লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ নভেম্বর ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ৪টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১২

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপূর্ণতা (আগস্ট ২০১৩)

একটি স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষা এবং অকল্পনীয় পূর্ণতা(!)
পূর্ণতা

সংখ্যা

মোট ভোট ১২

শায়মা জাহান তিথি

comment ১০  favorite ২  import_contacts ১,৯১৩
টেলিফোনের শব্দে হুড়মুড় করে উঠে বসল মিলি। অবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। বাম পাশের দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালো ঝাপসা চোখে। সাতটা পঁচিশ। মাগরিবের আযান হয়ে গেছে এতোক্ষণে। এসময়ে তার কাছে কেউ ফোন করার কথা না।
কেউ বলতে একজনই তার কাছে ফোন করে; তার স্বামী রুবেল। তবে এসময়ে না। এসময়ে সে ভীষণ ব্যস্ত থাকে। তাছাড়া রুবেল ফোন করে সপ্তাহে একদিন। শুত্রবারে তার সাথে শেষবার ফোনে কথা হয়েছে। আর আজ রবিবার। তাহলে কে হতে পারে! ভাবনায় পড়ে গেল মিলি।
কাঁপা হাতে রিসিভার তুলে নিল। কানে ঠেকাতেই শুনতে পেল অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে এক উচ্ছ্বসিত কন্ঠস্বর – ‘কী ব্যাপার বলো তো! এতোক্ষণ রিং হচ্ছে, রিসিভ করছ না কেন?’ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মিলি – ‘ওহ্ তুমি! যাক বাবা বাঁচা গেল। আমি আরো ভাবলাম কে না কে!’
- খুব অবাক হয়েছিলে বুঝি?
- হবো না? সেদিন না ফোন করলে!
- তাতে কী হয়েছে? সেদিন করেছি বলে আজ আর করা যাবে না?
- তাই বলেছি বুঝি? আজকাল সবকিছু একটু বেশি বেশি বোঝ।
- বুঝি না, বলো বোঝার চেষ্টা করি।
- হয়েছে হয়েছে। আর পান্ডিত্য জাহির করতে হবেনা।
- আমি মোটেও তা করিনি। শোন, যেজন্য ফোনটা করেছি, তোমাকে একটা সুসংবাদ দিচ্ছি..
- সুসংবাদ! তুমি দিবে!
- ঠাট্টা করোনা তো। সত্যিই সুসংবাদ। শুনলে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে।
- আচ্ছা! তো শুনি কী তোমার সেই মাথা খারাপ করার মতো সুসংবাদ?
- আমি দেশে আসছি মিলি, আমি দেশে আসছি!
- ওহ্! এটা তোমার সুসংবাদ? একথা তো গত পাঁচ বছরে পাঁচ লক্ষবারেরও বেশি শুনেছি।
- বিশ্বাস কর মিলি। সবকিছু ফাইনাল হয়ে গেছে। আগামী মাসের ৪ তারিখে আমার ফ্লাইট। ঈদের ঠিক দুদিন আগে পৌঁছে যাবো। এবার আর কোন রকম ঝামেলা হবেনা।
- শোন, তুমি আমাকে আর একথা বিশ্বাস করতে বোলোনা। এর আগেও তুমি আমাকে অসংখ্যবার এই একই স্বপ্ন দেখিয়েছ। যেদিন তুমি এসে আমার সামনে দাঁড়াবে, আমি সেদিনই শুধু বিশ্বাস করব তুমি এসেছ; তার আগে না।
- তুমি থাকো তোমার বিশ্বাস নিয়ে। তোমাকে ফোন করাটাই আমার ভুল হয়েছে।
ওপাশ থেকে রিসিভার রাখার প্রচন্ড শব্দ শুনতে পেল মিলি। নিজেও রেখে দিল রিসিভারটি; তবে নিঃশব্দে। নিজের ওপর প্রচন্ড রাগ লাগছে তার। কোন দরকার ছিলনা এভাবে কথা বলার। প্রতিবারই এমন হয়। শুরু হয় ভীষণ হাসি-খুশি, উচ্ছ্বাস আর প্রাণবন্ত একটা আমেজ নিয়ে; আর শেষ হয় রাগ, অভিমান কিংবা কখনো কখনো দুঃখ দিয়ে। এর কোন মানে হয়!

মিলি এক কাপ চা নিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসল। এসময়টা তার একান্তই একার। কাজের মেয়েটা চলে যায় সন্ধ্যা মেলানোর সাথে সাথেই। আর শিপলু ব্যস্ত থাকে ‘টম এন্ড জেরি’ নিয়ে। এ সময়টায় ওকে ডিসটার্ব করা একবোরেই চলে না। শিপলুর বয়স চার বছর তিন মাস। ওর জন্মের অনেক আগেই, বলতে গেলে মিলির বিয়ের প্রায় দু’মাসের মধ্যেই লিবিয়ায় চলে গিয়েছিল রূবেল। যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল – ‘এই তো যাব আর আসব। মাত্র দুটা বছর। কীভাবে কেটে যাবে টেরও পাবে না’।
- না গেলে হয় না? তুমি কী এখানে খুব খারাপ আছো?
- খারাপ নেই ঠিক। তবে এর চেয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করতে দোষ কী?
- আমার এর চেয়ে ভালো থাকার দরকার নেই।
- তোমার না থাকতে পারে, আমার আছে। শোন, এখানে থেকে সারা জীবন রোজগার করলেও জীবনে পূর্ণতা আসবে না। আর ওখানে দু’বছর ইনকাম করতে পারলেই একেবারে লালে লাল হয়ে যাব।
- আমার কথাটা একবার ভাববে না? আমি এতটা দিন এখানে একা একা থাকব কীভাবে?
- বললাম না, মাত্র দু’টা বছর। একটু মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা কর। তুমি তো আর অবুঝ না!
‘ঠিকই তো! আমি মোটেও অবুঝ না। দু বছরের জায়গায় আজ পাঁচ বছর মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। নিয়েছিও। আরও পাঁচ বছর দেরি হলে তাও মানিয়ে নিতে হবে। এছাড়া আর উপায় কী?’ – ভাবতে ভাবতে মিলির হঠাৎ খেয়াল হল চায়ে চুমুক দেয়া হয়নি এখনো। সম্পূর্ণ ঠান্ডা হয়ে গেছে। আনমনে হেসে উঠল সে। বসে বসে স্মৃতিচারণ করা ছাড়া আর যেন কোন কাজই নেই তার। এমন সময় শিপলুর ডাক শুনতে পেল সে – ‘মা...মা.....’
- আমি বারান্দায়।
- কতক্ষণ ধরে ডাকছি তোমাকে। কথা বলনা কেন?
- তোমার টিভি দেখা শেষ এতো তাড়াতাড়ি?
- ভাল্লাগছেনা। বাবা ফোন করেছিল মা?
- হ্যাঁ। তুমি কীভাবে জানলে?
- আমি তোমার গলার আওয়াজ শুনেছিলাম।
- তাই বুঝি!
- কী বলেছে বাবা?
- বলেছে এবার দেশে এসে আমাদের সঙ্গে একসাথে ঈদ করবে।
- সত্যি! তুমি সত্যি বলছ মা? বাবা ঈদের আগে আসবে?
- হ্যাঁ বাবা, আমি সত্যিই বলছি।
- ইয়াহো! শোন মা, বাবা এলে আমরা সবাই মিলে চিড়িয়াখানায় যাব। ঠিকা আছে?
- ঠিক আছে বাবা।
- আর যাদুঘরেও যাব। সুমনের বাবা প্রতি মাসে সুমনকে যাদুঘরে নিয়ে যায়। বাবলুরাও যায়।
- ঠিক আছে। তোমার বাবাকেও বলব তোমাকে নিয়ে যেতে।
- কী মজা হবে না মা!
- হ্যাঁ বাবা, খুব মজা হবে।
একটা বড় নিঃশ্বাস গোপন করল মিলি। শিপলু তো ছোট বাচ্চা। তার চাওয়া-পাওয়া গুলোও খুব সীমিত। মিলি নিজেই কতো কি ভেবে রেখেছে! রুবেল এলে কী কী করবে, কী কী বলবে, কোথায় কোথায় যাবে। তার স্বপ্নের প্রতিটা দিনই রুবেলকে নিয়ে সাজানো।

রুবেলও কম করেনি তার জন্য। নিজের পরিবারের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে তার মতো একটা অসহায়-গরিব-এতিম মেয়েকে ঘরে তুলে এনেছে। এতটুকু যে করতে পারে, তার কোন তুলনা হয়!

এভাবেই একঘেয়েমির মধ্যেই কেটে যাচ্ছিল মিলি আর শিপলুর জীবন। ঈদের যখন আর দিন চারেক বাকি, এমনি একদিন হঠাৎ অপরিচিত একটি নম্বর থেকে ফোন এল মিলির কাছে। যথারীতি কাঁপা হাতে রিসিভার তুলে নিল সে – ‘হ্যালো’।
- হ্যালো। মিসেস রুবেল বলছেন?
মিলির বুকের ভেতরটা ধক্ করে উঠল। এখন পর্যন্ত কেউ তাকে এভাবে সম্বোধন করেনি।
- জ্বি, বলছি।
- আমি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বলছি, আরিফ হাসান। আপনার স্বামী কিছুক্ষণের মাঝেই এখানে এসে পৌঁছবেন। আপনি যদি উনাকে রিসিভ করার ব্যবস্থা........
- জ্বি জ্বি আমি এক্ষুণি আসছি।
ফোন রেখে দিয়ে মিলি পাগলের মতো চিৎকার শুরু করল – ‘শিপলু...শিপলু.....ওরে শুনে যা.....তোর বাবা এসেছে....। দেখেছিস! আমি বলেছিলাম না! আমি জানতাম এবার আসবেই’।
- ওয়াও! সত্যি আসছে বাবা? আমার না বিশ্বাসই হতে চাচ্ছে না।
- ধুর বোকা! বিশ্বাস না করার কী আছে? মা কী তোর সাথে কখনো মিথ্যে বলেছি? শিগগির আয়, তোকে রেডি করে দেই।
- মা, বাবা কী আমাকে চিনবে?
- আরে বোকা, তোর বাবা তোর ছবি দেখেছে না!
- আচ্ছা মা, বাবা তাহলে ফোন করে জানালো না কেন?
- তোর বাবা নিশ্চয়ই আমাদের চমকে দিতে চাইছে। আর তাছাড়া আমি যে একথা বিশ্বাস করতে চাইনা, একারণেও বোধহয় বলেনি।
- তুমি বাবাকে বলে দিবে আর যেন এমন না করে।
- ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। তুই এখন গিয়ে জুতো পর। আমি ঝটপট তৈরি হয়ে নিচ্ছি।
- আরেকটা কথা মা, বাবাকে কিন্তু আমরা আর যেতে দিব না। ঠিক আছে মা?
- কক্ষনোই না। একেবারে বেধে রাখবো।
নিজের আচরণে নিজেই চমকে উঠছে মিলি। সারা জীবনে এতোটা খুশি সে কখনোই হয়নি। আজ তার নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আজ তার সকল একাকীত্বের অবসান ঘটিয়ে জীবনে পূর্ণতা এসেছে। আলমারি খুলে সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা বের করল সে। হালকা নীলের মধ্যে সাদা সাদা ফুল। চোখে টানা কাজল আর কপালে কালো টিপ পরল। সাজের মধ্যে কাজল আর টিপ রুবেলের সবচেয়ে পছন্দের জিনিস। রুবেল চলে যাওয়ার পর গত পাঁচ বছরে মিলি আর টিপ পরেনি।
তাড়াহুড়ো করে ট্যাক্সি নিয়ে মিলি এয়ারপোর্টে চলে এলো। গাড়ি থেকে নামতেই গম্ভীর চেহারার মাঝবয়েসী এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন।
- ম্যাডাম, আমার যদি ভুল না হয়, আপনিই নিশ্চয়ই মিসেস রুবেল?
- জ্বি, একেবারেই ভুল হয়নি। ওঁর আসতে আর কতক্ষণ? বাই দ্যা ওয়ে আপনারা জানলেন কীভাবে ওঁ আসছে?
- উনি এসেছেন। ঘন্টাখানকে আগে।
- ঘন্টাখানকে আগে! এতোক্ষণ বলেননি কেন?
- বলার তো সুযোগই হলো না। আসুন আমার সঙ্গে।
এদিকে শিপলুর যেন আর ত্বর সইছে না।
- মা, আমরা কী বাবার কাছে যাচ্ছি? বাবা কী ভেতরে?
- হ্যাঁ বাবা, তোমার বাবা ভেতরে। আমরা তার কাছেই যাচ্ছি।
প্রায় দশ মিনিট আরিফ হাসানের পেছন পেছন হেঁটে মিলি আর শিপলু গন্তব্যে পৌঁছল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আরিফ হাসান বললেন – ‘এই যে, এই রুমে’।
মিলির হার্টবিট যেন হঠাৎ করে বেড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই যেন হাজারটা ভাবনা এসে মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। রুবেল কী দেখতে আগের মতোই আছে! নাকি বদলে গেছে এ কয় বছরে! তাদের দেখে রুবেল প্রথমে কী ভাববে! কে আগে কথা বলবে! যদি রুবেল আগে কথা না বলে, তাহলে সে কী বলে শুরু করবে!

দ্বিধা-সংকোচ সব উপেক্ষা করে সে শিপলুর হাত ধরে আরিফ হাসানের সাথে ভেতরে ঢুকল। কিন্তু কোথায় রুবেল? রুমে তো কেউই নেই! চোখ ফেরাতেই দৃষ্টি আটকে গেল ঘরের এক কোণায়। একটি কফিন। মুহূর্তে থরথর করে কেঁপে উঠল তার সমস্ত শরীর। ঝাপসা চোখে আরিফ হাসানের দিকে তাকালো কিছু শোনার আশায়। আরিফ হাসান অত্যন্ত নিচুস্বরে বার কয়েক গলা খাকড়ি দিলেন। সম্ভবত বুঝতে পারছেন না কীভাবে শুরু করবেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন – ‘গত সপ্তাহে লিবিয়ার সিরত শহরে একটি মিলিশিয়া বাহিনীর সাথে স্থানীয় জনতার সংঘর্ষ শুরু হয়। আপনার স্বামী তখন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন। হাসপাতালে নেয়ার পথে উনি মারা যান.................’
আরিফ সাহেব সম্ভবত আরো কিছু বলছিলেন। কিন্তু মিলির কানে আর কিছু যাচ্ছিল না। তার মাথা পুরো ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। রুবেলের কী এভাবেই ফিরে আসার কথা ছিল! সে কি এভাবেই রুবেলকে ফিরে পেতে চেয়েছে! রুবেল কি তবে এভাবেই তার জীবনে পূর্ণতা এনে দিল! টের পেল তার গলার কাছে একটা ভীষণ ভারী পাথরের টুকরোর মতো জমা হয়ে আছে। তার ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কেঁদে উঠতে। কিন্তু সে কাঁদতে পারছে না। অধিক শোকে কি তবে মানুষ এমন হয়ে যায়!!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement