘হ্যাঁ মা। রওশনকে চিনতেন না আপনি! আমার বন্ধু রওশন। ও নাকি এ্যাকসিডেন্ট করেছে। ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছে। যাওয়া দরকার হাসপাতালে। কি যে করি!’

বলতে বলতে দরজা খুলে দিলাম আমি। মা দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে। চির উৎকণ্ঠিত মা আমার। এই মাঝ রাতেও তার চোখ এড়াতে পারে না কিছুই। ঘুম ঘুম চোখ তাঁর। দরজা খুলতেই চোখ কুঁচকে ওঠেন তিনি। তাঁর পেছনে জমাট বেঁধে আছে অন্ধকার। বারান্দার বাতিটা কখন নিভানো হয়েছে কে জানে! এ বাতিটা নিভালেই একেবারে ভুতুড়ে হয়ে যায় সবকিছু। দরজার বাইরে হাত বাড়িয়ে জ্বালিয়ে দিলাম বাতিটা। মা বললেন, ‘খবরটা কে দিলো?’

‘একটা লোক। আমি চিনি না। মনে হয় রাসত্মা থেকে তুলে নিয়েছে রওশনকে।’

মা’র মুখে সন্দেহের ছায়া দেখতে পেলাম আমি। মা বললেন, ‘কে না কে ফোন করল আলস্নাই জানে। ব্যাপারটা সাজানোও তো হতে পারে। যদি বদ মতলব থাকে কারো! তুই এক কাজ কর, এখন ঘুমা। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে হাসপাতালে যাইস।’

বলেই মা চলে গেলেন তাঁর রুমে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম স্থানুর মতো। মুনিয়া বললো, ‘আম্মা ঠিকই বলেছেন। তুমি সকালেই যাও।’ আমি মুনিয়ার মুখের দিকে গভীরভাবে তাকালাম। কি ভাবলাম বলতে পারি না। একেবারে চুপ হয়ে গেলাম আমি। কোন সাড়া-শব্দ নেই কোথাও। বাইরে রাত পোকার একটানা গুঞ্জন। দূরে কোথায় যেন দীর্ঘ লয়ে ডেকে উঠল একটা কুকুর। মনে হলো কাঁদছে কুকুরটা। বারান্দায় কিছু একটা খচমচ করে উঠল। তাকিয়ে দেখি একটা ভীষণ কালো বেড়াল চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। সে কি দৃষ্টি বেড়ালের! আমার ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। বেড়ালটাকে তাড়িয়ে দরজা লাগিয়ে দিলাম।

সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আমি। মুনিয়াকে বললাম, ‘আমি হাসপাতালে যাব। তুমি দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়। কি পারবে না এক একা থাকতে?’

মুনিয়া মাথা নীচু করে ফেলল। কিছু বলল না।

সে জানে বলে লাভ নেই। আমি যাবই। তারপরও সে মাথা তুলে বলল, ‘আমার কথা না হয় বাদই দিলাম। আম্মার কথা শুনলেও তো পারো। সকালেই যাও, প্লিজ।’

ওর কথায় যুক্তি থাকলেও আমার যুক্তি আমাকে বের হতে বলছে। আমি তাকে বললাম, ‘দ্যাখো, রওশন আমার বন্ধু। ও এ্যাকসিডেন্ট করেছে জানার পরও যদি না যাই তাহলে কেমন বিশ্রী হয়ে যায় না ব্যাপারটা? আমি ছাড়া ওর কাছের মানুষ আর কেউ খবর পেয়েছে কি না কে জানে? খোদা না করুক যদি একটা কিছু হয়ে যায়, তবে? একটু থামলাম। মাথা নেড়ে বললাম, ‘না আমি যাবই। তুমি আজ রাত একটু কষ্ট কর লক্ষ্যটি!’ ওকে আদর করে বেরিয়ে গেলাম আমি।

মধ্য রাতে ঢাকা এক ভিন্ন জগৎ। একেবারে নীরব পথ-ঘাট। কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। নেই কোন হই-হলস্না। সমগ্র শহর যেন নিমগ্ন হয়ে আছে গভীর ধ্যানে। কি অপার শামিত্ম চারিদিকে। ঘুমিয়ে আছে ঢাকা শহর। ঘুমিয়ে আছে শহরের সমস্ত জীবন।

অনেকদূর হাঁটার পর রিক্সা পেলাম। রিক্সা ছুটে চলল হাসপাতালের দিকে। যেখানে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে রওশন। আমার বন্ধু রওশন। ওর সাথে আমার পরিচয় হয় ভার্সিটিতে। আমরা একই সাবজেক্টে ভর্তি হয়েছিলাম। ক্লাস শুরুর মাস ছয়েকের ভেতরই তার সাথে জমে যায় আমার। ও ছিল খুব ভালো ছাত্র। আমি যদিও খুব ভালো ছাত্র ছিলাম না তবু ওর সাথে আমার কোথায় যেন মিল ছিল খুব।

রওশনের ভেতর একটি শিল্পী মন ছিল, যা আমাকে ভীষণ টানতো। ও খুব সুন্দর করে লিখত। কলম চালালেই তা হয়ে উঠতো শিল্পিত-সুন্দর। আমার খুব ভালো লাগত। তা ছাড়া আবৃত্তি, অভিনয়েও ছিল খুব পারদর্শী, চাপাবাজিতেও কিছুমাত্র কম ছিল না সে।

একবার হলো কি, বিভাগীয় ক্রিকেট টুর্ণামেন্টের টিমের জন্য নাম চাওয়া হলো। সেটা ফার্স্ট ইয়ারের ঘটনা। আমার মুখ ভর্তি চাপদাড়ি তখন। গোঁফও বেখাপ্পা। স্যারের কাছে গিয়ে রওশন আমার ব্যাপারে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অনেক কিছু বলল। বলল আমি নাকি দেখতে সিধুর মতো, খেলিও তেমন। স্যার বললেন, ‘তাই নাকি? কই, নিয়ে এসো তো তাকে।’

আমি বরাবরই একটু মুখচোরা। স্যারদের কাছ ঘেঁষতাম না খুব একটা।

রওশন আমাকে বললো, ‘স্যার তোকে ডাকছে।’

আমি স্যারের কাছে গেলাম। স্যার বললেন, ‘এই যে সিধু শোন। কাল সকাল আটটায় জগন্নাথের মাঠে থাকবে।’

আমি প্রথমে ঠিক বুঝতে পারলাম না স্যার আমাকে সিধুই বলছেন কেন আর জগন্নাথের মাঠেই বা যেতে বলছেন কেন? বললাম, ‘ওখানে কেন স্যার?’

স্যার বললেন, ‘প্র্যাকটিস করতে হবে। ক্রিকেট প্র্যাকটিস। আমি শুনেছি তুমি খুব ভালো খেলো। স্কুল লীগও নাকি খেলেছো। খুব ভালো হলো, অন্ততঃ একজন খেলোয়াড় তো পাওয়া গেলো। তো ঠিক আছে, সময়মত চলে আসবে কিন্তু।’ বলেই স্যার বিদায় দিলেন।

আমি কিছুই বলতে পারলাম না স্যারকে। ওদিকে স্যার বিশ্বাস করে বসে আছেন আমি খুব ভালো খেলি। এখন যদি বলি যে আমি আসলে খেলতে পারি না, তবে সেটাকে স্যার বিনয় ভেবে বসবেন। কি বিপদে যে পড়লাম! হাতে গোনা কয়েকদিন ছাড়া আমি ক্রিকেট খেলি নি। অথচ স্যারের কাছে রওশন আমার ব্যাপারে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে কত কি বলেছে আলস্নাই জানে। আমি কিছুই বলতে পারলাম না ওকে।

যাই হোক, পরের দিন সকালে জগন্নাথের মাঠে গিয়ে উপস্থিত হলাম। প্যাড-ট্যাড পড়ে নামলাম ব্যাট হাতে। বোলিং শুরু করল যে ছেলেটি সে সত্যি সত্যি স্কুল টিমে খেলত। কলেজে পড়ার সময় তার ডাক পড়তো বিভিন্ন টিমে খেলার জন্য। সে ছিল মিডিয়াম ফার্স্ট বোলার। সে যখন প্রথম বলটা ছুঁড়ল তখন আমি দেখতেই পেলাম না বলটা কোন দিক দিয়ে আসছে। সাইড স্ক্রিণ ছাড়াই প্র্যাকটিস করছিলাম বলে হয়তো এমনটি হয়েছিল। (অবশ্য কোনদিন সাইড স্ক্রিণ লাগিয়ে ক্রিকেট খেলার দুর্ভাগ্যও আমার হয় নি) আমি কিছুই দেখলাম না, তারপরও অন্ধের মতো ব্যাট চালালাম। আর সেটাই আমার জন্য বর হয়ে দেখা দিল। ব্যাটের গা ছুঁয়ে বল উড়ে চলে গেলে মাঠের বাইরে। আমি নিজেও হা হয়ে গেলাম ব্যাপারটায়। স্যার দৌড়ে এসে আমাকে পিঠ চাপড়ে বাহবা জানালেন। রওশন ওরা চিৎকার করে বলে উঠল, ‘কিরে তুই তো সত্যি সত্যি সিধু হয়ে গেলি!’

এর তিনদিন পরেই গ্রম্নপ পর্যায়ের প্রথম ম্যাচ। ওয়ান ডাইনে নামলাম। প্রথম উইকেট পড়েছিল মাত্র সাত রানে। আমি ভয়ে ভয়ে ব্যাট হাতে ক্রিজে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম আজ আমার জারিজুরি বস ফাঁস হয়ে যাবে। হলোও তাই। দুটো বল ঠেকালাম কোন রকমে। পরের বলটা কিন্তু আমি চোখেই দেখলাম না। চোখ বন্ধ করে চালালাম ব্যাট। ব্যাটে বল লাগল ঠিকই, কিন্তু বল মাঠের বাইরে না গিয়ে সোজা আকাশে উঠে গেল। আমি হা করে দেখলাম উইকেট কিপার দৌড়ে এসে ঠিক আমার সামনে থেকে লুফে নিল বলটা। এরপর থেকেই আমার নাম হয়ে গেল সিধু। আর এ নামের কৃতিত্ব রওশনের। ভার্সিটির যেখানেই যেতাম সেখানেই অন্ততঃ এ নামে একটা ডাক শুনতামই।

হঠাৎ একটি বাঁক নিল রিক্সা। আমি বেসামাল শরীরটা একটু সামলে নিলাম। কয়েকটা কুকুরের রাগী ঘর ঘর আওয়াজে তাকালাম ফুটপাতের দিকে। একটা দুর্বল কুকুরকে চারদিক থেকে ঘিরে আছে কয়েকটা সবল কুকুর। দুর্বল কুকুরটা মাটির ওপর নুয়ে পড়ে যেন অনুনয় বিনয় করছে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। হঠাৎ একটা ফাঁক দেখে দৌড় দেয় সে। আর সাথে সাথে অন্য কুকুরগুলো হামলে পড়ে তার ওপর। কামড়ে কামড়ে ক্ষত-বিক্ষত করতে থাকে দুর্বল কুকুরটাকে। আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়। করুণা হয় কুকুরটার ওপর।

আমরা রিক্সার মাত্র টিকাটুলী পার হলো। বামে বলধা গার্ডেন। এখানে একবার এসেছিলাম রওশন আর তানজিলাকে নিয়ে। তানজিলা ছিল আমাদের ক্লাসমেট এবং রওশনের প্রেমিকা। ওদের প্রেম-পর্বের সাথে আমার খানিকটা সম্পর্ক ছিল। ওরা প্রেম শুরু করেছিল আমার হাত ধরেই। তানজিলা, হাসনুবা, আফরোজা, রওশন, আমি আর সুমন যদিও একই সাথে চলাফেরা করতাম ক্লাসের ভেতর-বাইরে, তবুও তানজিলা প্রথম পথম রওশনের সাথে অতটা ফ্রি হতে পারেনি। রওশনের প্রতি দুর্বলতার কারণেই এমনটি হতো তার। তানজিলা যে রওশনকে পেতে চায় সে কথাটাও আমাকেই বলে দিতে হয়।

তানজিলার কথা মনে হতেই সেই ক্যাসেটটার কথা মনে পড়ে গেল আমার। তানজিলার গিফ্ট করা একটা গানের ক্যাসেট কী দূর্দান্ত দস্যুর মতো তছনছ করে দেয় আমাদের বন্ধুত্ব! ভাবতেই আমার ভয় লাগে।

সেদিন ক্লাস ছিল দশটায়। আমি ডিপার্টমেন্টে গেয়ে দেখি সবাই দাঁড়িয়ে আছে। ক্লাস হচ্ছে না। রওশন দাঁড়িয়ে কথা বলছে তানজিলার সাথে। আমি ওদেরকে হ্যালো করলাম। তানজিলা ক্লাসে চলে গেলে দেখলাম রওশনের হাতে একটা প্যাকেট। দেখতে চাইলাম আমি। রওশন প্যাকেট খুলে ক্যাসেটটা দিল আমাকে। নিয়াজ মোহম্মদের গানের ক্যাসেট। আমি গানের তালিকা দেখতে লাগলাম মনোযোগ দিয়ে। জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজো আমি...।

এরই মাঝে ক্লাসের আরো অনেকে এসে জড়ো হয়েছে সেখানে। আমি ক্লাসরুমে যাব বলে ক্যাসেটটা রওশনের হাতে ফিরিয়ে দিলাম। রওশন কার সাথে যে কথা বলছিল। সে আমার হাত থেকে অন্যমনস্কভাবে ক্যাসেটটা নিল। আমি চলে গেলাম।

তারপর দিন ক্লাসে আসতেই রওশন আমার কাছে ক্যাসেটটা চাইল। আমি ভাবলাম সে দুষ্টামি করছে। বললাম, ‘ক্যাসেট তো তোকে দিয়ে দিয়েছি।’

রওশন বলল, ‘না, তুই দেসনি। প্লিজ দে ক্যাসেটটা, এখনো আমি শুনিইনি।’

আমি তখনও ভাবছি দুষ্টামি করছে রওশন। আমি তো তাকে ক্যাসেটা দিয়েই দিয়েছি। তারপরও যখন সে চাইছে তখন এটাকে দুষ্টামি ছাড়া আর কি-ইবা ভাববো । আমি হেসে ফেলে বললাম, ‘আমি তো তোর হাতেই দিলাম। সত্যি সত্যি আমার কাছে নেই ওটা।’

এবার রওশন সিরিয়াস হয়ে বললো, ‘না রাজিব ফাইজলামি করিস না। ক্যাসেটটা দিয়ে দে।’

ওর কথা বলার ধরণ দেখে আমি খুব অবাক হলাম। ও এত সিরিয়াস হবে ভাবিনি। আর আমিও তো জানি ক্যাসেটটা আমি নেই নি। ওর হাতেই দিয়েছিলাম। আমি তাকে বললাম, ‘বিশ্বাস কর রওশন আমি তোর ক্যাসেট নেই নি। তুই হয়তো অন্য কাউকে দিয়েছিস। ভেবে দেখ্ ভালো করে।’

রওশন এবার বেসামালভাবে বলে ফেললো, ‘ধ্যাৎ। কি ভাববার কথা বলছিস তুই আমাকে? তুইই ভেবে দেখ ক্যাসেটটা দিবি কি না?’

আমি অপমান বোধ করলাম এবার। গম্ভীরভাবে বললাম, ‘আমাকে তুই বিশ্বাস করতে পারিস।’

রওশন বিশ্রী মুখভঙ্গী করে বললো, ‘রাখ তোর বিশ্বাস। তোর বিশ্বাসের খেতায় আমি পেশাব করি।’ বলেই চলে গেলো। ওর বলার ভঙ্গীটা এমন কদাকার ছিল যে, আমার কান্না আসতে চাইলো।

এরপর থেকে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয় রওশন। তানজিলাও এড়িয়ে চলতে শুরু করে আমাকে। আমার যে কি খারাপ লাগতে শুরু করলো ব্যাপারটায়, তা বলে বোঝাতে পারব না। আমি সাধারণতঃ কখনো কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করি না। তারপরও যদি কেউ বিনা কারণে আমার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে তবে তার চেয়ে বড় দুঃখের ব্যাপার আর কি হতে পারে?

সুমন একবার রওশনের সাথে আমার ব্যাপারটা মিটমাট করে দিতে চাইলো। কিন্তু রওশনের জেদের কারণেই তা আর হলো না। আমি খুব বাজে সময় কাটাতে লাগলাম। তার সাথে কি হয়েছে কেউ এ কথা জিজ্ঞেস করলে পাশ কাটিয়ে যাই। এটা এমন একটা ঘটনা যে কাউকে বলাও যায় না। কি বিশ্রি ব্যাপার, যেখানে একসাথে গলাগলি করে চলাফেরা করতাম, যেখানে একজন আর একজনকে দেখলেই পাশ কাটিয়ে যাই।

আমার বুকের ভেতর কষ্ট দাপাদাপি করে। আমার ইচ্ছে করে আগের মতো ফ্রি হয়ে যাই। কিন্তু পারি না। আমি আগ বাড়িয়ে গেলে রওশন এড়িয়ে যায়। আমার কষ্ট কবিতা হয়ে যায়।

কিছুই ঘটেনি আর সেই দুর্ঘটনার পর

কেবল বললে গেছে নদী আর বাতাসের গতি

বিশ্বাস বিশ্বাস বলে করি চিৎকার

হৃদয়ের সাথে তবু পড়ে যায় যতি।

কিছুই ঘটেনি আর সেই দুর্ঘটনার পর

কেবল বদলে গেছে নদী আর বাতাসের গতি।

রওশনের সাথে আমার সম্পর্ক একটু ঝালাই হয়েছিল অবশ্য। সেটা হয়েছিল আফরোজার আগ্রহে। কিন্তু আগের মতো ছিল না আর সে সম্পর্ক। আগের সেই তুইতোকারি চলে এসেছিল তুমিতে। কর্তাবার্তা বলতাম দায়সারা ভাবে। কেমন নিস্প্রাণ হয়ে গিয়েছিল আমাদের ঝালাই করা বন্ধুত্ব। সবকিছুতেই সৌজন্য খুঁজে বেড়াতাম আমরা। অকপটতা ছিল না কোন কিছুতেই। মনে হতো সবকিছু মেকি। কিন্তু তারপরও কেন যেন রওশনের সঙ্গ আমি ফিল করতাম খুব বেশী। আজো ওর সাথে আমার সম্পর্ক তেমনই। আমি যদি রওশনের সাথে যোগাযোগ না করি তবে সে ভুলেও আমার সাথে যোগাযোগ করবে না। আমার ধারণা, সে এখনো মনে করে ঔ ক্যাসেটটা আমিই মেরে দিয়েছি। তার এ ভুল কোনদিন ভাঙ্গবেও না। না ভাঙ্গুক, তাতে আমার কিছু আসবে যাবে না। তবে কষ্ট লাগবে এই ভেবে যে, আমার বন্ধুর কাছেই আমি অবিশ্বস্ত।

রিক্সা চলে এলো ঢাকা মেডিক্যালে। ইমার্জেন্সিতে গিয়ে খোঁজ করলাম রওশন কত নাম্বারে ভর্তি হয়েছে। ইমার্জেন্সির এডমিশন খাতা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এ নামে কোন রুগী পাওয়া গেলো না। আমি পড়লাম মহ বিপদে কি করবো এখন! নিশ্চয়ই রওশন ভর্তি হয়েছে কোথাও। হয়ত এ হাসপাতালেই। নাম জানতো না বলে বেনামে ভতিৃ করিয়েছে। কিন্তু যদি বেনামেই ভর্তি করাবে তবে ঐ ভদ্রলোক রওশনের নাম জানলা কি করে? আমি ঘুরে ঘুরে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রতিটি বেড খুজলাম। না নেই, কোথাও নেই। খুজতে কুজতে আমার পা ধরে এলো। রওশন খোথাও নেই। তবে কি ফল্স রিং পেয়েছিরাম আমি? তবে কি মা’র সন্দেহটাই ঠিক? কোন বাজে মতলবে পোন করেছে কেউ?

কথাটা মাথায় আসতেই আমি অবাক না হয়ে পারি না। কারণ কারো সাথে শত্রম্নতা নেই আমার। আমি কোর সাথে কখনো এমন কোন ব্যবহার করিনি যাতে সে আমার ওপর খাপ্পা হতে পারে। তাহলে কেউ আমার ক্ষতি করবে কেন? না না অসম্ভব। কেউ আমার ক্ষতি করতে পারে না। যে ফোন করেছে সে হয়তো হাসপাতালের নাম ভুল বলেছে অথবা মজা কছে আমার সাথে্ এ রকম করে ভাবতেই আমার মনটা হাল্কা হয়ে যায়। হাসপাতালের করিডোর ধরে বেরিয়ে আসি আমি। আমার পাশ ঘেষে দ্রুত একটি ট্রলি ছুটে যায়। ট্রলির ওপর পড়ে আছে একটি রক্তাক্ত দেহ। হুশ আছে কি নেই বোঝা যায় না। আমার কেমন খারাপ লাগতে থাকে আমি দ্রুত বেরিয়ে আসি হাসপতাল থেকে।

হাসপাতালের গেট দিয়ে যখন বেরিয়ে এলাম তখন বাজে সাড়ে তিনটা। ভীষন ক্লান্ত মনে হলো নিজেকে। বাইরের টি স্টলে বসে চা খেলাম এক কাপ। একটু চাঙ্গা হয়ে উঠলাম আমি। রিক্সায় উঠতে যা এমন সময় স্যুটেড-বুটেড ভদ্র গোছের একজন লোক দ্রুত আমার সামনে এসে বললো

এই যে রাজিব সাহেব আপনাকেই অনেকক্ষণ ধুরে খুজছি আমি। কোথায় ছিলেন আপনি?

