লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৯ জুন ১৯৮৭

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঈদ (আগস্ট ২০১৩)

কুঁড়ি বছর পরের একদিন
ঈদ

সংখ্যা

শাহ্‌রিয়ার তপু

comment ০  favorite ০  import_contacts ৩৮৬
তোমাকে,


রাজশাহী স্টেশনে নেমেই খানিকটা চমকে গেলাম। বহু বছর আগে দেখা সেই স্টেশনের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সেই ছোট্ট প্লাটফর্মের জায়গা নিয়েছে এক বিশাল প্লাটফর্ম। ছোট্ট দরজা দিয়ে বের হওয়া নয় এখন হাটতে হয় অনেকটা পথ। চাপাচাপি করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়ও এখন অনেকটা কম । অনেক মানুষই বসে আছে বিশাল সব পিলারের নীচে করা গোল করা জায়গায়। সেখানেই বসে আছে এক মেয়ে। হয়ত নতুন বিয়ে হয়েছে। ঘোমটার আড়ালে প্রায় পুরো মুখটাই ঢাকা। কিন্তু বসার ভঙ্গি অবিকল বহু বছর আগে এই স্টেশনে বসে থাকা আরেক সদ্য বিবাহিত মেয়ের মত। মুহূর্তের জন্য আমি থমকালাম। শিমু, তোমাকে মনে পড়ল ।


আমি ওখানেই একটা সিগারেট ধরালাম। কেনও জানিনা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। এক ধরনের কৌতূহলে। মেয়েটা কি তোমার মত দেখতে?? খানিক পরেই ঘোমটা একটু সরে যাওয়ায় তাকে দেখালাম । অপূর্ব সুন্দর এক মুখ! কিন্তু তোমার মত নয়। যত সুন্দরই হোক তোমার মত “ ক্ষমাহীন গাঢ় রূপসীর মুখ” সে কোথায় পাবে।

আমি বেরিয়ে এলাম। কত দিন পর এলাম সেই প্রিয় শহরে । কিছুই চিনতে পারিনা। পারার তো কথাও না। কতই না বদলে গেছে একদিন হাতের তালুর মত চেনা শহরটা । সেইসব কোনোমতে হেঁটে যাওয়ার রাস্তাগুলো এখন একেকটা রাজপথ। প্রাচীনগন্ধী বাড়ির দখল নিয়েছে আধুনিক সব দেওয়াল । আমাদের সেই বাড়িটাও খুঁজতে গিয়েছিলাম। সেই যে দুই কামড়ার ভাড়ার বাসাটা যেখানে একদিন শুরু হয়েছিলো তোমার আমার পুতুল খেলার সংসার। তোমার মনে আছে প্রথম দিন বাসায় নিয়ে গিয়ে কি লজ্জাটায় না পেয়েছিলাম! টিনের ছাদের প্রায় ভাঙ্গা বাসায় ঢোকা মাত্র কি প্রবল বৃষ্টি। একটা সময় পানি ঢুকে গেলো ঘরের ভিতর। ঘর গোছানো বাদ দিয়ে তুমি লেগে গেলে পানি সেচতে। আমার পক্ষে সে দৃশ্য দেখা সম্ভব ছিল না। নিজের অক্ষমতায় নিজেই ছোট হয়ে যাচ্ছিলাম । বাহিরে এসে সিগারেট ধরিয়ে নিজের লজ্জা ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলাম প্রাণপণে। এক সময় তুমি পাশে এসে দাঁড়ালে । আমি হড়বড় করে বললাম, পরের মাসেই নতুন বাসা নিবো যত কষ্টই হোক। তুমি হাসলে । বললে, আপনি যেখানে থাকবেন আমিও সেখানে থাকতে পারবো। বলেই লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেললে। সেদিন রাতেই আবার তীব্র ঝড় বৃষ্টি। মনে হচ্ছিল টিনের চাল উড়িয়ে নিয়ে যাবে। একটা সময় ভয় পেয়ে তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরলে। সেই প্রথম আমি পূর্ণতা পেলাম। এরপর কত বড় বাড়িতেই না আমরা থেকেছি । কিন্তু সেই ভাঙ্গা চালের নীচে কাটানো রাতটার মত অপূর্ব কোনও রাত কি আর এসেছে আমাদের জীবনে??

না অনেক খুঁজেও সেই বাড়িটা পেলাম না। পেলাম না আরও অনেক কিছুই। সেই সবুজাভ পুকুর বিলের শহর এখন অনেক বেশি যান্ত্রিক । সেই যান্ত্রিকতার ভিতর আমি যেন প্রাগৈতিহাসিক মানুষ যে খুঁজে ফিরছে তার স্মৃতির ভাগশেষ । অথচ এখানে আমি কাজেই এসেছিলাম। আসলে বয়স হয়েছে তো। এই বয়সেই স্যাঁতস্যাঁতে মনে মানুষ প্রবল আবেগে ছুঁতে চায় তার অতীত । আমিও বুড়ো হয়ে যাচ্ছি শিমু। সোডিয়াম আলো যখন কুয়াশার মত ঝরে আমি পথে পথে হাঁটি আর মনে মনে আবৃত্তি করি “আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ- সন্ধ্যায়” ।

হাঁটতে হাঁটতে একসময় পদ্মায় পৌঁছে গেলাম। পদ্মা পাড়ও আগের মত নেই। ইট কাঠ পাথরে সাজানো হয়েছে ঘাট। সন্ধ্যা হলেই আলোকসজ্জায় আলোকিত হয়ে ওঠে নদীর ধার। সেই আলোর লোভে হাজার হাজার মানুষের ভিড় হয়। সেখানে তোমার আমার প্রিয় নির্জনতা খুঁজে পাওয়া ভার। তবুও আমার চোখ খুঁজে ফেরে টি বাঁধের উপর সেই কাঁটাতার বিছানো জায়াগাটা, যেখানে রাত্রি গভীর হলে তোমার কণ্ঠে বেজে উঠত বিষাদের কোনও সুর। একটা সময় আমার কাঁধে মাথা রাখতে তুমি। তোমার চোখের জলে ভিজে যেত আমার শার্ট । আমি ফিসফিস করে বলতাম,
আমার মনে অনেক জন্ম ধরে ছিল ব্যাথা
বুঝে তুমি এই জন্মে হয়েছো পদ্মপাতা।
তখন কি আমার কাঁধে আশ্রয় খুঁজে পাওনি তুমি?? সেই বুক উদাস ঠাণ্ডা বাতাস, ঢেউয়ের নির্জন শব্দ, সারা রাত ঝরে পরা নক্ষত্রের আলো কি সুখী করেনি তোমায়?? জানা হয়নি আমার। আজকাল মনে হয় কি জানো, মানুষের আসলে সুখী হওয়ার প্রয়োজন নেই। যে এইটুকু স্মৃতির কারনে সারাজীবন কষ্টকে বুকে ধারণ করতে হয় তবে কেনও এত সুখী হতে চাওয়া??


হয়তো এসব দার্শনিক ভাবনা তোমার কাছে এখন নিতান্তই অর্থহীন । তুমি নিশ্চয়ই অনেক ভালো আছো। মিজান সাহেব অবশ্যই তোমাকে সুখে রেখেছেন। আসলে মিজান সাহেবের মত মানুষেরা কাউকে অসুখী করতে পারে না। অবাক হলে?? ভাবছো কিভাবে জানলাম?? তার সাথে একদিন আমার দেখা হয়েছিলো। আমি এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে জোর করে এক চা এর দোকানে বসালেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এত খাতির কি আপনার স্ত্রীর সাবেক স্বামী হিসেবে?? উনি হেসে বললেন, না...শিমু বলেছে আপনি তার দেখা সবচেয়ে ভালো মানুষ। আমি একজন ভালো মানুষের সাথে কিছুক্ষণ কাটাতে চাচ্ছি। আমি হাসলাম । তার কথা যতই শুনছিলাম ততই মুগ্ধ হচ্ছিলাম। সেই মুগ্ধতা আমাকে খুশি করেনি। আমার কেবলই রাগ হচ্ছিল লোকটার উপর। মনে মনে চিৎকার করে বলছিলাম, তুই মর তুই মর!


তুমি ভুল বলেছিলে। আমি ভালো মানুষ নই। ভালো মানুষ নই বলেই তোমার সুখ আমাকে সুখী করেনি। আমি সেদিন রাগে হিংসায় জ্বলে ছাই হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ছাড়া অন্য কেউ তোমাকে সুখী করবে এটা আমি কিভাবে সহ্য করি! তারপর একদিন অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়লাম মরে যাবো বলে। কিন্তু তা আর হলো না। আসগর চাচা বাঁচিয়ে দিলেন আমাকে । হ্যাঁ সেই আসগর চাচা, তোমার আরেকজন প্রিয় মানুষ। আমাকে ভালোবেসে যিনি আমার সাথেই কাটিয়ে দিলেন সারাটা জীবন। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর তিনি আমার হাত ধরে কাঁদছিলেন । আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম । যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি সবসময় সব ভালবাসার মানুষদের কাছে থেকে। এতকিছু পেয়েও কাউকে দিতে পারলাম না কিছুই। আসলে কিছু মানুষই থাকে এইরকম। কাঁচের মানুষ। তারা অন্যর ছায়া নিজের মাঝে ধারণ করে কিন্তু নিজের ছায়া দেখতে পায়না কোনোদিন।



তোমার মাঝে আমি আমার ছায়া খুঁজেছিলাম। সেইসব পাগলপারা দিন রাতে। তোমাকে ছাড়া একটা দিনও কাটানো কত কঠিন ছিল। তুমি কোথাও একা বেড়াতে গেলে একদিন পরেই কোনও অজুহাত বের করে হাজির হয়ে যেতাম আমি। আমার অজুহাত শুনে মুখ টিপে হাসতে তুমি। আমি লজ্জা পেয়ে যেতাম। কোনও কোনও মাঝরাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে অদ্ভুত সব আবদার করতে। আমি যতই রাগ করতাম ততই তুমি হাসতে। কখনও খোলা আকাশের নীচে আমার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে আবৃত্তি করতে,
তুমি তো জানো না কিছু, না জানিলে-
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে!
তখন তীব্র আবেগে তোমাকে চাইতাম। তোমাকে চাওয়ার তীব্রতা এতোটা ছিলই বলে কি তোমাকে হারিয়েছি এত সহজে??


অথচ এমনতো হওয়ার কথা ছিল না। যেদিন তুমি আমাকে তোমার অসুখের কথা প্রথম বলেছিলে আমি থমকে গিয়েছিলাম। আমি জানতাম, তুমি খুবই দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। পাওনা টাকা শোধ করতে না পেরে তোমার বাবা আত্মহত্যা করেছিলেন। তোমার মা অনেক কষ্টে তোমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। সবই জানতাম কিন্তু জানতাম না এই দারিদ্রতা তোমাকে এক অদ্ভুত মানসিক অসুস্থতা উপহার দিয়েছে। যা চেয়েছো তা কখনও পাওনি বলে কারও কিছু পছন্দ হয়ে গেলে সেটা চুরি করার এক অপমানজনক মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত তুমি। প্রথম যেদিন এসব বললে আমাকে আমি তোমার কান্না জড়ানো মুখটা বুকে নিয়ে বলেছিলাম, তোমার সব অপমান ভুলিয়ে দেব আমি। পরেরদিন তোমাকে এক মনোচিকিৎসক এর কাছে নিয়ে গেলাম । তোমার সাথে দীর্ঘ আলাপের পর তিনি আমাকে আড়ালে নিয়ে বলেছিলেন, আপনার ভালোবাসায় পারবে তাকে সুস্থ করে তুলতে।


শিমু, তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। তাই রফিক এসে যেদিন বলল, ভাবী আমাদের বাসা থেকে একটা শো পিস চুরি করে এনেছে আমি বিশ্বাস করিনি। বের করে দিয়েছিলাম ওকে বাসা থেকে। আমি ভেবেছিলাম তুমি এত দিনে সুস্থ। কিন্তু রফিককে বের করে দেওয়ার পর যখন তুমি এসে বললে, তুমি সত্যিই নিয়ে এসেছো আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। আমি কঠিন সুরে বললাম, তোমার চুরি করা জিনিস তোমাকেই ফেরত দিয়ে আসতে হবে। তোমার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেলো। তুমি বারবার বললে এত বড় লজ্জা যেন আমি তোমাকে না দেই। কিন্তু প্রচণ্ড রাগ আর অসম্ভব কষ্টে আমি তখন পাথর হয়ে গেছি। একসময় তুমি নিজেই ফিরিয়ে দিয়ে আসলে । ঘরে ঢুকে দাঁড়ালে আমার সামনে। সিগারেটের ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে ঘর। আমার হঠাৎ কি হল জানিনা। তোমার কান্নাভেজা ফোলা চোখ আমার চোখে পড়ল না। সব শক্তিতে তোমার গালে চড় বসিয়ে দিলাম। তোমার সেই অপমানিত নীলচে মুখ আমি কোনোদিন ভুলিনি।



ভুলিনি বলেই তোমাকে ছাড়া দিনরাত অসহ্যবোধ হলো। তোমাকে ফেরাতে গেলাম তোমার মা’র বাড়ি। সব অপরাধ নিয়ে সমর্পিত হলাম তোমার কাছে। কিন্তু তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিলে। আহ কতটা কষ্ট জমা হয়েছিলো তোমার বুকের ভিতর। তোমার ফিরিয়ে দেওয়ার দুঃখ নয় তোমার কষ্ট দেখে আমি আরও নিঃস্ব হয়ে গেলাম। যতটা যোগ্য নই তার অনেক বেশি ভালবেসেছিলে আমাকে। তাই সেই বরফ জমাট অভিমান ভাঙ্গা গেলো না কিছুতেই। অথচ এখন পেছন ফিরে তাকালে সবকিছুই কেমন তুচ্ছ মনে হয়। এই এতটুকু জীবন আমাদের । তাতেও কেনও আমরা জমিয়ে রাখি অসংখ্য বর্ষাকাল, তীব্রও অভিমানের কাঁটাতারে । তোমারও কি তাই মনে হয় না?? মনে হয়না, যে ঝড়ের রাতে শুরু হয়েছিলো আমাদের জীবন, ঠিক সেখান থেকেই শুরু করা যেতো আরেকবার?? জানি এইসব প্রশ্ন এখন অর্থহীন । তোমাকে দোষ দেইনা। কারণ, যৌবনের ভুলগুলো বড় কঠিনতম ভুল। কারণ, যৌবনের আবেগ বড় শুদ্ধতম আবেগ !

তারপরেও জীবনের অসংখ্য যদি, কিন্তু এর মাঝে তুমিও বেঁচে থাকো চিরটাকাল। ভাবতে কেমন অদ্ভুত লাগে এত ভালোবাসাবাসির পরেও আর কোনোদিন পাবো না তোমাকে। আর কোনোদিন দেখা হবেনা তোমার মুখ খানি। তবুও ফিরে চাইবো না তোমাকে। একদিন যাকে সব কিছু দিয়েও ধরে রাখতে পারিনি তাকে আবার চাইবো কোন অধিকারে। তাই আবার হঠাৎ তোমার কোনও স্মৃতির মুখোমুখি হয়ে গেলে লিখব এমনই কোনও দীর্ঘ চিঠি। অনেক না পোস্ট করা চিঠির মত সেই চিঠিও কখনও পৌঁছাবে না তোমার ঠিকানায়। তোমার প্রিয় কবির মত আমিও যে জেনে গেছি “জীবনের গল্প শুধু একবার আসে- শুধু একবার নীল কুয়াশায়” । কিইবা আসে যায় যদি সে গল্প অসমাপ্তই থেকে যায় ।

শেষপর্যন্ত জীবন মানেই তো অসমাপ্ত গল্পের সমাপ্তির অপেক্ষা। মানুষ অপেক্ষা করতে পছন্দ করে না তবু তার জীবন কাটে অপেক্ষায়, অপেক্ষায়…….

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement