বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ নভেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৪৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৫৩

বিচারক স্কোরঃ ৩.১৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৩৮ / ৩.০

শাশ্বত প্রেম উপাখ্যান

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

বোধের নির্বিষ প্রাচীর

ঘৃনা আগস্ট ২০১৫

ভৌতিক গল্প লেখার প্রচেষ্টা

ভয় এপ্রিল ২০১৫

কোমলতা (জুলাই ২০১৫)

মোট ভোট ২৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৫৩ গন্ধাবতী

জাকিয়া জেসমিন যূথী
comment ১২  favorite ১  import_contacts ৯৯০
ছেলেটা সাহিত্যানুরাগী। মেয়েটাও সাহিত্য চর্চা করে। এ পথে ও পথে ঘুরে ঘুরে বহু খাতায়, বইয়ের পাতায় চোখ মেলে অবশেষে দুজনার দেখা হয়ে যায়। এক সাহিত্যমঞ্চে। মেয়েটি সেখানে নিয়মিত হাত মেলে ধরে। অনেকেই চোখ মেলে দেয় সে হাতে। মুগ্ধতা প্রকাশ করে। মাঝেমাঝে দু একটা কট্যুক্তিও জোটে। কোমলমতি মেয়েটি আঘাতপ্রাপ্তা হয়ে ঝড়ে যেতে চায়। তবু, নতুন কিছু লিখলেই ছুটে আসে পুনরায় কাউকে দেখাতে। এভাবেই জমে যায় অনেক লেখা। পরিচিতি বাড়তে থাকে। পরিচিত সে এমনিতেই। কোমল মনের বলে।
মেয়েটি বাসাতেই থাকে। বাইরে বেরোয় কম। মানুষের সাথে দ্বন্দ্বে যেতে চায় না। চারকোণা দেয়ালে বন্দী করে রাখে নিজেকে। অবরোধবাসিনী সে নিজেই নিজের। অনেকটা অন্তর্মুখী স্বভাব তার। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত তার দিন, তার কর্ম, তার জগত। সারাদিন ডুবে থাকে নিজের ভুবনে। লেখালেখিতে। ঐ চার দেয়ালের নানান অভিজ্ঞতাই কলম ছুঁয়ে চলে আসে কোন কোন সাহিত্য পাতায়।
এরকমই একদিন, তার সাহিত্য পাতায় চোখ বুলিয়ে যায় এক নবাগত। কাব্য তার নাম। অনুগল্পের স্রষ্টা হলেও কবিতাই পড়ে বেশি। লেখেও কম না। মেয়েটির লেখায় তার চোখ আটকে যায়। কদিনের মধ্যে মনটাও। অতঃপর তাদের কথোপকথন শুরু হয়। বিন্দু বিন্দু অনুভূতিগুলো জমতে থাকে। দুজনে দুজনায় মেতে ওঠে প্রাত্যহিকতায়। কাব্য নামের ছেলেটি গান গায় মুক্ত কণ্ঠে। গান ভালোবাসে তরুণীও। খোলা কণ্ঠের গানে মুগ্ধতা ছড়ায় সে। নতুন বন্ধুটির প্রতি পারস্পরিক আগ্রহ। এই প্রথম সে ছেলেটির প্রোফাইলের ছবিগুলোতে দৃষ্টি দেয়। উত্তম কুমার টাইপের নায়কীয় চেহারা। চুলের ছাট হুবহু সেই স্টাইলে। এক চিলতে সৌম্য হাসি খেলা করে ছেলেটির দু চোখে, প্রশস্ত ঠোঁটজোড়ায়ও। শিশুর মত কোমলতায় ছাওয়া তার প্রতিটি মুখচ্ছবিতে। মেয়েটির কোমল মন ছেলেটির কোমল চেহারায় ডুবে যায়। লাজুক ছেলেমানুষী একটা চেহারা সারা দিন রাত মেতে আছে মেয়েটিকে ঘিরে, আপন আপন গন্ধে মিশে যেতে থাকে সারা বেলায়।
মেয়েটি বিকেলের চায়ে চা পাতার গুড়ো ছাড়বার আগেই ওর জানালায় যে ক’জন উঁকি দিয়েছে তাদের সবাইকে সহ কাব্যের কাছেও জেনে নিচ্ছে, “চা কি খাবা?”
কাব্য ভাবছে, বাহ! দারুন আহ্বান! তারুণ্যের উচ্ছ্বলতায় যেন খুব কাছেই দেখতে পেয়ে গেছে সে চায়ের আহবানকৃত মানুষটির আয়োজন। এই অনুভবের গন্ধে ডুবে যেয়ে কাব্য নামের ছেলেটি তার এই নবপরিচিতা কবিতার নাম দিয়েছে গন্ধাবতী। মেয়েটি এখন তার চিরচেনা নাম হারিয়ে নতুন নামে নবনিতা। এখন সে গন্ধাবতী।
কাব্য বলে উঠে, “হ্যাঁ, চা খাবো, গন্ধাবতী! বানাও তবে!”
“গন্ধাবতী! নাম আর পেলে না?” নাম নিয়ে তিরস্কার করলেও মনে মনে তার ভালোই লাগে। উপভোগ করে, বার্তা জানালায় ভেসে আসা লাজুক চোখের ছেলেটার চেহারায় চেয়ে মেয়েটার ভালো লাগে। শিশুসুলভ চঞ্চলা বালকের সাথে আড্ডা দিতে দিতে সেও যেন এক মুহুর্তে হয়ে উঠে চঞ্চলা বালিকা। কিশোরীসুলভ উচ্ছ্বলতায় পুনরায় সুধায়, “চিনি কতটুক? এক নাকি আধা?”
“চায়ে চিনি খাইনা যে আমি, গন্ধাবতী!”
“ঠিক আছে। দিয়ে ফেলেছি, বলতে বলতেই। আজকের মত খেয়ে নাও তবে?”
জিজ্ঞাসা নয়, অনুরোধ নয়। এ যেন এক অমোঘ নিয়তির মত আদেশ মেয়েটির। কাব্যকে যাই চাপিয়ে দেবে তাই যেন সে করবে বলে ভেবে নেয় সে।
গন্ধাবতীর আরেক পরিচয় ঘুমকুমারী সে। রাতে ঘুম। সকালে বেলা করে ওঠা। তারপরে দুপুরে আবার কিছুটা সময় গড়িয়ে নেয়া। সন্ধ্যায় একটু মিনি ঘুম। ওকে সবাই ঘুমকুমারীই বলতো। এখন সে গন্ধাবতী নাম নেয়ায় ঘুম হারিয়েছে দূরে। সারাদিন যেন কী এক ঘোর। কী যেন এক নেশা। নিজস্বতাই হারিয়েছে তার। সারাদিনের প্রতিটি অবস্থানে তাকে জড়িয়ে নিয়েছে কাব্য। হারাতে দেয় না। নিজেও হারায় না। সারাক্ষণ ঘিরে রাখে। কড়া প্রহরায়। এক অদৃশ্য বাঁধনে। এই অদ্ভূত ঘোর, এই অদ্ভূত আহ্বানকে প্রেম বলে ভাবেনি মেয়েটি। ভালোলাগাই কাজ করে শুধু। কাব্যের চেহারার ঐ মিষ্টি কোমল নিষ্পাপ হাসি, ওর জন্যে ঢেলে দেয়া অত আবেগ, অত স্নেহের ডালা উপভোগ্য তো বটেই। এতটা খেয়াল আজকাল কে বা রাখে কার! তবু অচেনা তো। অচেনা যুবক। উড়ে এসে জুড়ে বসেছে মনের কার্নিশে। ও কী জায়গা চায়? বসত গড়তে চায়? ভাবনার গভীরে মাঝেমাঝে উঁকি দিয়ে যায় প্রশ্নটা। কিন্তু আমলে নেয় না কোমল। কাব্যের কথোপকথন হেয়ালী ভেবে নেয়। বেশি গভীরে যেতে না চেয়ে ভাবে,
‘এই বেশ ভালো আছি বন্ধুতায়!
আবেগ জড়িয়ে থাক যতটা পারা যায়’

এক রাতে কাব্য আর গন্ধাবতীর কথা হচ্ছে। গন্ধাবতী চেষ্টায় রত নতুন একটা কাব্য লেখার। এদিকে বাস্তব কাব্য ডাকছে তাকে,
“এই যে শুনো।” কোমলমতির খবর নেই। সে লেখায় মগ্ন।
অনেকক্ষণ ডেকে ডেকে ক্লান্ত কাব্য। ওদিকে খবর নেই তার কবিতার। অনেকটা সময় নাকি অল্প সময়। লেখার বিরতিতে যেয়ে ফেসবুক বার্তায় চোখ পরে গন্ধাবতীর।
“আমারে ঘুম পাড়িয়ে দেবেন, গন্ধাবতী?” সাড়া শব্দ না পেয়ে তরূণের মনে জেগেছে সংশয়। সম্বোধন গেছে পালটে। তুমি থেকে উঠে এসেছে আপনিতে।
গন্ধাবতীও কম যায় না। পালটা বলে উঠে, “এই তুই কীরে? এখনো ঘুমাস নাই!”
“ঘুম নাই!”
“ঘুম নাই ক্যান? কি করছিস বসে থেকে?”
“কিছু না!”
“কিছু নাহ?”
‘এইতো জেগে বসে আছি,
বিন্দু বিন্দু তারাদের ক্লান্তিটা গায়ে মাখছি,...’
কাব্যিক কিছু লাইন ছুটে আসে গন্ধাবতীর বার্তা ঘরে।
“পাগল!” বলে কোমলমতি ফের মগ্ন লেখার খাতায়। লিখতে লিখতে ভুলে যায় কাব্যের কথা। এত রাতে সে কি জেগে থাকবে? ঘুমোবার সময়। ঘুমোবে এটাই বাস্তবতা।
কিন্তু কাব্য ঘুমোয়নি। তার দুচোখে ঘুম নেই। কোমলমতিকে যতটা সময় জেগে থাকা দেখা যায়, সেও মনে করে এ তার অমোঘ নিয়তি, ওর পাশে থাকা। বসে বসে ও গান মুখস্ত করতে থাকে। গানে সুর তুলবে ও, তারপরে শুনাবে কবিতাকে। নিজের কণ্ঠে গাওয়া গান, ভাবই আলাদা তার।
গন্ধাবতী আছে তার নিজের খেয়ালে। ঘর সংসার সামলে যতটা সময় পারা যায় ডুবে থাকে নতুন কিছু লেখার নেশায়। নতুন কিছু লিখে ইতিহাস হওয়ার চেষ্টায় সে মেতে থাকে। ইতিহাস হওয়ার জন্য তাকে ইতি উতি লেখা তুলে ধরতে হয়। সারা রাত ধরে লিখে ভোরের দিকে সে ঘুমোতে যায়। ঘুমোবার আগে আবারও দেখা কাব্যের সাথে।
কয়েক ঘন্টা আগেই যেখানে কাব্যের বার্তা এসে রয়েছে, গন্ধাবতীর চোখে পরে নি। লেখা রয়েছে_
‘গন্ধাবতী, কোথায় গেলে?
কাব্যের চোখে ঘুম নেই,
ঘুম দাও তুলে।’

কোমলমতিও মজা করে জবাব পাঠায়,

‘আয় আয় চাঁদ মামা,
টিপ দিয়ে যা;
কাব্যের চোখে ঘুম নেই,
ঘুম দিয়ে যা!’

কাব্য মজা পেয়ে সুর করে ডাক রেকর্ড করে পাঠায়, “গ-ন্ধা-ব-তী!”

এভাবেই একদিন, দুদিন, তিনদিন, চারদিন, ... কথার পাহাড় জমতে থাকে। কাব্য মিশে যেতে থাকে গন্ধাবতীর কথার মোহে। রচনা করে একটার পরে একটা কবিতা আর অণুগল্প। গান আর লেখালেখিতে ডুবে থাকা অষ্টপ্রহর।

সকালে ঘুম হতে জেগেই জানালা খুলে চোখে পরে গন্ধাবতীর,

‘রোদের পাখনা মেলে এলো সকাল
গন্ধাবতী, নয়ন পেতে উঠে বসো,
ফুলের গন্ধে দিবস শুরু
করলে কারে মাতাল!’

কাব্য পাঠিয়েছে এ বার্তা। গন্ধাবতী ছন্দ মেলাতে জানে না। তবু মেলানোর ব্যর্থ চেষ্টায় লিখে,
‘এইতো পাগল, আছি ভালো। বলছি তোরে, শুভ সকাল!’

গন্ধাবতীর জবাব পেয়ে উচ্ছ্বাস বাড়ে কাব্যের। নব উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পরে নতুন কাব্য লেখার। কিন্তু গন্ধাবতী আবার ব্যস্ত হয়ে যায় আটপৌরে প্রাত্যহিকতায়। ভুলে যায় কাব্যের কথা। ভুলে যায় আরও অনেক কিছু। অনেকটা সময় পরে আবার যখন আসে, দেখে বসে আছে কাব্য তার দু’চোখ মেলে, জানালা খুলে। ওদিকে বৃষ্টি এসেছে। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতে ভিজে সারা প্রকৃতি, বাসা বাড়ি সব।

গন্ধাবতীকে দেখেই, ওকে উদ্দেশ্য করে কাব্য বার্তা পাঠায়,

‘গন্ধাবতী,
হারিয়ে গেলে কোথায়?
তোমার মায়া চোখে ডুববো বলে
বসে আছি এথায়,
আকাশ ফুঁটো ঝরছে অঝর
ডাকছে তোমায় আমায়,
ইচ্ছে তাহার ভেজায়;
বলো হারালে সই, কোথায়?’

‘পিচ্চিইইইইই!’ বলে কপট রাগ দেখায় কোমলমতি, “বৌদিদের যেখানে সেখানে ভিজতে হয়না, জানিস না রে পাগল?”

“না! ভিজতে হবেই তোমায়! বৃষ্টি সুধায় আমায়!”

গন্ধাবতীর ভ্রু জোড়ায় চিন্তার ভাঁজ। পিচ্চি কি ওকে নিয়ে বেশি ভাবতে শুরু করেছে? বন্ধুতার সিড়ি হতে ও কি আরও উপরে উঠে যাচ্ছে ক্রমশ? এ পথ কি খুলে দিয়েছে কোমলমতিই নিজে? শিশুসুলভ চেহারার ওই তরুণ কি নেশায় ডুবেছে তার গন্ধাবতীর? প্রশ্নগুলো হঠাৎ গভীরতা মেলে উঠে আসে এই ক’দিনের ঠাট্টার প্রাচীর খুলে। গন্ধাবতী কিছুটা দ্বন্দ্বে জড়ায়।

গন্ধাবতী হাস্যোচ্ছলে মৃদু বকা দেয়,

‘পাগল ছেলে!
এমনি করে বাসিস না রে ভালো।
জড়িয়ে যাবি নিজের জালে,
নিজের দোষেই হারাবি সব
হারাবি তোর, প্রাণটা অকালে’

পাগল কাব্য। কাব্যে পাগল। জবাবে শুধু বলে, “হিহিহি!”
গন্ধাবতী ফের দ্বন্দ্বে জুড়ে। “ব্যাপারখানা কি? হাসিস কেন, অবুঝ?”

মনে মনে বলে,
“সময় থাকতে পড় কেটে রে,
এসব লেখা নেই যে তোর কপালে।
আসুক আরও সুন্দরী আর কোমল লাজুক লতা,
আমার দেবরটির হাত ধরে!”
স্পষ্ট করে সুধাতে পারে না কাব্যকে। ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে, “প্রেমে পরেছিস কখনো?”

কাব্যের সেই একই কথার ঢঙ। একই হেঁয়ালি জড়ানো বার্তা,

“প্রেমে পড়েছি। বহুদিন বহুবার!

প্রেমে পড়েছি ওই জ্যোৎস্নাস্নাত রাতের,
কখনো মেঘমুক্ত শরতের আকাশের,

পড়েছি প্রেমে বহুবার ভুলে থাকা ভুলে,
মেঘঘন কোন রমণীর লম্বা কালো চুলে!

প্রলয় তান্ডব রুদ্র ঝড়ে
অক্লান্ত বারিষ যদিও ঝরে!

প্রেমে পড়েছি ঐ বহুদূর হেঁটে যাওয়া পথের,
প্রেমে পড়েছি বহুবার রৌদ্রতপ্ত ব্যস্ত সকালের!”

কোমল নামের মেয়ে গন্ধাবতীর স্বস্তি জড়ায় এতক্ষণে! যাক সে তরুণ, কথার প্রেমিক, পরেনি মানবীর প্রেমে! স্বস্তিজনক সুরে বেরিয়ে আসে তার বার্তা, “তবু ভালো। এমন প্রেমে নেই কোন প্রতারণা, হারানোর কোন ভয়!”

সম্পর্কে যখন থাকে না অবিশ্বাস, থাকেনা কোন কাঁটা, তখন হয় সে সম্পর্ক পবিত্র, ফুলের মত কোমল। ক্রমে ওরা মিশে যেতে থাকে আরও গভীর বন্ধনে। আত্মার আত্মীয় যেন। পাঁচ সাতদিন আগেও যাকে চিনতো না। কারো কাছে কারো অস্তিত্বই ছিলো না। এই দুটি প্রাণই আজ জুড়ে বসেছে ভ্রাতৃত্ব নয়, বন্ধু নয়, প্রেম নয় তবু এক অমর বন্ধনে। দুজনে মিশে আছে দুজনের আত্মার গভীরে। কোন সম্বোধন নেই, একজন ডাকে গন্ধাবতী, আরেকজন বলে পাগলা। এভাবেই চলতে থাকে আগামীর দিনগুলো। এরপরে পেরিয়ে যায় অনেক দিন।

মাঝে অনেকদিন যোগাযোগহীন। দুজনেই ব্যস্ত। সারাদিনে সেই আগের মত টান টান উত্তেজনা হয়েছে প্রশমিত। জীবনের যান্ত্রিক ব্যস্ততায় ছুটছে দুজনে দুমূখী।

এর মাঝে অনেকদিন কোমলমতি কিছু টাইপ করেনি। ইন্টারনেটেও বসেনি। কম্পিউটারের কাজের চেয়ে অন্য কাজে ব্যস্ততা ছিলো। শাশুড়ি হঠাৎ কিডনীর জটিলতায় চিকিৎসা নিতে গ্রাম থেকে শহরে আসেন। ল্যাব এইডে তার পেছনে ছুটাছুটি ছুটাছুটি, তুমুল ব্যস্ততার। সাংসারিক ব্যস্ততাই শুধু নয়, টেনশনেও কেটেছে অনেকগুলো দিন গুরুজনের সুস্ততার ভাবনায়। কাব্যের ফোন নাম্বার নেয়া থাকলেও কল দেয়া হয়ে ওঠেনি। মনেই পরেনি ওকে।

আজ অনেক দিন পরে ইন্টারনেট সংযুক্ত করে ফেসবুকে লগইন হতেই পেছন থেকে ওর স্বামী ময়ুখ আজিজ বলে উঠলো, “এতদিন বাদে বসলে! আমার সেই পিচ্চি ভাইটা কেমন আছে?”

“জানি না কেমন আছে, আমার দেবর! অনেক দিন খোঁজ নেয়া হয়নি!” কোমলমতি বলে উঠলো ভাবলেশহীন কণ্ঠে।

অনেক দিন ফেসবুকে বসা হয়নি। নিরানব্বই প্লাস বন্ধুতা অনুরোধ, নোটিফিকেশন আর বার্তা জমে আছে। বার্তাঘরে কাব্যের বার্তা পরে রয়েছে অনেক পেছনে। আজ জুন মাসের বাইশ আর ও শেষ বার্তা দিয়েছে এক মাস আগে। বার্তা অনেক আগের। সেটা ব্যাপার না। ওকে পায়নি তাই বার্তা দেয়া ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু অবাক করা দৃশ্য হলো এই, “আপনি এই বার্তার কোন জবাব দিতে পারবেন না!” এরকম কথা লেখা থাকে যদি আইডিটা ডিএক্টিভ করা থাকে। কাব্য কেন ওর আইডিটা ডিএক্টিভ করবে? ও কাব্যের ফোন নাম্বারটার খোঁজ করে। মোবাইলে সেভ করা নেই ওটা। কোন যেন এক প্যাডে লিখেছিলো? খোঁজ খোঁজ খোঁজ। অবশেষে পাওয়া গেলো সেটা। এখন রাত সাড়ে এগারোটা ছাড়িয়ে গেছে। ফোন করা কি ঠিক হবে? ফেসবুকে চ্যাটিং চলতে পারে সারা রাত, তাতে কেউ কিছু মনে করে না। ফর্মালিটিস ক্ষুণ্ণ হবার মত কোন ব্যাপার থাকে না। কিন্তু রাত দশটা পেরিয়ে গেলে কাউকে ফোন দেয়াটা কেমন যেন দেখায়। ফোনে নাম্বারটা ডায়াল করে কানে ঠেকাতেই ময়ুখও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলো ওর দিকে। ও চাপা চিন্তাগ্রস্ত! ফোনে অনেকগুলো রিং হলো কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ রিসিভ করলো না। একবার, দুবার, তিনবার! নাহ, কোন সাড়াশব্দ নেই। পেটের মধ্যে খামচি দিয়ে ধরেছে বিশ্রি একটা অনুভূতি! এমন লাগছে কেন? ময়ুখও এবার পাশে এসে দাঁড়ায়, “কি হয়েছে, কোমল?”
“কাব্যের আইডিটা ডিএক্টিভ! কল দিচ্ছি, কিন্তু ধরছেনা!” বউয়ের মুখটা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কিছুটা। চিন্তামুক্ত করতেই ময়ুখ বলে দিলো, “হয়তো ঘুমিয়ে পরেছে! সকালে আবার ট্রাই কোরো!” সেকথা বলার পরেও বউয়ের মোবাইলটা বার বার কানে লাগানো দেখতে পেয়ে “আচ্ছা দাও তো নাম্বারটা, আমার ফোন থেকে ট্রাই করি!” বলে ময়ুখ জোর করে নিয়ে নাম্বারটা ডায়াল করলো। কিন্তু বিফল হলো। ওপাশ থেকে কেউ রিসিভ করলো না।

এক রাশ চিন্তার ঝড় বয়ে গেলো কোমল মনে, কাব্যের কাব্য ঝড়ে মুর্ছনা তোলে যার মনে, সেই গন্ধাবতীর। কিন্তু গন্ধাবতীর চিন্তায় পানি ঢালতে সারা রাতেও কেউ এলো না।

খুব ভোরে, ঘুম জড়ানো কানে ভাইব্রেশনের বিশ্রি শব্দটা সুরের দ্যোতনা সৃষ্টি করলো ওদের ঘরে। ময়ুখ ও কোমল একসাথে জেগে উঠলো দুজনে। কল এসেছে কোমলের ফোনে। নাম্বারটা অপরিচিত। দ্বিধাদ্বন্দ্ব মনে রিসিভ করে কোমল ফোনটা কানে নেয়। আর ওকে অবাক করে দিয়ে একটা ছেলেমানুষী কণ্ঠ “হিহিহি” করে হাসে। পুরুষ কণ্ঠ। “কিরে পাগলা, তুই?” বলে চিৎকার করে ওঠে পাগলা কাব্য নামের মিষ্টি চেহারার ছেলেটার গন্ধাবতী।

তারপরে হয় অনেক কথা। কাব্য জানায়, “মাস খানেক আগে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ফেসবুক থেকে ‘সেশন এক্সপায়ার্ড’ বলে একটা বার্তা এসে আইডিটা হঠাৎ ডিজেবল হয়ে যায়। এই আইডিটায়ই সব গল্প জমিয়ে রাখতাম। সেটাই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খুব আপসেট হয়ে পড়েছিলাম। এর মধ্যে তুমিও লাপাত্তা! কেমন আছো?”

“কেমন থাকবো? আছি! চলছে! অনেক ব্যস্ততা ছিলো। এই গত রাতেই এসে দেখি তুই নাই!”

“হু, আগের আইডিটা নাই। কিন্তু আমি তো আছি। রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি নতুন করে আরেকটা আইডি খুলে। দেখো নাই?”

“ও! তাই নাকি? এত্ত রিকোয়েস্ট জমেছে যে একবারে অতটা চেক করে দেখা হয়নি। আমি আসলে অতটা দেখিইনা! সত্যি কথা, দেবরজি।” পুনরায় যোগাযোগে আগের সেই দুষ্টুমী উচ্ছ্বলতাও ফিরে এসেছে দুজনার মধ্যে।

“গন্ধাবতী, তোমায় তো একটা খবরই জানানো হয়নি! চাকরি হয়ে গেছে আমার।”

“আরে তাই? কবে কোথায়?”

“এইজন্যেই তো এখন নেটে বসা হয় কম। এটাই আমার অফিসিয়াল নাম্বার! তোমাকে জানাবো বলেই এই নম্বর থেকে কল দিলাম।”

...
এই শুরু হলো পুনরায় কথা। এবার আর ভার্চুয়ালী নয়। কথা শুরু মুঠোফোনে। এখন যোগাযোগ বাস্তবতায়। আর হারিয়ে যাওয়ার থাকবে না কোন ভয়। বন্ধুতার উর্ধ্বে উঠে যাওয়া এক অতুলনীয় আত্মার বন্ধনে জড়ানো দুটি কোমল প্রাণের কথোপকথন চলতেই থাকে। চলতেই থাকে...
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন