এই মাতৃভূমিও আমাদের মা। স্বাধীন এই দেশটার গৌরবের ইতিহাস আগামী প্রজন্ম কি মনে রাখবে? এই আর্তনাদ একজন মা হারা ছেলের। যে জন্মদাতৃ মা'য়ের ঋণ মেটাতে মাতৃভূমি মা'কে রক্ষা করতে যুদ্ধ করেছে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ মার্চ ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ৭টি

সমন্বিত স্কোর

২.৬৭

বিচারক স্কোরঃ ১.৪৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.২ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মা (মে ২০১৯)

মা ও মাতৃভূমি
মা

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৬৭

সাইফুল সজীব

comment ৭  favorite ১  import_contacts ৩৯০
সকাল ১০ টা বাজে। প্রচন্ড জ্যামের মধ্যে গাড়িটা থেমে আছে। গাড়ির ভিতরে ড্রাইভার রফিক আর বৃদ্ধ আবু তাহের সরকার। তাহের সরকারের বয়স ৭০ হবে। বাহিরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে এবং হালকা বাতাস বইছে। আবু তাহের সরকার গাড়ির গ্লাসটা একটু নামালো, আর রফিককে অনুরোধ করে বললো, "বাবা, এসিটা কষ্ট করে একটু বন্ধ করে দিবেন"। রফিককে শুধু আবু তাহের সরকারই আপনি বলে সম্মোধন করে। বাকি সবাই তুই-তুমি বলে ডাকে। আবু তাহের সরকারের এক ছেলে, ছেলের বঊ, এক নাতি আর এক নাতনী। নাতি আর নাতনী 'রফিক আংকেল' বলে ডাকে আর তুমি বলে সম্মোধন করে। কিন্তু ছেলে আর ছেলের বঊ তুই বলে সম্মোধন করে।
দীর্ঘ জ্যামে আটকে থাকা অসংখ্য গাড়ির অনবরত হর্ণ তাহের সাহেবের কানে বাজেভাবে লাগছে।বৃদ্ধ তাহের গাড়ির গ্লাসটি উঠিয়ে দিয়ে চুপচাপ বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। গাড়ি আস্তে আস্তে চলে আবার দাঁড়িয়ে থাকে। রফিক গাড়ির রেডিও চালু করলো। রেডিওতে সংবাদ পাঠ হচ্ছে। তাহের সাহেব বাহিরে তাকিয়ে সংবাদ শুনচ্ছে। সংবাদ পাঠিকা বলছে "ফেনীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন-নির্যাতনের পর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার প্রতিবাদে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ ধর্ষক-ঘাতক সিরাজ উদ দৌলার ফাঁসির দাবিতে ঢাকায় মিছিল হচ্ছে।"
তাহের সাহেব খবর শুনে চাপা এক দীর্ঘশ্বাস নিলেন! আকাশে মেষ ভালোই জমেছে, গোঙরিয়ে গোঙরিয়ে আকাশ ডাকছে। গাড়ি একটু একটু চলছে। তাহের সাহেব গাড়ির পিছনে থাকা মাসখানেক পুরাতন এক খবরের কাগজ দেখতে পেয়ে হাতে নিল। প্রথম পাতাতেই বড় করে লিখা "বাসের চাপায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আবরার নিহত, সড়ক অবরোধ"। তাহের সাহেব পত্রিকাটি সাথে সাথে যেখানে ছিল সেখানেই রেখে দিল।
নাতি-নাতনিদের জন্য তাহের সাহেবের মন খানিকক্ষণ পরপর কেঁপে-কেঁদে উঠছে। জারা ও জোবান দুজনেই স্কুল থেকে ফিরে এসেই দাদাকে এদিক-ওদিক খুঁজবে। ওরা ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুলে পড়ে৷ সারাক্ষণ ইংরেজিতেই কথা বলে। অবসর সময়ে জারা-জোভান বাসায় পোষা বিদেশী কুকুরের সাথে খেলা করে। এই কুকুরটার একটা নাম আছে "টনি"। টনিকে লালন-পালনের জন্য একজন কেয়ারটেকার রাখা হয়েছে। জারা-জোভানের অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী দূরসম্পর্কের এক আন্টি ওদের মা'কে উপহার হিসেবে এই টনি'কে দিয়েছিল।
জারা-জোভানের মা'য়ের নাম লীরা চৌধুরী। বড়লোক বাবার মেয়ে। বাচ্চা দুইটা তাদের দাদার কাছে দেশ ও স্বাধীনতার গল্প শুনতে চায়। কিন্তু তাদের মা' লীরা চৌধুরী ছেলে-মেয়েদেরকে দাদার সাথে মিশতে দিতে চায় না। মা' লীরা চৌধুরী মনে করে, এইসব গল্প গ্রামের কালচার। ছেলে মেয়েরা গ্রাম্য হয়ে যাবে।
১৬ই ডিসেম্বর, ২১শে ফেব্রুয়ারি এবং ২৬শে মার্চে ছেলে-মেয়েদেরকে নিয়ে লীরা রেস্টুরেন্টে খেতে যায়, অথবা সিনেপ্লেক্সে ইংরেজি মুভি দেখতে যায়। তাহের সাহেব প্রায়ই ভাবে, নূতন প্রজন্ম কি তাহের সাহেবের মা-মাতৃভূমির ইতিহাস ভুলে যাবে! ৩০ লক্ষ শহীদ তাদের রক্তের বিনিময়ে যে মা'কে দিয়েছিল স্বাধীনতা, সেই গৌরবের ইতিহাস কী ভবিষ্যতে কেউ বহন করবে না?
লীরার বাবার নাম সুবের চৌধুরী। ঢাকা শহরের নামকরা ব্যবসায়ী। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি মানবতাবিরোধী ছিল। মহান মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে ধরিয়ে দিতেন।
তাহের সাহেবের ছেলের নাম মফিজুর রহমান সরকার (মফিজ)। একজন সরকারি চাকরিজীবী (উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা)। মফিজের এক সহকর্মীর মাধ্যমে সুবের চৌধুরী মেয়ে লীরা চৌধুরীর সাথে পরিচয় হয়৷ আস্তে আস্তে প্রণয়, তারপর বিয়ে। সুবের চৌধুরী তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে বেশ ধুমধাম ভাবে দিয়েছে। বিয়ের পর মফিজ তার নামের শেষে সরকার বাদ দিয়ে নিজেই চৌধুরী টাইটেল ব্যবহার করছে, মফিজুর রহমান চৌধুরী (মফিজ)। শ্বশুর তাতে বড্ড খুশিই হয়েছে।
মফিজের মা জুবেদা খাতুন মারা গিয়েছে বছর পাঁচেক আগে। ছোট বয়সে বিয়ে করে জুবেদা খাতুনকে ঘরে তুলেছিলেন তাহের সরকার। সংগ্রামের কয়েকবছর পর তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় জুবেদা খাতুনের বয়স ছিল ১৫ বছর। তারা একই গাঁয়ের এবং একই পাড়ার বাসিন্দা। এক উঠানেই দুইজনের ঘর। সম্পর্কে মামাতো- ফুফাতো ভাই-বোন। বিয়ের আগে একদিন তাহের সাহেব হাটে যাচ্ছিলেন। পিছন থেকে একজন মিয়া ভাই, মিয়া ভাই বলে দৌড়ে আসছে। তাহের সাহেব থামলেন এবং পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলেন জুবেদা খাতুন। কাছে এসে জুবেদা বলছে;
-মিয়া ভাই, হাটে যাচ্ছেন?
-হ্যাঁ,কোন্? তোমার কিছু লাগবে?
- আমার জন্য আলতা আনবেন?।
এই কথা বলেই লাজুক জুবেদা দৌড় দিলেন পাশের বাড়িতে সই পারুলের ঘরে।
তাহের সাহেব এর আগে অনেক বার হাটে গিয়েছে, কিন্তু এইবার এক অদ্ভুত আনন্দ বিরাজ করছে তার মনে। জুবেদার জন্য ছিল তার আলাদা একপ্রকার সন্মান-শ্রদ্ধা আর মায়া।
হাটের কাজ শেষ করে তাহের সাহেব আলতার দোকানে গেলেন। আলতার সাথে লাল কাঁচের চুড়ি আর চুলবাঁধার লাল-সবুজ ফিতা কিনলেন। পরম আনন্দে তাহের সাহেব বাড়ি ফিরছে। পথে বার বার তাহের সাহেব লাল-সবুজ ফিতাগুলোর দিকে তাকাচ্ছে
দেশে তখন থমথমে অবস্থা।আজ ৭ই মার্চ ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর ভাষন দিবে৷ এইদেশটা তাহের সাহেবের কাছে 'মা'য়ের মতো সন্মানের। তাহের সাহেব বিশ্বাস করে পাকিস্তানিদের কাছে 'মা' নিরাপদে থাকবে না। বাড়ি ফিরে তাহের সাহেব জুবেদাকে আলতা, চুড়ি আর চুলের ফিতাগুলো দিলেন। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল জুবেদার বড় ভাবি। বড় ভাবি একটু ঠাট্টা করছিলেন। তাতে লাজুক জুবেদা লজ্জা পেয়ে ভাবির পিছনে লুকালো।
তাহেরের বাড়ির রেডিও বাঁজচ্ছে, রেডিওতে ৭ই মার্চের ভাষন সম্প্রচার হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু বলছে "আমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি আরো রক্ত দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে তুলবো ইনশাআল্লাহ। এবারেরা সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।"
এই বাক্য শুনে যুবক তাহের যেন এক অদ্ভুত প্রাণ শক্তি ফিরেপেল। 'মা'কে মুক্তি করার তাগিদে সারা শরীরের রক্ত টগবগিয়ে উঠছে তাহেরের। আগাছাসরূপ পরাশক্তিকে মোকাবেলা করার জন্য এই বাক্যটাই তাহেরের মনকে সাহসী করে তুলেছে, চেতনাকে জাগ্রত করেছে।
আবু তাহের সরকাররের জন্মের দিন, জন্মদাত্রী মা প্রসব যন্ত্রনায় মারাগিয়েছিল। মা'য়ের আদর, মায়া, মমতা আর স্নেহ তাহের খুব অনুভব করতো। মা হারানোর যন্ত্রণা, একাকীত্ব আবু তাহের ক্ষনে ক্ষনে অক্ষরে অক্ষরে টের পেয়েছে। আবু তাহেরের বাবা ছিলেন একজন সাহিত্যিক| তাহেরের মা, মারাযাওয়া পর আর বিয়ে করেননি তাহেরের বাবা। তাহেরের বাবা, ছোট মাতৃহারা তাহেরকে সবসময় মা'য়ের গল্প বলতেন, আর বলতেন তাহের নাকি দেখতে তার মা'য়ের মতো হয়েছে। তাহেরদের বাসায় তার মা'য়ের একটা ছবি ছিল। তাহের বাস্তবে মা'কে না দেখলেও, মা'য়ের আদর না পেলেও; সে তার ভাবনায় তার মা'কে সন্মানের সর্বোচ্চ স্থানে রেখেছেন। তাহের মনে মনে ভাবে, এই পৃথিবীতে যদি সে জন্ম না নিতো; তাহলে তার মা হয়তো পৃথিবীর মায়া এতো তাড়াতাড়ি ত্যাগ করতো না। তাহের তার মা'য়ের কবরের পাশে প্রতিদিনই যেতো আর আর বলতো, "ক্ষমা করো দিও মা। তোমাকে পৃথিবীর মায়া ছাড়তে হয়েছে আমার জন্য ৷" তাহের সব সময় মহান আল্লাহর কাছে মৃত মায়ের জন্য অঝোরে কান্না করে দোয়া করতেন আর বেহেশতের বাসিন্দা করার জন্য প্রার্থনা করতেন।

তাহেরের বাবা তাহেরকে সবসময়ই বুঝেয়েছে এই দেশই তোমার মা। শিখিয়েছে এই দেশমাতৃকার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সেই ভয়াবহ গভীর রাত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালির উপর ঝাপিয়ে পড়েছে। তাহের তার মাতৃভূমি মা’কে আর মারাযেতে দিবে না। তাহের জাগ্রত, তাহের দুর্বার। সেই রাতেই, তাহের তার বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়ে বললেনঃ
-বাবা, আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি এই দেশকে পরাধীনতার শিকল ভেঙে মুক্ত করতে যাচ্ছি। আজ আমি মুক্তিবাহিনীতে যোগদেব ।
- তাহের, আমিও যাবো তোর সাথে বাবা। দেশটাকে স্বাধীন করেই ফিরবো।
বাবা-ছেলে একসাথে রাতের অন্ধকারে বের হয়েগেল, একটাই উদেশ্য- এই মা, এই মাটি আর এই দেশের একটি কণাও ছাড়া যাবেনা। তাহের তার মৃত মা'য়ের ছবিটা সাথে নিয়েছিল। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় পাশের বাড়িতে তাকিয়ে দেখে হারিকেন হাতে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে যে জুবেদা খাতুন, তা বুঝতে তাহেরের অসুবিধে হয়নি। তাহের আর তার বাবা যাচ্ছে, দূর থেকে জুবেদা খাতুন তাকিয়ে আছে। একটা সময় হারিকেনের আলো ছাড়িয়ে আঁধারে মিশেগেল বাবা-ছেলে।
হোসেন মিয়া, একই গ্রামের বাসিন্দা। সে চেয়েছিল পাকিস্তান অখন্ড থাকোক। নূতন সূর্য উঠুক সে চায়নি। সে তাই পাকিস্তানিদের পক্ষে জনমত গড়তে আর মুক্তিবাহিনীরকে পাক-হানাদার বাহিনির কাছে তুলে দিতে আল-বদর বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। যুদ্ধকালীন সময়ে একদিন হোসেন মিয়া পাক-হানাদাদের নিয়ে এসে তাহেরদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তাহের ও তার বাবার তথ্য দেয়নি বলে জুবেদার নিরীহ বড় ভাইকে গুলি হত্যা করেছে আর অন্তঃসত্ত্বা জুবেদার ভাবিকে গণধর্ষণ করে হত্যা করে গিয়েছে। তার একদিন আগে জুবেদা তার বাবা-মায়ের সাথে মামার বাড়ি চলে গিয়েছিল। হত্যার দিনই বিকেলে জুবেদার ভাই-ভাবী মামার বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল।
এইভাবে নয় মাস সারাদেশে হামলা, হত্যা, ধর্ষণ করেও অত্যাচারী পাকিস্তানিরা মাথা নত করে পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হয়েছে, এই বাংলা-মা'য়ের বীর ছেলেদের কাছে।
১৬ই ডিসেম্বর মা স্বাধীন হয়েছে, সারাদেশে অনন্দ মিছিল হচ্ছে; "জয় বাংলা, বাংলার জয়"।১৭ই ডিসেম্বর জুবেদা তার বাবা-মায়ের সাথে মামার বাড়ি থেকে নিজেদের বাড়িতে আশে। ভাই-ভাবীর মৃত্যুর খবর আগেই শুনতে পেয়েছিল। বাড়িতে গিয়ে স্বজনহারা জুবেদাদের সবার মনে থমথমে অবস্থা। তাও এক অদ্ভুত মাটিচাপা আনন্দ সবার মনে, এই মা,মাটি, এই দেশ স্বাধীন হয়েছে।
৯ মাস যেভাবে একজন মা তার অনাগত শিশুকে পেটে রেখে ব্যথার যন্ত্রনা সহ্যকরে, সেই সময় মা'য়ের ভালোভাবে ঘুম নেই, খাওয়া নেই; অনাগত সন্তান প্রসবের সময় মা কষ্ট সইতে না পেরে দাঁত কামড়িয়ে থেকে যখন দেখে তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তখন সাথে সাথে মা'য়ের কষ্ট নাই হয়ে যায়। ঠিক বাংলা মাও এমনই ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে, একটা লাল-সবুজ পতাকা যখন মুক্ত আকাশে উড়তে দেখেছে, সাথে সাথে বাংলা মা'য়ের সেই কষ্ট জয়ী হয়েছে৷
স্বাধীন হয়ে গেল দেশ, কিন্তু তাহের ও তার বাবা এখনো ফিরেনি। জুবেদা সকাল সন্ধ্যা পথ চেয়ে থাকে৷
একদিন খুব ভোরে, ফজরের আযানের পর সূর্য উঁকি দিচ্ছে। জুবেদা ঘুম থেকে উঠে বাহির হয়ে দেখলো, অদূরে তাহেররের মা'য়ের কবরের পাশে একজন হাটুগেড়ে বসেআছে। আর লাল-সবুজ রঙের একটা পতাকা মা'য়ের কবরের পাশে একটা লম্বা লাঠিতে উড়ছে। এইটা মিয়া ভাই, জুবেদা বুঝতে পারে। জুবেদার খুব আনন্দ লাগছে।
কিন্তু তাহের একা। তার বাবা, পাক-হানাদারদের হাতে শহীদ হয়েছে।
তাহের হারিয়েছে তার বাবাকে। জন্মদাতৃ মা’কে হারিয়েছে জন্মের সময়। এই বাবা-মায়ের ঋণ কি মাতৃভূমি মা’কে স্বাধীন করে মিটাতে পেরেছে? তাহেরের কাছে ২১শে ফেব্রুয়ারী, ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর অনেক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দেশের, এই মা’য়ের অস্তিত্ব রক্ষাত্বে এই দিন গুলো মনে রাখা উচিৎ। তাহের মনে করে, এই স্বাধীন দেশে মানুষ কখনো নিজের দেশের ভাই-বোনকে কষ্ট দিবে না। তাতে মা অনেক কষ্ট পাবে, হত্যাতো অনেক দূরের কথা।
স্বাধীনতা পরের বছর তাহের আর জুবেদার বিয়ে হয়। মফিজ হলো তাহের-জুবেদার দ্বিতীয় সন্তান। প্রথম সন্তান সাত বছর বয়সে পানিতে পরা মারা গিয়েছে। প্রথম সন্তার মারা যাওয়ার পর জুবেদা খাতুন মানষিক ভাবে ভেংগে পরেছিল। নানান ডাক্তার-কবিরাজ দেখানোর পর জুবেদা খাতুন স্বুস্থ হয়েছে। তার ১০ বছর পর মফিজ তাদের কোলে এসেছে। মফিজকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য ঢাকাতে রেখে পড়িয়েছে। পড়াশুনা শেষে মফিজ তার বাবার মুক্তিযোদ্ধার কোটায় সরকারী চাকরী পেয়ে যায়। চাকরী পেয়ে বাবা মাকে নিয়ে যায় ঢাকাতে। মফিজের বিয়ের পর, বঊ আর শ্বশুরের পরামর্শে মফিজ তার বাবা-মায়ে ভূলিয়ে ভালিয়ে তাদের গ্রামের বিটেবাড়ি বিক্রি করে দেয়। উদ্দেশ্য, ঢাকাতে একটা ফ্লাট কিনবে। তাহের সাহেব মনে মনে ভীষন কষ্ট পাচ্ছিল।
আস্তে আস্তে জ্যাম ঠেলে, বৃদ্ধ বোঝা তাহের সাহেবের গাড়ি গিয়ে থামলো সাবারের এক বৃদ্ধাশ্রমে। ছেলে মফিজ, অফিসের কাজ আছে তাই ড্রাইবার দিয়েই বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিচ্ছে। সামনে ২৬শে মার্চ। জারা-জোভানের স্কুল বন্ধ। ছুটি কাঁটাতে শ্বশুর বাড়ির সবার সাথে স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে বিদেশ যাচ্ছে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement