লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ ডিসেম্বর ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৫০টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাবা দিবস (জুন ২০১৩)

মাথার উপর ছাতাটা নেই
বাবা দিবস

সংখ্যা

তৌহিদ উল্লাহ শাকিল

comment ১  favorite ০  import_contacts ৪৬৫
বাবা হল মাথার উপর ছাতা।সে কথার মানে বুঝতাম না। যখন বুঝতে পারলাম তখন বাবা আর এই পৃথিবীতে নাই। আমি তখন এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরছি। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ঝরছিল সেদিন। ঘরে প্রবেশের পুর্বেই মায়ের চিৎকার শুনতে পেয়ে দৌড়ে ঘরে যাই। গিয়ে দেখি মা অঝোরে কাঁদছে বাবা তার পাশে বসে আছে নির্বাক হয়ে। আমায় দেখে বলল
-শাকিল তোর নানা মারা গেছে আজ সকালে , এই মাত্র তোর রুহুল মামা সাইকেলে এসে খবরটা দিয়ে গেল। আমরা এখনি তোর নানার বাড়ি যাব, তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম’।
আমি কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না, আমার নানা আমাকে বেশ আদর করত। তার একটি বিশেষ কারন আমি তার বংশের বড় নাতী বলে। হাতের ক্লিপ বোর্ডটা বিছানায় ফেলে রিক্সার জন্য ছূটলাম। বাবা আর আমি হেটে চলছি। আম্মু রিক্সায়। রাস্তা কাদা পানিতে একাকার। আর সেই কারনে আমাদেরকে হেটে চলতে হচ্ছে। বাবার হাতে ছাতা। তেরছাভাবে বৃষ্টি ঝরছে সেই কারনে ছাতায় কোন লাভ হচ্ছে না । একসময় লক্ষ্য করি বাবা নিজে বৃষ্টিতে ভিজে আমাকে ছাতার নিচে রাখছে। বাবাকে ছোট বেলা থেকেই বেশ ভয় পেতাম। সচরাচর তার সামনে আসতাম না। বাবা ব্যাঙ্ক থেকে বাড়ি আসার সময় আমার জন্য নিদেন পক্ষে একটি হলে ও খেলনা নিয়ে আসত। বাবা যেদিন বাড়ি আসত সেদিন বাড়ির পরিবেশ পাল্টে যেত। সেদিন ঘরে বিশেষ খাবার রান্না হত। মা বেশ সেজেগুজে থাকত, বাবা যে কোন একটা ফল নিয়েই আসত। আমাদের মাঝে তা নিয়েই কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। আমাদের বলতে আমার ছোট বোন আর ছোট ভাই। ছোট ভাই তখন বেশ ছোট । বাবা ছিল ক্রিকেটের দারুন ভক্ত। তিনি প্রায়ই আমাদের সাথে খেলতেন ছুটিতে এলে। তারপর বাবাকে বেশ ভয় পেতাম। বাবা যেদিন বাড়ি আসত সেদিন আমি দাদুর কাছে থাকতাম।
বৃষ্টির ঝাপটায় হাটতে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছিল। তারপর ও আমরা পাশাপাশি হাটছিলাম। বাবা কোন কথা বলছিল না। আমাদের সামান্য সামনের রিক্সা থেকে থেমে থেমে মায়ের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল কিছুক্ষন পরপর। একসময় আমরা নানা বাড়ি পৌছাই। আমাকে ধরে আমার খালারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। তাদের এবং আমার মায়ের কান্না দেখে আমার দুচোখের পানি বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারলাম না। সেদিন থেকে সবাই জেনে গেছে আমি শব্দ করে কাঁদতে পারি না। আমার কান্না এলে চোখ লাল হয়ে গিয়ে অজোরে অশ্রু বেরুতে থাকে। আর সেই কারনে কষ্টটা আমার বুকে বিঁধে থাকে বেশি ।
নানাকে কবর দিয়ে আমি আর বাবা আবার বাড়ির দিকে রওনা দেই। আম্মাকে রেখে আসি। আমরা আবার পরদিন খাবার নিয়ে আসতে হবে সেই কারনে বাড়ি ফিরি। আষাঢ়ের রাত বৃষ্টি থেমে গেছে অনেক আগেই। আকাশে একফালি চাঁদ চকচক করে জ্বলছে । সেই চাঁদের আলোতে একটি রিক্সায় বাবার পাশে বসি আমি। শুরু হয় বাবার কথা বলার পালা। যে বাবাকে সবসময় চুপচাপ থাকতে দেখি সেই বাবা অবলিলায় আমায় বলে যেতে থাকে তার ফেলে আসা শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলি। আমি মন্ত্র মুগ্ধের মত শুনতে থাকি সেসব কথা। কথায় কথায় একসময় বলতে থাকে তাকে স্কুলের কোন মেয়েটা পছন্দ করত, কার সাথে ঝগড়া হত। এখন অফিসে কোন বস তাকে ভালোবাসে, তিনি কোন কলিগকে ভালোবাসেন।
আমার কাছে বেশ ভালো লাগে। বাবার কথায় আমি অভিভূত হতে থাকি। সেদিন থেকে বাবার সাথে অন্যরকম একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়ে যায়। আগে বাবাকে দেখলে যে ভয়টা পেতাম সেটা কেটে যেতে থাকে । একসময় আমার সবচেয়ে কাছের এবং নির্ভরযোগ্য বন্ধু হয়ে উঠে বাবা। কলেজের লেখাপড়া আড্ডার বিষয় বস্তু বন্ধু বান্ধব সব ব্যাপারে নির্ধিদায় বাবার সাথে শেয়ার করতে থাকি। বাবা ও পুরো সপ্তাহ জুড়ে তার অফিসের খুঁটিনাটি আমাকে বলে যায়। বাবা যেদিন বাড়ি আসে সেদিন বাবাকে নিয়ে স্কুলের মাঠে ক্রিকেট খেলতে যাই। ক্রিকেট সম্পর্কে গ্রামে তখনো পুরো ধারনা হয়ে উঠেনি । বাবা সকলকে ক্রিকেট খেলা বুঝিয়ে দিতেন। নিজের টাকায় কেনা মালিক ব্র্যান্ডের একটি ক্রিকেট ব্যাট তিনি আমাকে কিনে দেন। আমাদের গ্রামে তখন সেটাই ছিল বাজার থেকে কেনা একমাত্র ক্রিকেট ব্যাট। বাবা আমাদের কে নিয়ে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন যার নাম ছিল সূর্য সেনা ক্লাব। উল্লেখ্য আমার বাবা একজন ভাল গোলকিপার ছিলেন। ৮৭-৮৮ মৌসুমে তিনি ঢাকার ক্লাবে খেলতেন। কানন, মহসিনের সাথে তোলা তার ছবি আজো আমার কাছে রক্ষিত আছে যত্ন সহকারে। বাবার চাকুরীতে প্রমোশন হয় মুলত ফুটবলার থাকার কারনেই। একসময় বাবা পুবালী ব্যাঙ্কে প্রধান হিসাব রক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। একসময় বদলী হয়ে আমাদের লাকসামে চলে আসেন।

ব্যাঙ্ক ইউনিয়ন নির্বাচন নিয়ে কি একটা সমস্যার কারনে বাবা চাকুরী ছেড়ে দেন। বাবা চাকুরী ছেড়ে দেওয়ার পর আমাদের পরিবারে বেশ কিছুদিন দুঃসময় যায়। বাবা শত কষ্টে ও আমাদেরকে কে কষ্ট পেতে দেননি। বাবা নিজে কষ্ট করেছেন কিন্তু আমাকে তার আঁচ পেতে দেননি।
এর কিছুদিন পর বাবা বাজারে ফোন ফ্যাক্সের একটি দোকান খুলেন । ধীরে আমাদের দুঃসময় চলে যায়। বাবা সব কিছু ঘুচিয়ে নিতে থাকেন । লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি ও বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য দোকানে বসতাম। বাবা জনকণ্ঠ পড়ত আমি প্রথম আলো । সেই কারনে দোকানে দুইটি পত্রিকা রাখত। বাবা আমাকে নিয়মিত পাক্ষিক ক্রীড়াজগত পত্রিকা কিনে দিত। আমি সেখানে কুইজে অংশ নিয়ে বেশ পুরুস্কার জিতি। এরপর একদিন মাঠে ময়দানে বিভাগে লেখা পাঠাই। সেই লেখা ছাপা হয়েছে দেখে বাবা যে কি রকম খুশি হয় তা ভাষায় ব্যাক্ত করার মত নয়।
কলেজের লেখাপড়া শেষে একসময় প্রবাসী আত্নিয়ের কল্যানে বিদেশ যাত্রার সুযোগ আসে। বাবা বলে
- দেশে থাকলে ও চাকুরি করবি বিদেশে গেলে ও করবি ,যাও একবার বিদেশ ঘুরে আস।
বিদেশ যাত্রার আগের রাত বাবার সাথে এক বিছানায় ঘুমাতে যাই। বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সেদিন ঘুমাই, বাবাকে ছেড়ে চলে যাব ভেবে বুকটা কেঁপে উঠছিল বারবার। বিমান বন্দরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে আবারো চোখের জল ফেললাম। বাবা কাঁদল মা কাঁদল বোন কাঁদল আমি শুধু কষ্টটা বুকে চেপে সৌদি এয়ার লাইন্সের বোয়িং সাতশ সাতে করে মদিনার উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। পেছনে পড়ে রইল আমার প্রানপ্রিয় বাবা এবং আমার পরিবার।
মদিনায় অবস্থানের দুই মাসের মাথায় একদিন বাবার মৃত্য সংবাদ শুনি মোবাইল ফোনে। কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছিল সেদিন । কেউ ছিল না আমাকে শান্তনা দেবার। চোখের জলে ভাসালাম নিজের বুক। মসজিদে নববীতে গিয়ে বাবার জন্য দোয়া করলাম, মহান আল্লাহপাক যেন উনার আত্নার মাগফেরাত দান করেন। বাবাকে হারিয়ে আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি। পুরো সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে যায়। সেই থেকে আজো প্রতিটি মুহর্তে বাবাকে মনে পড়ে, মনে হয় সব আছে কিন্তু তারপর ও দেখি আমার মাথার উপর ছাতা আজ আর নেই। এখনো অনেক সময় বাবার কথা মনে হলে চোখ লাল হয়ে যায় আর সেই সাথে বুকের কষ্টটা বেড়ে যায়। আর সেই সময় দু’চোখ গড়িয়ে চোখের জল ঝরে অজরে। বাবা আমি ও বাবা হতে চলেছি সেই ওপার থেকে তুমি আমায় দোয়া কর বাবা দোয়া কর।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement