লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৯ জানুয়ারী ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ৬টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৯১

বিচারক স্কোরঃ ১.৯৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftইচ্ছা (জুলাই ২০১৩)

পাখি সম্রাট
ইচ্ছা

সংখ্যা

মোট ভোট ৪৫ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৯১

ঘাস ফুল

comment ২৭  favorite ০  import_contacts ১,৩৭১
অতিশয় এক গরীব ঘরের ছেলে ‘সম্রাট’। বাবা খেটে খাওয়া সাধারণ একজন দিনমজুর। সাত ভাই তিন বোন। বাবা মা মিলে একুনে বার সদস্য বিশিস্ট একটি হা’ভাতে সংসার। উপরন্তু গোড়ামি এবং ধর্মীয় কুসংস্কারে নিমজ্জিত। মুখ দিয়েছেন যিনি আহার দেবেন তিনি। এমনিতর ঈমানের জোড় নিয়ে বুড়ো বাপ বেচারা সমানে খেটে যায়। অথচ আয় রোজগার সেই আগের মতোই সীমিত। বস্তুতঃ এতগুলো মুখের আহার একা যোগান দিতে গিয়ে সম্রাটের বাবার প্রানান্ত দশা।

এক বেলা আধা পেটা খেয়ে ছেলে মেয়েদের ছুরতহাল হয়েছে হাড্ডিসার। দরিদ্রতা জনিত অপুষ্টির ছাপ তাদের সারা শরীর জুড়ে প্রতিভাত। সর্ব্বক্ষণ প্যান প্যান ঘ্যান ঘ্যান লেগেই থাকে। বেকার ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আর কোন কাজ নেই তাদের।
অশিক্ষিত বাবামার সংসারে সম্রাট সন্তানদের তালিকায় ক্রমানুসারে দ্বিতীয়। ভাই বোনের মধ্যে বলতে গেলে সম্রাটই একটু চালাক চতুর কিছিমের। দিগন্ত জুড়ে যতক্ষণ পর্যন্ত দিনের আলো সুপ্রসন্ন থাকে কিশোর সম্রাট ততক্ষণ পর্যন্ত বন জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে মেধাকে কাজে লাগায় খাদ্য আর পাখি অন্বেষণ করে।
পাখির বাচ্চা হরণ তার স্বভাব সুলভ কাজ। বয়স অনুপাতে শারীরিক তেমন সক্ষমতা না থাকলেও ছোট বড় সব ধরনের গাছে আরোহন করার মতো বেশুমার সাহস এবং দক্ষতা তার মধ্যে প্রবল। গাছের মগডালে উঠে ফোঁকড়ে হাত ঢুকিয়ে অনায়াসে টিয়া পাখির বাচ্চা পেড়ে আনে।
অন্যান্য পাখির তুলনায় টিয়া পাখির মূল্য অধিক। স্বভাবতই ঝুকিটা বেশী নিতে হয় ওকে। সাধারণতঃ বড় গাছের মগডাল গুলোতে টিয়া পাখিরা বেশীর ভাগ বাসা বাঁধে। অবশ্য যেখানে ঝুঁকির পারিমান একটু বেশী সেখানে আনন্দের মাত্রাটাও কম নয়। অনেক কষ্ট করে যখন উঁচু মগডালে উঠে এক জোড়া টিয়া পাখির বাচ্চা পেড়ে আনে তখন যেন এভারেস্ট বিজয়ের আনন্দ ওর চোখে মুখে দৃশ্যতঃ ফুটে উঠে।
পাখি ধরায় পরদর্শীতার জন্য লোকজন ওকে “পাখি সম্রাট” বলে ডাকে। নামের সাথে ‘পাখি’ শব্দটা যোগ হওয়ায় কাজের প্রতি আগ্রহ এবং নির্ভরতা দুটোই দিন দিন বেড়ে যায় তার। এবং কাজটাকে জীবিকা হিসেবে নেয়ার বাসনা কালক্রমে পাকাপোক্ত হতে থাকে।
বাবার নিরন্ন অভাবের সংসার। তার উপর অশিক্ষা আর কুসংস্কার। প্রকৃতপক্ষে প্রগতিশীল শিক্ষার আলো ছেড়ে, অন্ধকার জীবন যাপনের রেয়াজ তার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। তাই লেখা পড়া করার মতো মৌলিক ইচ্ছা বা আগ্রহ অনেক আগেই তার তামাদি হয়ে গেছে।
মাঝে মধ্যে চুরি করে ফলমুল খাওয়ার দায়ে গ্রাম্য সালিসে মুরুব্বিরা চড় থাপ্পরের মাধ্যমে শাসন করেও কোন দিন বিদ্যালয় মুখী করতে পারেনি ওকে। শিক্ষার চেয়ে খাদ্যকে তার অধিক গুরুত্ব দিতে হয়। কিশোর বয়সে গাছে গাছে আহার্য্য ফলমুল সংগ্রহ এবং পাখিদের একান্ত সান্নিধ্য এক সময় তাকে পাখি ধরার নেশা থেকে পেশা অব্দি নিয়ে যায়।
সঙ্গত কারণে একজন ‘পাখোয়াল’ হওয়ার অভিপ্রায় দিনে দিনে তার মনের গভীরে বিস্তার ঘটতে থাকে। যাই হোক এমনি ভাবে বন জঙ্গলে পাখি আর খাদ্য অন্বেষণ করে কিশোর পাখি সম্রাটের খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে।
অনোভিপ্রেত ভাবে একদিন এই পাখি সম্রাটের জীবনে এক মহাবিভ্রাট ঘটে যায়। গ্রীষ্মের মৌসুম তখন, গাছে গাছে হরেক রকমের ফলের সমাহার। মধুমাস সমাগত প্রায়। নিত্যকার মতো সম্রাট তার স্বভাব সুলভ কাজে বেড়িয়ে পড়ে। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম। এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গল। সারা দিনমান ঘুরে বেড়িয়ে ফলমুল খেয়ে পেট ভরাতে পারলেও সেদিন একটিও টিয়া পাখির বাসা খুঁজে পায়না সে।
বাধ্য হয়ে বিফল মনোরথে বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু চোখের নজর তার গাছের ডালে ডালে ঘুড়পাক খাচ্ছিল। অকস্মাৎ একটা টিয়া পাখির ঝাক তার নজরে আসে। ঢিল ছুড়তেই পাখি গুলো স্বরবে উড়ে চলে আপন ঠিকানায়।
ব্যাস, আর যায় কোথায়, সম্রাটও পাখি গুলোর পিছু পিছু দৌড়াতে শুরু করে। দৌড়াতে দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে জঙ্গলের মাঝ বরাবর পুরাতন একটা তেঁতুল গাছের নীচে গিয়ে থামে। কৌতূহলী সম্রাট চেয়ে দেখে তেঁতুল গাছের একেবারে উপরের মগ ডালটা মরে সাদা হয়ে রয়েছে। সেই মরা ডালের গুড়িতে একটি নয় দুটি নয় অনেক গুলো টিয়া পাখির বাসা দেখতে পায় সে। বাসা গুলো থেকে ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের কান্নার চিচি আওয়াজ শুনে সম্রাটের মনোবীনা স্বানন্দে বেজে উঠে।
কম করে হলেও তিন/চার জোড়া টিয়া পাখির বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে আজ। বিনা পুঁজির ব্যাবসা, তাই জীবিকা হিসেবে এর চেয়ে সহজ মাধ্যম আর কি হতে পারে সম্রাটের তা জানা নেই। ও শুধু জানে ক্ষুদ জল খাইয়ে বাচ্চা গুলোকে বাজারে বিকিয়ে যা পাবে তাতে ক’দিন ভাল ভাবেই চলে যাবে।
দিগন্ত জুরে ঠাঠা রোদ উপেক্ষা করে পাখিদের পিছু পিছু উন্মন ছুটতে গিয়ে অনেকটা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে সম্রাট। তাই কিছুটা সময় জিরিয়ে নেয় তেঁতুল গাছটার শীতল ছায়ায় বসে। এদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল সমাসিন প্রায়। দিনের আলো থাকতে থাকতে কাজের কাজটি সেরে ফেলতে হবে। অভিলাষের পাগলা ঘোড়াটা প্রথম থেকেই তেঁতুল গাছের দিকে টানছিল ওকে। আগপাছ না ভেবে লাফিয়ে গাছে উঠে পড়ে।
গাছের ভেতরের দিকে কেমন যেন অন্ধকার বলে মনে হয়। তবু ঘিঞ্জি ডালপালার প্যাচানো জটলা দু’হাতে সরিয়ে অন্ধকারে সাপের মতো উপরে উঠতে থাকে। একটু একটু করে লোভের পাগলা ঘোড়া ওকে উপরে উঠার প্রেরণা যোগায়।পাখির বাচ্চা গুলোর আকর্ষণীয় চিচি আওয়াজ শুনে একেক বার মনে হয় ঐতো আর একটু উঠলেই হয়তো ওদের নাগাল পেয়ে যাবে।
কিন্তু না কেমন যেন সব মরিচিকার মতো মনে হয়। এখনো অনেক উপরে উঠতে হবে ওকে। এমনি করে গাছের অর্দ্ধেকটা না উঠতে ক্ষয় হয়ে যায় তার বেশ কিছু আলোকিত সময়। শরীরের সবটুকু শক্তি প্রয়োগ করে আবার প্রাণপণে উপরে উঠতে থাকে। কিন্তু কিছুতেই কাঙ্খিত সেই মরা ডালটি নজরে আসেনা তার।
এদিকে বিকেল গড়িয়ে সূর্যদেব বিসর্জনের জন্য পাটে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আদিগন্ত আলোক রশ্মি দ্রুত গেরুয়া হয়ে আসছে। পাখি সম্রাটের সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। প্রচন্ড লোভের বশে ক্রমাগত সে উপরে উঠতে থাকে। ঘুপসি তেঁতুল গাছের গরমে ঘেমে নেয়ে উঠে সম্রাট। কপালের ঘাম মুছে আবার উন্মাদের মতো উপরে উঠা শুরু করে। এভাবে বিরামহীন চেষ্টার পর সেই মরা ডালটাকে এক সময় দেখতে পায় সে।
খুশিতে আবার মনোবল চাঙ্গা হয়ে যায় ওর। শরীরের সব শক্তি একত্র করে পুনরায় উর্দ্ধগামী হয়। বড় গাছে উঠে নীচের দিকে তাকাতে নেই সে কথা সম্রাট জানে। এতোক্ষণোব্দি তাই নীচের দিকে এক বারের জন্যও ফিরে তাকায়নি সে। তবু কি মনে করে নীচের দিকে হঠাৎ নজর পড়তেই ছানাবড়া ছোখে চমকে উঠে।
সূর্যদেব তার গগন বিচ্ছুরিত আলোকিত আভা দিয়ে এতক্ষন ওকে উপরে উঠার পথ দেখিয়েছে। যত উপরে উঠে ততই আলোর দেখা মেলে। অথচ নীচের দিকে কখন যে সবকিছু সন্ধ্যার তিমিরে নিমজ্জিত হয়ে গেছে মোটেও তা বুঝে উঠতে পারেনি। নিবিষ্ট মনে এতক্ষণ সে কেবল উপরেই উঠেছে। গাছের নীচের দিকে তাকিয়ে উপর এবং নীচের পার্থক্য খুঁজে পায় সম্রাট। গাছের নীচের দিকে মনে হয় পুরোটাই আঁধারে ডুবে আছে।
আলো আর আঁধারের প্রকৃত পার্থক্য বুঝতে পেড়ে জীবনাত্মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় ওর। তেঁতুল গাছটাকে যেন বিকট একটা রাক্ষসের মতো মনে হয়। উপরে উঠার তিব্র বাসনায় আচমকা ভাটা পড়ে। কি করবে সহসা ভেবে পায়না। উপরে উঠবে নাকি নীচে নেমে যাবে? মোহাচ্ছ্বন্ন সম্রাট রিতিমতো সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগতে থাকে। এদিকে গেছো প্রানীদের বিটকেলে ভয়ার্ত শব্দ গুলো কানে ভেসে আসতে শুরু করেছে। নিশাচর বাদুড় চামচিকাদের ডানা ঝাপটা সহ গেছো ঝিঝি পোকাদের একটানা চিইইই শব্দ গুলো ধিরে ধিরে তিব্র থেকে তিব্রতর হচ্ছে।

জুবুথুবু ভাল্লুকের মতো থত্থর করে কাপতে থাকে সম্রাট। জগদ্দল পাথরের মতো শরীরটা ভারি হয়ে যায়। নীচে নামবে তারও কোন উপায় খুঁজে পায়না সহজে। সমুহ বিপদের আশঙ্কায় হাচড় পাচড় করে তবু নীচে নামতে প্রাণপণ চেষ্টা চালায়। কিন্তু অন্ধকারে অনেক উচু গাছ থেকে নেমে আসা কিছুতেই সম্ভব হয়ে উঠে না।
দিনের বেলা এমনিতে তেঁতুল গাছের ভেতর আলো আঁধারী ভুতুরে পরিবেশ বিরাজ করে। একেতো তেঁতুল গাছ তার উপর ভরা সন্ধ্যা। গা ছমছমে পরিবেশ। এর আগে তেঁতুল গাছে কখনো উঠেনি সে। তবে মানুষর মুখে শুনেছে অন্ধকার তেঁতুল গাছে নাকি ভুঁত প্রেত বাস করে। ভুঁত প্রেতের কথা মনে হতেই কিশোর পাখি সম্রাট ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে কেঁদে ফেলে।
মনে পড়ে এতো বড় বিপদের মুখোমুখি কখনো হয়নি সে। অন্ধকারের ভয়ে দিনের আলো থাকতে থাকতে সন্ধার আগে প্রতিদিন বাড়ি ফিরে এসেছে। আজ কেন যে অবেলায় এই তেঁতুল গাছটায় উঠতে গেল। ভুলের মাশুল গুনতে গিয়ে ফাঁপড়ে দম বন্ধ হবার উপক্রম তার। কিন্তু করার থাকেনা কিছুই। গাছ থেকে সে মোটেও নীচে নেমে আসতে পারেনা। ভয়ে হাত পা অবশ হয়ে আসে। উপরে উঠতে গিয়ে শরীরের সঞ্চিত শক্তিটুকু প্রায় নিঃশ্বেষ। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসছে। চারিদিক থেকে বিপদ ঘনিয়ে আসতে থাকে। গাছ থেকে নামতে না পারলে মৃত্যু তার অবধারিত।
গাছের একটা ডাল কোন রকমে জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে থাকে সম্রাট। টিয়া পাখির বাচ্চা গুলো আগের মতো এখন আর ক্ষিদেয় চিচি করে কাঁদছে না। বাবা মার কোলে হয়তো ওরা নিশ্চিন্তে ঘুমোছে। মরা ডালটিকেও আর দেখা যাচ্ছেনা। আস্তে আস্তে নিঝুম নিস্তব্ধ অন্ধকার যেন গ্রাস করে ফেলছে চারিদিক। জোনাকিরা সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালতে শুরু করেছে।
পুরানো ভাবনার জের ধরে মনের আরকাইভে জমে থাকা দৃশ্য গুলো একে একে ত্রিনয়নে ভেসে উঠে। আপসোসে বুকটা ভারি হয়ে যায়। এতদিন ভুল করে কতনা অন্যায় করেছে সে। মা পাখির কোল থেকে বাচ্চা হরণ করার সময় বাচ্চা গুলো বাবা মার জন্য কেঁদে কেঁদে আকুল হোত। বাচ্চা গুলোর জন্য ওদের বাবা মারাও কতনা কান্না কাটি করতো। তবু লোভের বশবর্তী হয়ে নির্দ্বিধায় ওদের নিয়ে এসে হাটে বাজারে বিকিয়ে দিয়েছে সে। এ সময় ‘পাখোয়াল’ হওয়ার তিব্র বাসনা তার সুশান্ত প্রবৃত্তিতে বাধ সাধে। অনুশোচনায় নিজেকে একজন ঘৃনিত অপরাধী বলে মনে হয় ।
ঠিক পাখির বাচ্চাদের মতোই মনটা ওর বাবা মার জন্য কেঁদে উঠে। অথচ বাবা মার সহযোগীতা কিম্বা সাহচার্য পাওয়া সুদুর পরাহত। অন্ধকার তেতুল গাছের ডালে বসে কেঁদে কেঁদে আকুল হয় সম্রাট। কিন্তু নেমে আসার পথ খুঁজে পায়না কিছুতেই।
কাঁদতে কাঁদকে শেষ আশ্রয় পরম করুনাময় মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে দু’হাত তুলে ক্ষমা চায়। প্রতিজ্ঞা করে জীবনে আর কখনো পাখির বাচ্চা হরণ করবে না সে। দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পায় একমাত্র পাখিদের অভিশাপের কারণে আজ ওর এই দশা। জীবন মরণ সন্ধিক্ষনে দাড়িয়ে পাপের পরিনাম সে হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে যায়। ‘পাখোয়াল’ হওয়ার অদম্য ইচ্ছা তার উপহাস হয়ে উড়ে যায় রাতের আঁধারে। এখন থেকে এই জঘন্য পাখি ধরা কারবার আর কখনো করবেনা বলে মনে মনে তওবা করে। এখনো তার সামনে অনেক সময়। এখন থেকে সে গ্রামের অন্যান্য ছেলে মেয়েদের মতো স্কুলে যাবে বলে মনোস্থির করে। আর অন্ধকার জীবন নয়। আলোকিত মানুষ হওয়ার অভিলাষ নতুন ভাবে তার মননকে বোদলে দেয়। বিনয় বিলাপে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে শেষ বারের মতো প্রাণ ভিক্ষা চায় সম্রাট। সোবহান আল্লাহ। সাথে সাথে তার দোয়া মহান আল্লাহ তাআলার দরবাবে কবুল হয়ে যায়।
জঙ্গলের মাঝ দিয়ে একটি সরু পায়ে চলা পুরানো পরিত্যাক্ত পথ গ্রামের দিকে চলে গেছে। সচরাচর বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া রাত থাক দুরে দিনের বেলাতেও ভুলে এ পথ মাড়ায় না কেউ। আকর্ষিক ভাবে সেই অন্ধকার পথ আলোকিত করে টর্চ হাতে কাউকে আসতে দেখে পৃথিবীর সব টুকুন আলোক রশ্মী যেন হাতের মুঠোয় পেয়ে যায় সম্রাট। কাঁন্না জড়ানো কন্ঠে পথচারির মনোযোগ আকর্ষণ করতে থাকে।
আল্লাহ পাকের মোহিমায় সেদিন পাশের গ্রামের ময়নার একটি ছাগোল হারিয়ে যাওয়ায় সে ছাগোল খুঁজতে বেড়িয়েছে। বিভিন্ন ঝাড় জঙ্গল খুঁজে খুঁজে কোথাও না পেয়ে অবশেষে এদিকটা হয়ে বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু তেঁতুল তলায় এসে মহা ঝঞ্ঝাট বেধে যায় তার। অন্ধকার রাতে তেঁতুল তলায় আসতে এমনিতে গা ছমছম করছিল, তার উপর ডুকরে ডুকরে কাঁন্নার আওয়াজ শুনে ভয়ে বেচারা ময়নার রিতিমতো জ্ঞান হারাবার দশা। ভীত সন্ত্রস্ত ময়না আরোষ্ট পা দুটো টান টান করে ঠায় দাঁড়িয়ে পড়ে। শরীরটা তার জমে পাথর হয়ে যায়। সামনে আর এক পা এগুতে পারে না সে।
