লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ মার্চ ১৯৮৫
গল্প/কবিতা: ১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঈদ (আগস্ট ২০১৩)

বৃষ্টি আমাকে ভিজিয়েছিল
ঈদ

সংখ্যা

হোসাইন সুনজন

comment ০  favorite ০  import_contacts ৩০৮
(১)
এয়ারপোর্টের পাশেই আমাদের পুরানো বাড়িটা। কর্ণফুলীর ঢেউ নিয়ে খেলতে খেলতে আমার বেড়ে উঠা। নেভাল একাডেমীর মুখে ঝাউবাগান পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত আর এয়ারপোর্টের বি¯—ৃত এলাকা আমার মানসিক চৌহদ্দি জুড়ে পুরো অ¤­ান। ৫ বছর আগে যখন আমি শিল্পের টানে স্কলারশিপ নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলাম তখন আমার পৃথিবীতে বিশেষ কেউ ছিলনা যে আমাকে এয়ারপোর্টে এসে বিদায় জানাবে। ছোট বেলায় বাবা-মাকে হারানোর পর আমার নিয়মিত অভিভাবক ছিল আমার চাচা। কিন্তু সেই চাচাও আমার থেকে মুখ ফেরাল যখন আমি ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ না পড়ে চার“কলায় ভর্তি হলাম।

আজ যখন মাদ্রিদের মায়া কাটিয়ে চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টে নামলাম বড় অচেনা মনে হচ্ছিল এয়ারপোর্টটাকে। আমার শৈশবের এয়ারপোর্ট রং পাল্টে এখন অনেক আধুনিক। আজও আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে কেউ আসবেনা জানতাম। দেশে ফিরছি সেটাও খুব একটা কাউকে জানানো হয়নি। একদিন আগে ফেসবুকে স্টাটাস দিয়েছিলাম। ফ্লাইটের সময় উলে­খ করে বলেছিলাম দেশি মডেল নিয়ে কাজ করব বলে দেশে আসছি। কেউ আমার পেইন্টিংস এর মডেল হতে চাইলে যাতে যোগাযোগ করে। কিন্তু অন্যান্য যাত্রীদের আত্মীয়-¯^জনদের দেখে আমার বুকের ভেতর কেমন জানি একটা চাপা কান্না বিরাজ করছিল। হঠাৎ আমার হাতে কারো স্পর্শ অনুভব করে চমকে উঠলাম তিথীকে দেখে। আমি কিছু বলার আগেই বলল আপনার ছবির মডেল হব তাই দেখা করতে আসলাম। আমার মনটা অদ্ভুত এক ভাল লাগায় ভরে উঠল।

তিথী আমার ছাত্রী। আমার কাছে ছবি আঁকা শিখত। নাইনে পড়ত তখন সে। আর এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে চার“কলাতে। আমি মাদ্রিদে যাওয়ার পর অনেক দিন যোগাযোগ ছিলনা। এখন ফেসবুকের কল্যানে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। সেদিনের ছোট্ট মেয়েটা এখন যে কারো চোখে পড়ার মত সুন্দরী নারী। তারপরও তাকে চিনতে আমার একটুও ভুল হলনা। কারণ ঝশুঢ়ব এ প্রায় সময় ভিডিও চ্যাট হত তার সাথে।
(২)
দেশে এসে ভালই কাটছিল আমার দিনগুলি। নিয়মিত ছবি আঁকছি। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। নতুন এক জীবনের ¯^াদ আমাকে বিমোহিত করে তুলছিল। তিথী নিয়মিত এসে সিটিং দিতে লাগল। আমাকে নিয়ে চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আমিও তার উপর অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম। আমার দিনগুলো তিথীময় হয়ে উঠল। মাদ্রিদে আমি অনেক নারী মডেল নিয়ে কাজ করেছি কিন্তু তিথীর চঞ্চলতা, ছবির প্রতি একটা বাঙ্গালী মেয়ের নিবেদন আমাকে কেন জানি দূর্বল করে দিল। দেশের শিল্পকলা, সাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে ওর সাথে অনেক আলাপ হত। ইউরোপে শিল্পকলা সম্পর্কেও আলাপ করতাম আমরা। আমরা কেউ কখনও কাউকে বলিনি কিন্তু পরস্পরের এই নির্ভরশীলতা একটা বিশেষ সম্পর্কের সেটা আমরা ছাড়াও এই মফ¯^ল শহরের বেশির ভাগ মানুষের আলোচনার বিষয় বস্তু হয়ে উঠল। সেও চার“কলার স্টুডেন্ট হওয়াতে আমাদের কাজগুলোও ভালই এগিয়ে যেতে লাগল। তিথীর উৎসাহে শিল্পকলা একাডেমী গ্যালারীতে আমার একটা একক চিত্র প্রদর্শনীও করে ফেললাম। সাড়াও আসল ভাল। জাতীয় পত্রিকাগুলো যোগাযোগ করতে লাগল। আমাকে নিয়ে কয়েকটি ফিচারও করল তারা। আমার সাথে থাকতে থাকতে তিথীও বেশ পরিচিত হয়ে উঠল।


আমাদের এই পথচলায় হঠাৎ ছন্দপতন ঘটল। সেদিন আমরা এস.এম. সুলতানের ইউরোপীয় চিন্তা চেতনা নিয়ে আলোচনা করছিলাম ফয়েজ লেকে। তিথীর ফোন আসলে সে উঠে গিয়ে আমার থেকে সামান্য দূরে গিয়ে কথা শেষ করে ফিরে এলো। আমি জিজ্ঞেস করি, কার ফোন ? ও উত্তর দিল ওর এক বন্ধুর, নাম রাজ, ফোনে পরিচয়। এরপর কয়েকবার দেখাও হয়েছে তাদের মধ্যে। আমি আর কিছুই বললাম না সেদিন। কিন্তু এরপর থেকে যত¶ণ তিথী আমার সাথে থাকে তত¶ণে কয়েকবার করে ফোন দেয় রাজ। তিথী আমার কাছ থেকে তাকে লুকাতে শুর“ করল। আমাকেও আগের মত সময় দেয়না। কেমন জানি এড়িয়ে চলতে লাগল। আমার কেমন জানি ইর্ষা হতে লাগল রাজকে। একদিন তিথীর মোবাইলের ইনবক্স ও সেন্ট আইটেম দেখে জানতে পারলাম ওরা একে অপরকে জান বলে ডাকে। ম্যাসেজের ভাষায় এটাও বুঝতে পারলাম ওরা একে অপরকে পছন্দ করে এবং অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমি যখন প্রশ্ন করলাম, তিথী উত্তর দিল ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছাড়া অন্য কোন সম্পর্ক নেই। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক কথা কাটাকাটি হল। ওর মতে আমার মন-মানসিকতা ছোট হয়ে যাচ্ছে তাই আমি তাকে সন্দেহ করছি। আমি ওকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম, আসলে ঈর্ষা থেকে এটা হচ্ছে কিন্তু বুঝতে চাইলনা। অনেক দিন তিথীর সাথে যোগাযোগ করিনি আমি। তিথীও করেনি। আমার ছবি আঁকার পর্বও শেষ করে দিয়েছি। এখন আর ছবি আঁকিনা। তারপরও তিথীর একটা পোর্ট্রটে শেষ করেছি ইতিমধ্যে।
(৩)
আজ তিথীর জন্মদিন। চিন্তা করলাম তিথীকে আজ ফোন করে চমকে দেব। তিথীর জন্মদিনটাকে ¯^রণীয় করে রাখব। আগে থেকে কেকের অর্ডার দিয়ে রেখেছি। তিথীর জন্য গিফ্ট হিসেবে ওর পোর্ট্রটেটা। রাত ১২টা ১ মিনিটে যখন ওকে ফোন করলাম ওর ফোনটা ব্যস্ত। কিছু¶ণ পর আবার ফোন করলাম, দেখলাম ফোন বন্ধ করে দিয়েছে। আমি একটা এসএমএস পাঠালাম। সকাল বেলা তুমূল বৃষ্টি শুর“ হল। আমি মোটামুটি মানের একটি পার্টির আয়োজন করে তিথীকে আবার ফোন করলাম। এবার তিথী ফোন রিসিভ করল। আমি তাকে ডরংয করলাম। এরপর বললাম আমার বাসায় আসতে আজকের দিনটা আমরা একসাথে কাটাব। কিন্তু তিথী বলল এই বৃষ্টির মধ্যে সে বের হতে পারবে না। এরপর ফোনটা কেটে দিল। আমার প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল। বৃষ্টিও আর থামতে চাইছেনা। মৌসুমী ভৌমিকের ¯^প্ন দেখব বলে গানটা বার বার শুনতে লাগলাম। অবশেষে বৃষ্টিতে ভিজব বলে বের হলাম। আমার শৈশবের সে বৃষ্টি ভেজার জায়গা নেভাল একাডেমী। অঝোর ধারায় ভিজছি আর মনে হচ্ছে সমস্ত গ­ানি ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে মন থেকে। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ছবি আঁকতে। একটা দৃশ্যও মনে মনে তৈরি করেছি। কিন্তু না আঁকবনা, আমি আর কোনদিন ছবি আঁকবনা। যতদিন তিথী আবার আমার মডেল না হবে। হঠাৎ আমার চোখ গেল কিছুটা দূরে দুইজন ছেলেমেয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। একজন অন্যজনকে জড়িয়ে ধরে আছে। অপূর্ব লাগল আমার কাছে। আর একটু কাছ থেকে দেখব বলে এগিয়ে গেলাম। চমকে উঠলাম বিথীকে দেখে। আমাকে দেখে সে একটুও বিচলিত হল না। ভাবলাম ভাল একটা ছবির প­াটফরম পেলাম। তিথী, রাজ, আর একটু দূরে আমি। না, ছবিটা আর কোনদিন আঁকা হলনা।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement