লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৭৬
গল্প/কবিতা: ৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমা (মে ২০১৭)

শূন্যে যাত্রা
মা

সংখ্যা

মোঃ কবির হোসেন

comment ১  favorite ০  import_contacts ১৯৬
গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে গরুটাকে পেটায় সেকান্দার। স্বযত্নে বানানো মোটা বেতের লাঠি থেতলে গেছে তারপরও থামেনা। এই যুগেও কলের লাঙ্গল চালানোর সামর্থ তার নেই। সম্বল শুধু দু’টো গরু তাও একটি আধমরা। অন্যদিকে ছেলেটা আজ বড্ড দেরী করছে ক্ষেতে ভাত নিয়ে আসতে। সারা সকালের ক্ষুধা নিয়ে পথের দিকে তাকায়- ভাত না আসতে দেখে ছেলের উপর রাগ ওঠে। তার ওপর আধমরা গরুটা হালে হাঁটতে চায়না। তাইতো অনেকণ ধরে গরুটাকে পিটিয়ে নিজেই দুর্বল হয়ে পরে সেকান্দার। রৌদ্রের মাঝে ক্ষেতের আলে বসে আধমরা গরুটার মতই জোরে জোরে শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছে সেকান্দার। কিছুক্ষণ পরেই দেখলো তার ছেলে মানিক আসছে ভাত দিয়ে। সেকান্দার দূর থেকে চেচিয়ে ওঠে-
’দুহার অইয়া গ্যাছে এ্যাহোন্ ভাত লইয়া আইছো। আয়, আইজগো তোর একদিন কি আমার একদিন।’
বাবার রাগ দেখে মানিক ভাত মাথায় আর পানির জগ হাতে থমকে দাঁড়ায়। বাবা আবার চেঁচিয়ে ওঠে-
’হারামজাদায় আবার খারাইয়া রইছে। এইয়া গায় শয় কেউর? তড়াতড়ি আয় কইলোম নাইলে তোরেও গরুডার মোতন পিডামু। ভাল থাকতে আয়।’
কথাগুলো বলতে বলতে সেকান্দার বেতের লাঠিটা নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। মানিক প্রথমে এক পা দু পা সামনে আগিয়ে বাবার মন মেজাজ খারাপ দেখে ক্ষেতের আলের পাশে সবকিছু রেখে দ্রুত দৌড়ে চলে যায়। অগত্যা সেকান্দার ভাতের বাটি নিয়ে খেতে বসে। ঢাকনা খুলে দেখে অল্প কয়টা পান্তা ভাত, পাশে ডালের ভর্তা আর দুটো পোড়া মরিচ। মুহূর্তের মধ্যে সেকান্দারের ভাত খাওয়া শেষ। পেটটা একটু ঠান্ডা হলো মাথাটাও ঠান্ডা হলো। আস্তে আস্তে সেকান্দার ক্ষেতের দিকে যায়। যে গরুটাকে এতক্ষণ ইচ্ছে মত পেটালো সেটার গায়ে হাত বুলিয়ে বলে-
’আমারে তুই মাপ কইর্‌রা দিস। হেই বেইন্‌না কাল অইতে কিচ্ছুই খাই নাই।’
ঘরে ফিরলেও সেকান্দারের শান্তি নেই। ছেলে-মেয়ের স্কুলের বেতন, চাল নেই, লবন নেই আরো কত কি। সংসারে শুধু নেই নেই শুনলে সেকান্দারের মাথাসহ সমস্ত দুনিয়া ঘুরতে থাকে। অন্যদিকে আশি বছরের বৃদ্ধা মা। নানা অসুখ বিসুখে জর্জরিত। দুবেলা ভাত জোটানো যেখানে সম্ভব নয় সেখানে তার মার অষুধ জুটবে কোত্থেকে। তাইতো তার মন মেজাজ সবসময় খারাপ থাকে। কথায় কথায় বউ এর গায়ে হাত তোলে। ছেলে-মেয়েকে মারে।
বিকেল বেলা সেকান্দার গরু দুটো নিয়ে বেড়িয়ে পরে ঘাস খাওয়ানোর জন্য। ঘরের পাশে নদীর পাড়ে যায়। সেখানে বসে বিশাল নদীর দিকে অপলক চেয়ে থাকে। নদীটার প্রতিও তার ক্ষোভ। কারণ এই রাক্ষুসে নদীই তাকে পথে বসিয়েছে।
এক সময় সেকান্দারের বিশাল সহায় সম্পত্তি ছিল। এলাকার অনেক লোক যারা এখন প্রতিষ্ঠিত তারা অনেকেই সেকান্দারের বাসায় কাজ করতো। একমুঠো চাল, দু’মুঠো ভাতের জন্য তার বাড়িতে ভীড় করতো। এখন সবই স্বপ্ন। সেকান্দারের সমস্ত সম্পত্তি ভাঙতে ভাঙতে নদীটা তার ঘরের একেবারেই কাছে এসে পড়েছে। মনের মধ্যে সারাক্ষণ ভয় কখন জানি বাড়িটা নদীর মধ্যে পড়ে যায়।
যে কিঞ্চিৎ জমি অবশিষ্ট আছে তাতে ফসল ফলিয়ে খরচা উঠেনা। তারপর গেলো বছর ক্ষেতে ধান হয়নি। পুড়ে গেছে। গ্রামের অনেক লোক, এনজিও ও ব্যাংকের কাছে পাহাড় সমান ঋণ। দিন দিন ঋণের বোঝা বাড়তেই থাকে। আর থাকে সীমাহীন অন্ধকার।
এক বর্ষার বিকেলে ঘরে রাগারাগি করে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ায় সেকান্দার। কয়েক বেলা ধরে চুলোয় আগুন জ্বলে না। কারো কাছে দুমুঠো চালের জন্য হাত পাতবে তারও জায়গা নেহ। ঘরে ফিরে সন্ধ্যাবেলা সেকান্দার তার বৌয়ের সাথে পরামর্শ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার। কিন্তু কোথায় যাবে, কোথায় গিয়ে তাদের কপালে দু’মুঠো ভাত জুটবে তার কোন উত্তর জানা নেই। সেকান্দারের বৌয়ের মনে সারাক্ষণ ভয়। না খেলেও এই ঘর, এই মাটি ছেড়ে কোথায় যাবে তারা।
পরের দিন সকালে সেকান্দার হালের গরু দু’টো হাঁটে নিয়ে বিক্রি করে দিল। আর বাজার থেকে মাংশ, পোলাও এর চাল, মা, বৌ, ছেলে-মেয়ের জন্য নতুন কাপড় কিনে বাড়ি ফিরলো। ছেলে-মেয়েরা বেজায় খুশী অনেক দিন পরে পোলাও মাংশ খাবে তাই। এতকিছু দেখে বৌয়ের মনে শান্তি নেই। খুব অস্থিরতা নিয়ে সেকান্দারকে জিজ্ঞেস করে- ’কই যাইবেন আপ্‌নে’
সেকান্দারের কাছে এ প্রশ্লের জবাব নেই। শুধু রাগের মাথায় বৌকে চুপ করতে বলে বেড়িয়ে যায়। একটা ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করে। আজ মধ্যরাতে তারা পাড়ি জমাবে কোন অজানার উদ্দেশ্যে।
অনেক দিন পরে সবাই মিলে পেট ভরে ভাল খাবার খেলো। সেকান্দার বৌকে বলে সবকিছু গুছিয়ে নিতে। বৌ সবকিছু গুছাতে থাকে আবার হঠাৎ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে। এক ফাঁকে সেকান্দার মা’র কাছে যায়। মা’র পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলে-
’মা তোমার লগে কত্ত অন্যায় করছি তুমি আমারে মাপ কইররা দিও।’
মা জড় শরীরটা নিয়ে উঠে বসে। বলে-
’তোর কি অইছে। এইরোহম কতা কইলে তো আমার খারাপ লাগে। তোর পোলাপান লইয়া তুই খাইতে পাওনা তার উপর আমার খাওন আমার ওষুধ। তোরে আমি কত কষ্ট দেই। তয় আমি মা কইলাম-তোরে আল্লায় সুখে রাখপে।’
সেকান্দার আর কোন কথা না বাড়িয়ে মাকে ঘুমোতে বলে। হয়ত কোন এক সময়ে বৃদ্ধা মা ঘুমিয়ে পড়েছেন। নৌকা এসে ঘাটে ভীড়েছে। মাঝি সেকান্দারের নাম ধরে ডাক দেয়। সবাই মিলে মালামাল নৌকায় তোলে। সবশেষে সেকান্দার সবাইকে নৌকায় উঠতে বলে। সেকান্দারের বৌয়ের বুকের ভেতর কেঁপে কেঁপে ওঠে। সেকান্দারকে বলে-
’আমার শ্বাশুড়ীতো এ্যাহোনো ঘুমায়। হ্যারে উডান।’
সেকান্দার বৌকে চাপা কন্ঠে একটা ধমক দেয়। বৌ কান্না জড়িত কন্ঠে বলে-
’মানিকের বাপ, আপ্‌নে এইডা কী করছেন। আমি আমার শ্বাশুড়ীরে রাইখ্যা কোনোহানে যামুনা। আপনের পায় পড়ি হ্যারে আপনি লইয়া লন্।’
সেকান্দার টেনে হিচড়ে তার বৌকে নিয়ে নৌকায় ওঠে। অন্ধকার রাত। সন্ধ্যা থেকে টিপ টিপ বৃষ্টি ঝরছে। নৌকায় উঠে সেকান্দার মাঝিকে বলে-
’এইবার নৌকা ছাড়ো মাঝি।’
ঝাপসা অন্ধকারের মাঝে নৌকা থেকে সবাই তাদের ছোট পুরানো বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে। নদীর বড় বড় ঢেউ এসে বাড়ির ভিটির সাথে ধাক্কা লাগে। মনে হয় ঘরটা এখনই বিলিন হয়ে যাবে ঢেউয়ের সাথে। তারপর ধীরে ধীরে নৌকাটা চলে যায় দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে কোন এক দূর অজানায়। রয়ে যায় নদীর ঢেউয়ের মাথায় দোল খাওয়া একটা জীর্ণ কুটির আর বয়সের ভাড়ে অচল একাকী মা।

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন