হাসপাতালের শয্যায় রোগীটি কাতরাচ্ছে। ডাক্তাররা সরাসরি বলে দিয়েছে, এখন অব্দি এ রোগের চিকিৎসা পৃথিবীর কোথাও নেই। এক চেনা ভাইরাস অজানা চেহারা ও কায়দায় মানবশরীরে ঢোকে। শরীরের কিছু অণুপরজীবির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে দেহের পুরো প্রতিরোধ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সুরক্ষা ব্যবস্থাটিই দখল করে নেয়। ‘এইচআইভি’ ভাইরাসের আধুনিক রূপ। এরপর শরীর আক্রান্ত হতে থাকে নানা রোগ, সংক্রমণে। …..রোগীটি শেষ সময়ের অপেক্ষায়, স্বজনগণ শেষ ভরসা সৃষ্টিকর্তার দিকে তাকিয়ে।
বন্ধুকে দেখে ঘরে ফিরে লেখক আনমনা হয়ে পড়ে। অলস দুপুর। একটা কাক ডাকছে কোথাও। তার ভাবনায় ঢুকে পড়ে কাকটি। যেন কোন এক অমোঘ শক্তিতে তাকে টেনে নিয়ে যায়। একটা ঘোর লাগা পরিস্থিতিতে লেখক চলে যায় এক স্বপ্নরাজ্যে।
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
কাকেরা সব আজ শহুরে বাবু। গ্রামে কোন কাক নেই। চাষ-বাস ভাল লাগে না তাদের। শহরের উচ্ছিষ্ট খাবারে মহা তৃপ্তি। সারা দিন হৈ চৈ….ডাস্টবিনের আবর্জনা নিয়ে টানাটানি। বিদ্যুতের তারে আসন ভাগাভাগি নিয়ে হুল্লোড়। মাঝে মাঝে ঘটে অঘটন। পুচ্ছ শর্টসার্কিটে জীবন ক্ষয়। বিদ্যুৎ বিভাগের উপর কাকীয় বিষোদগার। পাশাপাশি শহুরে রাজনীতিতে ভিলেজ পলিটিক্সের অভাবে মাঝে মাঝে বিষন্নতায় ভোগা। এসব নিয়ে নাগরিক কাক-জীবন।
ওদিকে গ্রামের শিয়ালেরা আছে জটিলতায়। গৃহস্থের খোয়াড় থেকে হাসটা মুরগীটা বর্গা নিয়ে কোন রকমে চলত তাদের। ‘উইথ-আউট রিটার্ন’ আজকাল কেউ কিছু করে না। মানুষও তাই এই একতরফা বর্গাচুক্তি মানল না। এখন ঘরে ঘরে পোল্ট্রি ফার্ম। তারের জাল আর লোহার দরজার কারাগারে থাকা মুরগীরা উল্টো শিয়ালদের আস্ফালন করে। ওরা যে শহরে চলে যাবে, সে উপায়ও নেই। শহরে মাটি নেই, সব কংক্রিটে মোড়া। গর্ত করবে কোথায়, থাকবে কীভাবে? যদিও শুনেছে কিছু সায়েব শিয়াল অট্টালিকা গর্তে কীভাবে যেন বহাল তবিয়তে আছে।
শহরের প্রান্তরেখায় মাঝে মাঝে যায় বুড়ো শেয়াল। গ্রাম আর শহরের সীমানাটা পরিষ্কার নয় তার কাছে। শুনেছে, এই পঁচা খালটা পর্যন্ত সিটি, নাকি মেট্রোপলিটন আভিজাত্যের রেখা। এমন না যে, ইউনিয়ন বা গ্রামের লুংগী পড়া মানুষ এই সীমানায় এসে প্যান্ট পড়ে শহরে ঢোকে। তবুও কাগজে-কলমে এই পর্যন্ত গ্রাম। উন্নত সড়ক, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এখানে এসে থমকে যায়। এ সীমানায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পোশাকের রং পাল্টায়।
শিয়ালেরা শহুরে ছাপওয়ালা জনগোষ্ঠির আশেপাশে খুব একটা আসে না। কাকেরা অবশ্য অতশত বোঝে না। ওরা শহরতলী ছাড়িয়ে মাঝে মাঝেই শিয়ালের সীমায় চলে যায়।
এমনই একদিনে বুড়ো শিয়ালের সাথে এক কাকের দেখা। টুকটাক কথা হয়।
- কী হালচাল, কাক ভাই? মুখে মাংস নাই। অভাব বুঝি শহরে খুব?
- আর মাংস! খাবারই জোটে না ঠিকমত! ডাস্টবিনের ময়লা ট্রাকে তোলার আগে অনেক ভাগীদার দাঁড়ায়। মানুষের সাথে কামড়া-কামড়িতে আমরা পারি? তাইতো ভাই এদিকে ঘুরি, খালের পাড়ে কোন পচা মাছ টাছ পাই কি না। তা তোমার ওদিকের কী অবস্থা? গ্রামে তো আর এত সমস্যা নাই।
-আমাদের অবস্থার কোন ব্যবস্থা নাই। চার/পাঁচ ঘর শেয়াল আছি আমাদের গ্রামে। পাশের গ্রামে আরেকটা বড় সমাজ আছে। খানা খাদ্যে টইটম্বুর, হাহ! রাতের শিয়াল ক্ষুধা পেটে দিনে-দুপুরে লোকালয়ে! বুঝতে কিছু বাকী থাকে বন্ধু?
- হুমম…অভাবী-অভাবীতে সন্ধি হয় না। তার উপর চালাকী করে কাকের মুখের মাংস তোমার ছিনিয়ে নেওয়ার কাহিনী লোকমুখে প্রচলিত। এই অবস্থায় তোমার প্রতি দয়া হলেও সমবেদনা আসে না বন্ধু। কাক ঠোঁট বাঁকায়।
- একদম ভুল বলনি বন্ধু। শঠতায় আমরা সেরা, বুদ্ধির জোরে টিকে থাকি। এ মুহুর্তে চরম অভাবে আছি ঠিক। তবে তোমার করুণা সমবেদনা কোনটাই চাই না। একটা উপকার করো- সায়েব শিয়ালদের একটা সন্দেশ পৌঁছে দাও।
কথা রাখে কাক। খবর পৌঁছে দেয়। পরদিন শহুরে আর গ্রাম শেয়ালের সভা হয়। কী শলা হল, খেঁকশিয়ালী ভাষায় কথাবার্তার আগা-মাথা ধরা গেল না।
কাকতালীয় কী না কে বলতে পারে। সিটি কর্তৃপক্ষ পরদিন থেকেই বেওয়ারিশ কুকুর নিধনে নামল। পাড়া মহল্লা শহরতলী থেকে সপ্তাহের মধ্যে সব কুকুর উধাও। বেশীরভাগ গেল কর্পোরেশনের ভাগাড়ে, লাশ হয়ে। বাকীরা জীবন বাঁচাতে পালাল শহর ছেড়ে। চটকদার বাড়িগুলোতে গলায় টাইয়ের মত করে বেল্ট ঝুলান কিছু বনেদী কুত্তাই শুধু থাকল।
কর্পোরেশনের কুকুর নিধন কর্ম সম্পন্ন, বাজেট খতম হল। দিন দু’য়েক পরেই শহরে কিছু নতুন অতিথি কুত্তা ঢুকল। কেমন যেন আড়ষ্ট চলাচল, চোর চোর ভাব। নিরীখ করে কাকের কেমন যেন সন্দেহ হয়। পুঁচকে টাইপ একটাকে টার্গেট করে। সন্তর্পনে লেজে দেয় এক রাম ঠোকর। ঘেউ ঘেউ এর বদলে কেমন এক ‘খ্যাঁক’ আওয়াজ করে ওঠে। এইটার ট্রেনিং ভাল হয় নাই- বুঝে ফেলে কাক। কুকুরের বেশে শিয়াল’রা সব শহরে! কাক তার ময়ুরপুচ্ছ লাগিয়ে জাতে ওঠার চেষ্টার কথা মনে করল। কিন্তু সেটা তো ছিল রূপমাধুরী অর্জনের মোহ মাত্র। এরা তো দেখি আটঘাট বেঁধে কোন কঠিন খেলায় নেমেছে!
পরের অবস্থা মনযোগ দিয়ে খেয়াল করল সে।। কুকুরবেশী শেয়ালেরা ভাগে ভাগে শহরে ছড়িয়ে পড়ল। ইন্টারভিউ দিয়ে কুকুরদের খালি পদগুলোতে চাকরি পেয়ে গেল। অবোধ শহুরে পুর-গৃহস্থরা পাহারার চাবি তুলে দিল জন্মতস্কর জাতটিকে। বেওয়ারিশ কুকুরগুলোর আধিপত্যের স্থান ফুটপাত আর সড়ক দখল করল বাকীরা। গভীর রাতে শহরকেন্দ্রে সমবেত ‘হুক্কা হুয়া’ তাল তুললেও কেউ টের পেল না। ইট পাথুরে মানুষ তো সেই কবেই শিয়ালের ডাক ভুলেছে।
আদিমকাল থেকে মানুষের সঙ্গী কাক এটা মেনে নিতে পারল না। প্ররোচনা আর দুষ্ট মন্ত্রণায় মানুষ তার পরীক্ষিত বন্ধুদের মেরে ফেলেছে, দূরে ঠেলে দিয়েছে। ধ্বংসের আলামত দিব্যচোখে দেখতে পেল সে। কা কা কা….করে মানুষের দ্বারে দ্বারে, জানালায় জানালায় সতর্কবাণী ছড়াতে থাকল। এবার কাকের অবাক হবার পালা! সুসংগঠিত পরিকল্পণা। অ-দিনে কোকিল ডেকে উঠল। সময় অসময় বাছ-বিচার করল না, চিন্তায় জড়ে পরিণত হওয়া মানুষ এটা ভেবেও দেখল না বর্ষায় কেন কোকিল সরব হল?
নীরব বন্ধুর চেয়ে সরব স্তুতিকারকদের জয়-জয়কার আজ। অল্পে তুষ্ট উপকারী কুকুরের চেয়ে মধুভাষী শৃগাল যেখানে আকাংখিত, কর্কশ কুচ্ছিত কাক কীভাবে পাত্তা পায় বনেদী গায়ক কোকিলকে ছাপিয়ে?
তাই কেউ শোনে না গুনহীন কাকের কথা। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। সুকণ্ঠী কোকিলের কুহু তানে বুঁদ মুগ্ধ মানুষ কাকের কর্কশ ‘কা কা’ কীভাবে গ্রাহ্য করে?
ধড়মড় করে সম্বিত ফেরে লেখকের। গলাটা শুকিয়ে এসেছে। বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গেল…বাড়ির সামনের পার্কের গাছগুলো কেমন যেন বিবর্ণ দেখাচ্ছে। লম্বা করে শ্বাস নিতে গেল। বাতাসে একটা ধোঁয়াটে গন্ধ! অশুভ চিন্তায় গা বেয়ে একটা চিকন ঘামের ধারা বইল।
০২ ফেব্রুয়ারী - ২০১১
গল্প/কবিতা:
২৩ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
আগামী সংখ্যার বিষয়
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ মার্চ,২০২৬