চাঁদপুর জেলার হাইমচর থানার নিভৃত নিরিবিলি নিভৃত পল্লী ওয়াসেকপুর। এখানে নেই কোনো যানবাহনের পি-পি আওয়াজ। এ গ্রামের সাধারণ বধূ খোদেজার কোল জুড়ে আসে এক কন্যা সন্তান। সন্তান জন্ম হলে আগেকার দিনে মানুষ ভাল মাওলানা এনে অর্থপূর্ণ আরবি নাম রাখতো। ইদানিং ব্যাপকভাবে বাংলা নামের প্রচলন শুরু হয়ে গেছে। বাংলা নাম রাখতে গিয়ে অনেকে জেনে কি-না জেনে দেব-দেবীর নামে ছেলে-মেয়েদের নাম রেখে ফেলছে। খোদেজার মেয়ের নাম রাখা হয় নাসরিন আক্তার। নাসরিন আক্তারের জন্ম হয়েছে বৃষ্টির দিনে। এই জন্য সবাই তাকে বৃষ্টি বলে ডাকতে শুরু করে। বৃষ্টি নামের আড়ালে তার আসল নামটি বলতে গেলে হারিয়ে যায়। বৃষ্টিও তার মায়ের মতো অনেক আদুড়ে। তার বাবাও তাকে খুব আদর করে। হাটি হাটি, পা-পা বেড়ে উঠতে থাকে বৃষ্টি। বাবা গ্রামের ¯^চ্ছল ব্যবসায়ী। পরিবারে অভাব বলতে নেই। বাবার আদর-¯েœহ, প্রশ্রয়ে বড় হয় বৃষ্টি। বাড়ীর পাশের প্রাইমারী স্কুল থেকে ক্লাস ফাইভ পাশ করে ভর্তি হয় হাইমচর হাই স্কুলে। দিনগুলো হাসি-খুশিতে চলে যায়। সামনে এসএসসি পরী¶া বৃষ্টির। সে লেখাপড়ায় মনোযোগ দিলো। সে ইংরেজী বিষয়ে বেশ দূর্বল। এ জন্য বৃষ্টি একই স্কুলের শি¶ক আবদুল খালেক স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে। বৃষ্টির বাবা আবদুর রহিম ব্যবসা করে। হাইমচর বাজারে তার বেশ বড় একটা মুদি দোকান আছে। দোকানে প্রচুর বেচাকেনা। কর্মচারী আছে ৪জন। ৪জন কর্মচারীও ঝামেলা সামাল দিতে পারে না। নিজের ব্যবসা ও বাবার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি-জমা নিয়ে রহিমের বলতে গেলে শান-শওকতেই জীবন চলে যাচ্ছে। বৃষ্টি দ্রুত বেড়ে উঠতে থাকে। তার বয়স এখন ৮বছর। বৃষ্টির প্রতি বাবা-মা’র আদরের কমতি নেই। খোদেজার সংসার জীবন ভালোই কাটতে লাগলো। কিছুদিন পর খোদেজার জীবনে কোথা থেকে ঝড় নেমে এলো। তার ¯^ামী আবদুর রহিমকে কেমন যেন শয়তানে পেলো। তার ¯^ামী প্রায়ই রাতে বাইরে থাকে। কিছু বললে জবাব দেয় ব্যবসার কাজে বাইরে থাকতে হয়। এভাবে বেশ কিছুদিন পার হবার পর খোদেজা মনে সন্দেহ জাগে। ¯^ামীর ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে থাকে। এব্যাপারে দোকানের কর্মচারী চান মিয়ার কাছ থেকে নিয়মিত খবরাখবর নিতে থাকে সে। পরে জানতে পারে অল্প বয়সী এক মেয়েকে বিয়ে করেছে আবদুর রহিম। বেশি টাকা-পয়সা হলে যা হয়। এ নিয়ে ¯^ামীর সাথে প্রচন্ড ঝগড়া হয় খোদেজার। একপর্যায়ে প্রচন্ড রাগাšি^ত হয়ে ¯^ামীর মুখের সামনে বলে দিলো তুমি তোমার সংসার নিয়ে থাক। আমি চলে গেলাম আমার বাপের বাড়িতে। আবদুর রহিম প্রথমে ভেবেছে। মনে রাগ এসেছে। কয়দিন পর ঠিকই ফিরে আসবে খোদেজা। কিন্তু না। খোদেজা আর আবদুর রহিমের সংসারে ফিরে আসেনি। ¯^ামীর ঘর ছেড়ে যখন বাপের বাড়িতে আসে তখন খোদেজার মাত্র ২৫বছর। বাপের বাড়ীতে কিছুদিন থাকার পর বাবা-মা তাকে আবার বিয়ে দিলো। নতুন ¯^ামী তাকে ঢাকার বাসাবোতে নিয়ে আসে। নতুন ¯^ামীন ঘরে যাবার সময় মেয়ে বৃষ্টিকে সাথে নিয়ে যায়। সৎ বাবার ঘরেই বড় হতে থাকে বৃষ্টি। সৎ বাবা লোকটা খুব একটা সুবিধার নয়। তবে মা খোদেজা বেগম বৃষ্টিকে সুখে রাখার চেষ্টা করে। নিজে কিছু সেলাই কাজ জানে। মহিলা ও বাচ্চাদের জামা-কাপড় সেলাই করে কিছু বাড়তি টাকা আয় করে খোদেজা। এই টাকা দিয়েই মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালায়। বৃষ্টি ক্লাস ফাইভ পাস করে হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। দিনগুলো মোটামুটি ভালোই কেটে যায় বৃষ্টির। দিন দিন প্রকৃতির নিয়মেই বড় হতে থাকে বৃষ্টি। বৃষ্টির বয়স এখন ১৩ বছর। ১২বছর বয়স পার হলে মেয়েদের শরীর কলা গাছের মতো দ্রুত বাড়তে থাকে। বৃষ্টি বোধ হয় কলা গাছের চেয়ে একটু বেশি পরিমাণে বাড়ছে। দিন দিন তার শরীরের পরিবর্তন হচ্ছে। শরীরের মেয়েলী বাঁকগুলো স্পষ্টই ধরা পড়ছে। মেয়েকে খুব শাসনে রাখে খোদেজা। নিজে অনেক কষ্ট-যাতনা সয়ে মেয়েকে কোনোরকম কষ্ট অনুভব করতে দেয় না সে। লেখাপড়া বেশ ভালোভাবেই চালিয়ে যায় বৃষ্টি। হাই স্কুল থেকে বৃষ্টির নামে কোনো অভিযোগ আসেনি। বরং প্রধান শি¶ক একদিন বৃষ্টির মাকে স্কুলে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। প্রধান শি¶কের ডাক পেয়ে বৃষ্টির স্কুলে যায় খোদেজা বেগম। স্কুলে যাবার পর খোদেজা যতœ-আপ্যায়ন করা হলো বেশ। বৃষ্টির লেখাপড়ার দিকে মনোযোগ আছে। এই কথাটাই বললেন স্কুলের শি¶করা। মেয়ের লেখাপড়ার ভালো খবর শুনে খুশি হলো খোদেজা। সে নিজে লেখাপড়ায় বেশি দূর এগুতে পারেনি। মেয়েটাকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করতে পারলে তার জীবনটা কিছুটা হলেও সার্থক হবে। বৃষ্টিকে উৎসাহ দিয়ে মা খোদেজা বেগম বলে শুন মা লেখাপড়াটা ভালো ভাবে চালিয়ে যা। তোর লেখাপড়ার খরচের ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে না। তোকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য যা খরচ হয় তা আমি যেভাইে হোক ব্যবস্থা করব। মার উৎসাহ পেয়ে ভালোই ভালোই লেখাপড়া চালিয়ে যায় বৃষ্টি। সামনে বৃষ্টির এসএসসি পরী¶া। পুরোদমে পরী¶ার প্রস্তুতি নেয় বৃষ্টি। একই ক্লাসের সাহানা ও জাহানারা সাথে বৃষ্টির গলায় গলায় ভাব। বলতে গেলে ওরা তিন জন ঘনিষ্ট বান্ধবী। সাহানা ও জাহানারা ¯^চ্ছল পরিবারের সন্তান। তাদের তুলনায় বৃষ্টি কম সুবিধা ভোগী। তবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান হলেও তাদের দু’জনের মধ্যে তেমন অহংকার নেই। বৃষ্টিও গরীব ঘরের সন্তান না। তার বাবা আবদুর রহিম অবস্থাপন্ন একজন ব্যবসায়ী। তার বাবা নিয়মিত যাকাত দেয়। মার সাথে থাকে বলে বৃষ্টিকে কিছুটা কষ্টের মধ্যে বড় হতে হয়েছে। এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হবার সময় অনেকগুলো টাকার দরকার হয়ে গেল। এ নিয়ে সৎ বাবার সাথে মার অনেক কথা কাটাকাটি হয়। সৎ বাবা বলে তোর মেয়েকে লেখাপড়া শিখানোর কি দরকার? তাকে বিয়ে দিলেই তো হয়। এই টাকা জোগাড় করতে বৃষ্টির মা হিমশিম খেয়েছে। মার কষ্ট দেখে একদিন বাবার সাথে কথা বলে বৃষ্টি। বৃষ্টি মোবাইলে বাবার সাথে অনেক কড়া কথা বলেছে। সে বলেছে আব্বা আম্মার কথা বাদ দিলাম। আম্মাকে আপনি ত্যাগ করেছেন। আমাকে তো আপনি ত্যাগ করতে পারেন না। আমি তো আপনার আপন। আমার ব্যাপারে আপনার কোনো দায়িত্ব নাই? আপনি নিয়মিত যাকাত দেন। অথচ নিজের মেয়ের খোঁজ নেন না। আপনার যাকাত আল্লাহ্ কবুল করবে না। মেয়ের গরম গরম কথা শুনে আবদুর রহিম বলে আমার সেই ছোট্ট মেয়েটা দেখছি এখন বড় হয়েছে। সুন্দর-সুন্দর কথা বলতে শিখেছে। রহিম বলে আমি তো তোমার মাকে ত্যাগ করি নাই। তোমার মাই রাগ করে আমার বাড়ী থেকে চলে গেছে। তোমার মা আরেক জনের সংসার করছে। তার দায়িত্ব আমি নেব কেন? সে আরো বলে তুমি আব্বার কাছে আস না কেন? আমার মেয়ের খরচের টাকার অভাব হবে? বৃষ্টি বলে না আমি আসব না। মা বলেছে কোনো দিন আপনার বাড়ীতে না যেতে। রহিম বলে আমার মেয়ে নিজের বাড়ীতে আসতে পারবে না এটা কেমন কথা? আমি বড় হয়েছি মায়ের আশ্রয়ে। আপনার আদর-যতœ পাইনি বললেই চলে। মা আমাকে আপনার কাছে যেতে বারন করেছে। মায়ের নির্দেশ আমাকে মানতেই হবে। ব্যাপারটা আপনি আর মা দু’জনের ব্যাপার। এখানে আমার কিছু করার নাই। রহিম মেয়েকে বলে তোমার মা মেয়ে মানুষ। তার রাগ থাকতে পারে, আমার কি রাগ নাই। আপনারা দুই জন রাগ নিয়েই থাকেন বলে কথা শেষ করে বৃষ্টি। এরপর বাবার সাথে আর যোগাযোগ করেনি সে। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে লেখাপড়া চালিয়ে নেয় সে। ছোট কয়েক জন ছেলে-মেয়েকে প্রাইভেট পড়ায় বৃষ্টি। আজকাল অনেকেই দরকার হোক বা না হোক মোবাইল একটা কিনবেই। যেসব ছেলে-মেয়েকে প্রাইভেট পড়ায় তারা একটা মোবাইল কেনার জন্য বৃষ্টিকে অনুরোধ করে। কারণ মোবাইল থাকলে যোগাযোগ করতে অনেক সুবিধা। প্রথমে তাদের কথায় গুরুত্ব দেয়নি। বৃষ্টিকে নিয়মিত কলেজে যেতে হয়। কলেজে যাবার পর মা খুব চিন্তিত থাকে। চিন্তা করে দেখলো আসলে মোবাইল কিনলে ভালোই হয়। প্রাইভেট পড়িয়ে মাসে যে টাকা পায় তা থেকে কিছু টাকা জমিয়েছিল। জমানো টাকা দিয়ে একটা মোবাইল কিনে নেয় বৃষ্টি। বান্ধবীদের সাথে এবং কলেজে থাকা কালে মার সাথে যোগাযোগ করার বেশ সুবিধা হয়েছে। একদিন মোবাইলে একটা কল আসে। মোবাইল রিসিভ বৃষ্টি বলে হ্যালো কে? অপর প্রান্ত থেকে বলে এটা কি মোমেনাদের বাসা? বৃষ্টি বলে না। অপর প্রান্ত থেকে বলে আসলেই কি ভুল নাম্বারে ফোন করেছি? বৃষ্টি বলে মোবাইলে ভুল কল আসে না। মানুষই ভুল নাম্বার প্রেস করে। অপর প্রান্ত থেকে বলে তাহলে কি আমি ভুল নাম্বারে ফোন করলাম। বৃষ্টি বলে অবশ্যই আপনি ভুল নাম্বারে ফোন করেছেন। অপর প্রান্ত থেকে জবাবে বলা হয় ভুল নাম্বারে ফোন করে ভালোই হল। আপনার মতো সুমধুর কণ্ঠের একজন মানুষের সাথে পরিচয় হল। সত্যিই আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন। বৃষ্টি আর কথা বাড়াতে চাইল না। মেয়েদের কথা শুনলে বেশির ভাগ এরকম কথাই বলে। অপর প্রান্ত থেকে বললো, আসলে অন্য কেউ বলে কিনা জানি না। তবে আমি বলি না। বৃষ্টি বললো এখন যে বললেন। অপর প্রান্ত থেকে বললো যা সত্যি এবং বাস্তব তাই বললাম। বৃষ্টি আর কথা বাড়াতে চাইলো না। হ্যালো রাখি বলে কল ক্যানসেল করে দিল সে। এভাবে প্রায় কয়েক দিন পর ফোন করে বসে অপরিচিত সে লোক। একদিন লোকটাকে অনেক কড়া কথা বললো। বৃষ্টি তাকে বললো জীবনে কোনো দিন মেয়েদের সাথে বলেননি। আপনাকে বার বার মানা করার পরও আপনি আমার নাম্বারে ফোন করছেন। ব্যাপার কি, আপনি কি চান? অপরিচিত লোকটার মেজাজ বোধ হয় একেবারেই ঠান্ডা। এভাবে কথা বলার পরও সে বিন্দুমাত্র রাগ হয়নি। আরো বলে কিনা আসলেই আপনার কথাই সত্যি। আমি অতীতে কোনো দিন আর কোনো মেয়ের সাথে কথা বলিনি। সেদিন কেন যে আপনার নাম্বারে কল চলে গেল। এর পর থেকেই আপনার সাথে কথা না বলে থাকতে পারি না। বৃষ্টি বলে আপনি যদি আমাকে ফোন করা বন্ধ না করেন তাহলে খারাপ ব্যবহার করতে বাধ্য হব। আপনি যত খারাপ কথা বলুন, গালাগাল করুন তবুও আমি আপনার সাথে কথা না বলে থাকতে পারবো না। বৃষ্টি বলে এ দেখছি বস্ত বড় এক বেশরম-বেহায়া। বেশরম-বেহায়া একথা শুনার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো অপরিচিত জন। শেষে বৃষ্টি বলে দেখুন আমি লেখাপড়া করি। আমাকে ডিসটার্ব করবেন না। আমার লেখাপড়ার ক্ষতি হবে। এর পর বেশ ক’দিন আর ফোন করে না সে লোক। অপরিচিত সে লোক ক’দিন ফোন না করায় বৃষ্টির কেমন জানি মনে হয়। লোকটাকে বেহায়া বলার জন্য বৃষ্টির খুব খারাপ লাগে। এতটুকু কড়া কথা সে না বললেই পারতো। এবার বৃষ্টি ভাবলো ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করবে। কললিস্টে সে লোকের নাম্বারটা ছিল। সে নাম্বারে ফোন করলো বৃষ্টি। কল রিসিভ করেই সালাম দিল সে লোক। বৃষ্টি শুরুতেই বললো সেদিন আপনাকে বেহায়া বলার জন্য সত্যিই আমি দুঃখিত। সরি আই এ্যাম এক্সট্রিমলি সরি। ঠিক আছে-ঠিক আছে। আপনি ফোন করাতেই আমার সব অভিমান দূর হয়ে গেছে। আসলে আপনার কথায় আমি বিশেষ কিছু মনে করিনি। তবে সাময়িক খারাপ লেগেছে মাত্র। অনেক দিন যাবৎ আমরা কথা বলছি অথচ এখনও আপনার নাম জানার সৌভাগ্য হয়নি। আচ্ছা আপনার নামটা জানতে পারি কি? বৃষ্টি বললো আমার নাম নাসরিন আক্তার। তবে স্কুল-কলেজ ছাড়া এ নামে আমাকে কেউ চিনে না। আমার আরেকটা নাম আছে। সেটা হলো বৃষ্টি। আপনার নাম বলবেন না? আমার আবুল হাসনাত। হাসনাত বললো নাসরিন নামটাই আমার পছন্দ। আপনাকে আমি নাসরিন নামেই ডাকবো। বৃষ্টি বলে দেখুন আমি এখনও ছাত্রী। লেখাপড়ার প্রচুর চাপ। আপনি প্রতিদিন ফোন করার দরকার নাই। হাসনাত বললো আমিও চাই আপনি লেখাপড়া চালিয়ে যান। আপনাকে অযথা ডিসটার্ব করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। হাসনাত বললো আচ্ছা আমারা কি একে অপরের সাথে দেখা করতে পারি না? বৃষ্টি বললো না এখন না। পরে দেখা যাবে। আমাদের বোধ হয় এখন ফোন রাখা উচিৎ। হাসনাত কয়েকদিন পর পর ফোন করে। বৃষ্টিকে অনেক অনুনয়-বিনয় করে বলে সে যেন অন্তত একটি বারের জন্য হাসনাতের সাথে দেখা করে। বৃষ্টি এব্যাপারে তার বান্ধবী সাহানার সাথে আলাপ করে। সে বলে যেতে চাইলে চল একদিন দেখা করে আসি। সাহানা আর বৃষ্টি দু’জন সিদ্ধান্ত নেয় তারা দু’জন হাসনাতের দেখা করতে যাবে। সাহানা আর বৃষ্টি চন্দ্রিমা উদ্যোনে অপেক্ষা করছে হাসনাতের। বৃষ্টি নাটকের মডেল ও নায়ক নোবেল ও সজলের ভক্ত। বৃষ্টি হাসনাতকে মনের কোঠরে স্থান দিতে শুরু করেছে। বৃষ্টি ভাবে হাসনাত হবে তার ¯^প্নের নায়ক নোবেল বা সজলের মতো। একটা ছেলে বৃষ্টির সামনে আসতে থাকে। ছেলেটা দেখতে অনেকটা নায়ক সজলের মতো। চোখে সান গ্লাস পরায় তাকে আরো বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। বৃষ্টি ভেবেছে ও হয়তো হাসনাত হবে। এটা ভেবে আনন্দে উদ্বেলিত হয় বৃষ্টি। সামনাসামনি আসতেই দেখে অন্য তরুণীর সাথে চলে গেল। বৃষ্টি হতাশ হয়ে গেল। সে যা ভেবেছিল তা হয়নি। শেষে হাসনাত এসে পৌঁছে। সাহানাই হাসনাতের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করে। হাসনাত মোবাইলে তার পোশাকের বিবরণ দেয়। নর্মাল প্যান্ট ও ফুল চেক শার্ট পরা থাকবে সে। পোশাকের বিবরণ শুনে বৃষ্টির আগ্রহ বেড়ে যায়। সে দূর থেকে হাসনাতকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। পোশাকের বিবরণ অনুযায়ী হাসনাতকে দেখে ফেলে বৃষ্টি। হাসনাতের বয়সটা কেমন জানি বেশি বেশি লাগছে। মাথায় চুল নেই। ভূঁড়িটা শরীর থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসেছে। শরীরের ভূঁড়ি বের হয়ে হাসনাত এই বয়সেই বিশ্রী হয়ে গেছে। হাসনাতকে দেখে কিছুটা হতাশ হয়ে যায় বৃষ্টি। সাহানা বৃষ্টিকে বলে এই যে এগিয়ে আসছে তোর প্রিয় মানুষ। ওকে তোর পছন্দ হয়েছে? আমি জানি তোর পছন্দ হয়নি। যেহেতু তোর সাথে হাসনাতের কখনো দেখা হয়নি। তাই চল বাড়ীতে চলে যাই। ও কাছাকাছি আসলে বলবি হাসনাতের নামের কাউকে তুই চিনিস না। ব্যস হয়ে গেল। কোন ঝামেলা হবে না। বৃষ্টি বললো যাকে মনে মনে পছন্দ করেছি, তার সাথে বেঈমানী করতে পারব না। হাসনাতের শারীরিক সৌন্দর্য হয়তো একটু কম। তবে মনটা অত্যন্ত কোমল। বৃষ্টি ভাবে হাসনাতের শারীরিক সৌন্দর্যের দিকটা না হয় ছাড় দিলো সে। তাতে কি? সব মানুষতো সুন্দর হয় না। সাহানার বার বার বারন ¯^ত্তে¡ও হাসনাতের সাথে দেখার প্রস্তুতি নিল বৃষ্টি। হাসনাত এগিয়ে এসেই জিজ্ঞেস করার সাথেই সাথেই নিজের পরিচয় দিল বৃষ্টি। তারা অনেকক্ষণ কথা বলল। হাসনাত বৃষ্টির বাসার ঠিকানা চাইল। বৃষ্টি প্রথমে ইতস্তত করল। পরে হাসনাতকে বাসার ঠিকানা দিল। একদিনতো হাসনাত সরাসরি বাসায় এসে হাজির। বৃষ্টি কি করবে ভেবে পায় না। হাসনাতকে বলে আপনি বাসায় এসেছেন কেন? মাকে আমি কি জবাব দেব? ভাগ্যিস মা ভিতরের ঘরে ছিল। এ জন্য রক্ষা। হাসনাত বলে শুন নাসরিন তোমাকে কয়েক দিন না দেখলে কেমন জানি মনে হয়। কোন কিছুই ভালো লাগে না। তাই আজ সাহস করে তোমাদের বাসায় চলে এলাম। তুমি আমাকে বকাবকি করো না। হাসনাতের মুখে নাসরিন নাম শুনলে বৃষ্টির আলাদা একটা অনুভূতি হয়। নাসরিন নাম শুনলেই তার সারা শরীর শিহরিত উঠে উঠে। সে যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়। বৃষ্টিদের বাসা মোটামুটি নিরিবিলি। একটু সুযোগ পেয়েই বৃষ্টির মুখে আলতো চুমু বসিয়ে দেয়। হঠাৎ কোন পুরুষ মানুষের স্পর্শ পেয়ে বৃষ্টির সারা শরীরে নতুন এক অনুভূতির ঢেউ খেলে যায়। বৃষ্টি বলে এসব কি হচ্ছে। এত তাড়াতাড়ি এসব ভালো না। হাসনাত বলে দেরি আর তাড়াতাড়ির প্রশ্ন কেন? তুমি তো আমার। তুমি বললে আমি এখনই তোমাকে বিয়ে করব। আমার মধ্যে কোন দূর্বলতা নাই। তোমাকে ভালোবেসেছি এবং তোমাকে আমি বিয়ে করব। শুধুমাত্র তোমার শরীর উপভোগ করাই আমার উদ্দেশ্য নয়। একথা বলেই হাসনাত আবার বৃষ্টির ঠোটে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করে। এবার বৃষ্টি সরে যায়। ভিতরের ঘর থেকে মা এসে বৃষ্টিকে জিজ্ঞেস উনি কে? বৃষ্টি সত্যিই এবার বিপদে পড়ে যায়। মাথায় বুদ্ধি হাজির হয়। বৃষ্টি বলে উনি আমার কলেজের বান্ধবী রাবেয়ার বড় ভাই। বান্ধবীর বড় ভাই বলায় তার জন্য চা বানাতে যায় বৃষ্টির মা। চা খেয়ে বিদায় নেয় হাসনাত। হাসনাতের সাথে পরিচয় হবার পর বৃষ্টির লেখাপড়ার ব্যাঘাত ঘটছে। বৃষ্টির মনটা সবসময় এলোমেলো হয়ে থাকে। হাসনাত বৃষ্টিকে ফোন করে বলে চল আমরা বিয়ে করে ফেলি। আমি কিছু টাকা জোগাড় করেছি। দেরি করলে এ সুযোগ হারাতে হবে। চল, দেরি করা যাবে না। হাসনাত চুমু খাওয়ার পর থেকে বৃষ্টির মন সবসময় অস্থির হয়ে থাকে। কিছুই ভালো লাগে না তার। লেখাপড়ায় বসাতে পারে না। হাসনাতের বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় সে। কলেজে যাওয়ার কথা বলে বাড়ী থেকে বের হয়ে আসে বৃষ্টি। তারা দু’জন সরাসরি গাজীপুর চলে যায়। সেখানে গিয়ে পরিচিত এক বোনের বাসায় উঠে বৃষ্টি আর হাসনাত। হাসনাত তার বাড়ী থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে আসে। আপাতত টাকার কোন সমস্যা নাই। সেখানে দু’দিন থাকার পরিচিত বোন আর তার ¯^ামী বৃষ্টি ও হাসনাতের বিয়ের আয়োজন করে। আশে-পাশের বাসার কয়েকজন মেহমান বিয়ে অর্থাৎ আক্দতে উপস্থিত ছিল। বৃষ্টি ও হাসনাতের দাম্পত্য জীবন ভালোই কাটছে। এদিকে ঘর ছেড়ে গিয়ে বিয়ে করার খবর শুনে বৃষ্টির স্ট্রোক করে। এভাবে বেশ কিছুদিন চলে যায়। হাসনাত বাড়ী থেকে যে টাকা নিয়ে এসেছিল সেগুলো প্রায় খরচ হয়ে গেছে। বিয়ের দিনই ২০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে যায়। এভাবে ৬ মাস যাওয়ার তাদের সংসারে টাকার সংকট দেখা দেয়। হাসনাত তেমন কাজ-কর্ম জানে না। সে কি করবে ভেবে পায় না। পাশের রুমের করিম ভাই রাজ মিস্ত্রির কাজ করে। হাসনাত তার সাথে হেলপার হিসেবে কাজে যায়। কাজ থেকে এসে হাঁপিয়ে উঠে হাসনাত। কারণ সে কখনো পরিশ্রমের কাজ করেনি। বৃষ্টি দেখে কয়েক দিন কাজ করে হাসনাতের হাতে ঠোসা পড়ে গেছে। বৃষ্টি বলে আমার জন্য তুমি এত কষ্ট করছ? হাসনাত বলে কি আর করবো? বাড়ী থেকে যে টাকা এনেছিলাম সে টাকাতো শেষ। এখন কি আর করব তুমি বল? বসে বসে তো আর খাওয়া যাবে না। হাসনাতের কষ্ট দেখে বৃষ্টি বলে আমি যদি গার্মেন্ট-এ চাকরীর চেষ্টা করি তোমার আপত্তি আছে? হাসনাত বলে তোমাকে চাকরি দেবে কে? গার্মেন্ট-এর চাকরীর অভাব নাই। পাশের বাসার রহিমা আপা গার্মেন্ট-এ চাকরী করে। তাকে বলে দেখি কি হয়। যে বলা সে কাজ। বৃষ্টির চাকরী হয়ে যায়। বৃষ্টি চাকরী করার হাসনাত কিছু করে না। বৃষ্টির বেতনের টাকা দিয়ে দু’জনের সংসার চলে যায়। হাসনাত কোন কাজ-কর্ম না করায় তাদের দু’জনের সংসারে দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকে। বৃষ্টি বলে আমাদের বিয়ে হল অনেক দিন। তোমাকে বিশ্বাস করে নিজের ঞর ছাড়লাম। তোমাকে বিয়ে করলাম। তোমার ঠিকানা বা বাড়ী ঘর কিছুইতো আমার চেনা হল না। তোমার বাড়ী-ঘর দেখতে ইচ্ছা করছে আমার। আমাকে তোমাদের বাড়ীতে নিয়ে যাও। এ কথা বলে বার বার তাগাদা দেয় বৃষ্টি। এসবের জবাবে হাসনাত কিছুই বলে না। এ নিয়ে প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি ও হাসনাতের মধ্যে ঝগড়া হয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে একদিন হাসনাত বৃষ্টির শরীরে হাত তোলে। হাসনাতের প্রতি প্রচন্ড রাগ হয় বৃষ্টির। বৃষ্টি বেশ কদিন হাসনাতের কথা বলেনি। পরে অনেক অনুনয়-বিনয় করে বৃষ্টির রাগ ভাঙ্গিয়েছে হাসনাত। বৃষ্টির বেতনের টাকা হাসনাতই ফ্যাক্টরী থেকে তুলে নিয়ে আসে। মাস শেষে একদিন বাসায় এসে দেখে বাসায় কিছু নেই। বৃষ্টির জমানো ৮ হাজার টাকা এমনকি বাসার হাড়ি-পাতিল কিছুই নেই। পাশের বাসার সবাইকে জিজ্ঞেস করে বাসার এ অবস্থা কেন? বাসার কিছুই তো নেই। এসব কে নিল? কেউ জবাব দিতে পারে না। অস্থির হয়ে তন্ন তন্ন করে সবকিছু খুঁজতে গিয়ে একটা চিরকুট খুঁজে পায়। চিরকুটটা হাতে নেয় বৃষ্টি। এটাতে লেখা আমি তোমার জীবন থেকে চলে গেলাম। আমাকে খোঁজার চেষ্টা করবে না। তুমি তোদের পথে থাক। আমি আমার পথে থাকি। আমার সাথে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। এ চিরকুট পড়ে বৃষ্টি মাথায় যেন গোটা আকাশটা ভেঙ্গে পড়ে। মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয় না। চোখেও যেন ঝাপসা দেখে বৃষ্টি। ঝাপসা চোখে সে শুধু অন্ধকার দেখে। এমন অন্ধকারের রঙ এমন নিকষ কালো যে, এ কালো রঙটা যেন বৃষ্টি কোন দিন দেখেনি।