লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৪ অক্টোবর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঈদ (আগস্ট ২০১৩)

ঈদের নতুন জামা
ঈদ

সংখ্যা

মো. রহমত উল্লাহ্

comment ০  favorite ০  import_contacts ১,৫১৭
‘কী মাহির, কাল বিকেলে খেলতে এলে না যে ? নাসিফের প্রশ্নের জবাবে মাহির মাথা নেড়ে নেড়ে একগাল হাসি দিয়ে বলে ‘হু ,হু ,হু ! কাল নরসিংদী গিয়েছিলাম । ঈদের জামা কিনতে । দারুণ শার্ট -প্যান্ট কিনেছি । মোবাইল প্যান্ট , শাহরূখ খান শার্ট । প্রজাপতির মত রং । আব্বু আগেই বলেছিলেন , দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় এক/ দুই/ তিন হতে পারলে , আমি যেমন চাই তেমন জামা-ই কিনে দেবেন। দেখিস ঈদের দিন । কী সুন্দর !’ ‘কত দিয়ে কিনলে ?’ অত্যন্ত আগ্রহ করে জানতে চায় রাফি । হেড স্যারের মত মুড নিয়ে জবাব দেয় মাহির-‘জী- না। দাম বলা যাবে না। কখনোই না।’ গুরু গম্ভীর ভঙ্গীতে মুখ খুলে ফাহিম -‘যা, দাম বলার দরকার নেই। আমারা এর চেয়ে সুন্দর জামা কিনবো দেখিস। ঢাকা থেকে কিনে আনবো। দুইটা প্যান্ট , দুইটা শার্ট কিনবো ।’ আরো জোরে বলে উঠলো রাফি ‘আমি কিনবো বিদেশি প্যান্ট -গের্ঞ্জি। জুতাও কিনবো বিদেশি।’ নাসিফ বললো -‘ঈদে আবার এসব কিনবো কেন ? আমি কিনবো পায়জামা, পাঞ্জাবি আর টুপি।’ এরা যখন এমনি বাহাদুরি প্রকাশের প্রতিযোগিতায় আর নতুন জামা কেনার আনন্দে উদ্বেলিত ; হানিফ তখন মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে বেরিয়ে যায় আড্ডা থেকে। কচ্ছপ গতিতে চলে যায় বাড়ির দিকে। খুব মনোযোগ দিয়ে বিষয়টি লক্ষ করে মাহির। গত দিনও খেলা শুরুর আগে ঈদের জামা কেনা নিয়ে যখন কথা হচ্ছিল, তখন পেঁচা মুখ করে অন্যদিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসেছিল হানিফ। অথচ অন্যসব আড্ডায় হানিফ-ই কৌতুক করে সবচেয়ে বেশি। অবিকল পারে -শেয়ালের হুক্কা হুয়া, পায়রার বাকবাকুম, শিশুদের ওয়াঁ ওয়াঁ। হাসির কথায় জুড়ি নেই তার। মাহির জানে হানিফের কষ্টটা কোথায়। তার জামা কেনা হবে না ঈদে। অন্যের বাড়িতে কাজ করেন বাবা। মানুষের কাঁথা সেলাই করেন মা। মাহিরদের কাজও করেন প্রয়োজনে। তাদের সঙ্গেই স্কুলে পড়তো হানিফ। মাথায় যেমন বুদ্ধি, গায়ে তেমন শক্তি। চাম্পাকলার মত হাতের আঙুল। মোটা মোটা টাক্নু। বড় কচ্চপের পিঠের মত ভরাট বুক। খাটোই বলা চলে বয়সের তুলনায়। গুরু গম্ভীর চেহারা। খরগোসের কানের মত খাড়া খাড়া কান। কুচকুচে কালো ঘন মোটা চুল। লালচে চোখ। উজ্জল তামাটে গায়ের রং। দেখতে অভাবি ঘরের মনেহয় না মোটেও। ভালো পারে বলেই তাকে খেলায় নেয় সমবয়সীরা। খেতেও পারে বেশ। সবচেয়ে ভাল পারে দাড়িয়াবাঁধা খেলা। মারবেল খেলার সময়ও মনে হয়, হাত তার পাকা শিকারীর বন্দুক। হাডুডু, ফুটবল, গোল্লাছুট, এককাছা, কানামাছি, ইত্যাদি সবুজ পাহাড় এলাকার এক কালের জনপ্রিয় খেলাতো এখন আর নেই বললেই চলে। ইদানিং সারাদিন শুধু ক্রিকেট খেলা ! ঈদের আগে আর একদিনও ক্রিকেট খেলতে আসেনি হানিফ। তার অভাবে প্রতিদিনই হেরেছে মাহিরের দল। ছোট বেলা থেকেই ঘনিষ্ঠতা দু’জনের। সব সময় এক পক্ষে খেলে। বোলিং এ সেরা হানিফ। ব্যাটিং এ সেরা মাহির।


চতুর্দিকে বিস্তীর্ণ সবুজ ধান ক্ষেত। মাঝখানে লাল মাটির টিলা। যেন সযত্নে বিছিয়ে রাখা হয়েছে বাংলাদেশের লাল - সবুজ পতাকা ! এই টিলা হচ্ছে ঈদের চাঁদ দেখার সবচেয়ে উপযোগী স্থান। এখানে দাঁড়ালে অনেক দূর পর্যন্ত চোখ যায় পশ্চিমের আকাশে। পূর্ব পুরুষেরাও চাঁদ দেখতেন এ টিলায় দাঁড়িয়ে। ফলে এর নাম হয়েছে চাঁদেরটিলা। বাবা বলেছেন- ‘অনেক বড় ছিল এই লাল মাটির টিলা। বর্ষার পানি আর কৃষকের কোদালের আঘাতে অর্ধেকও নেই এখন। একদিন হয়ত থাকবেই আর’। প্রতিবারের মত এবারও ফাহিম, রাফি, মাহির, ও নাফিস জমা হয়েছে চাঁদেরটিলায়। সবাই সূর্যাস্তের অপেক্ষায়। মনে হয় খেলার দিনের মত দ্রুত হচ্ছে না সন্ধ্যা। যেন পশ্চিম আকাশে গিয়ে কোথাও ঠেকে আছে লাল সূর্য। চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ। মজার খাবার খাবে। নতুন জামা পরবে। ঈদগাহে যাবে দল বেঁধে। কোলা কোলি করবে সবাই। এক সঙ্গে পড়বে ঈদের নামাজ। বেড়াতে যাবে পরস্পরের বাড়িতে। প্রীতি ফুটবল খেলবে বিকেল বেলায়। সন্ধায় যোগ দিবে ঈদপূর্ণমিলনী অনুষ্ঠানে। রাত করে বাড়ি ফিরলেও বকা দিবেন না মা-বাবা। বলবেন না লেখাপড়ায় বসতে। টিভিতে দেখবে ঈদের অনুষ্ঠান। এসব পরিকল্পনা করতে করতে চিৎকার করে উঠলো নাফিস-‘ ঈদের চাঁদ, ঈদের চাঁদ ! ঐ দেখো ঈদের চাঁদ !’ হৈ হৈ করে নেচে উঠলো সবাই। ‘ঈদের চাঁদ, ঈদের চাঁদ, স্বাগতম, স্বাগতম ।’ পাশের বাগে দাঁড়িয়ে বোবার মত তাকিয়ে আছে হানিফ। তার কাছে মিথ্যে মনে হচ্ছে স্কুলের সেই পড়াটি-‘ঈদ অর্থ আনন্দ’। কেউই দেখতে পায়নি তাকে। এত আনন্দের মাঝেও মাহির অনুভব করলো হানিফের অভাব।



পরদিন পুরাতন জামা পরেই ঈদের নামাজে মাঠে হাজির হল মাহির। সবাই অপেক্ষা করছিল তার জন্য। ‘কী, এই তোর নতুন জামা ? খুবতো চাপা মারলি এ কয়দিন। এখন সেই নতুন জামা কোথায় ? এতো সুন্দর শার্ট -প্যান্ট, আবার নরসিংদী চলে গেল না কি ? কিনেছিলে আসলে ? দেখেই চলে এসেছিলে বুঝি ? বন্ধুদের এত সব প্রশ্নে কিছুটা বিবর্ণ মাহির। হয়ত লজ্জিত হয়েছে নিজের অজান্তেই। চুপচাপ কিছুক্ষণ। আবারও বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগলো সবাই। শান্ত গলায় বললো মাহির- ‘অপেক্ষা কর, নতুন জামা আসবে।’ এবার মুখ খুললো রাফি- ‘তোর জামার আবার হাত- পা আছে না কি ? পাখা থাকলে তো আরো ভালো, তুইও উড়তে পারবি আকাশে।’ হা হা ... করে হাসতে লাগলো সবাই। কিছু না বুঝেই হানিফ দৌড়ে এসে অংশ নিলো হাসিতে। বললো- ‘দেখতো, আমারে কেমন লাগে মাহিরের নতুন জামায় ? মাহির আমাকে দিয়েছে এটি। আমি ফিরিয়ে দিয়ে ছিলাম রাতেই। সকালে দিয়ে এসেছে আবার। আমি না নিলে ঈদগাহেই আসতো না মাহির।’ সবাই চোখ ফিরালো হানিফের দিকে। মনে মনে বললো- ‘বাহ্ ! দারূণ সুন্দর তো !’ হানিফ যে এত সুন্দর, কোনদিন তা খেয়াল করেনি কেউ। আরো বেশি অবাক হয় মাহির ! দুই দুইবার পরেছিল সে এই জামাটি। কেনার সময় দোকানে একবার। বাড়িতে এসে মা কে দেখানোর জন্য আরেকবার। দুইবারই দাঁড়িয়েছিল আয়নার সামনে। অনেক ক্ষণ ঘুরে ফিরে দেখেছে নিজেকে। খুলতে ইচ্ছে করছিল না গা থেকে। সুন্দর লাগছিল খুব। অথচ এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে হানিফকে ! আরো বেশি সুন্দর লাগছে হানিফের তৃপ্তিভরা মুখের হাসি। ‘কী, কেমন দেখছিস তোরা আমার ঈদের জামা ?’ প্রশ্ন করলো মাহির। কথা বললো না কেউ। লজ্জিত হল সবাই ! পরাজিত হলো মাহিরের কাছে। নিজের জামা উপহার দিয়ে গর্বিত হলো মাহির। অন্য ঈদের চেয়ে অনেক বেশি ঈদময় মনে হলো
এবারের ঈদ ! //

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement