বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ অক্টোবর ১৯৯৭
গল্প/কবিতা: ৯টি

রিমোট গাড়ি

প্রশ্ন ডিসেম্বর ২০১৭

আমরণ ঋণী

ঋণ জুলাই ২০১৭

মায়ের ঋণ

ঋণ জুলাই ২০১৭

গল্প - প্রশ্ন (ডিসেম্বর ২০১৭)

স্যরের ১০মিনিট

খা‌লিদ খান
comment ৫  favorite ০  import_contacts ৩২
আমাদের সময় রেজাউল করীম নামের একজন স্যর ছিলেন। প্রতিদিন ক্লাস শেষে তিনি ১০মিনিট হাতে রাখতেন। স্কুলের প্রতিটি পিরিয়ডের জন্য সময় ছিল ৪০মিনিট। তিনি ১৫মিনিট পিছনের পড়া নিয়ে কথা বলতেন আর ১৫মিনিট সামনের পড়া বুঝানোর জন্য। আর শেষ ১০মিনিট প্রশ্ন পর্ব। তিনি এই ১০মিনিটের নাম দিয়েছেন ফ্রি টাইম ফর এনি কোশ্চেন। যে কোন প্রশ্নের জন্য উম্মুক্ত।
স্যর পুরো এলাকা জুড়ে এ কারণেই প্রসিদ্ধ ছিলেন। সকল ছাত্র-ছাত্রীর নিকট তিনি ছিলেন অনেক প্রিয় শিক্ষক। তিনি মোট ৫টা ক্লাস নিতেন। আর স্কুলও ছিল ফাইভ পর্যন্ত। তাই যারা হাই স্কুলে চলে যেত তারা স্যরের জন্য খুব কাদত। যেতে চাইত না। এমনও হয়েছে যে, কোন কোন ছাত্র ফাইভে পড়তো একাধিক বার। বার্ষিক পরীক্ষায় ইচ্ছা করে ফেল করত। আমিও তার একজন ছাত্র ছিলাম। আমি ফাইভে পড়েছি তিন বছর। কারন আমি যখন ফাইভে পড়ি তখনই সেই স্যর স্কুলে জয়েন করেন।
তার মূল বিষয় ছিল সমাজ-বিজ্ঞান। তার আরেকটা বৈশিষ্ট হলো তিনি বিজ্ঞান বুঝান ইসলাম ধর্মের আলোকে। প্রতিটা সুক্ষ্ম বিষয় তিনি ধর্মের অধীনে নিয়ে আসেন। এটা ছাত্রদের মাঝে দারুন প্রভাব ফেলে। আজ শুধু তার সেই বিষ্ময়কর ১০মিনিটের গল্পই শুনাবো।
তার সেই ১০মিনিট ছিল অনেক মজার, অনেক কিছু শিখার। তার এই একটা ক্লাস থেকে সবার অনেক কিছুই জানা হয়ে যেত। অনেকের মন-মানসিকতা, ভবিষ্যত ভাবনা অনেক কিছুই এ ক্লাসে এসে স্পষ্ট হত। তিনি তার ৩০মিনিটের ক্লাস শেষ করে বই বন্ধ করতেন। তারপর বলতেন- এবার বইটা বন্ধ করো। এবং আমার দিকে তাকাও। কারো কোন প্রশ্ন থাকলে সে দাড়াও এবং প্রশ্নটি করো। মনে রাখবে- যে কোন ধরণের প্রশ্ন হতে পারে। কারণ আমরা আমাদের এই সময়ের নাম দিয়েছি- ফ্রি টাইম ফর এরি কোশ্চেন।
ছাত্ররা প্রশ্নই খুজে পেত না। ভাবত- কী প্রশ্ন করা যায়…। তখন স্যর কোন একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিতেন। একদিন তিনি আলোচনা করলেন স্বয়ং ‘প্রশ্ন’ নিয়েই। বললেন-
আমরা আজ প্রশ্ন করতে এত লজ্জা পাই। ভাবি প্রশ্ন করব কি করব না। চিন্তা করি- যদি ভুল হয়ে যায় তাইলে তো সবাই হাসবে। অথচ প্রশ্ন মানুষকে অর্ধেক জ্ঞান শিখায়।
যে তোমাকে কোন বিষয় জানাচ্ছে তার মাথায় এক সাথে সব কথা নাও থাকতে পারে। এভাবে তুমি বঞ্চিত হতে পারো এমন জ্ঞান থেকে যা তোমার জন্য জরুরী ছিল। এখন তুমি যদি তাকে প্রশ্ন করো তাহলে তা তার মনে পরে যেতে পারে। এবং সে বলতে পারে- ওহ হো! আমি তো ভুলেই গেছিলাম। এটাও তো বলার দরকার ছিল।
প্রশ্নের মাধ্যমে ছাত্রের মেধা যাচাই হয়। তোমাদের মধ্যে সবচে’ মেধাবী কে তাও এই প্রশ্নের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে আবার তোমাদের মধ্যে সবচে’ দূর্বল কে তাও এই প্রশ্নের দ্বারাই বোঝা যাবে। প্রশ্নের ধরণই অনেক কিছু বলে দেয়। পূর্বযুগে সাদুদ্দীন নামের এক লোক ছিল। অনেক দূর্বল। তার প্রশ্ন শুনে ক্লাসের সকল ছাত্র হাসত। এক রাতে সে অলৌকিকভাবে মেধার মালিক বনে যায়। পরদিন সকালে সে এক প্রশ্ন করল। আগের মত সবাই হাসল। কিন্তু শিক্ষক গাম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন- এ প্রশ্ন তুমি কীভাবে করলে?
অন্যদিকে তোমাদের মাঝে দুষ্ট কারা সেটাও এই প্রশ্নের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। যেমন কিছু বিষয় এমন আছে প্রশ্ন করা যায় না। তা হতে পারে দুই কারণে}}} এক. বিষয়টা স্পর্শকাতর; দুই. বিষয়টা একটু এমনিতেই বোঝা যাবে…..
এভাবে তার বক্তব্য চলতে থাকে। তার লেকচার হত তাত্ত্বিক। বিষয় ভিত্তিক। আলোচনা থাকত থরে থরে সাজান। যেন কোন চলন্ত উইকি ইনসাইক্লোপিডিয়া।
আমি প্রথম যেদিন প্রশ্ন করেছিলাম সেদিনের ঘটনা। আগের দিন রাত থেকে আমি প্রশ্নের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
আমার বাবা ছিলেন এলাকার মেম্বার। তিনি স্যরকে ভালকরেই চিনতেন। তার উচু মানসিকতাকে শ্রদ্ধা করতেন। তাই প্রায় প্রতিদিনই আমায় জিজ্ঞাসা করতেন- আজ তোদের স্যর কী বলেছে? তুই তাকে কোন প্রশ্ন করেছিস কিনা?
