লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ আগস্ট ১৯৯৫
গল্প/কবিতা: ৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমা (জুন ২০১৪)

ভাঙ্গা বাড়ি আর আমার মা
মা

সংখ্যা

নাহিদ হাসান

comment ০  favorite ০  import_contacts ২৯৪
পরাজিত সৈন্য দলের মতো তারা একে একে যুদ্ধের ময়দান থেকে নিহত হয়ে ফিরে যাচ্ছে, কতদিন আর লড়াই করবে? দীর্ঘ ৩৪ বছর লড়ে গেছে অক্লান্তভাবে এখন আর আঁকড়ে ধরার শক্তিটা নেই, তাই বাড়ির ইটগুলির মূর্ছা যাওয়া চেহারা ধরা পড়ছে। ৩৪ বছরে এই বাড়ির তেমন উল্লেখযোগ্য কোন সংস্কার হয়নি কিন্তুআশেপাশের বাড়িগুলো ঠিকই দিন দিন বড় হয়েছে, আজ তারা এই বৃদ্ধ বাড়িটাকে দেখে মুচকি হাসে। তবুও এই ভাঙ্গা-ছোট্ট বাড়িটার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই, কারন সে তার বুকের ভেতর যে বিশাল একটা কিছুর ইমারত নিয়ে দাড়িয়ে আছে সেটা ছোয়ার সাধ্য আশেপাশের কোন বাড়িরই নেই। সে সাক্ষী হয়ে আছে তার ভিতর বাস করা মানুষদের অক্লান্ত শ্রমের, নতুন কিছু করার অদম্য ইচ্ছার আর আদর্শ নিয়ে জীবন সংগ্রামের প্রতিটা অধ্যায়ের।
এখন ঢাকা শহরে আবাসিক এলাকায়, বেশ সুন্দর একটা বাসায় থাকা হয়। প্রায় সন্ধ্যায় বসুন্ধরার গোছালো রাস্তায় হাঁটা হয় কিন্তু পা দুটো চলে অন্য কোথাও। ওই উদ্দেশ্যহীন হাঁটার মাঝেও না; কোথায় জানি একটা উদ্দেশ্য রয়ে যায়। আসলে বোকা মন খুঁজতে থাকে বগুড়ার সেই চিরচেনা ফ্লেবারটা, দু একটা মায়া মাখানো পুরনো মুখ। বাধ্য মনটা অবাধ্য হয়ে বার বার ফিরে যেতে চায় বগুড়ার সেই ছোট্ট বাড়িটাতে আর তার ভিতর বাস করা মানুষদের কাছে। প্রায় রাতে এই অবাধ্যতা যখন অসাধ্য হয়ে ওঠে না; বুকের ভেতর হু হু করতে করতে একটা গোঙ্গানি তৈরি হয় আর তখন মন টা মেতে উঠে গুগল ম্যাপে বাড়ির ছাদটা দেখার এক ব্যর্থ চেষ্টায়। তখন আক্ষেপ তৈরি হয় গুগল ম্যাপ আর একটু উন্নত কেন হয় না? আসলে দোষটা আমার ওদের যতটুকু করার ওরা করেছে, আমি ফেসেছি অন্যখানে।বিজ্ঞান পড়ার সুবাদে বিভিন্ন বন্ধন সম্পর্কে খানিক জানা হয়েছে কিন্তু মনে হয় ওসব well defined বন্ধনের চেয়ে অনেক গুণ বেশি শক্তিশালী হয় বিনা সুতার বন্ধনগুলো। এই অদৃশ্য বন্ধন গুলোর টান যে কতোটা শক্তিশালী তা টের পাই; যখন সচেতন মন প্রশ্ন করে কেন যেতে হবে, কেন কি আছে ওখানে ? আপাত দৃষ্টিতে তেমন কিছুই নেই বাড়িটাতে কিন্তু আমি যেই শৈশবের ঝলমলে দুপুর বুকে নিয়ে বড় হয়েছি তার সব রসদ আছে; আমার ছোট কাপা-কাপা পায়ে তালগোল পাকিয়ে ঠোঁট কাটার গল্প, দোলনার ধাক্কায় আমার ফেটে যাওয়া নাক, আমার পড়ার টেবিলটা, গুটিকয়েক বইয়ের কালেকশন, অনেকগুলো অসফল আর হাতে গোনা কয়েকটা সফল সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্ট আছে। ভাইয়ার, আপুর আর আমার চিৎকার চেঁচামেচির অনেক গুলো ক্যানভাস আছে।

প্রায় চার মাস হল আমি ঢাকাই , এই চার মাসের প্রায় প্রতিটাদিন আমার মা আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, “ বাবা! তোর ছুটি কবে?” আমার এক উত্তর “জুনে”। প্রতিদিন এক প্রশ্ন শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত হয়ে একদিন বলেই ফেললাম, “মা, তোমাকে আমি কতবার বলেছি যে আমার ছুটি জুনের আগে হবে না, তারপরও তুমি কেন একই প্রশ্ন করো?”
আমার মা গলায় একটা নীলাভ অনুভুতি নিয়ে বললেন, “ তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে রে! আমি রোজ ভাবি তুই যদি একদিন আমার কথায় বিরক্ত হয়েও চলে আসিস”। এ কথা বলার পর মা আর ধরে রাখতে পারেনি, আমিও আর ফোনটা ধরে রাখিনি।


১২-০৪-২০১৪ মিড টার্ম পরীক্ষা শেষ হল। মা আমাকে বললেন, “ একদিনের জন্য হলেও আয়, না বাবা”! আমি কড়া ভাবেই না বলে দিলাম। আমার মায়ের আবেগ বা অনুভুতির স্পন্দন যে আমাকে স্পন্দিত করে নি, তা নয়। আমি শুধু সত্য থেকে পালাচ্ছিলাম, যদিও মাঠটা ফুরিয়ে গিয়েছিল।

১৩-০৪-২০১৪ ময়মনসিংহ বাসস্ট্যান্ডে দাড়িয়ে ভাবতে লাগলাম নিজের সুখ খরিদ করতে তো ব্যর্থ হলাম, এখন অন্য কাউকে সুখী করে সুখ কিনতে হবে। তাই প্ল্যান করলাম না জানিয়ে বগুড়াই যেয়ে মা’কে চমকিয়ে দেব। বাসে উঠে ঘুমিয়ে পড়লাম, ঘুমের ভিতরে যখন চিন্তার চাকা ঘুরতে লাগলো তখন সপ্ন আর বাস্তবতার যে বিশাল ফারাক সেটা আঁচ করতে পারলাম। চোখ বন্ধ করা অবস্থায় যে কথাগুলো মনের মধ্যে প্যাচাচ্ছিল তা যদি গুছিয়ে বলা হয় তাহলে এইরকম কিছু একটা দাড়ায়, “মহাকালের প্রান্তরে আমাদের জীবন ধূলিকণার মতোন। জীবনাবসান চিরায়ত, তবুও থাকে শুধু ম্লান স্মৃতি। তাই মানুষের মনেও জায়গা থাকে প্রীতির স্মৃতিকে বহন করার জন্য। আর এই নশ্বর জগতে জীবনের চেয়ে জগত বড়। আবার জগতের চেয়ে অনুভূতি বড়। এই বড় অনুভূতিগুলোর মূল্য দিতেই আমার এবার বগুড়া যেতে হবে। কাঁটা দিয়ে যেমন কাঁটা তুলতে হয় তেমনি অনুভুতির মূল্য শুধু অনুভূতি দিয়েই দেয়া সম্ভব, এই বোধটা বার বার নাড়া দিতে লাগলো”।
আমি যখন বগুড়ায় এসে নামলাম তখন রাত ৪ টা। আমি সাতমাথা থেকে হাঁটা দিলাম বাড়ির দিকে তখন সঞ্জীব দা’র “ আমি তোমাকেই বলে দিব” এই গানটা মনের রেডিওতে বাজতেছিল। হুম, একা আমি, বিরান পথও আছে তবে আমার একা লাগছে না। দূষণ মুক্ত এই শহরে অ্যালুমিনিয়ামের থালার ন্যায় গোলাকার চাঁদ আমার যাত্রাসঙ্গী, একা আর লাগে কেমনে ?
এতো রাতে দরজা খুলাতে বেশ খাটতে হল, একবার তো এই চিন্তাও আসল দরজার পাশেই শুয়ে পড়ি। যাই হোক মা যখন দরজা খুললেন তখন ওনি এতটাই অবাক হলেন যে কয়েকবার আমার গায়ে ধাক্কা দিয়ে টেস্ট করলেন এবং কনফার্ম হওয়ার সাথে সাথেই বাবাকে ডাকতে ভিতরে চলে গেলেন আর বলতে লাগলেন , “ এই দেখো দেখো কে আসছে”! ওনি আমাকে দরজায় দাড়িয়েই চলে গেলেন আর আমি ভাবতে লাগলাম, “ আমার মা যে বাবার আদর্শ অর্ধাঙ্গী, সেটার পরিচয় ওনি সচেতন- অবচেতন সব ভাবেই দেন। ওনারা সবকিছুই অর্ধেক-অর্ধেক ভাগ করে নেন। আমাকে দেখার সুখ মা একা গ্রহন করতে চাননি। ৩৫ বছরের সংসারে তাঁরা যেমন দুঃখ ভাগাভাগি করেছেন তেমনি একজনকে ছাড়া অন্যজন অনেক সুখও ছেড়েছেন, আর আজকেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। যেই মন্ত্র মনে নিয়ে তাঁরা তাঁদের সংসার শুরু করেছিলেন তাঁরা আজও তাতে অবিচল। তখন মনে হচ্ছিল আমার বাবা-মা ভীষণ সফল, ভীষণ”!
আমার বাবা আসলেন, তারপর মা বললেন, “ শুকায় গেছিস তো, বাবা!” আমি বললাম, “ নাহ্‌ মা, মোটা হয়ে গেসিলাম, কয়েকদিন ডায়েট- টায়েট কন্ট্রোল করে সেইপে আসছি, না হলে তো তুমি আমাকে চিনতাই না”।
- তো তোর ছবি-টবি আছে নাকি? মোটা হওয়ার দেখি!
- আরে! শোনো আজকালকার ক্যামেরা তো মোটারে চিকন বানায় ফেলে। ওগুলার কোন বিশ্বাস নাই।
- ও! কারো বিশ্বাস নাই, শুধু তোর বিশ্বাস আছে তাই না? চল্‌ খেয়ে ঘুমাবি, খালি আজে-বাজে কথা-বার্তা।

মশারির ভিতরে মা আমাকে তাঁর চারমাসের জমানো সব কথা বলছেন, বাবার টি.ভি. অন করে ঘুমানোর কথা, ছোট মামার বিয়েতে গোশতে মশলা কমের কথা, ভাবির প্লেট ভাঙ্গার কথা, আমার ভাগ্নির টাইফয়েডের কথা ইত্যাদি ইত্যাদি। আজ কথাগুলো আমার কাছে সাধারন মনে হচ্ছে না, আমার বিরক্ত লাগছে না। এতো ক্লান্তির পরও আমার ঘুম পাচ্ছে না, ভাবছি পাবে ক্যামনে অনেকদিন পর তো আজ ঘুম ভাঙলো।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement