লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ নভেম্বর ১৯৬৪
গল্প/কবিতা: ২০টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঈদ (আগস্ট ২০১৩)

সাঁকো
ঈদ

সংখ্যা

মীর মুখলেস মুকুল

comment ১  favorite ০  import_contacts ৪৪২
আমাদের সাহেদ জামাল একজন কবি ও গল্পকার। আমার অনুজ কিন্তু সাহিত্যের উপর ভাল দখল তার। আমি গল্প লিখতে গেলেই হাত চেপে ধরে। লিখতে নিরুৎসাহিত করে। আমার নাকি লেখা হয় না। বিশেষ করে গল্পের ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে না। সে আমাকে উপদেশ দেয় এভাবে না এভাবে লেখেন। তার কথা আমার পছন্দও হয়। কয়দিন থেকে মাথার ভিতর এক গল্প ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু সাহেদকে পাচ্ছি না। সে এক বিশেষ কজে চিটাগং গেছে। তাও প্রায় সপ্তাহ হয়ে গেল। ফিরতে আরও প্রায় সপ্তাহখানেক লেগে যাবে। মেজাজ দু’শ কিলো ঝরের গতিতে পৌছে গেছে! কাজের আর সমায় পেল না! মনের অস্থিরতাকে কোন ভাবেই দমাতে পারলাম না। অবশেষে লিখেই ফেললাম। কিযে উল্টাপাল্টা লিখলাম কে জানে?

ছোট্ট একটা নদী দু’টি গ্রামকে দু’ভাগ করেছে। দু’গাঁয়ের লোক দু’¯^ভাবের। এক গাঁয়ে ধনী আর এক গাঁয়ে গরিবের বাস। সেজন্য বোধ হয পরস্পরের মিলও নেই। কিন্তু বিপদ আপদে যে একে অপরের আপন হয়ে যায় না তা ঠিক না। যায়। কেননা তারা মানুষ। কিন্তু সমস্যা হলো নদী। নৌকাই যোগাযোগের একমাত্র বাহন। ইস একটা সাঁকো যদি থাকতো? তাহলে সেই বন্ধনটা দ্রুত, দৃঢ় এবং অটুট থাকতো। তারপর যেন কী...? কী যেন...? ও হ্যা। শুনুনÑ

মানুষ, মানুষ আর মানুষ। মিরপুর থেকে গুলিস্থান। গুলিস্থান থেকে টঙ্গি। মোহম্মদপুর টু জুরাইন। গাবতলী-সায়েদাবাদ। গুলশান-পীরজঙ্গির মাজার ভায়া ফার্মগেট। ¯্রােতের মত মানুষ ছুটছে। এখানে সাঁকোর ছড়াছড়ি। তবে নদীর উপর দিয়ে নয়; রাস্তার উপর দিয়ে। আরে সাঁকোর মত; বড় বড়। ওগুলোকে নাকি উড়াল সেতু বলে। যোগাযোগ দ্রুত হয় বটে; তবে সম্পর্ক কতটুকু উন্নয়ন হয় কে জানে। নদীর উপর দিয়ে পানির ¯্রােত বয় আর এসবের উপর দিয়ে মানুষ আর যান-বহনের ¯্রােত বয়। যেদিক চোখ যায় যান-বহন আর মানুষ। বাসস্ট্যাণ্ড, রাস্তা, পার্ক, শপিংমল, কাঁচাবাজার; কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। রমজান মাস। সামসে ঈদ। কে কাকে পিছনে ফেলে আগে যাবে। বলায়, চলায়, কেনায়, খাওয়ায়; সবখানে প্রতিযোগীতা। যেন অলিম্পিক ইয়ার শুরুর আগেই ঢাকায় বিশ্ব-অলিম্পিকের আসর বসেছে। সেটা হলেও ভালই হতো। কেননা সেখানে সভ্যতা, শৃংখলা, নিয়ম-নীতি আছে। কিন্তু ঢাকায়? এখানে কী আছে?। ভয়াবহ শৃংখলা সংকট। আর সব তো বাদই দিলাম। এই দেখুন, কী সব আবোল-তাবোল ভাবছি। কার ভাবনা কে ভাবে। আমি অজপাড়াগাঁয়ের ছা-পোষা মানুষ। জ্ঞানির ভাবনা আমার ভেবে কী লাভ? বরং আজমতের কথা বলি।
আজমত ঢাকা শহরের টোকাই। কোন টোকাইকে নিয়ে কিছু লিখলে ভুল-ভ্রান্তি হলেও মান হানি হবে না। জেল-জুলুমের ভয় নাই। অন্যায় হলেও সেটা ক্ষম্য।
কী বলছিলাম যেন...? ও। আজমতের কথা...। ঢাকা শহরের এক টোকাইয়ের কথা। আজমত টোকাই হলেও সারাক্ষণ রাজপথে থাকে। রাজার মত। রাজার মত মানে রাজার পাইক পেয়াদাদের মত। ওরা যেমন দৌড়ের উপর থাকে আজমতও তেমন। তবে রাজার পিছনে নয়। ঢাকার রাজপথে আবার রাজা-টাজা আসবে কত্থেকে? তবে আছে। অনেক। হাজার হাজার। লাখেরও বেশি। আরে রাজপথে ট্রাক, বাস, কার আছে না? এসবই তো রাজা। বলতে পারেন রাজার রাজা। আমাদের আজমত ছোটে বাসের পিছে পিছে। যখন যানজোটে কোন বাস, মিনিবাস বা কারের গতি থিতু হয় তখনই আজমতের খেল শুরু হয়। শুরু হয় হাত-পা ছোঁড়া-ছুঁড়ির খেলা। আজমত একটা ইউনানি ঔষধ কম্পানির প্রচারপত্র বা হ্যাণ্ডবিল জানালা দিয়ে ভিতরে ছুঁড়ে দেয়। সেসব প্রচারপত্র ঢাকার বাসে নিয়মিত চলা-ফেরা করেন অথচ পাননি এমন লোক ক’জন আছে? নেই। তার উপর মধু মেশানো, মন ভুলানো, যাদুকরী ভাষায় নিরাশ, অক্ষম এবং সবরোগের শেষ চিকিৎসার গ্যারান্টিযুক্ত চিকিৎসার কথা লেখা থাকে যার কার্যকরী ক্ষমতা বিশ্বের বাঘা বাঘা যাদুকরকেও হার মানায়। এমনকি বিফলে টাকা ফেরতই নয় একটা ফ্ল্যাটও পেয়ে যেতে পারেন। কী যেন? ও...। আজমতের কথা।
এই বিশাল কার্য সম্পাদনের বিনিময়ে আজমতের সামান্যই আয় হয়। ভরদিন দৌড়ের পর দিনান্তে পঞ্চাশ-ষাট টাকা পায়। দুপুরে এক পেট নাস্তাÑ সিঙ্গারা বা ডালপুরি ইত্যাদী। মাত্র তের বছরের বালক হিসাবে আয়টা নেহায়েত কম না। ভাগ্য ভাল যে এও পাচ্ছে। মালিক আরও কম দিলে কার কী করার ছিল? দিন শেষে কোন দিন সিনেমা-টিনেমা দেখে, চা-চু খায়, সুযোগ বুঝে চুপে-চাপে নেভি সিগ্রেটে টান মারে, মুখ ধুয়ে বাড়ি যায়। বাড়ি মানে বস্তি। থাকে বিধবা মার সাথে আগারগাঁও বস্তিতে। তার মা হনুফা বাড়ি বাড়ি কাজ করে। ঢাকার বড়লোকদের বাড়ি। চলে যায়।

আজমত বস্তির ছেলে, রাস্তার রাজা, ফুটপাতে যার প্রতিনিয়ত সংগ্রাম। আর অনিক? অনিক আবার কে? পাঠক ভাবছেন, ঢাকার টোকাইদের কথা বলে সুকুমারবোধের উপর আঘাত হেনে নাকের জল চোখের জল এক করে সস্তা সেন্টিমেন্ট কুড়ানোর পাঁয়তারা করছি। মোটেও না। অনিকের কথা একটু শুনুন। সে কোন টোকাই না। অনিক বাঙালী বা বাংলাদেশের এক ভবিষ্যৎ নক্ষত্র। নিউরোসার্জন ডাঃ সাফকাত হাসান দম্পতির এই ছেলে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনের স্টাডি অব কম্পিউটার সায়েন্স এণ্ড স্পেস প্রোগ্রাম স্কুলের ক্লাস সেভেনের ক্যাম্পাস কাঁপানো ছাত্র। রেকর্ড মার্কস নিয়ে পরীক্ষায় পাশ করে এবং বিস্মোয়োকর তার আই কিউ স্কোর। সে হারতে শেখেনি। যেখানে হারের সম্ভবনা সেখানেই নতুন কৌশল। ব্রিজ স্থাপন। তারপর অগ্রসর হওয়া। সম্পর্ক সৃষ্টি, কার্জ উদ্ধার মানে জয়লাভ। দেখেছেন অতটুকু ছেলের এমন বুদ্ধি! ¯^ভাব শান্ত-শিষ্ট, তবে অসম্ভব রকমের গোঁয়ার এবং হঠাৎ কোন কিছুতে অসঙ্গতি দেখলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। জেদী টাইপের এই ছেলেটা অনেকদিন পর বাংলাদেশে আসছে বাবা-মার সাথে ঈদ করতে। ছেলেটাকে নিয়ে দম্পতির খুব ভয় কখন যে কী করে বসে।
ঈদের আর সাত দিন বাকি। উজ্জ্বল নীলাকাশ ছুঁয়ে বিমানটা উড়ছে। নিচে স্থির স্তুপ স্তুপ তুলোর মত মেঘের ঢেউ। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের লাক্সারি এয়ারবাসটির এই মুহূর্তের অল্টিচ্যুড প্রায় বারহাজার মিটার। গ্রাউণ্ডস্পীড দশহাজার কিলোটিার। উড়োজাহাজটার অবস্থান আরব সাগরের মাঝামাঝি।
সামনের মনিটরে একভাবে তাকিয়ে আছে অনিক। বাবাকে প্রশ্ন করে, আর কতক্ষণে ঢাকা পৌঁছবে?
এই তো ঘন্টা দু’ তিনেক। বাবার নিরস উত্তর।
শুনে অনিক চোখ বড় বড় করে, ভ্রæ কপালে তুলে বলে, এখনও এতো দেরী? যেন ওর কিছুতেই তর সইছে না।
আজমত রাস্তার রাজা। অনিক স্কুলের রাজা। দুজনেরই ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার। একজন হতদারিদ্র। অশিক্ষা আর কুসংস্কারের সাথে তার জন্মগত সংগ্রাম। অপরজন অর্থ-বিত্তের উপরে ভসে। শিক্ষা আর প্রগতিকে মগজ থেকে বের করে এনে আপন হাতে বিশ্ব দেখে। রাজায় রাজায় যখন একত্রে হয় যুদ্ধ তখন অনিবার্জ। দুই ক্ষুদেরাজকে আজ ঢাকার রাজপথে দেখা যাবে। দেখা যাক দুই ক্ষুদেরাজায় কী রকম যুদ্ধ হয়। মল্ল, সম্মুখ না আকাশ যুদ্ধ? এবং কে জেতে?

ইফতারের এখনও অনেক দেরি। বেলা চারটা-সাড়ে চারটা। ব্যাস্ত নগরীর নানা কোলাহল ছাপিয়ে কোন এক মিউজিক কর্ণার থেকে হাই ভলিউমে গান বাজছে Ñ‘ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ...।
গাউছিয়ায় রাস্তার পাশে ড্রেনের উপর টেবিল সাজিয়ে তার উপর থরে থরে সাজান পিয়াজু, বেগুনি, বুটভুনা, হালিম, কাবাব, শাহি জিলাপি আরও কত কী। তার উপর রাস্তার ধুলো ড্রেনের মাছি সমানে লুটোপুটি খাচ্ছে। রমজান মাস, সবার অধিকার সমান। ধুলারও মাছিরও।
তারপরও ইফতার বিকিয়ে কুলোতে পারছে না দোকানিরা। মুহূর্তে সব হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। সবখানে একই অবস্থা। মাছ বাজারে খাই খাই ভাব। পাঁটি ওরফে খাসির গোস্তের দাম শুনতে পারবেন কিনতে পারবেন না। গরুর কালাত (কাল রং অর্থে) ভাই মহিষের গোস্ত টুকটাক বাজারে মেলে। দাম? বাজার শেষে মানি ব্যাগ হাতালেই বুঝবেন। অথচ রমজান মাস। সাধনার মাস...। সংযমের মাস...।
গাউছিয়া মার্কেটে ভীড় ঠেলে ঠেলে নারী-পুরুষরা দেদারসে লেটেস্ট মডেলের জুতা, থ্রী-পিচ, শাড়ি এবং ভোগ্যপণ্য কিনছে। দাম দ্বিগুন না ত্রিগুন ভাবার অবসর নেই? পরে যদি না মেলে? কে কাকে ধাক্কা দিল টিজ করলো দেখার সময় কই? মাত্র দু’দিন বাদে ঈদ।
এদিকে অনিকদের টয়োটা কারটা নিউমার্কেটের পূব গেটের সামনে রাস্তার পাশে ঠ্যাকনো ছিল। ওর ডান হাতে শপিং ব্যাগ ভর্তি নতুন কাপড়-চোপড়। নিউমার্কেট থেকে শপিং শেষে মাত্র কারের পিছনে দাঁড়িয়ে ব্যাক কভার খুলে শপিং ব্যাগ রাখতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে হ্যাচকা টান খেল। আজমত দু’হাতে অনিকের বাম হাত ধরে এক টানে ওকে নিয়ে পড়লো ফুটপাতের উপর। নিচে আজমত তার উপর অনিক। ঠিক গুনে গুনে সাত আট সেকেণ্ড। পিছন থেকে এক মিনিবাস এসে ঝপাত করে আছড়ে পড়লো অনিকদের কারের উপর। ইণ্ডিকেটর, ব্রেকলাইট, বাম্পার ছাতু ছাতু।
অনিক কিছু আঁচ করার আগেই, বোধ হয় ছিচকেচোর ভেবেÑ আমাকে চিনিস? চোরের বাচ্চা চোর। দেখাচ্ছি মজা। অনিক উঠেই আজমতকে ধাপাধাপ কিল-ঘুষি আর কেডস পরা পায়ে লাথি দিতে শুরু করে।
অনিকের বাবা-মা বিস্তর মালামাল হাতে গাড়ির কাছেই চলে এসেছিল। ঘটনার ক্ষিপ্রতায় তরা হতভম্ব! কি হলো? কি হলো?

অনিককে দমাবার প্রাণপণ চেষ্টা করে। অনিক স্টপ ইট। দাঁড়াও...।
আজমত অন্যের জান বাঁচাতে যেয়ে নিজেন জান নিয়ে টানাটানি। সে বুঝে উঠতে পারে না এখন সে কী করবে। কোনমতে উঠে ভিড়ের ভিতর পালিয়ে যায়। অনিকের বাবা পিছন থেকে ডাকে, এই ছেলে দাঁড়াও...। শুনে যাও...।
কিন্তু ততক্ষণে আজমত ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
এ যাত্রা মল্ল যুদ্ধ হলো বটে, ফলাফল শুন্য। দেখা যাক পরবর্তি যুদ্ধে কে যেতে কে হারে।

সেরাতে আজমত দেরিতে বাড়ি ফিরলে মা জিজ্ঞাসা করে, এত দেরি ক্যা? ওমা সব্বনাসের কতা, তর মাতায় ব্যান্ডেজ ক্যা? হাতেও ব্যান্ডেজ! কার লগে মারামারি করছস? কাটলো ক্যামনে, কস না ক্যা? নাকি গাড়ির লগে ধাক্কা খাইচস? কী হইলো আমার বাজানের? হায় আল্লাহ্ অহন কী হইবো? বিলাপ করে কাঁদে তার মা।
মায়ের মন দুঃচিন্তায় অস্থির। আজমত মাকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা খোঁজে। এদিক ওদিক তাকায়, আবার চোখ বোঁজে, মাথা নিচু করে থাকে। অনিচ্ছা সত্বেও মিথ্যো বলে, কী আর হইবো, বাসের লগে দৌড়াইতে গিয়া উসটা খাইছি। বেশি লাগে নাই, এট্টু ব্যাতা পাইছি। তুই চিন্তা করস ক্যা, লগে লগে সাইরা যাইবো।
হ সাইরা যাইবো। তর আর বাসে বাসে কাগজ দিতে হইবো না। হতাশাগ্রস্ত মা ছেলের মুখে তাকিয়ে আদরের আবদার করে।
ছেলের উৎকণ্ঠা মেশানো পশ্ন, বাসে কাগজ দিমু না তয় চুরি করুম..., পকেট মারুম...?
রাতে আজমত জ্বরে ভাজতে থাকে। মায়ের মনে সে উত্তাপ সঞ্চারিত হয় দ্বিগুন বেগে। মা-বেটা কেউ চোখের পাতা এক করতে পারে না। মার কোলের ভিতর আজমত কুঁকুঁ করে, উসখুস করে...। গোসা হয়...। চোখের পাতা ভিজে যায়Ñ তোমারে বাঁচাইতে গেলাম, উল্ডা আমারে মারলা। যদি কোনদিন বড় হইবার পারি জিগামু আমারে মারছিলা ক্যা? তোমাগো গাড়ির পিছনে পিছনে দৌড়াই বইলা...? আমাগো গায়ে ছেঁড়া জমা বইলা ?
পরদিন সকালে নিকটস্ত ‘বুয়া নিচ্ছি বুয়া দিচ্ছি’ প্রতিষ্ঠান থেকে লোক আসে। তার মাকে আগারগাঁও এক বিদেশ ফিরতা বড়লোকের বাড়ি ঈদের কয়টা দিন কাজ করার নির্দেশ দেয়। নাহলে বুয়াগিড়ি ছুটে যাবে। হনুফা অসুস্থ্য ছেলেকে ফেলে কাজে চলে যায়।
কাল ঈদ। আজমত গায়ে প্রচণ্ড ব্যাথা জ্বর নিয়ে বিছানা থেকে উঠে। জমনো টাকার মাটির ব্যাংক ঠাস করে ভাঙে। গুনে গুনে সাতশ তিহাত্তর টাকা। তাই নিয়ে গুলিস্থান যায়। তার ইচ্ছা মাকে ঈদে একটা শাড়ি কিনে দেবে। ফুটপাথ থেকে সাড়ে তিনশ টাকায় মার জন্যে একটা প্রিন্টের শাড়ি, একশ টাকায় একটা প্লাস্টিকের সেন্ডল কেনে। নিজের জন্যে দেড়শ টাকায় একটা নীল সার্ট আর পঞ্চাশ টাকায় একটা স্পঞ্জের চপ্পল কেনে।
রাত্রে হনুফা বাসায় ফিরে দেখে আজমত জ্বরে কাতরাচ্ছে। মা টিফিন ক্যারিয়ারে আনা ভাত ছেলেকে খাওয়ায়। বলে, ম্যামসাবে খুব ভালা। দু’শ ট্যাকা দিছে। বাপরে তোমারে একটা শার্ট কিন্না দিবার শখ আছিল, লও যাই, মিরপুর দশ লম্বরে। কাল ঈদ অহনই যাই।
মা, আমারে কিছু দেওন লাগবো না। আমি কিন্না ফালাইছি। আর এই দেহ তোমার লাইগ্গা কী আনছি।
মা শাড়ি দেখে খুশিতে চোখ চকচক করে আর এক অনাগত ভবিষ্যতের দিকে চিন্তার জাল বিস্তার করে এবং অজানা এক আস্থার ভিতের উপর নিজেকে আবিস্কার করে। ছেলেকে বলে, বাজান আমার বাইচা থাহ।
ঈদের দিন মা ছেলেকে সকালে ডেকে তোলে, বাজানরে যাও বল সাবান দিয়া গোসল দিয়া ঈদের মাঠে যাইয়া নামাজ পইরা আহ। আমি সেমাই আর খিচুরি পাকাইয়া রাখছি, খাইবা। রাতে সাহেবগো বাড়ি খাওন আছে। বিরাট খাওন। সাহেবের ছেলে কি জানি কয়, এক্সিডেন হইতে অয় নাই, বাইচা গেছে, হ্যার জন্যে বড় একটা কাঙাল ভোজ দিব। আমি গেলাম গা। দুপরে রহিমা খালাগো বাত্তে খাইয়ো। ঠিক ঠিক সন্ধ্যাবেলা সাবগো বাড়ি জলদি আইসা পইরো। মন খারাপ কইরো না।
আজমত সারাদিন টো টো করে এদিক ওদিক ঘোরে। আইসক্রীম কিনে খায়। বিকালে সনি হলে ম্যাটিনি শো মারে। বলতে গেলে সারাদিনই না খাওয়া। সন্ধ্যায় সাহেবদের বাড়ি যায় কাঙাল ভোজে।
বিরাট প্যান্ডেলে আলোক সজ্জার বাহার আর খাওয়ার বিশাল আয়োজন দেখে আজমতের মন খুশিতে ভোরে উঠে। মনে মনে ভাবে অনেকদিন পর আজ ভাল-মন্দ খাব। সে মাকে দেখে প্লেট-বাটি ধোয়ায় ব্যস্ত।
মা ছেলেকে দেখে বলে, বাজান আইচো। মুখ শুকনা ক্যা? হারাদিন কিছু খাও নাই? রহিমা খালাগো বাত্তে যাও নাই? যাওগ্গা, বইয়া পড়, খুব ভালা খাওন, প্যাট ভইরা খাইয়ো।
অনিক খেতে বসেছে। পাতে পোলাও, খাসির রেজালা, কলিজা দিয়ে মুগের ডাল। গন্ধে মুখে পানি এসে যায়। সে ভাবে, আজ এমুন খাওন খামু...। আজমত ভাত মুখে দিতে যাবে ঠিক তখন দেখে তার মত নীল শার্ট গায়ে একটি ছেলে হাসি মুখে সবার ছবি তুলছে। আজমত নিজের শার্টের দিকে তাকায়, কত কী ভাবে; একই রং, তয় মনেলয় পার্থক্য দামে। আমারটা দ্যাড়শ, হেরটা দ্যাড়হাজার ট্যাকা হইবো। হঠাৎ তার ভাবনার মোড় ঘুরে যায়। উঠে দাঁড়ায়। আরে এইডা তো সেই শয়তান পুলা! যারে ভালবুইঝা জান বাঁচাইলাম উল্ডা আমারে মারলো। দূর হালার খাওনের গুষ্টি কিলাই। তগো খাওন খামু না। এমুন খাওন কত পামু।
খাওয়া ফেলে নতুন জামায় হাত মুচতে মুচতে প্যাণ্ডেল ছেড়ে চলে যেতে থাকে। সাথে সাথে বিষটি অনিকের নজরে আসে। অনিক তাকে চিনে ফেলেছে। সে তার পিছু নেয়, বলে এই ছেলে দাঁড়াও।
আজমত দাঁড়ায় না। আলো-আঁধারিতে হনহন করে চলে যেতে থাকে। অনিক হাপাতে থাকে, এই ছেলে দাঁড়াও, যেওনা। কথা শুনে যাও।
আজমত কোন কথাই শোনে না। দাঁড়ায় না। এ গলি ও গলি করতে থাকে। অনিক দ্রুত হাঁটে কিন্তু নাগাল পায় না।
প্লিজ, যেওনা, দাঁড়াও কথা আছে।
আজমতের মনে গোসা ফেপে উঠে, তর লগে কিয়ের কথা? এ্যাঁ? কিয়ের কথা?
অনিক দমবার পাত্র নয়, দাঁড়াও বন্ধু, দাঁড়াও।
আজমতের মনের ভিতর বাজতে থাকে, কিয়ের দুস্ত? জান বাচাইছিলাম তয় কিছু খাওয়াইয়া, ট্যাকা-টুকা দিয়া ঋণ শোধাইবি? পারবি? পারবি শোধাইতে? তুই আমারে মারলি? হারামী কোনহানকার। মারলি ক্যা? এ্যা? মারলি ক্যা? আজমতের চোখে পানি এসে যায়।
অনিক দমবার পাত্র নয়। রুদ্ধ শ্বাসে দৌড়ায়, দাঁড়াও ভাই, দাঁড়াও। এক মিনিট কথা শুনে যাও। আমার ভুল হয়েছে ক্ষমা করে দাও...।
তাতে আজমতের দিলে অভিমান বেশি করে দানা বেঁধে উঠে। তার মান আজ আর কেউ ভাঙাতে পারবে না। সে প্রাণপণ ছোটে। ভাবেÑ দৌড়াইয়া আমারে হারাইতে পারবি? ওই হালার পুত? পারবি?
অনিক কখনও হারেনি। আজ হারবে? হ্যাঁ, এ যুদ্ধে আজ আর তার জেতা হলো না। সে ব্রিজ স্থাপনের ওকুল আর খুজে পায় না। হতাশা নিয়ে চিৎকার করে, বন্ধু... এ যুদ্ধে তোমারই জয় হোক...। পূর্ণ হোক তোমার মন। শুধু শুনে রাখ আজ ঈদের দিন!

আজমত বাসের পিছে দৌড়ানো ছেলে। তাকে তেড়ে ধরবে অনিক? তাহলে তার জন্মাবোধি দৌড়ানোর ¯^ার্থকতা থাকলো কোথায়? সে অনিকের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে আসে বস্তিতে।
রাতে মাকে বলে, মনটা কেমুন করতাছে। কয়ডা দিন দাউদকান্দি ছোড খালাগো বাত্তে ব্যাড়াইয়া আহি?
ঈদের চার দিন পর বিমান বন্দরের লাউঞ্জে অনিকরা সবাই বসে অপেক্ষা করছে আমেরিকা ফিরে যাওয়ার জন্যে। অনিকের সামনে বড় একটা গ্রæপ ছবি। ছবির ঠিক মাঝে নীল রঙের শার্ট গায়ে একটি ছেলে। সবাই হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়ে।
অনিকের মা রেগে প্রশ্ন করেন, কিরে তোর হয়েছেটা কী? ক’দিন থেকে তুই এইসব ফকির-মিসকিনদের ছবি নিয়ে ঘুরছিস? শোয়া খাওয়া বেড়ানো সবখানে?
অনিক মন মরা। নিরুত্তর। মনে মনে বলে, মা তোমরা বুঝবে না এই নীল শার্টঅলা আমায় কী দিয়েছে..., কী শিখিয়েছে...। ও আমার জীবনের সবচেয়ে বড়...। বোধ হয় আমাদের মাঝে বড় এক বিভেদ। কিন্তু একদিন সেতু বন্ধন ...।
আজমত ছোটখালার বাড়িতে গিয়েও মন টেকে না। সারাক্ষণ মনের ভিতর একটা অপরাধবোধ কাজ করে। সে কী যেন একটা ভুল করেছে। ঈদের দিন সেই রাতের কথা সে কিছুতেই মন থেকে এড়াতে পারছে না।
কী সন্দর খাওন ফালাইয়া আইলাম। পুলাডা দুস্ত কইলো, ভাই কইলো, মাপ চাইলো, কী জানি কইবার চাইলো; তাও হ্যার কতা শুনলাম না। মনেলয় হুনাই ভাল আছিল। কী সন্দর চ্যাহারা আর কী বড় লোকের পুলা! আমরিকা থাহে, কান্দা-কান্দা গলায় আমারে দুস্ত কইলো...। ভাই কইলো...। ঈদের দিন মানসের লগে কাইজ্জা করণ ঠিক হইলো না...।
মন টেকাতে না পেরে চার দিনের মাথায় আজমত আগারগাঁও বস্তিতে ফিরে আসে। সারাদিন মায়ের জন্যে ছটফট করে কখন মা আসবে। রাতে মা এলে জিজ্ঞাসা করে, কাল আমি তুমার লগে হেই আমরিকান বড়লোকগো বাত্তে যামু। হেই পুলার লগে দেহা করুম।
কস কী বাজান হেরা তো আজগা আমরিকান চইল্লা গেছে।
রাতে আজমতের ঘুম আসে না, যা অইছিল অইছিল, আমার পিছন পিছন আইলা ক্যা? ডাকলা ক্যা? আমারে দুস্ত বানাইলা ক্যা? অহন আমি তোমারে কই খুঁজুম, দুস্ত...? দু’চোখে পানির দু’টো ধারা বয়ে যায়। রাস্তায় উচা উচা উড়াল সেতু দিয়া কত্ত তারাতারি মানুষ কই যায়গা...। উড়াল দেতু দিয়া আমিও তুমারে খুঁইজা...।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement