লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৪৪টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৯৫

বিচারক স্কোরঃ ২.৭৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.২ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - প্রায়শ্চিত্ত (জুন ২০১৬)

ফুলেশ্বরের স্বপ্ন
প্রায়শ্চিত্ত

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৯৫

মোজাম্মেল কবির

comment ৭  favorite ১  import_contacts ৯৮৪

ফুলেশ্বর রায় এর দিন শুরু হয় ফজরের আযানের আগে। মসজিদের ইমাম আব্দুল করিমকে জ্বিনে খুব অত্যাচার করে। ফজরের আযান দিতে আব্দুল করিমকে বাড়ি থেকে খানিকটা পথ হেটে যেতে হয়। পথের দুই পাশে ভুট্টা ক্ষেত। মাঝখানে পায়ে হাটা সরু পথ। আযানের আগে বাড়ি থেকে মসজিদে যেতে প্রায় প্রতিদিন ভুট্টা ক্ষেত থেকে জ্বিনে ডাকে করিমকে। পিছন থেকে বলে -হুজুর কই যান? হুজুর পিছনে ফিরে তাকায় না। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ যখন একা থাকে তখন সাহসের একটা সীমা থাকে। তারপর আর পারেনা। দিনের বেলা করিম ফুলেশের সাথে তার মনের কথা বলে। ফুলেশ্বর খুব সাহসী মানুষ। ঘটনা শুনে করিমকে বলে -হুজুর, বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আমার মোবাইলে একটা মিসকল দিবেন। আমি আপনাকে বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত পৌছায়ে দিয়া আসবো।
করিম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে একটু শক্তি যোগায়। এরপর থেকে করিম প্রতিদিন ফজরের আযানের আগে ফুলেশ্বরের মিসকলের অপেক্ষায় থাকে।
এই ফুলেশ্বর অভিমান করে পৃথিবী থেকে চলে গেছে।

আব্দুল করিম কৃষি খামারের মসজিদের ইমাম। পরিবার নিয়ে থাকে খামারের ভিতরে উত্তর কোনে একটা আধপাকা ঘরে। ফুলেশ্বরের বাড়ি খামারের উত্তরে। করিমকে অবসরে খামারে টুকটাক কাজ করতে হয়। কিন্তু কাজে করিমের একটু অনীহা। ইমাম সাহেব কাজ করলে তার গায়ের সাদা জামা কাপড় দ্রুত ময়লা হয়ে যায়। ফুলেশ্বর ক্ষুদ্র কৃষক। নিজের যা জমি আছে তাতে চাষবাস করে দিন চলে যায়। বউ আর দুই ছেলের সংসারে কতোই আর দরকার। নিজের ক্ষেতে দিনের কিছু সময় কাজ করলে সারাদিন অলস পড়ে থাকে। অন্যের কাজ করবে সেটা তার দ্বারা সম্ভব না। আত্মমর্যাদা বোধ অনেক। মজুরীর বিনিময়ে কাজ করে না সে। তবে অবসরের পুরো সময়টা মেজর সাহেবের খামারে পড়ে থাকে। তার বিনিময়ে সে কিছু আশা করে না তা নয়। মেজর সাহেব তার জন্য অনেক করে। তার পরও এতো বড় একটা খামারকে সে নিজের মনে করেই সব করে। করিমেরও অনেকটা স্বস্তির কারণ ফুলেশ। নিজ দায়িত্বে পুকুরে নেমে আবর্জনা পরিষ্কার করছে। ফুলেশ জানে কোন পাশের জঙ্গলায় বিষাক্ত সাপের উৎপাত। সেদিকে জঙ্গলা একটু বড় হতে দেখলেই দা হাতে লেগে যাবে পরিষ্কার করতে। ম্যানেজার আছে খামারে একজন। তাকে দিয়ে কোন কাজ হয় না। রাতভর মুভি দেখে আর সারা দিন ঘুমায়। জবাব যা দেয়ার তা ফুলেশ আর করিমকেই দিতে হয়। আর করিমের ভরসা ফুলেশ।
খামার থেকে মাইল খানেক মাটির রাস্তায় হেটে যেতে হয় ঢোলারহাট বাজারে। মাগরিবের নামাজের পর করিম বাজারে যায় সংসারের কেনাকাটা করতে। সঙ্গী ফুলেশ। এই রাস্তাটাকে বলে পুরাতন দার্জিলিং রোড। অনেক অনেক বছর আগে এই অঞ্চলের মানুষকে এই পথেই দার্জিলিং যেতে হতো তাই নামটা এখনো রয়ে গেছে। এখন অবশ্য অনেক বড় পাকা রাস্তা হয়েছে। এই পুরাতন দার্জিলিং রোডে এখন কিছু বাইসাইকেল চলে আর পায়ে হেটে কিছু মানুষ চলাচল করে। রাস্তার দুই পাশে আলু ক্ষেত। পাকা বাড়ি ঘর নেই। দূরে কিছু ছনের চাল দেখা যায়। যেদিন গ্যাংটকএ ভূমিকম্প হলো সেদিন করিম আর ফুলেশ বাজার করে এই পথে বাড়ি ফিরছিলো। মাঝ পথে এসেই মাটি কাঁপতে শুরু করলো। মনে হচ্ছিলো পায়ের নীচের মাটি উল্টে পাল্টে যাবে। দাড়িয়ে থাকা যাচ্ছিলো না। দুজনেই মাটিতে আছড়ে পড়ে। দুজনেই বাজারের ব্যাগ হাত থেকে ফেলে দেয়। করিম আর ফুলেশ একজন আরেকজনকে বুকে জড়িয়ে ধরে। করিম চিৎকার করে বলে যাচ্ছে -লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ... আর ফুলেশ রাম... রাম... করে চিৎকার করছে। দুজনের বুকে একই হৃদকম্পনের শব্দ। একজন অন্য জনের হৃদকম্পন শুনতে পাচ্ছে।


মেজর সাহেব দুই তিন মাস পর পর তিন চার দিনের জন্য খামারে বেড়াতে আসেন। তখন ফুলেশ্বরের নাওয়া খাওয়া বন্ধ। বাগানের আগাছা পরিষ্কার করা। পুকুর পাড়ের আগাছা পরিষ্কার করা। লিচু বাগানের আগাছা পরিষ্কার করা কুমড়া ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করা। মেজর সাহেব আসলে দোতলা বাংলো বাড়ির তালা খোলা হয়। দুই তিন মাসের জমে থাকা ধুলা ময়লা পরিষ্কার করে বিছানা পত্র গুছিয়ে বাড়ি চলে যায় ফুলেশ। ছোট কাল থেকে মেজর সাহেবকে মামা বলে ডাকে ফুলেশ। মামা একটু বিশ্রাম নিলে সন্ধ্যার পর চা খেতে খেতে গল্প জমে ফুলেশের সাথে। মেজর সাহেব ফুলেশের মনে যত্ন করে পুষে রাখা স্বপ্নের কথা জানে। মানুষের নিজের জন্য স্বপ্ন দেখার সময় ফুরিয়ে গেলে শুরু হয় সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য স্বপ্ন দেখা। প্রত্যেক মানুষ তার নিজের মতো করে স্বপ্ন দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। বাবা মায়ের চাপিয়ে দেয়া স্বপ্ন সন্তানের মন খুব একটা স্পর্শ করেনা। সন্তান তখন তার স্বপ্ন নিজের মতো করে সাজায়। সন্তানের মনের কথা বুঝার সক্ষমতা সব বাবা মায়ের থাকে না। দরিদ্র ফুলেশ্বর রায়ের স্বপ্ন তার ছেলে লেখাপড়া করে অনেক বড় হবে। মামার মতো মেজর সাহেব হবে। তাকে পড়াশোনায় অনেক ভালো করতে হবে। ছেলের ভালো পড়াশোনার জন্য অনেক টাকা দরকার এই খামারে নিজ দায়িত্বে বাড়তি কাজ করে যা কিছু পায় তার পুরোটাই কাজে লাগে ছেলের স্কুল মাস্টার কোচিং এই সব খাতে।
দোতলায় জানালার পাশে সোফায় বসে আছে মেজর সাহেব। পাশে সিগারেটের প্যাকেট। একটার পর একটা জ্বলছে সিগারেট। একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে মেঝেতে লাল মাদুরে বসে আছে ফুলেশ। এই গ্রামের সব খবর রাখে ফুলেশ। কে কার বিরুদ্ধে মামলা করলো। মামলা সত্যি কি মিথ্যা। কার বউ দুই বাচ্চা রেখে কার সাথে পালিয়ে গেলো। মেজর সাহেব সব কথা খুব মন দিয়ে শোনে। গল্প শুনে শুনে তার দরকারী তথ্য গুলো জেনে নেয়। শোনার ফাঁকে আবিষ্কার করে আশপাশে কার জমি বিক্রির সময় হলো। মানুষ বিপদে পড়লে জমি ভিটে বাড়ি বিক্রি করতে হয়। তাই ফুলেশের সব গল্প খুব মন দিয়ে শুনতে হয় মেজর সাহেবকে।
সব কথা শেষে আসে ফুলেশের পরিবারের কথায়। মেজর সাহেব ফুলেশের পরিবারের জন্য অনেক করে। নিজ থেকে না চাইলেও করে। মেজর সাহেব জানতে চায় -তোর বউ বাচ্চা কেমন আছে?
-ভালো আছে মামা। বড়টাকে কোচিংএ ভর্তি করাইছি। কিন্তু মামা তার লেখাপড়ায় আমার অসন্তুষ্ট লাগে।
-ঘরে ধান চাল আছে? বছর চলবে?
-তা যাবে। কিন্তু ছেলের পড়ার সব খরচের টাকার যোগান দিতে অর্ধেক ধান বিক্র করে দিতে হবে। আপনে তো চল্লিশ হাজার টাকা পাবেন... কখন যে দিতে পারি...
-সেটা নিয়ে ভাবতে হবে না। এই নে এখানে দশ হাজার টাকা আছে। বলে মানিব্যাগ থেকে দশটা হাজার টাকার নোট বের করে দেয় মেজর সাহেব।
ফুলেশ বরাবরের মতো কাঁচুমাচু করে হাতটা বাড়িয়ে মুখে বলে -তা লাগবে না মামা। আপনি আর কতো দিবেন...
-লাগবেনা জানি। হাতে রেখে দে কাজে লাগবে। আর শোন উত্তরের লিচু বাগানে কুমড়োর যা ফলন আসে বিক্রি করে করিমকে হাজার দুই টাকা দিয়ে বাকীটা তুই নিয়ে নিস। আর লিচু বিক্রির ত্রিশ ভাগ তোর বিশ ভাগ করিমের আর বাকীটা মসজিদের হিসাবে দিয়ে দিস।
-চা দিবো মামা?
-দে একটু লাল চা করে দে।
-মামা কি পূর্ব পাশের জানালা খোলা রেখে ঘুমান?
-হ্যা। যা গরম! রাতে বিদ্যুত কখন যায় কখন আসে...
-বলছিলাম কি জানালা ঘেষে তো বকুল গাছের ঢাল পাতা। রাতে সাপের উৎপাত বেড়েছে খুব। সেদিন নিচ তলায় ম্যানেজার সাহেবের ঘরের দরোজায় একটা গোখরো সাপ বসেছিলো। রাত তিনটার সময় আমাকে ফোন করে। ঘুম থেকে উঠে লাঠি নিয়ে দৌড়ে এসে সেই সাপ মেরে ফেলতে হয়েছে। মারার ইচ্ছা ছিলো না তাড়িয়ে দিতে চেয়েছি কিন্তু বার বার তেড়ে আসছিলো । এখন মামা এর জোড়াটা আশেপাশে ঘুরাফেরা করে।
-বলিস কি! একটু ভয় পেয় টর্চ হাতে দাড়িয়ে যায় মেজর সাহেব। ফুলেশকে বলে -তোর সাথে টর্চ আছে?
-জি আছে মামা।
-আয়তো একটু দেখি। দোতলার খাটের নিচ থেকে শুরু করে বাথরুম রান্নাঘর বাড়ান্দা এমনকি আলমারীর নিচে ভালো করে দেখে নেয়। ফুলেশ বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে দরজার ফাঁক ফোঁকর বন্ধ করে যায়।


প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির গড়মিল অনেক পুরোনো। মানুষ তার নিজের জীবনের অতৃপ্ত ভাসনা পূরণ করতে বীজ বপন করে সন্তানের জীবনে। সন্তানের নিজস্ব একটা জগৎ নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা আছে এটা মেনে নিতে পারেনা অনেকেই। কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিত মা বাবা।
সাঁওতাল পল্লীর ফুলেশ্বর রায় এর নিজস্ব জাতিস্বত্তা বলতে বিশেষ কিছু এখন আর নেই। ওরা এখন মিশ্র এক সংস্কৃতির বাসিন্দা। এক সময় মাঠের পর মাঠ অনাবাদী জমি ছিলো। এখন সব জমিতেই ফসল ফলে। চাষের জন্য পানির অভাব ছিলো বিদেশী অনুদানে কয়েক পরিবারের জন্য একেকটি গভীর নলকূপ স্থাপন হয়েছে। ফসলে মাঠের পর মাঠ সবুজ থাকে এখন সারা বছর। কিন্তু বেশীর ভাগ জমির মালিকানা হাত বদল হয়ে গেছে। দক্ষিণ অঞ্চলের চালাক মানুষ গুলো দুশ পাঁচশ টাকা বিঘা হিসাবে শত শত বিঘা জমির মালিক হয়েছে। যমুনা সেতু হবার পর বছর বছর বাড়তে থাকে জমির দাম। ততোদিনে ফুলেশ্বর রায়রা প্রায় ভূমিহীন। ফুলেশের এখনো তবু কিছু আছে। ছোট সংসারে বছরের খাবার জুটে।

নতুন বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার ছোঁয়া লেগেছে সবার মাঝে। ছেলে মেয়েরা স্কুল কলেজে যায়। পড়াশোনা শেষে দেশে বিদেশে ছোট বড় চাকুরী করে। ফুলেশ্বরের স্বপ্ন তার বড় ছেলে উজ্জ্বল রায় ভালো পড়াশোনা করবে। সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে চাকুরী পাবে। তাই ছেলেদের পড়াশোনার খরচের টাকার বাড়তি যোগান দিতে এদিক সেদিক ছুটতে হয় ফুলেশকে।
করিম হুজুর জানে ফুলেশ পরের কাজ করে না কিন্তু এক দুই মাস পর পর তাকে গ্রামে দেখা যায় না। দুই তিন সপ্তাহ পর আবার ফিরে আসে। ফুলেশের এই হারিয়ে যাওয়ার ব্যপারটা নিয়ে একদিন কথা তুলে করিম -দাদা একটা কথা বলবে?
-কি কথা বলেন?
-তুমি কোথায় যাও মাঝে মাঝে?
ফুলেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে -একেতো আমি মিথ্যা বলতে পারি না তার পর আপনে হুজুর মানুষ... কি করে যে বলি... শোনেন তাহলে। ইন্ডিয়াতে আমার এক ভাই থাকে তাতো জানেন।
-তা জানি।
-বর্ডার পার হয়ে তার কাছে চলে যাই। তার সাথে কিছু কাম কাজ করি। কামটা অনেক কঠিন। অনেক ঝামেলার। যে কোন সময় জীবনটাও যেতে পারে। কি করবো? সংসার তো চলতে হবে। ছেলেপেলে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন।
-কি কাম করেন?
বলবে কি বলবে না কিছুক্ষণ ভেবে মুখ খুলে ফুলেশ। করিম হুজুর তার খুব প্রিয় মানুষ। কাছের বন্ধু। এমন ভালো বন্ধু সহজে মিলে না। ফুলেশ বলে -সেখানে দুই ভাই মিলে দুইটা বাইসাইকেল নিয়ে নেপাল বর্ডারে চলে যাই। সাইকেলের দুই পাশে চারটে প্লাস্টিক কন্টেইনার ভরে ডিজেল নিয়ে নেপাল ঢুকে যাই। সেখানে বেশী দামে বেঁচে ফিরার পথে বস্তায় চিনি নিয়ে আবার ইন্ডিয়াতে ফিরে আসি। এই করে কিছু টাকা পাই। কি করবো বলেন? পোলাপানের লেখাপড়ায় অনেক নগদ টাকা লাগে। হুজুর আপনে এই কথা আর কাউকে বলবেন না জানি। তবুও বলছি কথাটা আপনার মধ্যেই রাইখেন।
-সে আমি আর কাউকে বলবো না দাদা। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।



ফুলেশ আজ বউকে পিটিয়েছে। দুঃখ কষ্ট আঘাত সব ছোয়াছে রোগের মতো। দিন সাতেক আগে ফুলেশের ফসলের ক্ষেত ক্ষতি করে প্রতিবেশী হারুনের গরু। এই নিয়ে হারুনের সাথে তর্ক ঝগড়া এক পর্যায়ে হাতাহাতি হয়। হারুন ফুলেশের হাড্ডিসার শরির দেখে মনে করেছিলো দুচারটা কিল ঘুষিতেই ব্যাটা ঘায়েল হয়ে যাবে। হাড্ডি আর চামরার নীচে এতো অসুরের শক্তি কে জানতো! হারুন উল্টো হেরে যায়।
হারুন গ্রাম্য মাতবরদের কাছে মার খাওয়া আর অপমানের নালিশ দেয়। সালিশ বসে। সমাজপতিরা খুব চতুর। দুই পক্ষ সবল থাকলে তারা মাসের পর মাস বছরের পর বছর সমাধান ঝুলিয়ে রাখে। কেউ আবার দুই পক্ষের হাত এক করে মিলে মিশে বসবাস করার পরামর্শ দেয়। চোখের জল ফেলে দুজনে বুকে বুক মিলিয়ে নেয়।
এক পক্ষ দুর্বল হলে তাদের বিচারের সমাধান দিতে সহজ হয়। ফুলেশ্বর তুলনামূলক ভাবে দুর্বল প্রতিপক্ষ। দুর্বলের বিপক্ষে রায় দেয়া সহজ। ফুলেশ অপরাধী সাভ্যস্থ হয়। বিচারে উপস্থিত সভায় দশটা জুতার বাড়ি খাবে ফুলেশ। এমন হাতাহাতি তর্কাতর্কির মতো ঘটনা গ্রামে কতোই ঘটে তার জন্য শতশত মানুষের সামনে জুতার বাড়ি খাওয়ার ঘটনা এই প্রথম। শালিসে ফুলেশ্বরের স্ত্রী পুত্রের নিরব উপস্থিতি ছিলো। স্ত্রী পুত্রের সামনে নিজের প্রতি অবিচারে বেঁচে থেকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করলো ফুলেশ্বর রায়।
এই ঘটনায় ফুলেশের গোছানো সংসারটার ভীত নড়ে যায়। ফুলেশ তার বড় ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিয়েছে। একে নিয়ে আর আশা নেই। লেখাপড়ায় তেমন ভালো করতে পারেনি তবুও তো চালিয়ে যাচ্ছিলো। সালিশে স্ত্রী পুত্রের সামনে অপমানে ফুলেশ আধ পাগলের মতো আচরণ করছে আজকাল। পড়ালেখা করে উজ্জল রায়ের কিছু বন্ধু স্বজন জুটেছে। তাদের কানেও গেছে খবরটা। মনের দুঃখে জীবনে প্রথমবার গাঁজার কল্কীতে হাত দেয় উজ্জল রায়। প্রথম দিন তারপর প্রতিদিন চলতে থাকে। এক কান দুইকান করে বাবা ফুলেশ্বরের কানেও আসে। ফুলেশ্বরের ধারণা মিথ্যে না। মা গোপনে ধান বিক্র করে ছেলের বাড়তি হাত খরচের টাকার যোগান দেয়। তা সে অনেক দিন ধরেই দিয়ে আসছে। জানা গেলো গাঁজা ধরার পর।
মায়েরা ছেলের অপকর্মের কথা বিশ্বাস করতে চায় না। বাবার চাক্ষুষ প্রমাণ থাকলেও না। মায়ের কাছে তার সন্তান পৃথিবীর শ্রেষ্ট সন্তান।
এই নিয়ে বিকেলে স্বামী স্ত্রীতে তর্ক লাগে। বউ মানতেই চাইছেনা তার ছেলে নেশা করে। এও মানছে না গোপনে হাত খরচের টাকা দিয়ে সে ভুল করেছে। স্বামীর সাথে উল্টো তর্ক করছে। ভুল আর শুদ্ধ যাই হোক মায়ের ভালোবাসা এমনই অন্ধ হয়। সন্ধ্যা গড়িয়ে কালো হয়ে এসেছে চার পাশ। উত্তেজিত ফুলেশ বউএর চুলের মুঠি ধরে টানতে থাকে -আয় আমার সাথে, দেখে যা। তোর পুত্রধন স্কুল ঘরের পিছনে কাদের নিয়ে কি করছে...
রাতে খাবার রান্না হয়নি। বউ বালিশে মুখ গুঁজে বিছানায় শুয়ে আছে। ক্ষুধার্ত ফুলেশ বাড়ান্দায় বসে বকবক করে যাচ্ছে। রাত দশটায় ছেলে বাড়ি ফিরলে তাকে দেখে মাথায় আগুন ধরে ফুলেশের। ছেলের বাড়ি ফিরার শব্দ শুনে মা আর আবেগ ধরে রাখতে পারছে না। এতোক্ষণের জমে থাকা আবেগ বাধ ভেঙে বের হতে চাইছে। ছেলে মায়ের কাছে খাবার চাইলে মা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।
ফুলেশ তখনো বাড়ান্দায় খুটিতে হেলান দিয়ে মাথায় হাত রেখে বসে আছে। ঘরের ভিতর থেকে জোরে কান্নার শব্দ কানে আসতেই দাড়িয়ে দরজার দিকে তাকায় ফুলেশ। চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে -এখন থামবি? না থামলে কিন্তু একেবারে মেরেই ফেলবো।
ঘর থেকে ছেলে উজ্জল উত্তেজিত হয়ে বের হয়। বাবার সামনে এসে দাড়িয়ে বলে -তোর ক্ষমতা থাকলে মাকে মারতে আয়!
ফুলেশ্বর হা করে কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে অসহায় তাকিয়ে থাকে। ছেলের এই মারমুখো রুপ দেখে পা থেকে মাথা পর্যন্ত অবশ হয়ে আসে ফুলেশ্বরের। ফুলেশ্বর মাথা নিচু করে বাড়ি থেকে বের হয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

করিম হুজুর ফজরের আযান দিয়ে প্রতিদিনের মতো মুসুল্লিদের জন্য অপেক্ষা করে। মুসুল্লি আসে না। আশেপাশে দু চার ঘর মুসলিম পরিবার বাদ দিলে বাকী সব হিন্দু পরিবার। মুসলিম পরিবারের কর্তারা খুব ভোরে নদীতে মাছ ধরতে চলে যায়। ফজরের নামাজটা প্রতিদিন ইমাম সাহেবকে একাই আদায় করতে হয়। তাই সে নামাজ একটু আগেই সেরে ফেলে। এতো দিনে বেশ কিছু ভালো নামাজী জ্বিনদের সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠেছে। তার ধারণা ফজরের নামাজ সে একা আদায় করে না। তার পিছনে কিছু জ্বিন নামাজ আদায় করে। জ্বিনকে এখন আর সে ভয় পায় না।
সূর্য উঠতে থাকে আর মক্তবে আরবি পড়ার জন্য বাচ্চারা আসতে থাকে একে একে। এই সময়টুকু পুকুর পাড়ে হেটে নেয়। করিম হাঁটতে হাঁটতে পূর্বপাশে আট নাম্বার পুকুরের পাড়ে চলে যায়। কাঁঠাল গাছের দিকে চোখ পড়তেই অজ্ঞান হয়ে পরে যাওয়ার অবস্থা। কাঁঠাল গাছের ঢালে একটা লাশ ঝুলে আছে। গলায় দড়ি। দেখতে ঠিক ফুলেশের মতো! হ্যা ফুলেশ্বর রায়!
গ্রামের সব মানুষ এর মধ্যে কাঁঠাল গাছটি ঘিরে দাড়িয়ে আছে। মাটি থেকে দেড় ফুট উপরে ঝুলে আছে ফুলেশের পা দুটি। ছেলে উজ্জ্বল রায় হাঁটু গেড়ে বসে বাবার লাশের পা দুটি শক্ত করে চেপে ধরে আছে বুকের মধ্যে। ছেলের কান্নার কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না। ক্ষণিকের কান্নার শব্দ বাতাসে ভাসে। আজীবনের কান্নার শব্দ বাতাস নাগাল পায় না। সেই কান্না বাসা বাঁধে মানুষের বুকের মধ্যে। আজীবনের প্রায়শ্চিত্তে বুকের সেই জমাট বাঁধা কান্নার বরফ গলে না।
======
পাদটীকাঃ
গল্পটি সত্যি ঘটনার অবলম্বনে লেখা। যাকে নিয়ে এই গল্প সেই ফুলেশ্বর রায় (ফুলেশ) আমার দেখা কিছু সংখ্যক ভালো মানুষের একজন ছিলেন।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement