লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৭ জুলাই ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ৭টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপূর্ণতা (আগস্ট ২০১৩)

অপূর্ণ স্বপ্ন
পূর্ণতা

সংখ্যা

মোট ভোট ১০

Sayed Iquram Shafi

comment ৫  favorite ০  import_contacts ১,০৩১
একসময় সব কিছু ছিল রহিমা জান বিবির। হাঁস-মুরগী, গরু-গোয়াল, চাষবাসে ভরা ছিল তার সংসার। সর্বনাশা পদ্মা নদী টাই সব শেষ করে দিল। নিজের জায়গা-জমি, সহায়-সম্বল হারিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হল তার স্বামী আবদুল মজিদ। অসুস্থ হয়ে বেচারা যে বিছানায় পড়ল আর সুস্থ হয়ে ফিরতে পারল না। একনাগাড়ে একমাস অসুস্থ অবস্থায় এই সুন্দর দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিল। স্বামী মারা যাবার পর আর কোনো সম্বল রইল রহিমা জানের। মা বেঁচে ছিল। মা চাইল তাকে আবার বিয়ে দিতে। রাজি হল না রহিমা জান। সে বলে আমি যদি আরেকজনের সংসারে যাই তাইলে আমার পোলাডা মানুষ হইব না। বৃদ্ধা মা তাকে বলে এই পোলারে লইয়া তর দিন যাইব নি। সামনে অনেক দিন পইরা রইছে। এই পিচ্ছি পোলারে লইয়া তুই কিভাবে দিন কাডাইবি? আমি তর মা কইতাছি আমাগো পাশের গাঁয়ের করিম বক্সের বউ মইরা গেছে। হে প্রস্তাব পাডাইছে। তুই রাজি হইয়া যা মা। রহিমা কিছুতেই রাজি হয় না। তার মনে শুধু ছেলের ভবিষ্যৎ চিন্তা। পোলাডারে মানুষ করতে হইব। তার বাপের অনেক স্বপ্ন আছিল। তার ছেলেকে লেখাপড়া শিখাইয়া বড় করব। তার স্বামী সেলিমের বাপের স্বপ্ন সে পুরণ করবে। কিন্তু রহিমা জানের কিছুই তো নাই। খাওনের ব্যবস্থা নাই। ঘর-ভিটা নাই। থাকে বাপের বাড়ির এক চিলতে ঘরে। গায়ে খাটা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নাই তার। শরীরে এখনও তাকৎ আছে। কাজ কইরা খাইতে পারবে। সিদ্ধান্ত নেয় সে কাজ করবে। মেয়ে মানুষের কাজ ত চাইলেই পাওয়া যায় না। কারো বাড়ির কাজ পাইলেই সে করবে। কাজ পাইলেই হইল। গাঁয়ের অবস্থাপন্ন আবুল খায়েরের পরিবারে কাজ নেয় সে। সে বাড়িতে কাজ করেই দিন কাটে রহিমা জানের। পুরাদস্তুর গৃহস্থ ঘরের বউ রহিমা জান এখন নেহায়েত পরের ঘরের একজন চাকরানী। একটা মাত্র ছেলের খাওয়া-পড়ার জোগাড় যে করতে হবে তাকে। সারাদিন গাঁধার খাটুনী খেটে ছেলেটার মুখে একমুটো ভাত তুলে দিলে পারলে মনটা শান্তি পায়। দিন যত যায় তত বড় হতে থাকে রহিমা জানের আদরের ছেলে সেলিম। মোঘল সম্রাট আকবরের এক ছেলের নাম ছিল সেলিম। তার নাম অনুসারে রহিমার স্বামী আবদুল মজিদ অনেক শখ-আহলাদ করে ছেলের নাম রাখছিল মোঃ সেলিম। আবদুল মজিদ তার ছেলেকে শাহজাদা সেলিম বলেই ডাকত। বড় আদরের ছিল ছেলেটা। ছেলেটাকে নিয়ে স্বামীর স্বপ্ন পুরণ করার জন্যই নিজেকে নিয়ে কিছুই ভাবে না রহিমা জান। সবাই বলে এই ভরা যৌবনে একটা ছেলে নিয়ে কিভাবে জীবন কাটাবে সে। মা ও আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেই দ্বিতীয় বিয়ের জন্য চাপ দিল। সে কিছুতেই রাজি হল না। রহিমা ভেবেছে সে যদি নিজের কথা ভাবে ছেলেটার ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার। ছেলে সেলিমকে মানুষ করার জন্য সবরকম ত্যাগ স্বীকারে সে প্রস্তুত। রহিমা জান ছেলে সেলিমকে স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করে দেয়। সেলিম নিয়মিত স্কুলে যায়। স্কুলে যাওয়ার জন্য তাকে তাগাদা দিতে হয় না। মা ভোর বেলায় উঠে ভাত রান্না করে কাজে চলে যায়। সেলিম ভাত খেয়ে স্কুলে চলে যায়। স্কুল থেকে এসে বিকালে মাঠে খেলাধুলা করে সন্ধ্যায় পড়তে বসে। বাড়িতে বিদ্যুৎ নাই। রাতে চেরাগ বাতি জ্বালিয়ে পড়তে বসে সেলিম। রহিমা জানের ভাগ্য ভাল আজকালকার ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করানোর জন্য কত কিছু করতে হয়। দামী পোশাক-আশাক, জুতো কিনতে হয়। অনেক টাকা খরচ করে নামি-দামী মাস্টার দিয়ে প্রাইভেট পড়াতে হয়। সেলিমের জন্য এসবের কিছুই করতে হয় না। লেখাপড়ার জন্য স্কুলের মাস্টাররাই সেলিমের ভরসা। স্কুলে যাওয়ার জন্য একটি মাত্র জামা আছে সেলিমের। অসীম দুঃখ-কষ্টের মধ্যে লেখাপড়া করতে হয় সেলিমকে। তবে সেলিম মেধাবী ও দেখতে খুবই সুন্দর এ জন্য স্কুলের স্যারেরা তাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। সেলিমের পড়নে ছেড়া স্যান্ডেল দেখে হেড স্যার নাসির উদ্দিন তাকে একজোড়া চামড়ার স্যান্ডেল কিনে দিয়েছিল। সেলিমের কি ভাগ্য! অনেক ছাত্র-ছাত্রীর বাবা-মা হেড স্যারকে টাকা-পয়সা দিয়ে খুশি রাখে। সেখানে হেড স্যার উল্টো সেলিমকেই স্যান্ডেল কিনে দিল। এদিকে আবুল খায়েরের বাড়ির কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠে রহিমা জান। শরীর আর মানতে চায় না। বয়স কম হল না। ৫০ পার হয়ে গেছে। রহিমা স্বপ্ন দেখতে থাকে এইত আর কইডা দিন। আমার সেলিম কলেজ থেইকা পাস দিয়া বাইর হইলেই একটা চাকরী হইব। হের চাকরী হইলে আমার আর কি চিন্তা। সেলিমকে সুন্দর দেইখা একটা বিয়া করাইয়া দিলে আমার কাম শেষ। স্বপ্ন দেখতে দেখতেই দিন গুণে রহিমা জান। সে ভাবতে থাকে কত না সুন্দর হইছে আমার সেলিম। তার জন্য মাইয়ার অভাব অইব না। পাশের গায়ের আবদুল করিম সেলিমের খোঁজ-খবর নিতে থাকে। তার নাকি একটা মেয়ে আছে। কলেজে পড়ে। আবদুল করিম এক সময় খুব গরীব ছিল। বিদেশে গিয়ে বেশ টাকা-পয়সা রোজগার করেছে। বিদেশ থেকে দেশে এসে এখন ব্যবসা করে। রহিমা জান পরের বাড়িতে কাজ করলেও সে গৃহস্থ ঘরের মেয়ে সেটা আবদুল করিম জানে। এ জন্য সে সরাসরি রহিমা জানের বাড়িতে যায়। সে বলে সেলিমের মা ছেলে তোমার বড় হইছে। তাকে বিয়ে দিতে হইব না? রহিমা জান বলে হ ভাই তা ত হইবই। কিন্তু আমার যে সহায়-সম্বল কিছুই নাই রে ভাই। পরের বাড়িতে কাম কইরা আমার দিন চলে। আমারে খিছুই কওন লাগব না। তোমার সব কিছুই আমি জানি আপা। তুমি জান আমার একটা মেয়ে আছে। মেয়েটা আমার খুব আদরের। এই মেয়ে হওনের পর আমি টাকা-পয়সার মুখ দেখছি। আমার মেয়ে রোখসানা বেগমের সাথে তোমার ছেলে সেলিমের বিয়ে দিতে চাই। তোমার ছেলেও শিক্ষিত আর আমার মেয়েও শিক্ষিত। ছেলে-মেয়ে দুইজনই মাশা আল্লাহ্ সুন্দর। তাদের দুই জনকে মানাইব ভালা। আল্লাহ্র রহমতে এখন আমার টাকা-পয়সার অভাব নাই। তোমার ছেলে চাইলে একটা চাকরীর ব্যবস্থা কইরা দিমুনে। চাকরী করতে না চাইলে ব্যবসা বা বিদেশ পাঠায়া দিমু। যদি তুমি রাজি থাক। রহিমা জান বলে আমার একটাই স্বপ্ন আমার ছেলেটা মানুষ হবে। গাঁধার মত খাইটা ছেলেডারে মানুষ করছি। ভাই আবদুল করিম তুমি যদি আমার ছেলেডার দায়িত্ব নেও আমার আপত্তি নাই। আবদুল করিম বলে আলহামদু লিল্লাহ্ আপা। সেলিম কখনো তার মায়ের অবাধ্য হয় নাই। মার হুকুমেই বিয়েতে রাজি হয়ে যায় সেলিম। ধুমধাম বাদ্য বাজিয়ে সেলিমের বিয়ে হয়ে যায়। ছেলের বিয়েতে রহিমা জানের কোন কষ্ট হয় নাই। বিয়ের সব খরচ দিয়েছে তার শশুর আবদুল করিম। রহিমা জানের হাতে ছিল স্বামীর দেয়া স্মৃতি একজোড়া সোনার কানফুল। সেটা পরম মমতায় ছেলের বউয়ের হাতে তুলে দেয় সে। বিয়ের পর কিছুদিন শশুরের ব্যবসা দেখাশুনা করে সেলিম। এরপর সৌদি আরব চলে যায়। সৌদি আরবে গিয়ে বেশ টাকা-পয়সা আয় করে সে। গাজীপুরে জায়গা কিনে একটা বাড়ি নির্মাণ করে। বাড়িটা দোতালা। সেলিমের শশুর আবদুল করিম লোকটা খারাপ না। তবে সেলিমের বউটা কেমন জানি দেমাগি। শাশুড়িকে পাত্তা দিতে চায় না। রহিমা জানের একটা মাত্র ছেলে। এ জন্য নতুন অবস্থায় আদর করে বউকে কোন কাজ করতে দিত না। পুরনো হওয়ার পরও বউ কোন কাজ হাতে নিতে চায় না। রান্না-বান্না থেকে শুরু করে সব কিছুই করতে হয় রহিমা জানকে। কিন্তু যত দিন যেতে থাকে বউয়ের ব্যবহার অসহ্য করে তুলে তাকে। বৃদ্ধা শাশুড়িকেই সারাদিন খাটাতে পারলেই যেন সেলিমের বউ শান্তি পায়। সেলিম বিদেশ থাকাতেই বউটা আরো বেশি প্রশ্রয় পায়া গেছে। একমাত্র ছেলের বউয়ের আচরণে মন খারাপ হয়ে যায় রহিমা জানের। সে বলে কি বউ মা আমি কি এই বয়সেও তোমারে রান্না কইরা খাওন লাগব নি। সেলিমের বউ বলে আমি রান্না জানি না। রহিমা জান বলে রান্না না জানলে একটা কাজের লোক রাখ। আমার শরীর যে আর মানে না। বউ বলে আপনি থাকতে আবার কাজের লোক ঠিক করতে হবে নাকি? রহিমা জান বলে আমি তোমাদের কাজের লোক? কাজের লোক মনে কইরাই কি আমারে রাত-দিন খাটাও? ঠিক আছে আমারে যখন কাজের লোক ভাব তাইলে আমি আর তোমাদের সংসারে থাকুম না। এ কথা বলেই ঘর থেকে বের হয়ে যায় রহিমা জান। সে ভেবেছিল বউ তাকে বাঁধা দেবে। বউ উল্টো বলে আপনি চলে গেলে আমি কি বাঁধা দিতে পারি? বউয়ের কথা শুনে মাথা ধরে যায় তার। সে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। ঢাকায় গিয়ে দূর সম্পর্কের এক বোন খতিজা বেগমের বাসায় আশ্রয় নেয় রহিমা জান। খতিজাও মেসে কাজ করে। সে নিজেও গরীব। দূর সম্পর্কের বোন খতিজা রহিমা জানকে কয়দিন খাওয়াবে। রহিমা জান বলে বোনরে আমারে একটা কাজ ঠিক কইরা দেও। খতিজা রহিমা জানকে একটা মেসে রান্না করার কাজ ঠিক করে দেয়। শরীর মানতে চায় না তবুও পেটের দায়ে রহিমা জানকে মেসে কাজ করতে হয়। মেস মেম্বাররা রহিমা জানকে জিজ্ঞেস করে বুয়া তোমার ছেলে-মেয়ে নাই? রহিমা জান মিথ্যা বলতে পারে না। সে বলে আমার একটা মাত্র পোলা। পোলাডা অনেক টেকার মালিক। ছেলের বউয়ের কারণে আমার অহনও কাম কইরা খাইতে হয়। রহিমা জানের কথা শুনে সবাই হাই-হুতাশ করতে থাকে। তারা বলে, আহারে দুনিয়াটা কত কঠিন। ছেলের অনেক টাকা। আর মাকে কিনা মেসে কাজ করে খেতে হয়। একদিন প্রচন্ড জ্বর হয় রহিমা জানের। কেঁপে-কেঁপে খতিজাকে বলে বইনরে আমার শরীরডা খুব খারাপ লাগতেছে। আমার মেসে খবর দেও আইজ আমি কামে যাইতে পারুম না। খতিজা বলে তোমার অত চিন্তা করতে হইব না। তুমি আগে সাইরা ওঠ। জ্বরের মধ্যে রহিমা জান কল্পনা করতে থাকে। আহারে কত সুখে আছিলাম আমি। সর্বনাশা পদ্মা আমার সব শেষ কইরা দিল। অসুখে পইরা স্বামীডা আমার দুনিয়া ছাইড়া গেল। পোলাডারে লইয়া কত স্বপ্ন আছিল। নিজের জীবন-যৌবন সব শেষ কইরা পোলাডালে মানুষ করলাম, লেখাপড়া শিখাইলাম। পোলাডার অনেক টেকা হইল। কিন্তু আমি যেহানে আছিলাম হেয়ানেই রইয়া গেলাম। অহন আমার আর স্বপ্ন নাই। শিক্ষিত মানুষ বলে স্বপ্নের রঙ নাকি রঙ্গীন হয়। আমার স্বপ্নের কোন রঙ নাই। আমি মন ভরে সুখের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু আমার স্বপ্ন গুলান রঙ্গীন না হইয়া অমাবশ্যার অন্ধকারের মত কালো হইয়া যায়। আমার আর সুখের স্বপ্ন দেইখা লাভ নাই। ঈমান নিয়ে দুনিয়া থাইকা বিদায় নিতে পারলেই বাঁচি। পোলাডার কথা বড় মনে পড়তাছে। সেলিমডা যদি আমারে দেখতে আইত। এসব ভাবতে-ভাবতে কেঁপে কেঁপে ঘুমিয়ে পড়ে রহিমা জান।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement