টুং টাং কাঁচের গ্লাসের শব্দ চারিদিকে ।কাঁটা চামচ আর প্লেটের শব্দ অন্যান্য শব্দের সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত শব্দ তরঙ্গ চার দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে ।হাসি, গল্প আর গানের শব্দে গমগম করছে হোটেলের হল রুম ।আজ পুরোন বছরকে বিদায় দিয়ে গান, বাজনা, হাসি, ঠাট্টার সঙ্গে প্রচুর খাদ্যের আয়োজন করে নতুন বছরকে স্বাগতম জানানো হবে ।
সবাই মহা ব্যস্ত । কেউ খাওয়ায় ব্যস্ত , কেউ গল্পে ব্যস্ত, অকারন হাসছে কেউ,ফালতু কথা বলছে কেউ, অপ্রয়োজনে ছুটাছুটিতে ব্যস্ত কেউ । এ হলরুমে সবার থেকে বেশী ব্যস্ত সাদেক আলী । সে কিচেন থেকে খাবার সাজিয়ে টেবিলে টেবিলে পরিবেশন করছে । আজ নববর্ষ । হলরুমে তিল ঠাঁই নাই । নিজের বউয়ের কোমর কে ধরে আছে, কার ষড়শী কন্যা কোন যুবকের সঙ্গে লেপ্টে আছে , কেউ খেয়াল করছেনা । এ সব দেখার তাগিদ নেই করো মধ্যে । সাদেকের ও নেই। তবু তার চোখে বারে বারে এ ধরনের দৃশ্য পড়ছে । এদের মধ্যে অনেকেই তার হোটেলের অনেক পুরনো কাস্টমার । তাই সে বেশীর ভাগ সাহেব, বউ , ছেলে ও মেয়েদের চেনে ।তার পরিচিত মানুষ গুলো যখন নোংরামী করছে, তখন তারা লজ্জ্বা পাচ্ছেনা । লজ্জ্বায় মাথা অবনত করছে সাদেক ।
দৃষ্টি অবনত রেখে মাথা নিচু করে খাবার নিয়ে খুব দ্রুত পাশ কেটে চলে যাচ্ছে সাদেক। অতি সাবধানে টেবিলে খাবার পরিবেশন করছে । প্রতি মুর্হূতে অতিথিদের হুকুম পালনে ব্যস্ত সে । মাত্র তিন মাস আগে তার এ হোটেলে চাকুরি হয় । এ হোটেল সাদেকের খুব ভালো লাগে । আগের হোটেলের ম্যানাজার লোকটি ছিল জটিল প্রকৃতির । সে সবার সাথে খুব দুর্ব্যবহার করত। তবে মালিকের নির্লজ্জ্ব চাটুকার ছিল ।হোটেল মালিক ছাড়া ও যেকোন মালিক তোষামদকারী কর্মচারীকে বেশ পছন্দ করে ।তাই দেখা যায় চাটুকার কর্মচারীর চাকুরি সহজে যায় না ।সাদেক তোষামদের কাজ ভালো পারেনা বলে কয়েক মাস পর পর তাকে হোটেল পাল্টাতে হয় ।
আই.এ.পাশ সাদেক আলী ইংলিশ মোটামুটি লিখতে ও বলতে পারে । পিতার মৃত্যুর পর বিধবা মা ও ছোট দুই বোনের দায়িত্ব এসে পড়ে সাদেকের কাঁদে ।এ অফিস সে অফিস ঘুরে শেষ পর্যন্ত এক বন্ধুর সাহায্যে চাকুরি হয় ছোটখাট একটি চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে । চার বছর বিভিন্ন হোটেলে চাকুরি করার পর সে এ হোটেলে কাজ করছে । এ হোটেল যেমনি বড় ও সু্ন্দর, তেমনি ভালো ম্যানাজার ভদ্রলোকটি । সহজ- সরল সাদেকে তিনি খুব পছন্দ করেন ।
সাদেকের এ হোটেল এতটাই পছন্দ সে কিছুতেই এ চাকুরি হারাতে চায় না ।আগের হোটেলে দেখেছে যুবক- যুবতীরা দু’ কাপ কফি নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে আছে । যারা পরকিয়া করতে আসে তারা অবশ্য ভালো খাবারের অর্ডার দেয় । চিকন ফ্রাই, নুডুলস, লাচ্চি, ফালুদা তো থাকবেই । তবে তারা সব খাবারের অর্ডার একসঙ্গে দেয় না । কিছুক্ষন পর পর একটা একটা করে অর্ডার দেয় আর দীর্ঘক্ষন বসে থাকে । এরা দীর্ঘ সময় বসে থেকে কি মজা পায় সাদেক জানেনা, সে শুধু জানে হোটলে আগত অতিথিদের খুশী রাখতে হবে। এখানে আসার আগের চাকুরিটা হারিয়ে ছিল শুধু মাত্র একজন অতিথিকে খুশী করতে পারেনি বলে । সে ছিল প্রভাবশালী লোকের ষোড়শি কন্যা এবং অনেক পুরনো ও নিয়মিত কাস্টমার । সাদেক আইসক্রীম দেয়া সময় মেয়েটির দামী জামায় ফেলে । মেয়েটি প্রচন্ড রাগারাগি করে। সাদেককে যথেষ্ট বকাবকি করার পরে ও মেয়েটি ম্যানাজারে কাছে নালিশ করে । ম্যানাজার কাস্টমারকে খুশী রাখার জন্য সাদেককে সঙ্গে সঙ্গে বের করে দেন ।
এখন সাদেক অনেক সাবধানি । সে সব কাজে সব সময় খুব সতর্ক থাকে । সেজন্য এখানকার ম্যানাজারের সুনজর তার উপর আছে । আজ যখন নানা দৃষ্টি কটু দৃশ্য চোখে পড়ছে,সে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরয়ে নিচ্ছে । মহিলাদের পর পুরুষদের সাথে অন্তরঙ্গ সময় কাটাতে দেখে সাদেকের নিজের স্ত্রীর কথা মনে পড়ছে বারবার ।দু’ বোনের বিয়ে দিয়ে গত বছর সাদেক বিয়ে করে । মায়ের পছন্দ করা পাত্রী । তবে বিয়ের আগে পাত্রীর সঙ্গে মোবাইলে সাত মাস কথা বলে ছিল সে ।একমাস কথা বলার পর পাত্রী মমতাজের প্রেমে পড়ে যায় সাদেক । সে ছুটি পাচ্ছিলনা বলে বাড়ি যেতে পারছিলনা । ফলে বিয়েটা আটকে থাকে । মমতাজ আর সে রাতদিন ছটফট করেছে দুজন দুজনকে কাছে পাওয়ার অপেক্ষায়। একটা সময় অনেক কাকুতি মিনতী করার পর ছুটি পায় সাদেক । ছুটে যায় বাড়ি ।
তার পর ভালো লাগা ভালোবাসার মানুষটাকেে বিয়ে করে বাড়ি নিয়ে আসে । দশ দিনের ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিল সে । চোখের পলকে দশ দিন অতিবাহিত হয়ে গেল, টের পেলনা সাদেক । যেদিন বউ আর মাকে একা বাড়িতে রেখে কর্মস্থলে ফিরে এসেছিল, সেদিন বউ ও মা অঝোরে কাঁদেছিল । তার ও বউ আর মাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করেছিল । পুরুষদের কাঁদতে নেই, সেই কথা ভেবে বহু কষ্টে সে কান্না চেপে রেখেছিল । কাজে ফেরার পর অনেক দিন সে কাজে মন বসাতে পারেনি । বার বার নতুন বউয়ের মুখ খানা চোখে ভাসে । তার চলে আসা পথের দিকে তাকিয়ে বউ অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে ছিল ।মায়ের নজর এড়িয়ে পেছন থেকে বারবার গায়ের শার্ট ধরে টেনে ছিল । সাদেক সামান্য অবসর পেলেই বউকে ফোন করতো । গত দেড় বছর থেকে তার মোবাইল বিল অনেক বেড়ে গেছে । কাস্টমার কমে আসলে খাবারের অর্ডার নিয়ে কিচেনে কুককে বুঝিয়ে দিয়েই বউকে ফোন করতো ।যতদুর সম্ভব কন্ঠস্বর নিচু করে বউকে বলতো----- হ্যালো, মমতা কি করছো ? রাতের খানা খাইছ ? মা কই ? ঘুমাইছে ? তোমার একলা রাত জাগার দরকার নাই । তাড়াতাড়ি ঘুমাইয়া যাও । আইজ রাইত অনেক কাজ করতে হইবো আমারে । আজকে আর কথা হইবোনা । আগামী কাইল আবার ফোন করমু বলেই তাড়াহুড়ো করে ফোন কেটে দেয় ।প্রায় দিন মমতাজের কোন কথা বলা হয় না । যখন সে কিছু বলতে যাবে তখন সাদেক ফোন কেটে দেয় ।কারন ম্যানাজারে ধমক ও চোখ রাঙানোতে বাধ্য হয় সাদেক ফোন কাটতে ।কখনই ভালো ভাবে বউয়ের সাথে কথা বলতে পারেনা, বউয়ের কথা শুনার সময় হয় না ।
মা ও বউ নিয়ে তিন জনের সংসার ।অভাব অনটন লেগেই আছে তার জীবনে। যখন প্রেম করতো তখন ও মমতাজকে তেমন কিছু দেয়নি , বিয়ের একবছর পার হয়ে যাওয়ার পরও ভালো কিছু কিনে দিতে পারেনি সাদেক। তার মা ও বউ একা বাড়ি থাকে । চোখের সামনে এত পরকিয়া দেখার পর ও সে কোনদিন তার বউকে নিয়ে এ ধরনের কোন কিছু কখনই ভাববেনা । সে তার বউকে ভালো ভাবে জানে ও বিশ্বাস করে। তার ধারনা সততা, ন্যায়বোধ ও বিবেকের দিক দিয়ে তার বউ অন্য সাধারণ দশজন নারী থেকে অনেক উপরে । সে নিজে ও সব সময় সততার সাথে জীবন- যাপন করছে । মমতার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগে সে তার পাড়ার সম বয়সী এক মেয়ের প্রেমে পড়ে ছিল । সাদেক ইন্টার পাশ করার আগেই সে মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় অন্যত্র । মমতার সাথে পরিচয় হওয়ার আগে সে আর কোন মেয়ের দিকে ফিরে তাকায়নি ।
সাদেক আলী গরীব মানুষ । তাদের জীবনে বছরের প্রথম দিন যেমন শেষ দিনটি ও একই রকম থাকে । যাদের জীবনে পহেলা বৈশাখ কোন আনন্দ নিয়ে আসেনা, তাদের জীবনে ইংরেজী নববর্ষে জায়গা কোথায়? আজ নববর্ষ । ইংরেজী না বাংলা তা নিয়ে সাদেকের কোন মাথা ব্যথা নেই । তার চিন্তা ভালো ভাবে হোটেলের দায়িত্ব পালন করা ও পোয়াতি বউয়ে খোঁজ- খবর নেয়া । নববর্ষের প্রস্তুতির জন্য সাদেক সারাদিন গর্ভবতী স্ত্রী কোন খোঁজ নিতে পারেনি। ডেলিভারী আসন্ন বউয়ের খোঁজ নিতে না পেরে সন্ধ্যা থেকে তার মন খচখচ করছিল ।।যত রাত বাড়তে থাকে তত অতিথিদের আগমন বাড়তে থাকে। বহুবার চেষ্টা করে ফোন করতে ব্যর্থ হয় সাদেক । মনে নানা শংকা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সে ।রাত এগারোটায় তার সমস্ত শংকা সত্যি করতে বাড়ি থেকে ফোন এলো । রিং বাজতেই দৌঁড়ে হলরুম থেকে বেরিয়ে যায় সাদেক । একটু নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে ফোন রিসিভ করে---- হ্যালো, বলতেই তার মায়ের কন্ঠ ভেসে আসে ।
------- বাপ, বউয়ের অবস্থা বালানা ।
------ ক্যন? কি হইছে মা?
------- সন্ধ্যায় ব্যথা উঠেছে, কিন্তু এখনো বাচ্চা হইলোনা । আমি একলা মানুষ , কি করমু বুঝতাছিনা । আমার খুব চিন্তা হচ্ছে , বাপ ।
----- অবস্থা কি বেশী খারাপ? ধাত্রী খালা কি কয়? দেরী না কইরা যেমনে পার তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়া যাও । ফোনটা মমতারে দাও, হের লগে কথা কমু ।
------ আইচ্ছা, বলে মমতার কানে ধরে ফোন । মমতা কোঁ কোঁ ছাড়া কোন কথা বলছেনা । সাদেকের ভীষন কষ্ট হচ্ছে । সে বুঝতে পারছেনা এ মুহূর্তে তার কি করা উচিত । হলরুমে উচ্চ স্বরে গান গাইছে বহু নামী-দামী শিল্পী । অতিথীদের অট্টহাসি ও হাততালির শব্দ আর কানে ডুকছেনা সাদেকের । চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে । সে শুধু ভাবছে,নতুন বছর তার জন্য কি বয়ে আনছে ?