নীলক্ষেত পুরনো বইয়ের বাজার থেকে একটা পুরনো বই কিনি। মলাটের পিছনে দেখতে পাই একত্রিশ বছর আগে এই বইটি একজন স্বামী তাঁর স্ত্রীকে উপহার দিয়েছিলেন। হাতে লেখা নাম ঠিকানা সাথে কিছু আবেগের কথা পড়ে আমার মন আমাকে টেনে নিয়ে যায় সেই বইয়ের মালিকের সন্ধানে। এক সময় দেখা মিলে সেই মানুষটির। এরমধ্যে আবিস্কার হয় তাঁর জীবনের বেদনাদায়ক ঘটনার। তিন দশক আগের প্রাণোচ্ছল একজন মানুষ পাথরের মূর্তি হয়ে বেঁচে আছেন। এই বইটি ফিরে পেয়ে আবার নতুন করে যেন তাঁর জীবনে প্রাণ ফিরে আসে। ভালোবাসার এই একটিমাত্র স্মৃতি তাঁর মনের মধ্যে জমাটবদ্ধ বরফকে গলিয়ে খরস্রোতা নদীর প্রবাহ সৃষ্টি করে। সেই হিসাবে আমি নিশ্চিত গল্পটি বিষয়ের সাথে গভীর ভাবে সমঞ্জস্যপূর্ণ। বাকিটা বিচারের ভার পাঠক এবং ভিজ্ঞ বিচারকগণের হাতে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৪৫টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৪৩

বিচারক স্কোরঃ ৩.০৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উষ্ণতা (জানুয়ারী ২০১৯)

২৭ নম্বর পরীবাগ
উষ্ণতা

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৪৩

মোজাম্মেল কবির

comment ১২  favorite ০  import_contacts ৬৫৫
পুরনো একটা বইয়ের মলাট উল্টে চমকে গেলাম। অন্য কারো ক্ষেত্রে কি ঘটতো জানি না, আমার বেলায় তাই ঘটলো। ১৯৮৭ সালে বইটি একজন স্বামী তার স্ত্রীকে উপহার দিয়েছিলো। রুশ উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ বই। নীলক্ষেত পুরনো বইয়ের বাজার থেকে সস্তায় দুর্লভ বই কেনার শখ আমার অনেক দিনের। পুরনো বইয়ের গন্ধ আমাকে মাতাল করে, অদ্ভুত এক টান পুরনো বইয়ের প্রতি। এখানে এমন বই পাওয়া যায় যা এখন আর লাইব্রেরীতে বিক্রি হয় না। বইটির নাম জামিলা। প্রচ্ছদে সবুজ ফসলের মাঠে এক জীবন সংগ্রামী নারীর ছবি। বাংলায় অনুবাদের কারণেই হয়তো প্রচ্ছদ শিল্পী এক বাঙালি নারীর মুখ কল্পনা করে এঁকেছেন। আর নাম জামিলা হওয়ার কারণে মনেই হচ্ছিলো না বইটি অনুবাদ। আসল কথায় আসি, চমকে গেলাম বইয়ের মলাট উল্টে। একত্রিশ বছর আগে স্বামী তার স্ত্রীকে বইটি উপহার দিয়েছিলো, স্ত্রীকে কিছু আবেগের কথা লেখা আছে প্রচ্ছদের পিছনের সাদা পৃষ্ঠায়। পড়ে যা মনে হলো স্বামী কদিন পরেই দেশের বাইরে যাবে দীর্ঘ সময়ের জন্য। স্ত্রীর পেটে সন্তান, সে জানে না সন্তান পুত্র নাকি কন্যা হবে। হাতে আঁকা দুটি শিশুর মুখ, একটি ছেলে আর একটি মেয়ে শিশুর। নিচে ফাউন্টেইন পেনে স্বাক্ষর আশরাফ হোসেন, ২৭ পরীবাগ, ঢাকা, তারিখ ২৪/০৩/১৯৮৭ ইং। বিশ টাকায় বইটি কিনে একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে টানতে ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকি।
আমি কোথায় যাচ্ছি ঠিক জানি না। একত্রিশ বছর আগের আশরাফ হোসেনের একটা কাল্পনিক মুখ আঁকি মনে মনে। আটাশ কি ত্রিশ বয়সী যুবক। গায়ে খদ্দরের পাঞ্জাবী। ঘন কালো গোঁফ, মাথায় ঝাঁকড়া চুল...
কাঁটাবন রোড ধরে হেটে আমি মনের অজান্তেই চলে আসি পরীবাগ। বাম দিকে তাকিয়ে ২৭ নাম্বার একই হোল্ডিঙে এই শতকের শুরুর দিকে তৈরি চারটা উঁচু দালান দেখতে পেলাম। যখন দেশে রিয়েল এস্টেট কোম্পানির ব্যাবসা জমজমাট সে সময়ের তৈরি এই আবাসিক দালান গুলো।
আমি কিছুটা অবাক হলাম, আমার কি এখানে আসার কথা ছিলো? নাকি হাতের বইটি আমাকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে! আমি নিজেকে প্রশ্ন করছি –তুমি কি আশরাফ হোসেনকে খুঁজতে এসেছো? মন থেকে উত্তর এলো –জানি না...
মানুষের মনে বড়ই অদ্ভুত মেকানিজম কাজ করে যা সম্পর্কে সে মানুষটা নিজেও অজ্ঞাত। মন ভিতর থেকে ফুঁসলিয়ে মানুষটাকে দিয়ে তার ইচ্ছা পূরণ করিয়ে নেয়। এতক্ষণে আমিও নিশ্চিত হলাম আমার মন আমাকে দিয়ে আশরাফ হোসেনের সন্ধান করার চেষ্টা করছে।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে তখন। রাস্তার উল্টো দিকে একটা চায়ের দোকানে বসে চা খেয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে তাকিয়ে আছি দালান গুলোর দিকে। এখনো কি আশরাফ হোসেন এখানে বাস করেন? আমি কি কিছু জানতে চাইবো এই লোকটার বিষয়ে? আমি জানি আমার মন তীব্র ভাবে আশরাফ হোসেনকে খুঁজতে চাইছে কিন্তু কারো কাছে তার সন্ধান করতে চাওয়ায় জড়তা মুখে। হাতের বইটা নাড়াচাড়া করে ফিরে আসলাম। সেদিন রাতে অদ্ভুত কিছু স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নের বিষয় আশরাফ হোসেন আর তার পরিবার… কিছু স্বপ্নের কথা ঘুম ভেঙে ধারাবাহিক কিছুই মনে থাকে না। এলোমেলো স্বপ্ন।
পরদিন বিকেলে বেরিয়ে আবার সেই চায়ের দোকানে বসে রইলাম। কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে দুইবার চা খেলাম। বারবার চোখ চলে যাচ্ছে পাশাপাশি দাড়িয়ে থাকা চারটি দালানের দিকে। মাঝ বয়সী চায়ের দোকানদার আড়চোখে আমাকে খেয়াল করছে। তার দিকে তাকাতেই চোখ সরিয়ে নিতে দেখলাম। মুহূর্তেই দোকানদারের মনের অবস্থা বুঝতে পারলাম –সামনে দেশের জাতিয় নির্বাচন, গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন ঘোরাফেরা করছে। গায়ে কালো জ্যাকেট, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ কিছু একটার সন্ধানে আছে... আমাকে দেখে তার মনে তেমন কিছুই মনে হচ্ছে। গতকাল একবার এসে তার দোকানেই ঘণ্টা খানেক বসেছিলাম, পরপর দুই দিন এমন নতুন মুখ সন্দেহজনকই বটে।
দোকানে লোকজন আসছে চা সিগারেট কিনছে চলে যাচ্ছে। গতকাল যেমন তিন চার জন লোকের লাগাতার আড্ডা ছিলো আজ নেই! কেউ এসে বসছে না। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে চা দোকানীর কোন ইশারা ইঙ্গিত থাকতে পারে। একটু ফাঁকা পেয়ে আমি আরেকটা সিগারেট চাইলাম। বেঞ্চ থেকে উঠে দাড়িয়ে ঠোটে সিগারেট নিয়ে ঝুলে থাকা লাইটারে ধরিয়ে দোকানদারকে বললাম –আচ্ছা, আমাকে একটা তথ্য দিতে পারেন? আড়চোখে তার দিকে চেয়ে বুঝতে পারলাম তার চোখে ভয় আর আতংকের ছাপ, আমার প্রশ্নটা শুনেই তার গলা কেমন শুকিয়ে আসছে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম এই দোকানের আশেপাশে ইয়াবা গাঁজা সহ নানা ধরণের মাদকের জমজমাট ব্যাবসা আছে। আর এইসবের তথ্য তার কাছে আছে। ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলো –কি তথ্য স্যার?
-আশরাফ হোসেন নামে কাউকে চিনেন আপনি? আমি বললাম। প্রশ্ন শুনে সে হ্যা কি না বলবে এই নিয়ে ইতস্তত বোধ করছে দেখেই বুঝতে পারলাম আমি বোধহয় সন্ধান পেয়ে গেছি। সন্ধান আমি পেয়েগেছি এটা নিশ্চিত, তবে তার মিথ্যে কথা থেকেই একটা নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া গেলো। সে আশরাফ হোসেন সম্পর্কে ঠিকই জানে কিন্তু উত্তর দিলো –স্যার আমি এই এলাকায় আইছি বেশী দিন হয়নাই, এই নামে কাউরে চিনিনা। তবে স্যার এই এলাকায় চল্লিশ বছর ধইরা আছে আকবর চাচা, সে কইতে পারবে। হাতের আঙুল উঁচিয়ে দেখালো –ঐযে দুই নম্বর বিল্ডিঙটা দেখতেছেন, ঐ বিল্ডিং এর দারোয়ান সে। আমি সেদিন চলে আসলাম। একটা উত্তেজনা নিয়ে কাটলো ঘুমের আগ পর্যন্ত। কিন্তু রাতে ভালো ঘুম হলো।
পরদিন বিকেলে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে বের হতে হলো। জ্যাকেট না পরে কোর্ট গায়ে দিলাম। নিচে নীল সাদা চেক শার্ট। শেভ করে মুখটা পরিষ্কার করতে হলো। পকেটে একটা কলম ঢুকিয়ে নিলাম। জামিলা বইটা খাকি একটা খামে ভরে ঠিক মাগরিবের নামাজের পর দুই নাম্বার বিল্ডিং এর গেটে ঢুকলাম। গার্ড রুম থেকে সত্তুরের কাছাকাছি বয়সী বৃদ্ধকে দেখে বুঝতে পারলাম তিনিই আকবর চাচা। কাছে এসে সালাম দিলেন, আমি সালামের উত্তর দিয়ে বললাম –আপনি নিশ্চই আকবর চাচা।
-হ্যা, আপনি কার কাছে আসছেন?
-আমি আসলে আপনার সাথেই একটু কথা বলবো।
-আমার সাথে? কি বিষয়ে? একটু অবাক হয়ে বললেন।
-আসুন না একটু বসি কোথাও। কয়েক মিনিট সময় নিয়ে কথা বলতে হবে তো।

আকবর চাচা গার্ড রুমের পাশেই তার থাকার ছোট্ট ঘরটায় নিয়ে গেলেন। একটা প্লাস্টিকের চেয়ার এগিয়ে দিয়ে তিনি বিছানায় বসলেন। -বলুন তো শুনি কি কথা? আমার দিকে গভীর আগ্রহ ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন।
আমি পূর্বেই চিন্তা করে এসেছিলাম কিভাবে শুরু করবো। এটাও নিশ্চিত ছিলাম যে দোকানদার জেনে বুঝে ঠিক জায়গাতেই পাঠিয়েছে আমাকে। আমি সরাসরি খাম থেকে বইটা বের করে বললাম –চাচা, এই বইটা আশরাফ সাহেবের। তিনি তাঁর স্ত্রী রুবীকে এই বইটা উপহার দিয়েছিলেন... আমি এই বইটা উনার হাতে ফিরিয়ে দিতে চাই।
আকবর চাচা বইটা হাতে নিয়ে এতোটাই অবাক হলেন যে, একবার আমার দিকে আরেকবার বইটার দিকে তাকিয়ে কি বলবেন কিছু বুঝতে পারছিলেন না। পাতা উল্টে হাতের লেখা দেখেই বুঝতে পারলেন এটা আশরাফ সাহেবের নিজের হাতের লেখা। তাঁর হাতে লেখা কতো চিঠি নিয়ে পোস্টবক্সে ফেলে এসেছে! আকবর চাচার চোখ দেখে খানিকটা ভেজা ভেজা মনে হলো আমার কাছে। তিনি যেন একই সাথে অনেক ঘটনা মনে করার চেষ্টা করছেন। চোখটা উজ্জ্বল হয়ে যেতে দেখলাম যেন তাঁর হাতে একটা মানুষের ত্রিশ বছরের ঘুম ভাঙিয়ে দেয়ার একটা ঔষধ পেলেন। -এই বই আপনি কোথায় পেলেন? কাঁপা কণ্ঠে বললেন আকবর চাচা।
-বইটা আমি ফুটপাত থেকে কিনেছি। কিন্তু আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে আশরাফ সাহেব সম্পর্কে। এবং আমি নিজ হাতে বইটা উনার হাতে তুলে দিতে চাই। এই উপকার টুকু করবেন আমার জন্য?
-সেই ব্যাবস্থা না হয় করে দিলাম, কিন্তু... তাঁর সম্পর্কে... কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করলেন –আপনি এমন একটা জিনিস নিয়ে এসেছেন... আপনাকে না বলেও পারছি না। চোখ থেকে চশমাটা খুলে বিছানায় রাখলেন। শুনুন তাহলে, উকিল সাহেব মারা যাওয়ার মাস ছয়েক আগে মা হারা একমাত্র ছেলেকে ছেলের পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করিয়ে বউ করে ঘরে আনলেন। রুবী ম্যাডাম পড়তেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর সাহেব তখন বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন। ম্যাডাম দেখতে পরীর মতো সুন্দরী ছিলেন। বিয়ের বছর খানেক পরই পেটে সন্তান আসলো। স্ত্রীর পেটে চার মাসের সন্তান রেখেই সাহেব লন্ডন চলে গেলেন পি এইচ ডি করতে। কিন্তু মাস ছয়েক পর লন্ডনের পড়াশোনা শেষ না করেই ফিরে আসতে হলো সাহেবকে। এইটুকু বলে থেমে গেলেন আকবর চাচা।
-কেন?
-আমাকে উকিল সাহেবই গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিলেন, উনার এখানেই কাজ করেছি। তারপর আশরাফ সাহেবের খোঁজ খবর দৈনন্দিন প্রয়োজন এখনো আমাকেই দেখতে হয়। সেই সূত্রে এই পরিবারের ভিতর বাহির সব কিছুই আমার জীবনেরও একটা অংশ। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি একজন ভালো মানুষ। তাই, সত্যিটা আর গোপন রাখছি না আপনার কাছে। ম্যাডাম পেটের সন্তান নিয়েই তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পুরনো বন্ধুর হাত ধরে আমেরিকায় চলে যায়। সেখানে সন্তান হলে নাকি তাদের সিটিজেনশীপ পেতে সুবিধা হয়। তার বন্ধু হুমায়ুন আগে থেকেই সেখানে ছিলো। মাঝে মাঝে দেশে আসা যাওয়া করতো।
-আশরাফ সাহেব নিজের সন্তানকে ফিরিয়ে আনলেন না কেন?
-দুঃখটা তো সেখানেই, পেটের সন্তানের বাবা নাকি ছিলো হুমায়ুন...
-আশরাফ সাহেব এখন কোথায় আছেন?
-আছেন, এই বিল্ডিঙের পিছনে বাবার আমলের পুরনো বাড়িতে। প্রথম দিকে বেশ অনেক বছর মাথা উঁচু করেই চলছিলেন। প্রায় দেড় যুগ হলো আস্তে আস্তে সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কারো সাথে দেখা করেন না। বাইরে যান না। দেশ সমাজ রাজনীতি কোন কিছুতেই আগ্রহ নেই। মোবাইল কম্পিউটার ইন্টারনেট কোন প্রযুক্তির সাথেই সম্পর্ক নেই। বিশাল ঘর ভর্তি বই... এই নিয়েই থাকেন। জানেন? গত বিশ বছর ধরে আমি সাহেবকে হাসতে দেখি না।
-আমি কি সাহেবের সাথে একটু দেখা করার সুযোগ পাবো?
-এভাবে তো হবে না, বইটা নিয়ে আমি যাচ্ছি আপনি বসুন এখানে কিছুক্ষণ। আকবর চাচা বইটা নিয়ে পাশের গলি দিয়ে বাসায় গেলেন। মিনিট দশেক পর ফিরে এসে দূর থেকে আমাকে ইশারায় ডাকলেন –আসুন তাড়াতাড়ি! জাদু মন্ত্রের মতো পরিবর্তন দেখছি হঠাৎ! আসুন!
আকবর চাচার হাতে বইটা দেখছি না। আমার বুকের ভিতর হৃদকম্পনের শব্দ আমি যেন নিজ কানে শুনতে পাচ্ছি! আমি আকবর চাচার পিছনে যাচ্ছি মনের ভিতর এক উত্তেজনা নিয়ে।
অনেক পুরনো বাড়ি। বারান্দায় নক্সা করা তিনটা পিলার, বাড়িটা কতো বছরের পুরনো তা অনুমান করা গেলো না। বিশাল বারান্দায় লোহার গ্রীল, দেখে মনে হচ্ছে এক সময় এই গ্রীলটা ছিলো না। বারান্দা পেরিয়ে মাঝখানে বসার ঘর। এর পর বেশ বড় একটা ঘর, চার পাশে হাজার হাজার দেশি বিদেশী বই। মাঝখানে একটা টেবিল। আমাকে দেখে চেয়ার থেকে উঠে দরজার কাছে আসলেন। খদ্দরের পাঞ্জাবীর উপরে চাদর গায়ে। আমি কল্পনায় যে মুখটা দেখেছিলাম তার সাথে অনেক মিল! শুধু রবি ঠাকুরের মতো পাকা দাড়ি গোঁফ। মাথায় প্রায় অর্ধেক চুল নেই। আমাকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে পাশের একটা চেয়ারে বসালেন। পাঁথরের মতো জমে থাকা একটা মুখে অনেক বছর পর একটা হাসির রেখা দেখে আকবর চাচা চোখে জল ধরে রাখতে পারলেন না। আমি মানুষটাকে জীবনে প্রথম দেখলেও বুঝতে পারলাম তাঁর বুকে হাজার বছরের জমাটবদ্ধ বরফ গলে খরস্রোতা নদী হয়ে বয়ে যাচ্ছে। টেবিলের দুই পাশে দুটি ল্যাম্প থেকে আলো এসে পড়ছে টেবিলের মাঝখানে। বইয়ের মলাট উল্টে নিজের হাতের লেখাটা হাতের আঙুল দিয়ে ছুয়ে দেখছেন বার বার। আশরাফ সাহেবের চোখ থেকে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে ভিজে গেলো তাঁর নিজ হাতে একত্রিশ বছর আগের লেখার উপর। বহুদিন এমন করে পাথরের কান্না দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার।
ঘণ্টা দুয়েক প্রাণ খুলে আড্ডা দিয়ে বুক ভরা প্রশান্তি নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে আসলাম। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমার ছায়ার সাথে হেঁটে চলেছি আমি উদ্দেশ্যবিহীন মানুষ। যার জীবনের কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। আগামী কাল নিয়ে ভাবনা নেই। যা হওয়ার হবে যা ঘটার ঘটবে... পরিকল্পনা গুলো মানুষকে এলোমেলো করে, লোভী করে স্বার্থপর করে... মাঝে মাঝে আশরাফ হোসেনের মতো মানুষের সান্নিধ্য হঠাৎ করে ভাগ্যে জুটে গেলে এটাই বুঝি জীবনের আসল নির্যাস।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement