(বি:দ্র:-এই গল্পে সুখাইয়ের সংলাপগুলো সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত।)
-ভাই,চানরাইত কিতা আইজকোই হইব নি ?
রায়নগরের মোড়ে বিসমিল্লাহ টি স্টল এর বারান্দায় ইফতারির আয়োজন গোছাতে গোছাতে হঠাৎ আমায় প্রশ্নটা ছুঁড়ল সুখাই।সুখাই মিয়া।সোনাপাড়া বস্তির মুখচেনা প্রলেতারিয়েত। আমার খুব পরিচিত এই টি-স্টলটাতে মাসবেতনে মজুরি খাটে।জীবনের পথে ১৪ কদম বাড়াতে না বাড়াতেই যে সাবলম্বী।সারা রমজান মাসটাতেই আমি রোজা ভাঙছি এই সুখাই মিয়ার ইফতারি দিয়েই।
-হ্যাঁ,আজকেই তো হওয়ার কথা।বাইচান্স আজকে যদি চাঁদ দেখা না যায়,তাইলে কালকে তো নিশ্চিত।
আজকে চাঁদটা নাও দেখা যেতে পারে-আমার মুখে এই কথাটা শুনে সুখাইয়ের হয়তো বিশ্বাস হচ্ছিল না।ইফতারের আর মাত্র তেরো মিনিট বাকি।দ্রুত হাতের কাজ সারতে সারতে সে ঘন ঘন পশ্চিমের মিশকালো আকাশটার দিকে তাকাচ্ছিল।যদি সেই ক্যানভাসটাতে হঠাৎ একটা হাসিমাখা চাঁদমুখ খুঁজে পায়।কিন্তু কপাল খারাপ-সিলেটের বেহায়া মেঘলা আকাশটাতে সুখাইয়ের জন্যে কোন সুখবর নেই।
-সুখাই,সব রোজা রাখছিস তুই?
-না ভাই,হাছা কথা কই- একটা রাখতাম পারছি না।গত হরতালের দিন বিকালে আব্বার ভ্যানগাড়িটা ভাঙ্গিলাইছে পিকেটার হকলতে, ইদিন রাত্রে বাপ-পুতে সেহরি করতাম পারছি না।কিন্তু বাকি হকলটি রোজা রাখছি ভাই।
-ঈদ কই করবি ?
-বাড়িত করমু,আব্বার লগে চানরাইতোই বাড়িত যাইমুগি।আমি ত আইজকোই যাইতামগি আছলাম।কিন্তু চান ত দেখা যার না ভাই ।
দেখতে দেখতে হঠাৎ সন্ধ্যার শ্মশান থেকে আযানের ধ্বনিটা ভেসে আসতে লাগল।ঘামে ধোওয়া হাতে ইফতার খেতে খেতে সুখাই আবার উৎসাহী চোখে সন্ধ্যের আকাশে ঈদের চাঁদটা খুঁজছিল।
-তা ঈদের জন্যে কি কেনাকাটা করলি, সুখাই ?
-হয় ভাই,ইবার নিজের টেকাদি প্রথম ঈদ করমু।ওস্তাদে ৬০০ টেকা বোনাস দিছইন,আর লগে বেতনের ১১০০ টেকা।কিন্তু নিজের লাগি কুনতা কিনছি না ভাই।গতবার আম্মার বউত শখ আছিল্- একখান নয়া জায়নামাজো বইয়া ঈদের নামাজ পড়তা,কিন্তু হঠাৎ করি আব্বার টি.বি. হই গেল,আমরার পুরা ঈদখান অই মাটি হই গেছিল।আম্মার লাগি একখান সুন্দর দেইখ্যা জায়নামাজ লইছি ভাই।আর আব্বার লাগি লইছি একখান সাদা পাঞ্জাবি ।বাকি টেকা যেতা থাকব,আব্বারে দিলাইমু,ভাঙ্গা ভ্যানগাড়িখান ত ঠিক করা লাগব।
-সুখাই,তোর আর ভাই-বোন নাই ?
-হয় আছে।ছোটু একটা বইন আছে,কেলাস টু-ত পড়ে।আইচ্ছা ভাই,ফিরোজা রং কোনটারে কয় আপনে চিনঅইন নি?
-ফিরোজা রং ?এই তো তোর গায়ের শার্টটাই তো ফিরোজা রংয়ের। কিন্তু কেন রে?হঠাৎ তোর ফিরোজা রং চেনার দরকার হলো কেন ?
-না ভাই,বইনে আমারে কইয়া দিছিল,তাইর লাগি একখান ফিরোজা রংয়ের জামার কাপড় নিতাম।আরও কইয়া দিছে,লাল আর নীল রংয়ের দুইগোছা করি কাঁচের চুড়ি নিবার লাগি।ঈদর দিন সই হকলতের লগে সাইজ্যা আস্তা গেরাম চক্কর দিব,ইতার লাগি।
আমার ইফতারিটা খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই ।ঘড়ির কাঁটার গঞ্জনাটা ভুলে গিয়ে শুধু সুখাইয়ের কথাটাই শুনছিলাম একমনে।সুখাইকে দেখে আমার খুব হিংসে হচ্ছিল-ওর কাছে বায়না ধরার অনেকেই আছে। এই ঈদে আমার কাছে বায়না ধরার মতো কেউ নেই।অথচ এই গত ঈদেও একজন ছিল।ভাবতে ভাবতে স্নেহার নিষ্পাপ মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে।গত ঈদে টিউশনির বেতনের টাকায় স্নেহার জন্যে একটা সুন্দর টেবিল ল্যাম্প আর একটা নীল মলাটের ডায়েরী কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম।ডায়েরীটা হাতে দেওয়ার পর স্নেহার মুখের যে হাসিটা দেখেছিলাম,তা ভুলবার নয় ।তখন আমি ভুলেও জানতাম না,আমার ছোট্ট বোনটার সেই মুখের হাসিতে যতটুকু সরলতা ছিল,তার শিরা-ধমনীতে প্রবাহমান রক্ত ধারায় সেই পরিমাণে লোহিত কণিকা ছিল না ।গত এপ্রিল মাসের মাঝবয়েসে স্নেহা যখন রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের আই.সি.ইউ তে সাদা বিছানা চাদরে ক্লান্ত শরীরটা মিশিয়ে দিতে দিতে আমার কাছে বেঁচে থাকার বায়না ধরেছিল,আমি তথন তার সেই বায়নাটা মেটাতে পারিনি।তাই তো সে শেষমেশ সব হিসেব-নিকেষ চুকিয়ে ফেলে সব বায়নার উর্ধ্বে উঠে গেছে,খুব নীরবে।
টি-স্টলটা থেকে বেরিয়ে আমি সাদা মেসবাড়িটার দিকে হাঁটা ধরলাম।তখনো সুখাই মাখাটা কাঁধে ঠেকিয়ে আশাবাদী চোখে সেই মন খারাপের মেঘলা আকাশে ঈদের চাঁদটা খুঁজেই যাচ্ছিল।আমি জানি-আজ না হোক কাল চাঁদটা সুখাইয়ের জন্যেই উঠবে--------
অবোধ্য নিয়তিকে নাচিয়ে আঙুলের ডগায়,
লিখে যা স্বপ্নপূরণের স্মারক।
চাঁদদেখা সুখটারে ঠুকে রাখ জমার খাতায়,
তুই অশ্রুযোজিত রক্ত-ঘামের জাতক ।।