আমরা মহান বিজয় দিবস উৎযাপন করি প্রতি বছর। কিন্তু স্বাধীনতার সুফল বা বিজয় এখনো আমরা লাভ করতে পারিনি। আমরা এখনো কুসংস্কার, কুশিক্ষা অপরাজনীতি, থেকে মুক্ত হতে পারিনি। বিজয় দিবস তখনই স্বাথক হবে যখন আমরা এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্ত হতে পারব।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৭৮
গল্প/কবিতা: ৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবিজয় দিবস (ডিসেম্বর ২০১৮)

শ্যামলা মেয়ে
বিজয় দিবস

সংখ্যা

কিশোর কারোনিক

comment ০  favorite ০  import_contacts ১০
নাম চাঁদনী। কিন্তু চেহারায় নামের সাথে মিল নেই। মা-বাবা চিন্তিত তাদের মেয়েকে নিয়ে। পাত্রপক্ষরা মেয়েকে পছন্দ করছে না। একের পর এক পাত্রপক্ষ ভালমন্দ খাওয়া দাওয়া করে, মেয়ে দেখে, মেয়ের হাতে একশো টাকার নোট দিয়ে বলে, “বাড়ি গিয়ে খবর দেবো।” কিন্তু খবর আর দেয় না। এভাবে ১০/১২ জায়গা থেকে পাত্রপক্ষরা এসে ঘুরে গেছে।
চাঁদনীর মনটা খুব খারাপ। মাঝেমধ্যে ওর ইচ্ছা করে, এ জীবনে আর বিয়েই করবে না। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তবুও কিছু স্বপ্ন ওকে আনন্দ দেয়। স্বামী হবে, সংসার হবে; যে সংসারে চাঁদনীই কত্রী হবে। সন্তান হবে, সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবে। ওর জীবনের সমস্ত ঘটনা ওদের বলবে । কিন্তু স্বপ্ন কি ওর পূরণ হবে?
এই তো সেদিন পাশের বাড়ির ময়নার বিয়ে হয়ে গেল। ময়না বয়সে চাঁদনীর অনেক ছোট। দেখতে একটু ভাল ছিল। কিন্তু গুণ বলতে মাকাল ফল। যে ওর স্বামী হয়েছে তার সাথে বনিবনা হচ্ছে না। আর বনিবনা হবেই বা কী করে, ময়না যে মুখরা, ভদ্র সমাজে তা বলবার না।
কিন্তু চাঁদনীর গুণের শেষ নেই। এই মহল্লার কোনো মানুষ যদি চাঁদনীর সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করতে যায়, তবে তার বুক কেঁপে উঠবে। আর সেই মেয়েকেই কেউ পছন্দ করছে না। এই দুঃখের কথা কাউকে বলা যায়? মনের কথা মনের মানুষকেই বলা যায়। বাইরের রূপ মাধুর্যই কি সব? প্রচলিত একটা কথায় চাঁদনীর আরো বেশি মন খারাপ করে দেয়। কথাটা এমন “আগে দর্শনধারী তারপর গুণবিচারী” এ কেমন কথা! যদি বাজার থেকে সোনা ভেবে তামা কিনে তার গুণ বিচার করতে যায়, তবে তার ফলাফল কী হবে? তামার গুণ তামাই হবে। দুদিনেই রং উঠে আসল রং ধারণ করবে।
চাঁদনী অবসরের সময়টুকু বই পড়ে কাটায়। বই পড়ে জ্ঞান সঞ্চয় হয়েছে। মনের অনুভ’তি তীক্ষè হয়েছে। সমরেশ মজুমদার এর কালবেলা উপন্যাস পড়ে শেষ করেছে আজ বিকেলে। উপন্যাসটি পুরুস্কারপ্রাপ্ত। কিন্তু কালবেলার ভেতর এমন কোন বিশেষত্ব নেইম, যে কালবেলা উপন্যাসকে পুরুস্কার দেওয়া যায়। উপন্যাসের নায়ককে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নায়ক জানে নায়িকা মাধবীলতা তার প্রতি দুর্বল। নায়ক অনিমেষ ভাবে তার প্রেমিকা মাধবীলতার জন্য কিছু একটা করার দরকার। কিন্তু পুরুষ মানুষ হিসেবে এক নারীকে তার যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে মাধবীলতাকে কাছে টানবার কিচুই সে করে নি। অনেক কথা জমেছে চাঁদনীর মনে। কিছু দিন থেকে পুরুষ মানুষ সম্পর্কে কেমন ঘৃণা জমতে সাহায্য করছে; ও যে বইগুলো পড়ছ্ েসেই বইগুলোর সরল রেখার হরফগুলো।
বিয়ে হচ্ছে না বলে বাড়ির অনেকে কটু কথা বলে। চাঁদনী যেন ওদের মাথায় বোঝা হয়ে আছে। মাথা থেকে নামাতে পারলেই বাঁচে।
আজ সকালে চাঁদনীর ছোট ভাই রমেনের সাথে চাঁদনীর বেশ কথা কাটাকাটি হয়েছে, সামান্য একটা বিষয়কে কেন্দ্র করে। টেলিভিশনে ধারাবাহিক নাটক হচ্ছে। চাঁদনী বিছানার ওপর বসে নাটক দেখছে। নাটকটি চাঁদনীর মনে ধরেছে। সপ্তাহে একদিন হয়। বিদ্যুৎ যদি থাকে চাঁদনী নাটক দেখবেই। এমনি সময় রমেন ঘরে ঢুকে টিভির চ্যানেল চেঞ্জ করে ক্রিকেট খেলা দেখতে লাগল।
চাঁদনী বলল, “এটা কী হলো, রমেন?”
রমেন কিছু বলল না। চাঁদনী আবার বলল, “নাটকটি আর বিশ মিনিটের মতো হবে, নাটকটি হয়ে গেলে তারপর খেলা দেখিস।”
রমেন বলল, “আমি খেলা দেখব।”
একটু উত্তেজিত স্বরে চাঁদনী বলল, “তোকে খেলা দেখতে মানা করছি? নাটকটা হয়ে গেলে দেখ।”
“না, এখন ক্রিকেট খেলা হবে।”
চাঁদনীর রাগ হয়ে গেল। বিছানা থেকে টিভির রিমোটের ডিজিট চেঞ্জ করল। রমেন ক্ষিপ্ত হয়ে জোর করে টিভির রিমোট কেড়ে নিতে গেল। চাঁদনী বাঁধা দিল। রমেনের রাগ যেন বাড়ল। ও জোর করেই রিমোট নেবার জন্য চেষ্টা করতে লাগল। আর চাঁদনী ততই বাধা দিতে থাকল, এক পর্যায়ে রমেন বলল, “ছুড়ির বিয়ে হলে আমি দশ টাকার ছিন্নি করব।”
চাঁদনী রাগতস্বরে বলল, “আমার বিয়ে হোক আর না হোক তোর কী?”
“তোর বিয়ে হয়ে তো আমরা বাঁচি।”
“কেন তোর ঘারে চড়ে বসেছি আমি?”
“আর কতকাল খাবি, তোর জন্যই তো মা চিন্তা করে অসুখ বাঁধিয়েছে।”
“তুই আমাকে খাওয়ার খোঁটা দিচ্ছিস? আমি তোরটা খাই? যত দিন ইচ্ছা আমি এই বাড়িতে থাকব।”
“এখানে থাকবি না তো কোথায় যাবি? তোর কি যাবার জায়গা আছে?”
চাঁদনী এক চড় মেরে দেয় রমেনের গালে। চাঁদনী কাঁপছে, রমেন চাঁদনীকে ধাক্কা দিল। চাঁদনী ভারসাম্য ঠেকাতে না পেরে পড়ে গেল, ড্রেসিং টেবিলের এক কোনায় লেগে পিঠে বেশ আঘাত পেল। রমেন চ্যানেল চেঞ্জ করে বিছানায় বসে খেলা দেখতে লাগল।
চাঁদনী রমেনের এমন ব্যবহার কষ্ট পেল। কেউ ওকে বুঝতে চায় না। ওর চাওয়া পাওয়া ইচ্ছা কিছুই যেন থাকতে পারে না। গায়ের জোরের কাছে সব কিছুই যেন চলে যায়।
চাঁদনী আস্তে উঠল। উঠে পাশের ঘরে ঢুকে বালিশে মুখ গুঁজে বিছানার ওপর শুয়ে পড়ল। অঝরধারা কান্না চাঁদনীর চোখ দুটো থেকে বেয়ে অশ্রু হয়ে পড়তে লাগল। মাঝেমধ্যে বাবা-মা ওকে উপেক্ষার চোখে দেখে। শুধু বিয়ে না হবার জন্যে। বিয়েই কি সব কিছু? একটা ছেলে যদি বিয়ে না করে থাকতে পারে, তবে মেয়ে পারবে না কেন? শুয়ে ভাবছে আর অঝরে চোখ বেয়ে জল বের হচ্ছে।

চাঁদনী আয়নাতে সহ¯্রবার ওর চেহারা দেখছে, কিন্তু নিজের কাছেই ওর চেহারা ভাল লাগে না। নিজের কাছেই যা ভাল লাগে না তা অন্যের কাছে ভাল লাগবে কী করে। পূর্বে কী পাপ যে করেছি! ভাবে আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়্।ে বিবেকানন্দের একটা কথা ওর মনে পড়ল। “পূর্বজন্মের পাপ বলে যদি কিছু থেকে থাকে তবে এই শরীরটা সেই পাপ।”
একদিন আত্মহত্যা করতে ওর ইচ্ছা হয়েছিল, কিন্তু চাঁদনী তা করবে না। চাঁদনী উপলব্ধি করতে চায় পৃথিবীর রূপরস। কে অবহেলা করল, আর কে যতœ করল তা বড় বিষয় নয়; বড় বিষয় জীবনের নিয়মকে মেনে চলা।
আগামী সোমবার লোক আসবে চাঁদনীকে দেখতে। যদি মেয়ে দেখে পছন্দ হয় টাকা পয়সায় বাধবে না। চাঁদনীর মা বাবা জানে মেয়ে পাত্রপক্ষের পছন্দ হবে না। শুধু শুধু টাকা পয়সার খরচ। একবার চাঁদনীর বাবা ভেবেছিল না করে দিই। কিন্তু আবার ভাবল সবার পছন্দ তো এক রকম না। যদি পছন্দ হয়েই যায়। উপার্জন করে যে টাকা জমিয়েছে, চাঁদনীর বাবার বিশ্বাস ঐ টাকায় চাঁদনী বিয়ে হয়ে যাবে। বর্তমান রেওয়াজ হয়ে গেছে, যে ছেলে বিয়েতে মেয়ের বাবার কাছ থেকে যত বেশি টাকা নিতে পারবে। সে ছেলের দাম সমাজে তত বেশি। আর মেয়ে অর্থ্যাৎ বউটা দেখতে সুন্দরী অথবা যদি চাকরিজীবি মেয়ে হয় তবে তো কথাই নেই।
সোমবার পাত্র পক্ষরা এল চাদনীকে দেখতে। পাত্র নিজেও এসেছে। ঘরটা সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে চাদনী নিজেই। নতুন আত্বীয়দের ঘরে বসতে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে জল খাবার দেওয়া হয়েছে। দুইটা করে সিংগারা, একটা রাজভোগ, একটা কালোজাম, একটা ছানার জিলাপী, একটা কেক, একটা লাড্ডু, আটটা পিরিচে সাজিয়ে ট্রেতে করে চাদনীর মা ঘরে ঢুকে টি টেবিলের উপর রাখল। আত্বীয়রা জল খাবার আপ্যায়নে খুশি হলো।
চাঁদনীকে নিয়ে বাড়ির অন্যান্যরা পাত্রপক্ষ বসা ঘরে প্রবেশ করে চাঁদনীকে একটা চেয়ারে বসালো। চাদনী মুখটা নিচু করে আছে। অভিমানে মুখটা উচু করতে চাচ্ছে না । এক মুখ আর কতজনকে দেখাবে!
চাঁদনীর নাম ঠিকানা লিখতে বলল পাত্রপক্ষ ভেতর থেকে একজন। চাঁদনী ভাবল, আমি কি অশিক্ষিত যে ঠিকানা লিখতে পারব না। তবু ফর্মালিটি বজায় রাখতে নাম ঠিকানা লিখে দিল। অনেক প্রশ্ন করল পাত্রপক্ষরা, চাঁদনী ওর সাধ্যমত উওর দিল। একজন বলল, বৌদির মাথার চুল কত বড়?
চাঁদনীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা শাড়ির আচল সরিয়ে দেখাল, লোকগুলো খুশি হল। বয়স্ক একজন বলল, ‘মা তুমি এখানে একটু হাটোতো । পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা চাঁদনীকে দাঁড়াতে সাহায্য করল। চাঁদনী গুটি গুটি পা ফেলে কিছুদূর হাটল । আর একজন বলল, ‘মা তুমি এবার বস।”
চাঁদনী চেয়ালে বসল। পাত্র ইশারা করে দেখাল মেয়েটির মুখ উচু করে দিতে। চাঁদনীর পাশে থাকা মহিলা চাঁদনীর মুখ উঁচু করে দিল। চাঁদনীর মুখ নিচের পানে। মুখ উচুঁ করার সময় চোখের পাতা মেলে পাত্র দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু কোনজন বুঝতে পারল না। চোখের পাতা নিচু করে নিল। পাত্রপক্ষ থেকে ইশারার করে জানাল মেয়েকে নিয়ে যেতে পারেন। মহিলাটি চাঁদনীকে নিয়ে পাশের ঘরে প্রবেশ করল।
দুপুরের খাওয়া দাওয়া হয়ে গেল নতুন আতœীয়দের । চাঁদনী মুখ ভার করে বিছানায় বসে আছে। মেয়ে দেখতে আসা আতœীয়রা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করছে। পাত্রপক্ষরা ইঙ্গিত পেয়েছে এই মেয়েকে বিয়ে করলে টাকা পয়সা ভালই পাওয়া যাবে। দেখতে খারাপ তাতে কী হয়েছে! সংসারের কাজকর্ম করতে পারলেই হল। গায়ের রংটা তো সব কিছু নয়। নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে চাঁদনীর বাবাকে একজন জানিয়ে দিল, ‘‘মেয়ে আমাদের পছন্দ। আপনারা আমাদের বাড়িতে কবে আসবেন?”
চাঁদনীর বাবা হতবাক হল। আনন্দে চোখে জল এলো। রমেন চাঁদনীর ঘরে ঢুকে বলল, “দিদি তোকে ওরা পছন্দ করেছে।”
কথাটা শুনে চাঁদনী চমকে গেল। চাঁদনী নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না। কপালের পানে চোখ টেনে বলল, “কী বললি?”
রমেন হাস্যজ্বলে বলল, “ছেলেদের তোকে পছন্দ হয়েছে, এবার তোর বিয়ে হয়ে যাবে।”
রমেনের চোখেমুখে আনন্দ। রমেন ঘরে যেভাবে এসেছিল সেভাবেই চলে গেল।
চাঁদনী পড়ল বিপাকে। নিজেকে বুঝতে পারছে না। মনে প্রশ্ন জাগল ছেলের কেমন রুচি? যে ওর মতো কুৎসিত চেহারা মেয়েকে পছন্দ করল। নিশ্চয় ছেলেটি সুন্দরের পূজারী নয়। যে সুন্দর কিছু ভালবাসে না, তার সাথে এক ছাদের তলায় একসাথে সংসার করা যাবে কী করে? স্কুলে পড়ার সময় শুনেছে কত মেয়েকে কত ছেলে বলেছে, “আমার তোমাকে পছন্দ হয়।” কিন্তু চাঁদনীর পানে ফিরেও তাকাত না কেউ।
এই প্রথম একজন পুরুষ জানিয়েছে চাঁদনীকে তার পছন্দ হয়েছে। যে যেমন লোক সে তেমনই খোঁজে। উথাল পাতাল করে দিল চাঁদনীকে। পুরুষ জাতির উপর যে ঘৃণা জেগেছিল, চাঁদনীর মনে তা আরো বদ্ধমূল হল। চাঁদনী ভেবে শিহরিত হল, ছেলেটি হয়তো তাকে করুণা করছে। শুধু টাকা পয়সার জন্যই তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। মনে মনে কত কিছু ভাবে। হঠাৎ কী যেন ভেবে ছেলেকে লোক দিয়ে ওর ঘরে ডেকে চাঁদনী জানিয়ে দিল, ‘আপনাকে আমার পছন্দ হয়নি, আমি আজীবন কুমারী থাকতে চাই।”
ছেলে হতবাক হল চাঁদনীর কথায়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement