আধুনিক কবিতা
শুরুতেই একটা কথা বলেছিলাম যে কবিতার রসাস্বাদনের জন্য প্রত্যেককেই মোহমুক্ত মন নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। নতুন কিছুর স্বাদ পেতে অবশ্যই পুরনো ধ্যান ধারণার শিকল থেকে মুক্ত থাকতে হবে। রবীন্দ্রনাথ তার বিপুল পরিমাণ সৃষ্টি, কর্মযজ্ঞ, মানবিক বোধ দিয়ে তার একান্ত নিজস্ব একটা পৃথিবী গড়ে গিয়েছেন। সেই পৃথিবীর সৌন্দর্যে আজো আমরা মোহিত হই, সৌরভে আন্দোলিত হই, বিস্ময়ে অভিভূত হই। বাংলা সাহিত্যকে, বাংলা ভাষাকে বিশাল একটা ধাক্কায় তিনি উঠিয়ে দিয়ে গেছেন বিশ্ব সাহিত্যের কৌলীন্যের স্তরে। কিন্তু তিনি ঈশ্বর নন। আসলে শিল্প সাহিত্যের জগতে কিংবা বাস্তব কোন জগতেই কোন মানুষ ঈশ্বর নন। ঈশ্বর একজনই। তার দেখানো পথ ধরে নতুন সাহিত্যিকবৃন্দ এগিয়ে যাবেন। কিন্তু তার রচিত জগতে আটকে পড়ে থাকলে বাংলা সাহিত্য সামনে এগোতে পারবে না। রবীন্দ্রযুগে বেশীরভাগ কবিদের কবিতা রচনা চলেছে তার ছায়া হয়ে। এই ছায়া থেকে বেরোতে পেরেছিলেন বলেই নজরুল নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। এই ছায়া থেকে বেরোতে পেরেছিলেন বলেই ত্রিশ দশকের পঞ্চ কবি বলে খ্যাত সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমীয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে প্রমুখ কবিরা নিজস্ব আলোয় উদ্ভাসিত হতে পেরেছিলেন।
চল্লিশের দশক থেকে বাংলা কাব্যভাষার আর একটা পটপরিবর্তন শুরু হয়। জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ প্রমুখ ত্রিশের কবিরা আধুনিক কবিতা লিখলেও সাধু ভাষার নিগড় থেকে বেরোতে পারেননি। চল্লিশের কবিরা কথ্যভাষাকে সাহিত্যে আনার চেষ্টায় প্রথম ভূমিকা রাখেন। উদাহরণস্বরূপ ফররুখ আহমেদের অসম্ভব কাব্যব্যঞ্জনাময় কিছু কবিতায় সেই ধারার প্রয়োগ দেখি- ’যেখানে পথের পাশে মুখ গুজে পড়ে আছে জমিনের পর/ সন্ধ্যার জনতা জানি কোনদিন রাখেনা সে লাশের খবর’- (লাশ)। ’দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা/ তবু জাগলে না, তবু তুমি জাগলেনা’- (সাত সাগরের মাঝি)। কিংবা সুকান্তের সেই চমৎকার পঙক্তিগুলো, 'কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি/ ক্ষুধার এ রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/ পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।' এই দশকের কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন সুকান্ত ভট্টাচার্য, আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ।
আমাদের আধুনিক কবিরা
মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসিমউদ্দীনদের উজ্জ্বল উপস্থিতির পরে ত্রিশের পঞ্চ কবি জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ প্রমুখ পার হয়ে, চল্লিশের দশকের ফররুখ আহমেদ, সুকান্ত ভট্টাচার্য হয়ে পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তর দশকের কবিতাই মূলত সাধারণ পাঠকদের কবিতামানসকে এখনো প্রভাবিত করে চলছে। পঞ্চাশের দশকের কবিতা ছিল বিষয় বৈচিত্র্য, ইমেজারীর ব্যবহার, চিরায়ত ঐতিহ্যের উপস্থাপন ও ভাষার উচ্চমাত্রায় ঋদ্ধ। মহান কিছু কবিদের আবির্ভাব হয় এসময়। শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরীর মত স্বনামখ্যাত কবিকুল এই সময়কে শাসন করেছেন। ষাটের দশকের কবিরাও পূর্বসূরিদের কাব্যধারাকে অন্যলোকে টেনে নিয়ে গেছেন স্বাচ্ছন্দ্যে। তাঁদের মধ্যে সিকদার আমিনুল হক, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, মহাদেব সাহা, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, প্রমুখ পঞ্চাশের দশকের কবিতার বিপ্রতীপ এক নতুন ধারা সৃষ্টি করলেন। এছাড়াও হুমায়ুন আজাদ, অসীম সাহা, সাজ্জাদ কাদির, হেলাল হাফিজ প্রমুখ কয়েকটি নাম খুবই উল্লেখযোগ্য। সে তুলনায় সত্তর অনেকটা নিষ্প্রভ হলেও এই সময়ে প্রচুর কবিদের আবির্ভাব ঘটে। এই 'কবি'দের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছেন আবিদ আজাদ, ত্রিদিব দস্তিদার, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আবু হাসান শাহরিয়ার, নাসির আহমেদ প্রমুখ।
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।।