আমি লোকটার দিকে ভালো করে তাকালাম। না একে তো আমি চিনি না। কে এই লোক? ভাবতে লাগলাম মনে মনে। আমার স্মৃতিকোষ ব্যর্থ হলো এ লোককে সনাক্ত করতে।

আমাকে অবাক হয়ে তাকাতে দেখে লোকটা বললো আমি জানি আমাকে আপনি চিনতে পারছেন না। আমিই ফোন করেছিলাম আপনাকে। আপনার বন্ধুকে প্রাথমিক চিকিৎসার পরই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সে এখন আমাদের সাথেই আছে। আপনি আমার সাথে আসলেই দেখতে পাবেন তাকে।

লোকটার কথা শুনে আমি আশান্বিত হলাম। কিন্তু আমার মনের ভিতরে প্রশ্ন জেগে উছল, এ লাকটা আমাকে চিনলো কি করে? দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে জিজ্ঞেস করে বসলাম কিন্তু আপনি আমাকে চিনলেন কি করে?

লোকটা এবার হেসে উঠলো। তা হাসিতে কোন খাদ নেই। আমার মন সে হাসিতে হাল্কা হয়ে গেলো। বললো লোকটা, ‘এই ছবি দেখে, আপনার বন্ধুর পকেট থেকে পাওয়া।’

আমারই একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি তার হাতে। যে ছবি আমি ছাত্রাবস্থায় অসংখ্যবার ব্যবহার করেছি। এর এক কপি রওশনের হাতে থাকতেই পারে। আমার মনের সন্দেহ দূর হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় সে?’

‘এই তো গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছে আপনার জন্য, আসুন।’

লোকটার সাথে আমি এগিয়ে গেলাম গেট থেকে একটু দূরে অন্ধকারে দাঁড়ানো গাঢ় রঙের মাইক্রোবাসের দিকে। লোকটা আমার পিছন পিছন আসছে। গাড়ির দরজার কাছে যেতেই পিছন থেকে আমাকে ভীষণ জোরে ধাক্কা দিল লোকটা। খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে ছিটকে পড়লাম আমি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেললো গাড়ির ভিতরে বসে থাকা দু’জন। দরজা বন্ধ হয়ে গেল দ্রুত এবং আরো দ্রুত বেগে ছুটতে শুরু করলো গাড়ি। আমি উপুড় হয়ে পড়ে রইলাম সীটের নীচে। আমার পিঠের ওপর ওদের পা।

ঘটনার আকস্মিতায় আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হলো না। ভয় পেতেও ভুলে গেলাম আমি। তবে এটা বুঝতে পারলাম যে আমাকে কিডন্যাপ করেছে ওরা। কিন্তু কেন? ওরা কেন কিডন্যাপ করবে আমাকে? আমি কি কারো কোন ক্ষতি করেছি? আমি মনে করতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার মনে পড়লো না তেমন কোন ঘটনা। আমি তো কখনো কারো ক্ষতি করি নি। আমার মাথার ভেতর প্রপেলারের ঘূর্ণন শুরু হয়। আমি হঠাৎ বলে বসলাম, ‘কি ব্যাপার, আপনারা আমাকে কিডন্যাপ করছেন নাকি?’

ওরা কোন জবাব দিল না। পিঠের ওপর পায়ের চাপটা একটু বাড়িয়ে দিল শুধু। এ রকম শোচনীয় অবস্থায়ও আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘আপনারা কথা বলছেন না কেন? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আপনারা?’

আমার কথা শেষ হতে পারলো না। সাঁ করে একটা ঘুষি এসে পড়লো আমার মুখের ডান দিকে। সেই ভদ্রবেশী লোকটা কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বললো, ‘এত ব্যস্ত হবেন না স্যার। একটু ধৈর্য ধরুন। এখনি জানতে পারবেন আপনাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’

লোকটার কথায় ঘৃণায় আমার সারা শরীর রি রি করে উঠল। চিৎকার করে বলে উঠলাম, ‘শালা জানোয়ারের বাচ্চা। আমার সাথে লড়ার শখ থাকলে তুই একা আয়। আমার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দে। একজন অসহায় মানুষকে মারতে লজ্জা করে না! থুহ, কাপুরুষের বাচ্চা।’

আরো একটা ঘুষি এসে পড়লো আমার চোয়ালের ওপর। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠি আমি। দাঁত বসে গেলো জিহবায়। মুখ ভরে যায় তরল পদার্থে। মুখ খুলে দিলাম আমি। মুখ থেকে গলগল করে রক্ত পড়তে লাগলো। কান্না আসতে চাইলো আমার। কিন্তু কাঁদলাম না। আমার দুর্বলতা ওদের টের পেতে দিতে চাই না। দাঁত-মুখ চেপে ব্যথা হজর করার চেষ্টা করলাম। দাঁত কড়মড় করে বলে উঠল একজন, ‘চুপ হারামজাদা। কোন কথা কইবি না।’

প্রায় আধঘন্টা পর মাইক্রোবাসটা এসে থামলো একটা খোলা মাঠে। ওরা আমাকে জামার কলার ধরে টেনে নামিয়ে আনল গাড়ি থেকে। মাঠটার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কোথায় এনেছে ওরা আমাকে। বুঝতে পারলাম না। তবে আশেপাশে কোথাও কোন বাড়িঘর দেখতে পেলাম না আমি।

আমার বুকটা কেঁপে উঠল কি এক অজানা আশঙ্কায়। ওরা আমাকে ঘিরে ধরলো এবার। ওরা তিনজন। গাড়ীর ড্রাইভিং সিটে আর একজন বসে আছে। চাঁদটা আকাশের ঠিক মাঝখানে এখন। তারই স্বল্পালোকে ওদেরকে অস্পষ্ট দেখতে পারলাম আমি। ওদের চেহারায় কেমন রূঢ়তা খেলা করছে যেন। সেই ভদ্রবেশী লম্পটটা সামনে এস বললো, ‘দেখুন তো চিনতে পারছেন নাকি আমাকে?

আমি ভালো করে তাকালাম তার দিকে। না, একে তো আমি আগে কখনো দেখি নি। কে এই লোক? আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘না আপনাকে আমি চিনি না।’

চিনবেন, এক্ষুণি চিনবেন। বলেই হাতের ইশারা করলো লোকটা। সাথে সাথে একটা লোক পকেট থেকে পিস্তল বের করল। তাক করল আমার দিকে। আমি এবার সত্যি সত্যি কেঁপে উঠলাম। এরা কি আমাকে মেরে ফেলবে?

ভাবতেই আমার ভিতর কে যেন মাথা নেড়ে বলে উঠল, না মারবে কেন এরা? এদের কি ক্ষতি করেছ তুমি? তোমার সাথে তো ওদের কোন শত্রুতা নেই। তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? ভয় পেয়ো না। সাহস রাখো।

আমি সত্যি সত্যি সাহসী হয়ে উঠলাম। আমার মনে হলো, এরা যদি আমাকে মেরে ফেলতে চায় তো মারুক। তবু এদেরকে আমি ভয় করবো না।

আমি বিক্ষিপ্তভাবে এটা সেটা ভাবছিলাম। ঠিক মনোযোগ ছিল না কোন কিছুতেই। হঠাৎ ভদ্রবেশী লোকটা আমাকে ভীষণ জোরে থাপ্পড় মেরে বসলো। আমি টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলাম। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠলো লোকটা, ‘শালাকে একবারে গেড়ে ফেল। শালা বানচোৎ।’

এ কথা বলার সাথে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার সাঙ্গপাঙ্গরা। এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকে তারা আমাকে। কিছুই করার নেই। আমার হাত বাঁধা পিছন থেকে। তারপরও আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘জানোয়ারের বাচ্চারা আমাকে মারছিস কেন? আমি তোদের কি ক্ষতি করেছি? আমাকে মারিস না। ছেড়ে দে।’

ওদের কিল-ঘুষি-লাথির বেগ আরো বাড়তে থাকে। আমি আর সহ্য করতে না পেরে এবার গলা ছেড়ে চিৎকার করে উঠি, ‘বাঁচাও আমাকে বাঁচাও। তোমরা কে কোথায় আছো আমাকে বাঁচাও।’

সেই ভদ্রবেশী লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠি, ‘আমাকে ছেড়ে দে হারামজাদা। আমি তোর চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করব। ছাড় হারামজাদা, আমাকে ছাড়। সাহস থাকে তো একা লড়তে আয় আমার সাথে। উহ্ মাগো, বাবাগো, বাঁচাও, বাঁচাও...।’

আমার চিৎকার শুনে ফিরে আসে সেই ভদ্রবেশী লোকটা। আমার কাছে এসে নীচু হয়ে আমার মুখের ভিতর গুঁজে দেয় এক টুকরা কাপড় কিংবা রুমাল। আমার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। জিহবা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিতে চাই কাপড়ের টুকরাটা। কিন্তু পারি না। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকি আমি।

আমার জামার কলার ধরে আবার দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকি আমি। পড়ে যাই যাই অবস্থা। এবার সেই লোকটা বললো, তোর অন্তিম কোন ইচ্ছা থাকলে বলতে পারিস। যদি পারি তবে রাখার চেষ্টা করব। বল, তোর কোন ইচ্ছা আছে?’

আমি মাথা ঝাঁকালাম। ওরা আমার মুখের ভিতর গুঁজে দেয়া কাপড় সরিদে ফেললো। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, ‘আমার একটা প্রশ্নের উত্তর জানার খুব ইচ্ছা আছে।’

‘বল, দেখি তোর প্রশ্নের জবাব দিতে পারি কি না।’ বললো লোকটা।

আমি দৃঢ় কণ্ঠে বললাম, ‘আমি আমার মৃত্যুর কারণ জানতে চাই। জানতে চাই, কেন আমাকে হত্যা করা হচ্ছে?’

হা... হা... হা... অট্টহাস্যে ফেটে পড়লো লোকটা। কি ভয়ানক সে হাসি! হায়েনার হাসিকেও হার মানায়। হাসতে হাসতেই বলে উঠল সে, ‘তোর মৃত্যুর কারণ তুই নিজেই।’

 লোকটার কথা শুনে আমি চমকে উঠলাম। কি বলছে লোকটা! আমি প্রতিবাদ করে উঠলাম সাথে সাথে, ‘না, আমি এমন কোন কাজ করিনি যার জন্য আমাকে কেউ হত্যা করতে পারে?’

এমন সময় লোকটার মোবাইল বেজে ওঠে। মোবাইল অন করে টানটান হয়ে দাঁড়ায় লোকটা। তারপর জ্বি স্যার, ঠিক আছে স্যার, অবশ্যই স্যার ইত্যাদি ইঙ্গিতধর্মী কথা বলে যায়। এক সময় বলে ওঠে, ‘ঠিক আছে স্যার। আধ ঘন্টার মধ্যে কাজ সেরে চলে আসছি।’ বলেই মোবাইল অফ করে দেয়। মনোযোগ দেয় আমার দিকে। বলে, ‘প্রস্ত্তত মিস্টার। আপনাকে এখনি ফায়ার করা হবে।’

ওর কথা শুনে আমার গলা শুকিয়ে গেল। আমি এখন বুঝতে পারছি এরা পেশাদার খুনী। কারো ইঙ্গিতে এরা খুন করছে আমাকে। আমার নিস্তার নেই আজ। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। কিন্তু আমি জানতে পারলাম না কেন মারা হবে আমাকে? আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না এখনো। শেষ ইচ্ছে পূর্ণ হলো না আমার। মানবিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত আমি আজ।

আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমার স্ত্রীর মুখ। কানে বাজতে লাগলো মায়ের নিষেধাজ্ঞা। আমি চোখ বুঁজে ফেললাম। আর দেখতে পেলাম রাস্তার মোড়ের সেই দৃশ্য। একটা কুকুরকে ঘিরে ধরেছে কয়েকটি কুকুর। আর ...


আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
রোদের ছায়া খুব খুব ভালো ............কিন্তু কেন মেরে ফেলা হলো রজব কে?
সালেহ মাহমুদ UNION ALL SELECT NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL# প্রণয়পীড়িত এরও ঠিক একই প্রশ্ন। ওকে যে উত্তরটা দিয়েছিলাম সেটাই আবার আপনাকে পেস্ট করে দিচ্ছি- “এটাই তো এ সময়ের প্রশ্ন। কেন গুম-খুন ইত্যাদি হচ্ছে। প্রতিদিনই তো কোন না কোন গুমের ঘটনা ঘটছে। যার একমাত্র কারণ স্বয়ং খুনিও জানে না। সে শুধু জানে বিশেষ একজনকে খুন করতে হবে। তার বিনিময়ে সে অর্থ পাবে।”
আসন্ন আশফাক তাকে মারলো কেন?
সালেহ মাহমুদ UNION ALL SELECT NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL,NULL# এটাই তো এ সময়ের প্রশ্ন। কেন গুম-খুন ইত্যাদি হচ্ছে। প্রতিদিনই তো কোন না কোন গুমের ঘটনা ঘটছে। যার একমাত্র কারণ স্বয়ং খুনিও জানে না। সে শুধু জানে বিশেষ একজনকে খুন করতে হবে। তার বিনিময়ে সে অর্থ পাবে।
মিজানুর রহমান রানা ব্লগে বিচরণ করার মজাই আলাদা। কেমন একটা স্বাধীনতার গন্ধ পাওয়া যায়। চমৎকার লেগেছে সালেহ মাহমুদ ভাইয়ের এই গল্পটি। শেষে এসে সত্যিই ছোট গল্পের সেই শেষ হয়ে হলো না শেষ আক্ষেপটি রইলো।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "অভিমান”
কবিতার বিষয় "অভিমান”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ মার্চ,২০২৪

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

জানুয়ারী ২০২৪ সংখ্যার বিজয়ী কবি ও লেখকদের অভিনন্দন!i