বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫

keyboard_arrow_leftসাহিত্য ব্লগ

শো অফ

ফাহমিদা বারী

  • advertisement

     (আমার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ 'পরিধিবিহীন বৃত্ত' তে এই গল্পটি আছে। শেয়ার করছি গক'র বন্ধুদের উদ্দেশ্যে। )

                                     

    সেই সাড়ে চারটা থেকে সেজেগুজে পটের বিবি হয়ে বসে আছে অরনী।

    এতো দীর্ঘ সময় ধরে মুখে ঘষে ঘষে মোজাইক প্লাস্টারিং সে অনেকদিন করে না। স্বামী শিশিরের ঔদাসীন্যে সাজগোজের প্রতি আকর্ষণ তার একেবারেই চলে গিয়েছিল। বিয়ের পরে প্রথম প্রথম একটু সাধ আহ্লাদ ছিল মনে। তখন মাঝে মাঝে এই ঘষা ঘষি চালাতো।  ঘুরিয়ে ফিরিয়ে স্টাইল মেরে খোঁপা বাঁধতো। অনেক ঘুরে ঘুরে শপিং করে নতুন কেনা কোনো লেটেস্ট ডিজাইনের শাড়ী পরে, চোখে মুখে তীব্র আবেদন ফুটিয়ে তুলে দাঁড়াতো স্বামীর সামনে। গলার স্বরে ন্যাকামি ফুটিয়ে তুলে ভুরু নাচিয়ে শিশিরকে জিজ্ঞেস করতো,

    ‘এ্যাই, দেখো তো, শাড়িটা কেমন হয়েছে?’

    জিজ্ঞেস করেই চোখজোড়া পিনের মতো সাঁটিয়ে রেখে দিতো বরের দিকে। ভাবখানা এই, চোখ সরিয়ে ফেললেই যদি চোখের মুগ্ধতাটা মিস হয়ে যায়!

    শিশির হাই তুলতে তুলতে তার রিসার্চ পেপারের ওপর থেকে ক্লান্ত চোখ জোড়া সরিয়ে নিতে নিতে বলতো,

    ‘এই একই শাড়ি না গতমাসেও কিনলে!

    মুহূর্তেই পিন মারা বেলুনের মতো ফুস করে অরনীর ঢঙের বাতাস বেরিয়ে যেতো। মানুষ অল্প শোকে কাতর হয়। অরনী তীব্র শোকে পাথর হয়ে যেতো। গতমাসে তো দূর, গত তিনমাসেও সে একটা শাড়ি কিনেছে কী না সন্দেহ। আর এই লোক কী বলে!

    তখনো তার বিয়ের এক বছরও হয় নাই । মানুষ নতুন বউকে নিয়ে কতো রঙ্গ রসিকতা করে। প্রতিমাসে চার পাঁচটা করে শাড়ী কিনে দেয়। মাসে কমপক্ষে দু’তিনবার চাইনিজে বা দামী রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে নিয়ে যায়। না হলেও নিদেনপক্ষে বাড়ির কাছে কাবাবের দোকান অথবা ফার্স্ট ফুডের দোকানে বার্গার, ফুচকা খেতে যায়। খাওয়াটা তো বাহানা মাত্র, নতুন বউএর সাথে একটু ফস্টি নস্টি করাই মূলত আসল উদ্দেশ্য। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে ছল চাতুরি মাখা ভাবময় আলাপচারিতা। চোখে চোখে কতো মধুর ভাব বিনিময়। হাতের ছোঁয়া লেগে শরীরে বিদ্যুতের ভোল্টের আদানপ্রদান।

    হা হতোস্মি!! সে সব কস্মিনকালেও অরনীর পোড়া কপালে জুটে নাই।

    যেন মানুষ নয়, পুরোদস্তুর এক রোবটকে বিয়ে করেছে অরনী। কাজ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। তার কাছে আলাপ মানেই হচ্ছে কাজের আলাপ। তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা মানে তো রীতিমত প্রহসন। প্রথম দিকে অরনী বুঝতে পারতো না। বাসার প্রয়োজনীয় কথা বলার ফাঁকে দু’চারটা এদিক সেদিকের গল্প করতে গেলেই শিশির বলে ওঠতো,

    ‘আর কিছু বলবে অরনী? মানে কাজের কথা? অফিসে খুব ব্যস্ততা এখন। বাসায় এসে তোমার কথা শুনবো।‘

    ইলেকট্রিক শক খেলেও মনে হয় এর চেয়ে কম ব্যথা লাগে। অরনীর মনের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের মাতামাতি শুরু হতো। এখন অবশ্য সব সয়ে গেছে। তাই আর খামোখা আলাপ জুড়ে দেওয়ার বাজে চেষ্টা চালায় না। ফোন ধরেই এখন গড়গড় করে কাজের কথা বলে যায়।

    সেই কথা তৃতীয় কেউ শুনলে মনে করবে, অরনী বুঝি কাউকে আবহাওয়া বার্তা পড়ে শোনাচ্ছে। ওপাশের রিমোট টিপে দেওয়া রোবটটা সেসব আবহাওয়া বার্তা শুনে খুব খুশি হয়। শোনা শেষ হলেই রেকর্ডেড ভয়েসের মতো করে বলে,

    ‘ঠিক আছে। এখন তাহলে রাখি।‘

    এই রবোটের সাথে আজ প্রায় তিন বছর যাবত বসবাস অরনীর। মহাকালের হিসেবে ক্ষুদ্র সময়। কিন্তু অরনীর মনে হয়, এই তিন বছরেই সে রসকষ বিহীণ মরুভুমিতে বেড়ে ওঠা ক্যাক্টাস হয়ে গেছে। গা ভর্তি ঝিরিঝিরি কাঁটা। পানি ছাড়াও আপাত দিব্যি সতেজ। কিন্তু ফুল নাই, বৈচিত্র নাই। ত্রিশ বছরেই সে যেন এখন চল্লিশের বুড়ি।

    অরনী তার এই অকাল বার্ধক্য চুপচাপ মেনে নিয়েছিল। জীবনে না চাইলেও কতো কিছু মেনে নিতে হয়। এটিও তার মধ্যে একটি। অভিযোগ জানিয়ে গলা ফাটিয়ে লাভ নেই। তাতে নিজের গলারই ক্ষতি হবে শুধু।

    গতবছরের শেষের দিকে এসে স্কুল ফ্রেন্ড শীলার সাথে দেখা হওয়ার পরে থেকেই অরনীর মাথাটা নষ্ট হয়েছে। তার আগ পর্যন্ত সব কিছুই  ঠিকঠাক ছিল। মানে রোবট মানবের সাথে রোবটীয় মানবী হয়ে দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিচ্ছিলো আর কী!

    শীলার সাথে দেখা হয়ে যায় যমুনা ফিউচার পার্কে। অরনীর বাসা থেকে একদম কাছেই এই শপিং মল। প্রথম দিকে মনে খুব ইচ্ছা জাগতো শিশিরের সাথে গিয়ে সেখানে প্রাণখুলে শপিং করবে। কতো কতো সব মজার মজার খাবারের দোকান। আর কী ভালো সিনেমা হল! একদিন এক ছুটির দিনে শিশিরকে প্রস্তাবটা দিয়েই বসলো অরনী। শিশিরও কপাল গুণে না করলো না। অতঃপর শপিং মলে এসে সে যা শুরু করলো, তাতে অরনী মনে মনে ঠিক করলো আর কখনোই সে এই রবোট মানবের সাথে শপিং এ আসবে না।

    অরনী কিনতে চাইলো শাড়ি। শিশির খুঁজে খুঁজে মান্ধাতার আমলের দাদি নানিরা যেসব শাড়ি পরতেন সেগুলো পছন্দ করতে লাগলো। সেগুলোর না আছে আধুনিকতা, না আছে ফ্যাশন বোধ। সাদামাটা কাট কাট ডিজাইন। আর কী তার রঙের ছিরি! দীর্ঘদিন আমাশায় ভোগা পাংশু বর্ণ। সেগুলো গায়ে জড়ালে বয়স অনায়াসে এক লাফ দিয়ে আরো দশ বছর বেড়ে যাবে।

    দোকানদার যতো আধুনিক ডিজাইনের শাড়ি দেখাতে চান, শিশির ততোই চাল বাছার মতো সেগুলোর খুঁত বাছতে শুরু করে। ‘এটার রঙটা বেশি ক্যাটক্যাটে’ ‘এখানে তো এক শাড়ির মধ্যে দু’রকম ডিজাইন, হোমোজিনিয়াসনেস নেই কেন?’ ‘এই শাড়ি বেশি ফিনফিনে’ ...হাজারটা অনুযোগ। অরনী তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, ‘ওসব শাড়ি এখন ওল্ড ফ্যাশন্‌ড...এখনকার মেয়েরা ওসব পরে না’...শিশির ততোই গোঁ ধরে বসে থাকে। দোকানদার শাড়ি দেখানো বাদ দিয়ে মুখ টিপে তাদের কাণ্ড কীর্তি দেখতে থাকে। শেষমেষ অরনী শাড়ি কেনা বাদ দিয়েই উঠে পড়ে।

    রেস্টুরেন্টে খেতে বসেও আরেক বিপত্তি। ‘এতো ডিপ ফ্রাই খাওয়া ঠিক না...বাইরের খাবার ভীষণ আনহেলদি...এখন তো বাসাতেই রেস্টুরন্টের চেয়ে মজার খাবার তৈরি করা যায়...।

    অরনী মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। সিনেমা দেখার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে। আর ও পথ মাড়িয়ে কাজ নেই।

    এরপর থেকে অরনী একাই আসে শপিং মলে। শিশিরের অবশ্য তাতে আপত্তি নেই। সে বরং এতে মনে মনে খুশিই হয়। অরনী নিজের মনে সময় কাটাক। ছুটির দিনগুলোতে আরাম করে টিভি দেখা আর আয়েশভরা ভাতঘুম দেওয়ার পরিবর্তে দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়ানোর কোনোই মানে হয় না। অরনীর একেকসময় মনে হয়, এই সুযোগটা পাওয়ার জন্যই মনে হয় শিশির সেদিন এতো ঘটনা ঘটিয়েছিল।

    কিন্তু শীলার সাথে দেখা হওয়ার পরে থেকে অরনীর চিন্তা ভাবনাই আমূল পালটে গেল। তার স্বাধীন চিন্তাশক্তি একেবারে চুর চুর হয়ে গেল। আর তা হবে না ই বা কেন!

    একই ভার্সিটি থেকে একই বছরে সে আর শীলা পাস করে বেরিয়েছিল। শীলা দেখতে শুনতে অরনীর ধারে কাছেও ছিল না। পাশাপাশি দাঁড়ালে তাকে অনায়াসেই নায়িকা অরনীর সখী চরিত্রে অভিনয় করা এক্সট্রা বলে চালিয়ে দেওয়া যেতো। ছেলেরা অরনীর দাক্ষিণ্য পাবার আশায় শীলার শরণাপন্ন হতো। সে ছিল অরনীর কাছে পৌঁছাবার সামান্য মাধ্যম মাত্র।

    সেই শীলা ঝলমলে সাজ পোশাকে ঝলমল করতে করতে অরনীর কাছে এসে একেবারে চেঁচিয়ে উঠলো,

    ‘ও মাই গড! এ আমি কী দেখছি! তুই অরনী? এ কী দশা তোর! এই দেখো দেখো...ও হচ্ছে অবনী...ঐ যে আমার ক্লাসমেট...তোমার কাছে গল্প করেছি না!’

    শেষ কথাটা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কেতাদুরস্ত পোশাকের ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে বলা। তারপরে যেন ভুলে গেছে এমন ভঙ্গিতে বলে উঠলো,

    ‘ও অরনী, পরিচয় করিয়ে দেই। আমার হাজবেণ্ড শাকিল।‘

    অরনী শীলার সূচনা মন্তব্যে প্রচন্ড অপ্রস্তুত হয়ে একটা হাসির মতো ভাব করলো। শাকিল ভদ্রলোকের অবশ্য অরনীর দিকে ভ্রুক্ষেপই নাই। সে একহাতে তার সুন্দরী স্ত্রীর সরু কোমর জড়িয়ে ধরে আছে। অরনীর হাসির উত্তরে একটু গা ছাড়া স্মার্ট ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকালো।

    অরনী হাঁ করে তাকিয়ে থাকে শীলার দিকে। এ কী অবিশ্বাস্য পরিবর্তন শীলার! গায়ের রঙ যেন ঝলসে বেরুচ্ছে। চোখের দৃষ্টিতে কন্টাক্ট লেন্সের মায়াবী ঘোর। চকচকে মুখে মেকআপের নিখুঁত আবরণ। ভ্রুর আকৃতি, ঠোঁটের লিপস্টিক, চোখের মাশকারা কোনো কিছুতেই কাঁচা হাতের ছোঁয়া নেই। দেখেই বোঝা যায়, এ একেবারে পেশাদার মেকআপ শিল্পীর সুনিপুন হাতের কাজ।

    পরনের পোশাকটিও অতি অতি আধুনিক। অরনী ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, এই পোশাকটির নাম কী। অনেকটা কামিজের মতো শেপ, আবার ঠিক কামিজও না। দুপাশে অনেকখানি পর্যন্ত কাটা। সেখানে কেমন যেন ফিতের সাহায্যে গিঁট দিয়ে রাখা। সামনেও একেবারে কোমর পর্যন্ত কাটা। সেই কাটা অংশ দুটো পতাকার মতো দু’দিকে ঝুলে আছে। ওড়না জাতীয় কিছু একটা গলার কাছে আটকে আছে। সে বেচারার আসল কাজ যে কী তা মনে হয় সে নিজেও ভুলে গেছে। পায়ে ঢোলাঢালা পালাজ্জো। চুলে যেন রংধনুর রঙের বাহার। নানা রঙের পাক খাওয়ানো। বেশ বাস আর সাজ সজ্জা দেখে অরনীর হাঁ করা মুখ আর বন্ধ হয় না।

    শীলা এবার অরনীকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলে ওঠে,

    ‘ কী রে কী দেখছিস এমন করে? এ কী চেহারা হয়েছে তোর? চেনাই যাচ্ছে না! তুই তো এখনই একেবারে বুড়ি হয়ে গেছিস রে! আর একা নাকি? হাজবেণ্ড কই?’

    অরনীর মাথার মধ্যে একেবারে শর্ট সার্কিট হয়ে যায়। যে শীলা ওর কাছে পাত্তাই পেতো না, সে এখন অরনীকে এমন ঠেলা দিয়ে কথা বলে! অরনী আমতা আমতা করে বলে,

    ‘ভার্সিটিতে। বিজি মানুষ। কাজ নিয়ে দিনরাত পড়ে থাকে।‘

    শীলা বাঁকা সুরে বলে,

    ‘হুম বুঝেছি। তা আমরাও তো কাজকর্ম করি তাই না? সে যাক। এই শোন, দেখা যখন হলো...’

    শীলা হড়হড় করে অনেক কিছু বলে যায়। এক পর্যায়ে অরনীর মোবাইলে নিজের নাম্বার টা সেভ করে দেয়। সেখান থেকে কল দিয়ে নিজের মোবাইলে অরনীর নাম্বারটা তুলে নেয়। তারপর আরেক দফা রূপের তুফান তুলে বলে,

    ‘বাই রে! আমাদের আবার একটা পার্টিতে এটেণ্ড করতে হবে। আমি ফোন দিবো তোকে। সামনের মাসেই আমাদের বাসায় একটা ছোট খাট গেট টুগেদার হবে। তুই অবশ্যই আসবি উইথ হাজবেন্ড। এইবার কিন্তু ব্যস্ত সাহেবের নিস্তার নেই। এ্যাণ্ড বাই দ্য ওয়ে, টেক কেয়ার ডিয়ার। লুক এ্যাট ইয়োরসেলফ! ইউ আর ওনলি থার্টি, নট ফিফটি ফাইভ! এনজয়...’

    বলেই ওর হাজবেন্ডের হস্তবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ঝলমল করতে করতে বেরিয়ে গেল। শীলার হাজবেন্ড এই পুরো সময়ে তার সুবেশি স্ত্রীর উপরে থেকে তার চোখ জোড়া সরাতেই পারলেন না। অরনীকে একেবারে মশা মাছির মতোই উপেক্ষা করলেন।

    দামী সেন্টের সুবাস মিলিয়ে যেতেই অরনীর মাথা কেমন ঝিম ঝিম করতে লাগলো।

    এতোদিন অরনীর মনে হতো তাকে বোধকরি কয়েকবছর সিনিয়র বলে মনে হয়। আজ সে জানলো, কয়েক বছর নয়...তাকে একেবারে পঁচিশ বছর সিনিয়র বলে মনে হয়। পঞ্চান্ন বছর! অরনীর কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগলো। সেদিনের মতো শপিং টপিং মাথায় উঠলো। একটা রিক্সা ডেকে তাড়াতাড়ি বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো।

    বাসায় ঢুকে এক ঝটকায় হাতের ব্যাগটা বিছানায় ছুঁড়ে মেরে অরনী সটান বিছানায় শুয়ে পড়লো, বাইরের কাপড় টাপড় পাল্টানোরও দরকার বোধ করলো না।

    শিশির যখন ফিরলো, তখন বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যে। অনেকক্ষণ ধরে কলিং বেল বাজানোর পরে অরনী এসে দরজা খুলে দিলো। মুখ তুলে শিশিরের সাথে একটা কথাও বললো না। অপমানে তার ভেতরটা এখনো জ্বলে যাচ্ছে।

    শিশির সারাদিন কাজ করে এসে ক্লান্ত। অরনীর চোখ মুখ দেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। কিন্তু অরনী কিছুই বললো না। আবার এসে বিছানায় উলটে পড়ে গেল।

    সেদিনের পরে থেকে অরনীর দিনরাত্রি পালটে গেল। শীলা অরনীকে ফেসবুকে এ্যাড করে নিয়েছে। ফেসবুক অরনী আগে তেমন একটা ব্যবহার করতো না। তার বন্ধু বান্ধব তেমন বেশি নয়। ভার্সিটি লাইফের অল্প কয়েকজন তার ফ্রেণ্ড লিস্টে আছে। সে চাকরি বাকরি করে না। অতএব কলিগ নেই। সেই গুটিকয়েক বন্ধুবান্ধবের পোস্টে মাঝে মাঝে লাইক দেয় এই পর্যন্তুই তার ফেসবুক এক্টিভিটি।  

    শিশির ছবি তুলতে পছন্দ করে না। তাই অরনীর ইদানীং একদম ছবি তোলা হয় না। সে তেমন একটা ছবি টবিও পোস্ট করে না। অনেক টা নিষ্ক্রিয় সদস্য সে ফেসবুকের।

    কিন্তু শীলা তাকে সক্রিয় সদস্যতে পরিণত হতে বাধ্য করলো। সে প্রতিদিন ঝাঁকে ঝাঁকে ছবি পোস্ট করে। নিজের ছবি, হাজবেন্ডের সাথে রোমাণ্টিক ছবি, বারান্দায় এলো চুলে দাঁড়িয়ে উদাসী ছবি, সদ্য কেনা ফার্নিচারের সাথে ছবি, বাড়ির পোষা পাখীর সাথে ছবি, আকাশের দিকে তাকিয়ে ছবি, মাটির দিকে তাকিয়ে ছবি...আর প্রতি ছবির সাথে আবেগঘণ স্ট্যাটাস।

    এই যেমন সকালে ভেজা মুখে ফেসওয়াশ মাখতে মাখতে ছবি। সঙ্গে স্ট্যাটাস,

    ‘হাবি কে না করলেও শোনে না। বেস্ট কোয়ালিটির ফেসওয়াস তার যখন তখন গিফট করা চাই।‘

    দুপুরে গোসল সেরে মাথায় টাওয়েল জড়িয়ে ছবি। মুখে মোহনীয় ভঙ্গি। সাথে স্ট্যাটাস,

    ‘আমাকে নাকি এভাবে খুব ভালো দেখায়। আমার না, ওর কথা...(চোখ টিপে দেওয়ার ইমো)’

    বিকেলে হাজবেণ্ডের সাথে চায়ের কাপ হাতে ছবি। কাপে কাপে ঠোকাঠুকি। সাথে স্ট্যাটাস,

    ‘মনে মনে ঠোকাঠুকি। লাইফ ইজ বিউটিফুল।‘

    ছবি দেখতে দেখতে আর সুখের গল্প শুনতে শুনতে অরনী ঈর্ষায় এক্কেবারে কানা হয়ে যায়। সব রাগ গিয়ে পড়ে বাবা-মায়ের পছন্দ করে দেওয়া অবিকল মানুষের মতো দেখতে রোবটটার উপর। এর জন্যই অরনীর আজ যত দূর্গতি। মূল চরিত্র থেকে পার্শ চরিত্রে পদায়ন। তার তিরিশ বছরের যৌবন পঞ্চান্নতে পরিবর্তিত।

    অরনীরও স্ট্যাটাস দিতে মনে চায়, ‘লাইফ ইজ স্ট্রেসফুল!’

    এর মধ্যেই একদিন শীলা ওকে আর শিশিরকে দাওয়াত দেয়। শিশিরেরএকটা ওয়ার্কশপ চলছে। কিন্তু অরনী এখন কোনো কথা শুনতে নারাজ। হাজবেণ্ড ছাড়া বান্ধবীর বাসায় গিয়ে হাজির হলে এবারে আর কথার তোড়ে টেকা যাবে না।

    অরনী সমন জারী করে দেয়। যে করেই হোক, শিশিরকে অরনীর সাথে যেতেই হবে। দরকার পড়লে একদিন ওয়ার্কশপে যাবে না। কিন্তু এবার সাথে না থাকতে পারলে বাড়িতে ভাত বন্ধ!

    অরনীর শক্ত অবস্থান দেখে শিশির বাধ্য হয়ে বিকেল আর সন্ধাটুকু ব্যবস্থা করবে কথা দেয়। অরনী সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। তারপর শিশিরের ফোন পায়। কাঁচুমাচু স্বরে বলে,

    ‘অরনী প্লিজ এবার ক্ষমা করে দাও। কিছুতেই বের হতে পারছি না। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি গাড়ি নিয়ে.......’

    অরনী ধুম করে ফোন রেখে দেয়। তারপর গাড়ির তোয়াক্কা না করে একাই রওয়ানা দেয় শীলার বাসায়। শীলা ঠিকানা দিয়েছিল, তবু একা সিএনজি নিয়ে বাসা খুঁজে পেতে অরনীর বেশ বেগ পেতে হয়।

    ভেতরে চলছে উদ্দাম পার্টি। সুবেশী অতিথিদের মাঝে অরনী কোথায় লুকাবে খুঁজে পায় না। শীলা অরনীকে দেখে নাচতে নাচতে এগিয়ে এসে বলে,

    ‘কী রে, আজকেও একা! ওহ! পুওর গার্ল! আচ্ছা বাদ দে! আয় সাবার সাথে আলাপ করিয়ে দিই...’

    শীলা তার কয়েকজন বন্ধু বান্ধবীর সাথে অরনীকে পরিচয় করিয়ে দেয় ।

    ‘আমার ভার্সিটির ফ্রেন্ড, অরনী। এখন দেখলে অবশ্য বুঝবি না আগে কেমন রূপসী ছিল!’

    শীলার বন্ধু বান্ধব সকলেই হাই ফ্যাশনের মানুষ। অরনীর বুঝতে অসুবিধা হয় না সবাই অরনীর চেহারার আনাড়ি মেকআপ দেখে আড়ালে হাসি গোপন করতে ব্যস্ত।

    সেই প্রথম দিনের মতোই শীলার হাজবেণ্ড শীলার সাথে সাথেই ঘুরতে থাকে। প্রত্যেকের সাথে ঠাট্টা মজাও করে। শীলার বান্ধবীদের সাথেও তার স্মার্ট আলাপচারিতা। কিন্তু প্রতি কথাতেই স্ত্রীর প্রতি মুগ্ধতা যেন ঝরে ঝরে পড়ছে। আর সে কী প্রশংসা! শীলার এক বান্ধবীর শাড়ি দেখে সকৌতুকে বললো,

    ‘ওয়েল, ইউ লুক গুড। বাট মাই ওয়াইফ কুড বি ইভন বেটার ইন দিস শাড়ি! হাহা হা...’

    পার্টি শেষে শীলা অরনীকে জিজ্ঞেস করে,

    ‘তোর ড্রাইভারকে ফোন দে। সবার ড্রাইভারের জন্য সার্ভেন্টস রুমে এরেঞ্জমেণ্ট করা আছে।‘

    অরনী পাংশু মুখে বলে,

    ‘আমি তো সিএনজিতে এসেছি আজ। ইয়ে, ড্রাইভার তো ছুটি নিয়েছে।‘

    মিথ্যে বলায় অপারদর্শী অরনীকে দেখে শীলা মুচকি হাসে। চোখ মেরে চুক চুক করে বলে,

    ‘কী রে! হাবি একটা গাড়িও কিনে দেয় না। সিএনজি দিয়ে বউকে পাঠায়! পুওর গার্ল...’

    শীলার বাসা থেকে বের হয়ে এসে অরনী মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে এই অপমানের প্রতিশোধ তাকে নিতেই হবে। শীলাকে তার দেখিয়ে দিতেই হবে অরনী এখনো ফুরিয়ে যায়নি। সে চাইলে এখনো সবকিছু আবার আগের মতো করতে পারে। হাজবেণ্ডের মনোযোগ পাবার ক্ষমতা তার শীলার চেয়ে কিছু কম নেই।

    অরনীও দিনরাত ছবি তুলতে শুরু করে। শিশির হয়তো বসে মন দিয়ে কাজ করছে। অরনী গিয়ে শিশিরের মুখ হাত দিয়ে ওর দিকে ঘুরিয়ে, গালে গাল ঠেকিয়ে ছবি তোলে। শিশির ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে যায়।

    প্রয়োজনের বেশি সাজগোজ করে বাইরে ঘুরতে যায়। যেখানে যা পায় তার সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তোলে। আর বাসায় এসে সব ফেসবুকে সমানে আপ্লোড করতে থাকে। মিনিটে মিনিটে নটিফিকেশন আসে। লাইকে লাইকে ভরে যায় ফেসবুকের টাইমলাইন।

    অপরিচিতদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টের বণ্যা বয়ে যায়। মেসেঞ্জারের অসীম খোলা প্রান্তরে মেসেজেরা হুটোপুটি খেতে থাকে। অরনী রাজহংসীর মতো গলা উঁচু করে সবাইকে ইগনোর করে। তার তো শুধু নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। আর বেশি কিছু নয়। শীলা যা পারে, তা সে কয়েকগুণ বেশি পারে এটা তাকে দেখিয়ে দিতে হবে।

    তবু শীলার সাথে সে কেন যেন পেরে ওঠে না। শীলার হাজবেন্ড অবলীলায় জড়াজড়ি করে শীলার সাথে ঘনিষ্ঠ ছবি তোলে। শিশিরকে দিয়ে সে কিছুতেই সেরকম ছবি তোলাতে পারে না। শীলা কতো ঘোরাঘোরির ছবি দেয়, তার হাজবেন্ড সহ। অরনীও শিশিরকে নিয়ে এখানে সেখানে বেড়াতে যায়। আহসান মঞ্জিল, লালবাগের কেল্লা...কখনোবা ঢাকার বাইরে।

    অরনীর উদ্দেশ্যই থাকে বেশি বেশি ছবি তোলা। শিশির ভীষণ বিরক্ত হয়। বলে,

    ‘অরনী, ঘুরতে এসেছি। আসো, ঘোরাটা এনজয় করি। জায়গাটা দেখি। পাগলের মতো ছবি তুলে কী করবে?’

    অরনী তবু হাল ছাড়ে না। একবার না পারিলে...।

    এরমধ্যে একদিন হঠাৎ রাস্তাতে শীলার সাথে অরনীর দেখা হয়ে যায়। অরনী রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মাটির ফুলদানি দরদাম করছিলো।

    সে দেখতে পায়, শীলা একটা হোটেল এর সামনে থেকে তার স্বামীর সাথে হাত ধরাধরি করে বেরিয়ে আসছে। অরনী লুকিয়ে পড়তে চায়। আজকেও সে একা। শীলা না জানি কেমন খোঁচাটা দেবে! অরনী লুকিয়ে পড়ার জায়গার সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।

    ওরা কিছুটা সামনে এগুতেই অরনী লক্ষ্য করে, শীলা অন্য একজন লোকের হাত ধরে হেঁটে আসছে। সাথের লোকটা তার স্বামী নয়। ইতিমধ্যে সে ও অরনীকে দেখে ফেলেছে। একটুও অপ্রস্তুত না হয়ে সামনে এগিয়ে এসে বলে,

    ‘আরে অরনী যে! মিট মাই ফ্রেণ্ড...’

    অরনী সবিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। ফ্রেন্ড? কেমন ফ্রেণ্ড? হোটেল থেকে হাত ধরাধরি করে...!

    শীলা অরনীকে তার ফ্রেণ্ডের কাছে থেকে একটু দূরে সরিয়ে এনে বলে,

    ‘কী রে! এতো অবাক হওয়ার কী আছে?’

    ‘শীলা...তুই? তোর হাজবেণ্ড তোকে এতো ভালোবাসে...!’

    ‘তাই নাকি?’ শীলা হো হো করে হেসে ওঠে।

    ‘বন্ধু, ওসব করতে হয়। শো অফ। আমার হাজবেণ্ডকেও করতে হয়, আমাকেও করতে হয়। সোস্যাল স্ট্যাটাস ঠিক রাখতে হয়। অন্যদের কাছে আইডল হবার জন্য করতে হয়। সে এতে অংশ নিয়ে আমার ফ্রেণ্ডদের সাথে ফ্লার্ট করার সুযোগ পায়। তাদের সাথে রিলেশন রাখতে পারে। আমি খোঁজ নিতে যাই না। আর আমাকে করতে হয় বোরডম কাটানোর জন্য। এক মুখ দেখতে দেখতে বোর হয়ে যাই...’

    শুনতে শুনতে অরনীর মাথা ঘুরতে থাকে সেই প্রথম দিনের মতো।

    তাড়াতাড়ি বাসায় এসে শুয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ফেসবুক খুলে চোখ দেয় শীলার পেজে। সেখানে স্বামীর সাথে সহাস্য মুখে দাঁড়ানো শীলার মুখে চোখে দিগ্বিজয়ের লিপ্সা! সেই থাকে ঝুলে থাকা স্ট্যাটাস,

    ‘বাইরে চমৎকার আবহাওয়া। মনে ডানা মেলা পাখীর ঝাপ্টা। উদ্দাম আনন্দে ভেসে যাওয়ার এই তো সময়! যদি পাশে থাকে মনের মতো একজন সঙ্গী। লাইফ ইজ রিয়েলি বিউটিফুল!’

    নিজের মোবাইল খুলে আজকের তোলা ছবিগুলোতে চোখ বোলায় অরনী। তারপরে সেটা বন্ধ করে ঘৃণাভরে বিছানায় ছুঁড়ে মারে।

    এতোদিনের জমে থাকা উষ্মা কাটিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়,

    ‘কালো মেঘেরা হারিয়ে গেছে অজানা আকাশে। আমার এক চিলতে বারান্দায় মিশে ছিল তাদের শেষ পদচিহ্নটুকু। সেটুকুকেও আজ বিদায় দিলাম। ঝকঝকে রোদে মিশে থাকুক জীবনের পবিত্র আবাহন............জীবন সে যে সত্যিই সুন্দর..!.’

     

     

     

advertisement