যেই আমি বলতাম- ‘না বাবা, পারিনি’ অমনি খ্যাপে যেত। কারণ তিনিই আমায় রোজ একটা করে নতুন প্রশ্ন বানিয়ে দিত। কিন্তু আমি একদিনও বলতে পারতাম না। এমনিতেই সবার সামনে দাড়িয়ে কিছু বলতে আমার কণ্ঠ শুকিয়ে আসত। শরীর ঘেমে যেত। আর তিনি হলেন স্যর!!
প্রতিদিনের মত সেদিনও বাবা একটা প্রশ্ন শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তবে তা ছিল একটু অন্যরকম। বাবা বললেন- আজ তোদের রেজাউল করীম স্যরকে জিজ্ঞাসা করবি- স্যর আপনি এমন অসাধরণ প্রতিভা কীভাবে পেলেন? আপনার বড় হয়ে ওঠার কাহিনীটা একটু বলবেন।
আমি আগের মতই নার্ভাস হয়ে গেলাম।
স্যর প্রতিদিনের মত সেদিনও জিজ্ঞাসা করলেন- কারো কিছু জানার আছে? জানার থাকলে নির্দ্ধিধায় বলতে পারো। আমি প্রস্তুত জ্ঞান বিতারণে-
আমি বহু কষ্টে সেদিন দাড়িয়ে গেলাম। দাড়িয়েই কাপছি। কিচ্ছু বলতে পারছি না।
স্যর আমার দাড়ানো অবস্থা না দেখেই বললেন- ঠিক আছে! তোমরা আরো প্রস্তুত হও। আজ তোমাদের একটা সুন্দর ও মজাদার গল্প বলব।
এরই মধ্যে আমাদের ক্লাসের সবচে’ দুষ্ট রুমি তালুকদার বলে উঠল- স্যর, রাতুল দাড়িয়েছে!
স্যর আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলেন। আমি মাথা নেড়ে বসতে যাচ্ছিলাম আর বলছিলাম- না স্যর, আমার কোন প্রশ্ন নেই। ওরা আমাকে ধাক্কা দিয়ে দাড় করিয়ে দিয়েছে।
স্যর আমার চাহুনি ও কণ্ঠ শুনেই বুঝতে পারলেন আমার নার্ভ দূর্বল। আমার নিশ্চয় কোন প্রশ্ন আছে আর ওরা আমাকে ধাক্কা দিয়ে দাড়া করিয়ে দেয় নি। কারণ এই সাহস আপাতত এই স্যরের ঘন্টায় কারো নেই।
স্যর আমাকে কাছে ডাকলেন। আমি ইতস্তত করছিলাম। তিনি তার দু’হাত প্রসারিত করে ডাকলেন। অগত্যা আমি এগিয়ে গেলাম। কাছে যেতে যেতে সবাই দু’পাশ থেকে চিমটি ও টিপ্পনী কাটছিল।
আমি কাছে গেলে স্যর আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি ভেউ ভেউ করে কেদে দিলাম। আমার মনে হলো – কেমন একটা প্রশান্তি দেহ-মন ছুয়ে গেছে। দু-তিন মিনিট পর একটু সাহস করে বললাম- স্যর আমি প্রতিদিনই একটা করে প্রশ্ন বানিয়ে নিয়ে আসি। কিন্তু ভয়ে দাড়াতেই পারি না। আর আজ কোনমতে দাড়াতে পারলেও প্রশ্নটা ভুলে গেছি….
স্যর আমার কথা কেড়ে নিয়ে বললেন- তাই তোমার এবারের প্রশ্ন হলো- আমি কেন এমন ভয় পাই? আর আজ কেনই বা ভুলে গেলাম?
তাই তো!

এটা শুনে সবাই হেসে দিল।
স্যরও মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন- আজ তাহলে ২০মিনিট। প্রথমে রাতুলের এই ভুলে যাবার কারণ তারপর যদি ওর সেই প্রশ্নটি মনে পড়ে যায় তাহলে সেটার উত্তর। আর যদি না মনে পড়ে তাহলে আমার সেই মজার গল্পটি।
অনেকে আবদার করলো- স্যর আপনার সেই মজার ঘটনাটাই আগে বলুন।
স্যর বলেছিলেন- আসলে আমার এত কিছু করার উদ্দেশ্য তোমাদের রসের গল্প বলে মজা দেয়া না। তোমাদের জীবনের জন্য কিছু শিখানো। আর সেটা হবে তোমাদেরই প্রশ্নের মাধ্যমে। তাই তোমাদের ‘প্রশ্ন’ আমার কথার অবশ্যই অগ্রগন্য।
এবার শুরু হলো স্যরের ‘ভয়’ সম্পর্কীয় লেকচার
‘আসলে মানুষের ভয় সাধরণত দুই ধরনের। এক শ্রদ্ধার ভয়। দুই জানের ভয়। এর প্রত্যেকটিই আবার দুই প্রকার। এক স্বভাবজাত নার্ভ প্রবলেম। দুই স্বভাবজাত নয় বরং পরবর্তীতে সৃষ্ট। পরে ভয় সৃষ্টি হবার অনেক কারণ থাকতে পারে। তার আগে আমি বলব আমরা ভূতকে কেন ভয় পাই। এবং সবশেষে বলব এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। এখন শোন বিস্তারিত…..’
এভাবে তার ভয় বিশ্লেষণ চলতে থাকে। আর সবাই হা করে কথা গিলতে থাকে। আগে সবাই ধারণা করত- স্যর আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে আসে। আজ সেটা ভুল প্রমানিত হলো। স্যর বললেন – তোমাদের ছুটির সময় হয়ে গেছে। যাদের কাজ আছে চলে যেতে পার। আর রাতুল তুমি কি থাকবে না চলে যাবে? যদি থাক তাহলে আগে বলো তোমার প্রশ্ন মনে হয়েছে কি না? আর যদি না থাক তবে আমি আমার মজার কাহিনীটা বলা শুরু করব।
আমি বললাম- ‘আলবাৎ থাকব স্যর। আমার পরিবার আপনাকে সম্পূর্ণ সাপোর্ট দেয়। আর এই সামান্য দেরীতে কিচ্ছু বলবেন না তারা।’
সেদিন অবশ্য ক্লাসের কেউই বাসায় যায় নি। আমার মনে একটু সাহস লাগছে। মনে হচ্ছে আমি আমার মনের কোন মানুষের সাথে মনের কথাগুলোই বলছি।
এবার স্যর বললেন- তোমার প্রশ্নটা…
একটু ভয় পেয়ে বললাম- সেটা তো এখনো মনে করতে পারছি না।
স্যর এবার তার গল্প শুরু করে দিলেন। গল্পটা তারই ছোটবেলার। কীভাবে তিনি এত বড় হলেন? এত এত জ্ঞানের অধিকারী হলেন…। আর আমার প্রশ্নও সেটাই ছিল। তিনি কথা শেষ করে বললেন- কীরে রাতুল, তোমার প্রশ্নও বুঝি এটাই ছিল?
আমি অবাক হয়ে গেলাম। স্যর আমার মনের কথা কীভাব বুঝলেন?
পরে অবশ্য বাসায় এসে জেনেছি বাবাই তাকে সব বলেছে। এবং অনুরোধ করেছে তার ছোটবেলার কাহিনী সবাইকে বলতে। আমার নার্ভাস হয়ে যাওয়ার বিষয়টাও স্যর আগে থেকেই জানতেন।
এরপর আমার জমানো প্রশ্নগুলো একে একে তার কাছে করি। আমার প্রশ্নের সাথে অন্যদের প্রশ্নও যোগ হয়। ওরা সবাই আমার কাছে প্রশ্ন জমা দিত। আর আমি তা সাজিয়ে স্যরের কাছে পেশ করতাম। এভাবে আমি স্যরের অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে যাই। আর আমার জীবনের গতি সুনির্দিষ্ট করতে তার কাছেই আরো দু’বছর থেকে যাই।
আসলে প্রশ্নে রয়েছে নানাবিধ উপকার। যার কোনটা প্রত্যক্ষ্ আবার কোনটা পরোক্ষ। এতে মুখের জড়তা দূর হয়। সমাজ সেবায় গতি আসে।
এই প্রশ্ন ভবিষ্যতের বহু কাজের ভিত্তি প্রস্তরও বটে। যেমন সাংবাদিকতা, আলোচনা-সমালোচনার অনুষ্ঠান কিংবা টক-শো, বিভিন্ন বিতর্ক।
আমাদের বয়সের সাথে প্রশ্নে ধরণ পাল্টায়। আমরা একেক বয়সের মানুষ একেক রকম প্রশ্ন করি। আমাদের সৃষ্টিকর্তাই আমাদের প্রশ্ন ক্ষমতা দান করেছেন।
আর এ প্রশ্নের জন্য অবশ্যই সব সময় উত্তর তৈরী থাকা কাম্য। নইলে মানুষের বিগড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন