লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ আগস্ট ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ২টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঈদ (আগস্ট ২০১৩)

ভুলি নাই
ঈদ

সংখ্যা

নাসরীন

comment ০  favorite ০  import_contacts ৪০৬
২০০৩ সালের কথা।
বি কম ফাইনাল পরীক্ষা সামনে। রমজান মাস।
আমরা চার ভাইবোন। ভাইয়া পড়াশোনা শেষ করে চাকরির চেষ্টা করছে, বাকি তিন ভাইবোন কেউ স্কুলে, কেউ কলেজে পড়ি। বাবা র একার আয়ের সংসার, ঈদে সবাই কে সব কিনে দিতে পারেন না, কেউ জুতা পেল তো জামা পেল না, জামা পেল তো পাঞ্জাবি পেল না, এই অবস্থা। ছোটকাল থেকে আম্মু র কাছ থেকে দারিদ্রতা কে উপেক্ষা করতে শিখেছি, শিখেছি কি ভাবে মিথ্যে চাকচিক্য আর পোশাকিআনাকে পাশ কাটিয়ে চলতে হয়। তাই ঈদে প্রতিবেশিদের দামী দামী কাপড়চোপড় আর তার চেয়ে দামী হাবভাব দেখে ও নিজের মলিনতা নিয়ে কখনো হীনমন্যতায় ভুগিনি। আমার মা জমিদার বাপের আদরের ছোট মেয়ে হয়ে যদি মলিন শাড়ি তে ঈদ করতে পারে, আমরা আর কি।
তো, ভাইয়া চাকরির চেষ্টা করছে, হচ্ছি হব করে শেষ মুহুরতে কেন যেন চাকরি আর হয় না। আব্বু পরিচিত দের সাধ্যমত বলে রেখেছেন ভাইয়ার জন্য। কোন লাভ হয় না। মুখে বলে “ ভাইজান, আপনার ছেলে মানে তো আমার ই ছেলে, ওর চাকরি হবে না ? “
কাজের কাজ কিছুই হয় না। ভাইয়া গিয়ে অফিসে অফিসে ঘণ্টা র পর ঘণ্টা বসে থাকে, কোথায় খাওয়া, কোথায় কি, দিন শেষে ফিরে আসে উদ্ভ্রান্ত, বিপর্যস্ত, হতাশ হয়ে। আব্বু জায়নামাজ আর তসবি নিয়ে বসে থাকেন, ভাইয়ার চেহারা দেখে যা বোঝার বুঝে নেন। আব্বু সারাজীবন এক কথা র মানুষ, কাউকে কথা দিলে জান দিয়ে হলে ও রাখার চেষ্টা করেন। কাউকে এমন কোন কথা দেন না যা রাখতে পারবেন না। আর ভাবেন সবাই তার মতন, জীবনটাকে সরল রেখার মত চালিয়েছেন, সরল চোখে দেখেছেন। এখন আশে পাশের মানুষদের জটিলতা আর ভণ্ডামো দেখে মানতে পারছেন না। খালি বলেন- আমি তো কারো সাথে হিপক্রাসি করি নাই, মানুষে কেন করবে। চিন্তায়, টেনশনে আব্বুর মুখ শুকিয়ে যায়। আমার খুব মায়া হয় জানালার পাশে নীরবে বসে থাকা বাবার আশাহত চেহারা দেখে, মায়া হয় অন্ধকারে মশার ঝাঁকের মধ্যে বিছানায় শুয়ে থাকা ভাইয়ার মিছেমিছি ঘুমের ভান দেখে।
তখন আমাদের ল্যান্ড ফোন বা মোবাইল কোনটাই ছিল না। তৃতীয় কি চতুর্থ রমজান এর কথা।
আব্বুর ডিউটি ইফতার এর পর। তো আব্বু অফিসে, আমরা ভাইবোন রা বাসায়। রাত আট টা কি নয় টা। উপর তলায় বাড়িওয়ালা খালাম্মা হন্ত দন্ত হয়ে আমাদের বাসায় এসে জানালেন- আব্বু অফিসে স্ট্রোক করেছেন, উনাকে সেন্টার পয়েন্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আম্মু হতভম্বের মত কথাগুলো শুনলেন, মাথার আকাশ মাথায় ভেঙ্গে পড়লে যা হয়। আমরা দুই বোন চেচিয়ে কেঁদে উঠলাম । ভাইয়া শান্ত ভাবে আম্মু কে জড়িয়ে ধরল, বলল ঘরে টাকা পয়সা যা আছে সব নিয়ে নিতে, আমি কাঁদতে কাঁদতে আম্মুর ব্যাগ গুছিয়ে দিলাম, হাসপাতালে কত দিন থাকতে হয় কে জানে।
ভাইয়া ব্যাগ আর টুকটাক দরকারি জিনিষ পত্র নিয়ে এক রিকশায়, আমি আম্মু কে নিয়ে আরেক রিকশায় উঠলাম। সাড়া রাস্তা নিঃশব্দে অশ্রুপাত করতে করতে গেলাম।

ততক্ষনে আব্বুর শরীর আরো Fall করেছে, মেডিকেল এ নিয়ে আসা হয়েছে উন্নততর চিকিৎসার জন্য। আই সি ইউ র সামনে কলিগ দের জটলা। আম্মু কে দেখে সবাই এগিয়ে এলেন। কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেউ বা সাহস। কিন্তু আমি জানি আমার মা কত টা শক্ত মনের মানুষ। এসব কোনটাই উনার দরকার নাই। আই সি ইউ র কাচের দেয়ালে মুখ লাগিয়ে দেখলাম আব্বু র সারা শরীর যন্ত্র পাতিতে ঢাকা, ইলেকট্রিকের শক এর ধাক্কায় কেঁপে কেঁপে উঠছেন, আব্বুর দুই পা চেপে ধরে থাকা আমার মামাতো ভাই ( ডাক্তার ) এর গ্লাভস পরা হাত আব্বুর শরীর থেকে বের হওয়া বর্জ্যে মাখামাখি।
বেশীক্ষণ এই কষ্টকর দৃশ্য সইবার মানসিকতা আমার ছিল না। আম্মু কে নিয়ে সরে আসলাম দূরে।
একটু পর এলেন আব্বু র অফিসের বস , উনার ছেলেমেয়ে সবার দীর্ঘকালিন গৃহশিক্ষক ছিলেন আব্বু। তাই অফিসিয়াল সম্পর্কের বাইরের আনঅফিসিয়াল সম্পর্ক টা আরও গভীর ছিল। উনি আম্মুর কাছে এসে বেশ মোটা একটা খাম ধরিয়ে দিলেন,বল্লেন – ওর চিকিৎসার যাবতীয় দায় দায়িত্ব আমার। এ নিয়ে যেন কোন অবহেলা না হয়। এর পর অফিসের ম্যানেজার কে ডেকে বলে দিলেন- সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানের জন্য।
শুরু হল আম্মু র যুদ্ধ। আমাদের যুদ্ধ।
রমজান মাস, কোথায় সেহরি, কোথায় ইফতার। চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে আমরা রোযা রাখছিলাম। আম্মু হাসপাতালে আব্বু র সাথে, ভাইয়া বাসা হাসপাতাল এ আসা যাওয়া।
সেই দিন গুলি তে দেখেছিলাম অজাত শত্রু মানুষ কাকে বলে। অত্যন্ত সাধাসিধে মানুষ বলে আব্বু র কোন শত্রু ছিল না। যে নয়দিন আম্মু আব্বু কে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন কিছু কিনে খেতে হয় নি, মুহূর্তের জন্য একা থাকতে হয়নি। উল্টো গাদা গাদা ফলমূল , হরলিক্স, দামী দামী বিস্কিটের টিন ভাইয়া কে দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন।
নয়দিন পর আব্বু কে বাসায় নিয়ে আসা হল।
আম্মু অলিখিত আইন জারি করলেন- আমরা কেউ যেন হল্লা না করি, আব্বু র সামনে অহেতুক কথা বার্তা না বলি, ভাইয়ে বোন এ ঝগড়া না করি।
আব্বুর কথা বার্তা বলা বারন, সারাদিন জানালার ধারে বসে থাকেন বোবার মত, চোখে ভরসাহারা চাউনি। আম্মু পাশে বসে ফিসফিস করে বলেন- কোন চিন্তা না করতে, সংসার যেমন চলছিল তেমন ই চলছে। চিকিৎসার কোন ব্যাঘাত হবে না। আব্বু একদিন ঈদ নিয়ে কথা তুলতে আম্মু শান্তস্বরে বললেন – এইবার কেউ কিছু কিনবে না। ছেলেমেয়েদের এই শিক্ষা আছে। আল্লাহ ভরসা।
সেবার ঈদে আমরা কেউ নতুন জামা পাই নাই, পোলাও জরদা সেমাই খাই নাই, নতুন জামা না পেয়ে কারো বাসায় বেরাতে ও যাই নাই। সব ভাই বোন রা আব্বু র পাশে বসে খুনসুটি করে কাটিয়ে দিলাম অবিস্মরণীয় একটা ঈদ।
এখন ভাই বোনরা সবাই যার যার জায়গায় সুপ্রতিষ্ঠিত। সবাই ঈদে অনেক কিছু কিনি, নিজের জন্য, ভাইবোন দের জন্য, আব্বু আম্মু র জন্য। কত কিছু রান্না ও করি। কিন্তু সেই ২০০৩ এর আনন্দ বেদনা মিশ্রিত ঈদের মত কোনটাই হয় না।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement