চোরের গায়ে কষে একটা লাথি মেরে লোকটা সকালে বউয়ের সাথে ঝগড়ায় হেরে যাওয়ার ক্ষোভ থেকে খানিকটা নিষ্কৃতি পায়। মনের মধ্যে সারা দিনের জমে থাকা ক্ষোভটা এখানেই ঝেড়ে ফেলে যায় অফিস ফেরত মোটা বেতনের কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ "শালা চোর বাটপারে ভরে গেছে দেশটা...!"
দৌড়ে এসে রেলের টিকিট চেকার আধমরা নেতিয়ে পড়ে থাকা চোরের পেটে পায়ের জুতো দিয়ে গুতো মেরে বলে "শালা শুয়োরের বাচ্চা...!”
স্টেশনের ফুড কর্ণারের কর্মচারী দোকান থেকে দৌড়ে এসে ভিড় ঠেলে সজোরে লাথি মারে গোটা তিনেক " এই খানকির পুত আমার দোকানের পেপসির বোতল চুরি করে"
অফিস ফেরত এক ঘুষখোর সরকারী কেরানি একটু উঁকি দিয়ে চোরের চেহারাটা দেখে বলে “একে পুলিশে দিন! গতকাল আমার হাত থেকে যে ছোকরাটা স্মার্টফোন কেড়ে দৌড়ে পালিয়ে গেছিলো এর চেহারা দেখে তেমনই লাগছে! এই বেজন্মার দল ঢাকা শহরটাকে চোরের শহর বানিয়ে ফেলেছে!”

লক ডাউনে বন্ধ থাকা রেল স্টেশনটি কয়েক মাস পর আবার চালু হয়েছে। প্রাণ চাঞ্চল্য আবার ফিরে এসেছে অনেকটা আগের মতোই। এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানো পথশিশুরা আবার ফিরে এসেছে। স্টেশনের সামনে মাঝে মাঝে একটা পিকাপ ভ্যান এসে খাবার দিয়ে যেতো। দুদিন আগেও এসেছিলো খাবারের প্যাকেট নিয়ে।
গত পরশু দিন দুপুরে পিকাপ ভ্যান থেকে একটা খাবারের প্যাকেট পেয়েছিলো টুকু। টুকু প্যাকেটটা ঘরে নিয়ে মায়ের সাথে ভাগ করে অর্ধেকটা দুপুরে আর বাকী অর্ধেক খাবার খেয়েছিলো রাতে। দুদিন ধরে স্টেশনের সামনে দাড়িয়ে আছে, সেই পিকাপ গাড়িটা যদি আবার খাবার নিয়ে আসে... গতকাল সারাদিন গেলো, আজকের দিনটাও পার হলো, গাড়ি খাবার নিয়ে এলো না।

গতকাল বিকেলে একলোক দোকান থেকে টোস্ট বিস্কুট কিনে চেইনে বাঁধা প্রিয় কুকুরকে খাওয়াচ্ছিলো। কুকুরের পাশে দাড়িয়ে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো টুকু। লোকটার চোখে চোখ পড়তেই কিছুটা দয়া হয়। দুটি টোস্ট বিস্কুট ছুড়ে দেয় টুকুর দিকে। সাথে সাথে কুকুরটা লাফিয়ে আসে টুকুর বিস্কুট দুটি কেড়ে নিতে। কুকুরের সাথে খানিকটা ধস্তাধস্তি করে টুকু নিজের দখলে নেয় বিস্কুট দুটি। কাল বিকেলের সেই দুটি টোস্ট বিস্কুট ছিলো তার শেষ আহার। রাত গেলো আজ সারাটা দিন গেলো। আর পারছে না টুকু...।

স্টেশনের দক্ষিণে রেল ক্রসিংয়ের পাশে একটা রুটির দোকান আছে। সকালে রুটি আর বিকেলে পুড়ি সিঙ্গারা বানায়। বড় একটা থালায় অনেক গুলো গরম সিঙ্গারা সাজানো। কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকে টুকু। ইচ্ছে হচ্ছে দুটি সিঙ্গারা নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যেতে। জীবনে চুরির অভিজ্ঞতা নাই। তাছাড়া দৌড়ে পালানোর মতো শক্তিও নাই শরীরে। এই ভেবে একবার ফিরে আসে। গরম সিঙ্গারার গন্ধ আবার টেনে নিয়ে যায় টুকুকে। মনে শক্তি সঞ্চয় করে। ক্ষুধার্ত শরীরে ব্যথায় জমে যাওয়া পেশী গুলোকে যথাসাধ্য শক্ত করে দুই হাতে দুটি সিঙ্গারা নিয়ে স্টেশনের দিকে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করে। হাতে শক্ত করে ধরে রাখে দুটি সিঙ্গারা, একটা নিজের জন্য একটা মায়ের জন্য...। শরীরের সমস্ত শক্তি খাটিয়েও বেশী দূর যেতে পারেনি টুকু। রুটির দোকানের পেশীওয়ালা কর্মচারী প্লাটফর্মের কাছে এসেই ধরে ফেলে। পেটে একটা ঘুসি খেয়ে টুকুর হাত থেকে সিঙ্গারা দুটি ছিটকে পড়ে রেল লাইনের পাশের আবর্জনার স্তুপে। ততক্ষণে গোটা দশেক উৎসুক লোক ছুটে এসে ঘিরে ফেলে চোরকে। ভিড় ক্রমেই বাড়তে থাকে। চোর চলে যায় পাবলিকের দখলে।


টুরিস্ট এজেন্সিতে চাকরী করতো রাজু। মার্চ মাসের শেষ দিকে অফিস বন্ধ হয়ে যায়। পাঁচ মাস ধরে বেতন বন্ধ। জুনে লক ডাউন খানিকটা শিথিল হওয়ার পর অফিস খোলার কথা থাকলেও সবাইকে ডাকেনি অফিসে। ডাক না পড়াদের একজন রাজু। হঠাৎ গতকাল অফিস থেকে কল আসে, মনে একটা উৎফুল্ল ভাব... আবার নিয়মিত অফিস করবে বেতন পাবে! কিন্তু অফিসে ঢুকে নোটিশ বোর্ডে ঝুলে থাকা ছাঁটাই তালিকা দেখে মাথায় আচমকা আকাশ ভেঙে পড়ে। তালিকায় নয় নাম্বার সিরিয়ালে তার নামটিও ঝুলছে। তিন মাস ধরে বাড়িওয়ালার ভাড়ার চাপ। সংসার খরচ চলছে এর তার কাছ থেকে ঋণ করে। আশা ছিলো একসাথে কয়েক মাসের বেতন পেয়ে সব শোধ করে দিবে। আবার আগের মতো হয়ে যাবে সবকিছু। এর মধ্যে বাড়িওয়ালা বাসা ছাড়ার নোটিশ দিয়েছে।
মনটাকে শক্ত করে হিসাব বিভাগ থেকে দুই মাসের বেতন নিয়ে ভাউচারে সই করে রাজু বেরিয়ে আসে অফিস থেকে। সারা দিন মতিঝিলের ফুটপাতে হেঁটে মনস্থির করে, চাকরিটা নেই এই কথা বউকে বলা যাবে না। তাহলে সে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়বে। সেই দুশ্চিন্তায় ক্ষতি হবে পেটের বাচ্চাটার।
বিকেলে একটা আন্তঃনগর ট্রেনে চড়ে বিমানবন্দর স্টেশনে নেমে প্লাটফর্মের জটলার দিকে এগিয়ে যায় রাজু। বারো তেরো বছর বয়সী একটা বাচ্চা ছেলেকে এভাবে মারধর করছে মানুষ! ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে ছেলেটার পাশে বসে। কপালের বাম পাশে একটা জখম থেকে ফোটা ফোটা রক্ত ঝরছে । হাতের ব্যাগটা পাশে রেখে পকেট থেকে একটা টিস্যু পেপার বের করে কপালের ক্ষত স্থানে চেপে ধরে। ডান হাতে ধরে ছেলেটাকে তুলে বসতে সাহায্য করে। খানিকটা ধমকের সুরেই বলে “আপনারা যার যার কাজে যান...! এতটুকু একটা বাচ্চাকে মানুষ এভাবে মারে!”
পাশ থেকে একজন চেচিয়ে উঠে “আরে মিয়া এতো দরদ দেখায়েন না, এই ব্যাটা চোর!”
“এই ছেলে কী চুরি করেছে আপনার?”
“কি চুরি করেছে... কিছুটা সন্দিহান হয়ে পাশের জনকে জিজ্ঞাসা করে “কি চুরি করেছে? পাশের একজন তার পাশের জনকে বলে “কি যেন চুরি করেছে...?
“আপনারা কেউ বলতে পারছেন না কী চুরি করেছে ছেলেটা, অথচ আয়েশ করে পিটিয়ে যাচ্ছেন! দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি হচ্ছে প্রতিদিন, তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস আছে আপনাদের?
রাজুর উত্তেজনা দেখে এক এক করে সরে যায় সবাই।
রাজু ছেলেটাকে বগল বন্দি করে দাঁড়াতে সাহায্য করে। দাঁড়ানোর মতো যথেষ্ট শক্তি নেই ওর শরীরে। রেল ক্রসিংয়ের পাশে একটা ফার্মেসিতে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেলেটাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে। সে দেখেই বুঝতে পারে ছেলেটা খুবই ক্ষুধার্ত। জানতে চায় “কি খাবি বল?”
“পরোটা আর ডিম।”
তিনটা পরোটা সাথে দুইটা ডিম প্রায় খাবলে খেয়ে ফেললো ক্ষুধার্ত ছেলেটা। এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তৃপ্তি করে ওর খাওয়ার দৃশ্য দেখছিলো রাজু। এই মুহূর্তে রাজুর কাছে মনে হচ্ছে ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয়ার মতো প্রশান্তি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। দুই গ্লাস পানি খেয়ে হাসি মুখে রাজুর দিকে তাকায় ছেলেটা। তৃপ্তির হাসিটা দেখে রাজু জানতে চায় “তোর নাম কি?”
“টুকু”
“কি চুরি করেছিলি টুকু?”
“আমি আঙ্কেল চোর না, জীবনে চুরি করিনাই...। আমি রাস্তায় ফুল বেচতাম। ট্রাফিক জ্যামে গাড়ি থামলে ফুল হাতে নিয়া জানালায় টুকা দিতাম, স্যার ম্যাডামরা ফুল কিইন্যা নিতো, কেউ কেউ খুশি হইয়া পঞ্চাশ একশ টাকাও দিতো! ভাইরাস রোগটা আসার পর থেইক্যা কেউ আর গাড়ির জানালাই খুলে না!”
“তোর বাবা কি করে টুকু?”
“আমার বাপেরে তো আমি দেখিনাই, মায়ে কইছে আমি ছোট্ট থাকতে নাকি বাবায় আরেকটা বিয়া কইরা মায়রে ফালায়া পালায়া গেছে,আমার মা বাসা বাড়িতে কাম করতো, রোগডা শুরু হওয়ার পর থেইকা মায়ের কামও বন্ধ,কেউ কাজের বেটি ঘরে ঢুকতে দেয় না। আমগো ঘরে খাওন নাই। কেউ কিছু দিলে খাই, না দিলে উপাস থাকি। সাহেব, আপনে অনেক ভালা মানুষ, একটা সত্যি কথা কই?”
“বল”
“আমি কিন্তু আইজকা চুরি করছিলাম”
“কি চুরি করেছিলি টুকু?”
“মসজিদের সামনে যে হোটেলটা আছে না, ঐখান থেইকা দুইটা সিঙ্গারা চুরি করছিলাম...”
খানিকটা আবেগপ্রবণ স্বভাবের রাজু ভিজতে থাকা চোখটা আড়াল করতে অন্য দিকে মুখটা ফিরিয়ে নেয়, চশমাটা খুলে চোখ মুছে বলে “আচ্ছা টুকু তোর কি একটু ভালো লাগছে এখন? তুই কি হাঁটতে পারবি?”
“হ্যা হাঁটতে পারুম সমস্যা নাই, আমরা তো মাঝে মাঝেই মানুষের এমন লাত্থি গুতা খাই, অভ্যাস আছে...”
“তুই থাকিস কোথায়?”
“ঐযে ইস্কুলটা দেখতেছেন না, ইস্কুলের পিছনে একটা বস্তি আছে সেইখানে আমি আর আমার মায় থাকি”
রাজু টুকুকে সাথে নিয়ে বাজারে যায়। চাল ডাল আটা তেল সহ প্রায় এক মাসের খাবার কিনে রিক্সায় করে রাজুর ঘরের সামনে পৌঁছে দিয়ে আসে। ফিরার সময় নিজের মোবাইল ফোন নাম্বারটা এক টুকরো কাগজে লিখে দিয়ে আসে। বলে আসে “তোর আর তোর মায়ের আয় রোজগার শুরু হওয়ার আগেই যদি খাবার শেষ হয়ে যায় তাহলে এই নাম্বারে কল দিস”
“সাহেব আমার মায়ের লগে একটু দেখা কইরা যাইবেন না?”
“নারে টুকু, আজ না অন্য দিন, ফোন করিস কিন্তু"
“আইচ্ছা”
রাজু এই সন্ধ্যাটা নিয়ে একটু চিন্তায় ছিলো। তার অফিস শেষে ঘরে ফিরতে ঠিক এতটাই সময় লাগে। রোকসানা মোটেই বুঝতে পারবে না আজ তার অফিস ছিলো না,তার চাকরিটা চলে গেছে।
অযথা হর্ন বাজিয়ে দুরন্ত বেগে ছুটে চলছে বড় রাস্তার গাড়ি গুলো। ফুট ওভার ব্রিজে রাস্তা পার হচ্ছে অস্থির মানুষেরা। উড়াল সেতুর নির্মাণ শ্রমিকরা ব্যাস্ত উন্নত রাষ্ট্রের সিল মোহর লাগানর কাজে। ব্যাস্ত নগরীর ফুটপাত ধরে হেঁটে ঘরে ফিরছে রাজু, চারদিক যেন ভৌতিক নিরবতা। কোথাও কেউ নেই। নগরে জনমানুষের চিহ্ন নেই। রাস্তার দুই পাশে দাড়িয়ে আছে শুধু উঁচু উঁচু ভূতুরে দালান গুলো। পরিত্যাক্ত এক নগরীর সে যেন সর্বশেষ এক নাগরিক।