আল্লাহ রসুলের দোহাই দিয়ে দোয়া দরুদ পাঠ করতে থাকে। কিন্তু কিছুতেই যেন সে কান্না থামেনা বরঞ্চ আরো বেশী হতে থাকে। এদিকে ভয়ে ময়নার দম বেড়িয়ে যাবার উপক্রম প্রায়।
কম্পিত হাতে কোন রকমে বিড়ি আর ম্যাচ বেড় করে একটা বিড়ি ধরায়। শুনেছে আগুন দেখলে নাকি অশরিরীরা ভয় পায়। তাই কৌশলটা প্রয়োগ করে। তারপর মাথা ঠান্ডা রেখে ঘটনা আঁচ করে অবশেষে নিশ্চিত হয়। না এটা কোন ভুতের কান্না নয় মানুষের কান্না বলেই মনে হয়। কেননা ভুত প্রেতেরা খনা খনা নাকি নাকি সুরে কান্না করে।
কিছুটা ভয় বিরক্তি আর ক্রোধ মিশ্রিত কাপা গলায় কন্ঠ চড়িয়ে তেতুল গাছ লক্ষ্য করে ময়না জানতে চায় - গাছের উপর কান্দে কোন শালা রে? সাথে সাথে সম্রাট উত্তর দেয় আমি ভাই, আমি সম্রাট, পাখি সম্রাট, অন্ধকারে গাছ থেকে নামতে পারছিনা, বলে আবার ভেউ ভেউ করে কাঁদতে থাকে।
পাখি সম্রাটের নাম শুনে ঘটনা বুঝতে খুব বেশী সময় লাগেনা ময়নার। গাছে গাছে পাখি ধরে বেড়ায় যে সম্রাট তাকেতো সে ভাল করেই চেনে। নিশ্চয় পাখি ধরতে উঠে শালা গাছে আটকা পড়েছে।যাক বাঁচা গেল বলে মনে মনে ময়না প্রবোদ গোনে।
ভুতের ভয়টা নিজের শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নিজেকে কিছুটা হালকা করে নেয় ময়না। তবে সম্রাটের উপর মেজাজটা তার ভীষণ খাট্টা হয়ে যায়। কেননা আর একটু হলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতো সে। ওর জন্য ময়না আজ মৃত্যুর মুখোমুখি দাড়িয়ে। ক্রোধের আগুনে সম্রাটকে যেন কিলিয়ে কাবাব বানাতে ইচ্ছে করে তার।
রাগে ক্ষোভে মনের খায়েশ সে মনেই চেপে রাখে। শালা নীচে নেমে এলে আচ্ছা করে প্যাদানী দেবে। শালার পাখি ধরার সাধ মিটিয়ে দেবে আজ। আখাস্তা গালী গালাজ করতে করতে ময়না এগিয়ে গিয়ে সম্রাটকে নীচে নেমে আসতে বলে।
আশ্বস্ত হয়ে কাঁন্দতে কাঁন্দতে সম্রাট ময়নাকে অনুরোধ করে টর্চের আলো ধরে থাকলে সে নীচে নামতে পারবে। সম্রাটের কথা মতো ময়না অন্ধকারে টর্চের আলো ধরে থাকে। অবশেষে আলোয় পথ খুঁজে পেয়ে কিশোর পাখি সম্রাট বহু কষ্টে সেই অন্ধকার তেঁতুল গাছ থেকে নীচে নেমে আসে।
সুযোগ মতো ময়নাও প্রস্তুত ছিল। তার মনের ইচ্ছাটা এবার পুরণ করে। সম্রাট নীচে নামতেই চুলের মুঠি ধরে আগে কোষে একটা চড় মারে ওর গালে, সাথে সাথে প্রশ্ন করে কেন উঠেছিস ???

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement