লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ ডিসেম্বর ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ১৬টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

২৩

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftইচ্ছা (জুলাই ২০১৩)

পাংশুদিনের ইচ্ছেগুলো
ইচ্ছা

সংখ্যা

মোট ভোট ২৩

রক্ত পলাশ

comment ৯  favorite ১  import_contacts ১,০০০
আমার প্রিয় ছুটিবারের দিনটার মনটা খুব খারাপ ।সেই সকাল ৬টা থেকে একটা সূর্যমুখী ফুলের বায়না ধরে অঝোরে কাঁদছে ।তাই আমার মনটাও যুগপৎ খারাপ।গতরাত্রে বামপাঁজরের টবে কয়েকটা ইচ্ছেফুলের গাছে পানি দিয়ে রেখেছিলাম, আজ সকালে ফুল তুলব বলে;কিন্তু ফুলগুলো আর ফুটতে পারল কই?
ইচ্ছে ছিলো , সকালের কৈশোরে রায়নগরের মোড়ে নিতাইদার চায়ের টংয়ে চিনামাটির চায়ের কাপে খামোখাই ধূয়াবাজি খেলব ।তারপর যখন সানরাইজ বেকারীর রিকশাভ্যানটা বেল বাজাতে বাজাতে মীরাবাজারের পথে ছুটবে,তখন আমিও একটা নিম্নবিত্ত রিকশাচেপে উড়াল দেব-সোনাপাড়া বস্তির ঠিকানায় ।যেখানে আমার পাগলা জগাই থাকে-তারে সবাই পাগল বলে।অথচ এ নিয়ে তার অনুযোগ ছিল না কোনদিনই।লাগামপচা ঠোঁটের হাসিটা লেগেই আছে দিনমান।যেন পাগলা জগাই পাগল হতে পেরেই সুখে আছে।
ইচ্ছে ছিল , আজকে তারে মোহন কাকুর দোকান থেকে পাঁচ টাকার একটা মিষ্টি খিলিপান কিনে দিয়ে প্রশ্ন করি----
“ও জগাই জিজীবিষা কারে কয় ?”
জগাই তখন কি বলত উত্তরে ? আমি চিলেকোঠা ঘরের নীল জানালায় বৃষ্টি মাখতে মাখতে উত্তর সাজাই-হয়তো হঠাৎ করেই জগাইয়ের ঘন কালো লোমে ঢাকা বৃত্ত পাঁজরে কয়েকটা শব্দ সাবালক হয়ে উঠত-----
“ ভালোবাসি,আমরা ভালোবাসি-
মধ্যবাসন্তী রাতের
চন্দ্রমুখী ফানুশপাখি।
অথচ সেই আমরাই
পিছুটানে ভুলে থাকি-
চন্দনকাঠের চিতার পালকি ।।”
তারপর সে তৃপ্তির হাসি হাসত , যে হাসিটার মানে আমি ছাড়া আর কেউ বুঝে না।ঐ হাসিটা দেখে হয়তো আমার খুব হিংসে লাগত।তখন আমিও তাকে শুনিয়ে দিতাম, খেয়ালে বুনা কয়েকটা লাইন-বুঝলে জগাই,আমার কোন কষ্ট নেই,তাই নষ্ট হবার তাড়া নেই।তাই তোমার মতো হাসতে পারি।চোখটা লাল করে,মনগড়া দুঃখ নিয়ে ; ন্যাকা কান্না আমি কাঁদি না।
কথাটা শুনে জগাই হয়তো ময়লা দাঁতের হাসি দিয়ে আমায় উপহাস করত,আর দুই চোখে ধ্রুব উষ্মা নিয়ে হয়তো বলে উঠত-----
“মিথ্যে বললি তুই ।শুনিসনি বুঝি,সুবোধ বলেছিল-মানুষ অন্ধকারে যতটা কাঁদে আলোতে ততটা কাঁদতে পারে না রে বোকা।”
আমি হয়তো সবসময়ের মতো মিথ্যে বলে ধরা খেতাম , তখনো পাগলা জগাই হাসতেই থাকতো----সুখে-দুখে বারোমাসে,জীবনটা ভলোবেসে,সবকিছু অবশেষে--------।
ইচ্ছে ছিলো, যখন ছোট্টবেলার প্রিয় জলপাই রংয়ের পাহাড়িকা ট্রেনটা পালাবদলের হুইসেল বাজিয়ে, দিনযাপনের খয়েরী ধূয়া উড়াতে উড়াতে ছেড়ে যাবে সকালের স্টেশন-ঠিক বেলা সোয়া এগারো,আমি পায়ে হাঁটা রথে চড়ে রাস্তা মাপবো চাঁদনীঘাটের পথে ।যেখানে আমার জন্যে আধঘন্টা ধরে অপেক্ষা করে আছে অনিন্দিতা, আর ধৈর্য্যের বাধে শান দিতে দিতে হাতঘড়ির তিন কাঁটায় সরল অংক কষছে । তারপর যখন আমি স্বৈরাচারী রোদের অত্যাচারে, মোটামুটি স্নানের শেষে পৌঁছে যেতাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে, তখন আমার রোদে জ্বলা মুখটা দেখে অনিন্দিতার হয়তো একটু মায়াই লাগতো।তবুও মান-অভিমানের পালা শেষে ঘড়ির কাঁটা নিশান গাড়তো ঠিক বারোটায়।
অনিন্দিতার মান কিসে ভাঙানো যায় তা তো আমার জানাই আছে।আমি পনেরো কদম পা বাড়িয়েই চলে যেতাম পুরান পুলের কোলে।সেখানে খুব ছিমছাম কাচের ঘরে,আচার নিয়ে সওদা করে ঝাঁকড়া চুলের সিরাজ ভাই।তার রিকশাভ্যানের সাইডপকেটে বড় করে লাল অক্ষরে লিখা------
সিরাজ ভাইয়ের আচার,পঞ্চরসের আচার
নিজে খান,বাড়ির জন্যে নিয়ে যান
না খাইলে কপালের দোষ,খাইলে পরে দিলখুশ-----।

পাঁচ টাকার চালতা আর পাঁচ টাকার জলপাই কিনে নিয়ে অগ্নিমূর্তির সামনে দাঁড়ালেই দুধে আলতা নরম গালে ঠুলের দেখা মিলত।অনিন্দিতার সেই হাসিটা আমি আচারে মিশিয়ে দিতাম।তারপর সুরমার ঢেউ গুণে গুণে পুরনো স্বপ্নগুলোর গায়ে নতুন নতুন জামা পড়িয়ে দিতাম দু ’জন মিলে।সপ্তাহে মাত্র একটা দিনই তো কাছে পাই।তাই দুজনেরই কত বায়না !! আমি হয়েতো অনিন্দিতার কাছে একটা গান শুনতে চাইতাম , অনিন্দিতাও গলা ঝেড়ে শুরু করে দিত--------
তোমার পঞ্চরসের আচার,আর মিষ্টি একটা পান
আমার সুরমা পাড়ের কবিতাটা গায় চাঁদনীঘাটের গান
এককাপ রং চা ,আর মিষ্টি একটা পান
আমার সুরমা পাড়ের কবিতাটা গায় চাঁদনীঘাটের গান------।

তারপর অনিন্দিতা হয়তো আমার কাছে একটা কবিতা শুনার বায়না ধরতো , রক্তপলাশের কবিতা।আমি তখন রক্তপলাশ সেজে প্রেমিকা রক্তজবাকে শুনিয়ে দিতাম একটা চপল প্রেমের কবিতা------
এই তো যেদিন
তুমি দীপান্বয়ী দুই সজল চোখে,
নবমীর চাঁদে উপমিত তোমার উপবৃত্ত কপালে;
আমার চঞ্চল অনামিকার চপল তুলিতে
সলাজ সিঁদুরের লালিমায় পরিণীতা সাজলে-
ঠিক সেদিন থেকেই
আমাদের প্রেমটা প্রকৃত ভগ্নাংশ।
আঁধছেড়া টিস্যুপেপারে প্রথম প্রেমের কবিতা লিখে,
আমি লবে আছি
সেই কবে থেকেই।
আর তুমি সেই সেদিন থেকে,
ফিরে গেলে হরে;
অগ্নিশুদ্ধ সেই কবিতাটা পড়ে-------
“ যদিদং হৃদয়ং তব
তদিদং হৃদয়ং মম।।”

কবিতাটা শুনতে শুনতে অনিন্দিতার চোখ দুইটা হয়তো সজল হয়ে উঠতো,আর আমার রুক্ষ পাষাণ হাতে নরম হাতটা চেপে ধরে হয়তো আশাবাদী গলায় বলে উঠতো-----
“ বাকি সব মিথ্যে
কবিতাটা যেনো সত্যি হয়----”
এই সত্যি-মিথ্যের নামতা পড়তে পড়তেই দিনটা বিকেল হয়ে যেতো।তারপর আযানের ডাক শুনে সন্ধ্যের শ্মশানে পৌঁছোবার আগেই দুজনার দুইটা পথ আলাদা হয়ে যেতো,আগামী ছুটিবারে আবার দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ।

রাতের কৈশোরে যখন আমি খুব একলা,তখন হয়তো রায়নগরের গলির মোড়ে খুঁজে পেতাম প্রলেতারিয়েত সুখাই মিয়াকে ।ইচ্ছে ছিলো, তার তিন চাকার উড়োজহাজটায় চড়ে মাঝরাত পর্যন্ত চষে বেড়াই ছোট্ট সিলেট শহরটা।তখন হালাল ঘামে ভেজা গামছাটা কোমরে বেঁধে, লালন হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে সুখাই মামা হয়তো গেয়ে উঠতো-----
পোনা মাছে লাফ দিয়াছে পুকুরে
শনিবারের বার বেলাতে দুপুরে
তাই ঢেউ এর উপর ঢেউ,উঠিল জলে
আমার মনের পাখি বনে পালায়,কি কৌশলে--------
মামার কাছে সেই মানুষদের গল্পটা শুনতে চাইতাম , যারা আছে মাটির কাছাকাছি ।মামা তখন নিজের গল্পটাই হয়তো শুনিয়ে দিত,চার লাইনে-----
হালাল ঘামে স্বপন বুনি
দিন আনি খাই দিন মোরা
তিন চাকাতে জীবন চড়ে
সুখ আর দুঃখ একজোড়া ।
অন্যমনে চিলেকোঠার জানালায় বসে ফেরারী ইচ্ছেগুলোর লিস্ট তৈরী করতে করতে কোথায় জানি হারিয়ে গিয়েছিলাম আমি।হঠাৎ পুবের ব্যালকনিটায় পোষমানা শালিকপাখিটা শিষ দিয়ে গাইতে লাগল------
বারান্দায়,রোদ্দুর,
আমি আরাম কেদারায় বসে দুই পা নাচাই রে।
গরম চায়, চুমুক দিই,
আমি খবরের কাগজ নিয়ে বসে পাতা উল্টাই রে।
কলিং এর ঘন্টা শুনে ছুটে গিয়ে দরজা খুলি
দারোয়ান দাঁড়ায় এসে তোমার দেখা নাই
তোমার দেখা নাই রে,তোমার দেখা নাই ।।
ব্যালকনিটায় ছুটে আসতেই খেয়াল হলো , সূর্যিমামাটা শেষমেশ উঁকি দিয়েছে ।হাতঘড়িতে দিনের বয়স পৌনে নয়।তাই ইচ্ছে গুলোকে বাকির খাতায় রাখার ইচ্ছে হলো না।প্রিয় নীল রংয়ের টি-শার্টটা গায়ে চড়িয়ে,শৌখিন মধ্যবিত্ত হেডফোনটা কানে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লাম স্যান্ডেল পায়ে, সেই পরিচিত সোনাপাড়া বস্তির ঠিকানায় , আমার পাগলা জগাইয়ের খোঁজে ।তখন মোবাইল ফোনের সাদামাটা মিউজিক প্লেয়ারটাতে,শুধু গিটার হাতে নিয়েই,বিচূর্ণ তেষট্টিতে বসে; আমার গানওয়ালা গলা ছেড়ে গাইছিল--------------------

ইচ্ছে হল এক ধরনের গঙ্গাফড়িং ,
অনিচ্ছেতেও লাফায় খালি তিড়িং বিড়িং ।
ইচ্ছে হল এক ধরনের বেড়াল ছানা,
মিহিগলার আবদারে সে খুব সেয়ানা।
ইচ্ছে হল এক ধরনের মগের মুলুক,
ইচ্ছে হাওয়ায় অনিচ্ছেটাও দুলছে দুলুক।
ইচ্ছে হল একধরণের আতশবাজি ,
রাতটাকে সে দিন করে দেয় , এমন পাঁজি ।
ইচ্ছে হল একধরণের দস্যি মেয়ে,
দুপুরবেলা দাদুর আচার ফেলল খেয়ে।
ইচ্ছে হল একধরণের পদ্য লেখা,
শব্দে সুরে ইচ্ছে করেই বাঁচতে শেখা।
ইচ্ছে হল একধরণের পাগলা জগাই,
হঠাৎ করে ফেলতে পারে যা খুশি তাই।
ইচ্ছে হল একধরণের স্বপ্ন আমার,
মরব দেখে বিশ্বজুড়ে যৌথখামার

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement