কিছুটা শহরতলী ও কিছুটা গ্রামের ছায়া-শীতল পরিবেশে বেড়ে উঠা সাদিক ও আনিকা। দু’জন দু’মেরুর বাসিন্দা। অর্থাৎ আনিকা সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আর সাজিদ অভাব-অনটন ও নিত্য সমস্যার সাথে লড়াই করে বেড়ে উঠা তরুণ। তারুণ্য মাখা উচ্ছলতা, ক্রেজ, সাধ-আহলাদ বলতে যা বুঝায় এসবের কিছুই সাদিকের মধ্যে নেই। ডাল-ভাত খেয়ে কোনো মতে বেঁচে থাকলে পারলেই সাদিকের সান্ত¡না। তবে সাজিদ এমন গরিবী হালে জীবন কাটাবে সেটাও নয়। তার এ্যামবিশন বা উচ্চাকাক্সক্ষা যে নেই তা নয়। সবসময় সে স্বপ্ন দেখে একদিন সে প্রতিষ্ঠিত হবে। গরীবি হাল তার একদম পছন্দ নয়। গরীবি হালকে সে ঘৃণা করে। অভাব-অনটন ও নিত্য সমস্যার জ্বালাতন তার একদম ভালো লাগে না। সে স্পষ্টই বুঝতে পারে তার আর্থিক অবস্থা ভালো নয় বলে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের কাছে তার সমাদর নেই। একজনই শুধু ব্যতিক্রম। সে আর কেউ নয় আনিকা। আনিকা সবসময় সাদিকতে ফলো করে। সাদিক কোথায় যায়, কি করে সব খবর রাখে আনিকা। কি প্যান্ট পরে-কি শার্ট গায়ে দেয়। সবকিছুই সে ফলো করে। একদিন একটা জিন্সের প্যান্ট পরে বাইরে গিয়েছিল সাদিক। সে জিন্সের প্যান্টে নাকি সাদিককে ভালো মানায়নি। কথাটা সাদিক শুনেছিল তার ভাতিজির কাছে। ভাতিজা-ভাতিজিরা সাদিকের খুব প্রিয় সেটা আনিকা ভালো করেই জানে। এ জন্য সাদিকের ভাতিজি নুজহাতকে কথাটা বলেছিল আনিকা। নুজহাত সাদিককে বলেছিল আনকেল ছাই রঙয়ের জিন্সের প্যান্টটা আপনি পরবেন না। এটা আপনাকে ভালো মানায় না। জবাবে সে বলেছিল তাই নাকি ! এটা কি তোমার ভালো লাগেনি? নুজহাত বলেছে না আনকেল আমি বলছি না। কথাটা বলেছে আনিকা আনটি। ও তাই নাকি! তাহলে তো জিন্ট-এর প্যান্ট আর পরা যাবে না। সত্যিই সেদিন থেকে সাদিক জিন্সের প্যান্ট পরা ছেড়ে দিয়েছে। সে ঘটনার পর বহু বছর হয়ে গেলো। আনিকার বিয়ে হলো। এখন আনিকা ১ ছেলে, ১ মেয়ের জননী। সাদিকের জীবনটা আগের মতোই এলোমেলো রয়ে গেছে। আজ বহু বছর হয়ে গেলো সাদিক জিন্স-এর প্যান্ট আর পরেনি। আনিকার বিয়ে হলো অনেকদিন। স্বামী বিদেশ প্রবাসী। আনিকার বাবা সরকারী চাকরী করতো। কি একটা ঘটনায় তার চাকরী চলে যায়। চাকরী গিয়ে তার বরং ভালোই হয়েছে। এলাকায় ব্যবসা করে বেশ উন্নতি করেছে। টাকা-পয়সা হয়েছে বেশ। পুরনো পৈত্রিক বাড়িতে দোতলা ইমারত নির্মাণ করেছে। অনেকে বলে মেয়েদের ভাগ্যে আহমেদ সোবহানের আর্থিক উন্নতি হয়েছে একথা বলতেই হয়। তার তিন মেয়ের মধ্যে সবারই দীর্ঘ গড়ন। সুন্দর বলতে যা বুঝায় সেটা আনিকার মধ্যে পুরোপুরি আছে। তিন বোনের মধ্যে অন্যরা যে বিশ্রী তা নয়। আনিকার ব্যাপারে অনেকে বলতো সে নাকি খুব দেমাগী। আসলে সাদিকের কাছে এসব কিছুই মনে হতো না। আনিকা সাদিককে দেখলে কেমন জানি হয়ে যেত।একদিন বাড়ি থেকে সবাই পিকনিকে যাবার প্রস্তুতি নিল। সাদিকের ছোট বোন তাকে অনুরোধ কললো ভাই বাড়ি থেকে সবাই পিকনিকে যাবে। আমিও যাব। তুমি কি যাবে? চলো না যাই। সাদিক বললো নারে। আমি যাব না। মনে অশান্তি রেখে বাহ্যিক শান্তি খুঁজে কি লাভ। তুই গেলে যা। ওরা ঠিকই পিকনিকে গেল। পিকনিকে গিয়ে ওরা অনেকগুলো ফটো তুলেছে। আনিকাও অনেকগুলো ফটো তুলেছে। সাদিকের ছোট বোনের সাথেও বেশ কয়েকটা জয়েন্ট ফটো তুলেছে আনিকা। পিকনিক থেকে এসে তারা ফটোগুলো সাদিককে দেখালো। ফটোতে আনিকাকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। যেন সদ্য বাগানে ফোঁটা গোলাপ। অনেক সময় দেখা যায় সুন্দরী মেয়েদের ফটো সুন্দর হয় না। কেমন জানি বাজে হয়। এক্ষেত্রে আনিকা অনেকটা ব্যতিক্রম। আনিকা দেখতে যেমন সুন্দর। ক্যামেরা ফিগারও ঠিক তেমন। যাদের বলা হয় ফটোজেনিক ফিগার। আনিকা দেখলে সাদিকের কেমন জানি মনে হতো। মেয়েদের শরীর নিয়ে সাদিকের তেমন আগ্রহ নেই। এ জন্য সাদিকের ঘনিষ্ট বন্ধুরা প্রায় তাকে নানা কথা বলে। তারা বলে কিরে সাদিক তোর কি কিছু নেই। এখন পর্যন্ত একজন মেয়ের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক করতে পারলি না! দোস্ত তোকে দিয়ে কিছুই হবে না। সাদিকের ঘনিষ্ট বন্ধু আফতাব সাদিকের কাছে এসে বলতো সে তার মেয়ে বন্ধু শাহনাজকে কিভাবে কিস করেছে, জড়িয়ে ধরেছে। এসব কথা শুনতে আজ কালকার তরুণদের ভারী আগ্রহ। সাদিকের কাছে এসব কথা-ঘটনার ব্যাপারে বলতে গেলে মোটেই আগ্রহ নেই। সাদিকের কাছে প্রেম-রোমাঞ্চের কথা বলতে এসে বন্ধুরা তার অনাগ্রহ দেখে বন্ধুরা বিরক্ত হয়ে যেত। শেষে বলতো তুই একটা গাঁধা। আমাদের স্কুলের সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে তোর সাথে সম্পর্ক করতে চাইলো। তুই তাকে এড়িয়ে গেলি। আমাদেরও কিছু করতে দিলি না। তবে ব্যতিক্রম হলো আনিকা। সাদিক শুধু আনিকাকে কিছুটা পছন্দ করতো। আনিকাকে দেখলে সে কেমন জানি হয়ে যেত। এটাই মনে হয় ভালো লাগা বা ভালোবাসা। ভালোলাগা-ভালোবাসা থেকেই প্রেম-অমর প্রেমের সৃষ্টি হয়। সাদিকের প্রেম-ভালোবাসা হয়নি। সারাক্ষণ তাকে নিজের ও পরিবারের ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবতে হয়। নিজের এখনো স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়নি। সংসারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষ সাদিকের মা প্রায় অসুস্থ থাকেন। তিনি হাইপারটেনশন রোগী। সংসারের ঘানি টানতে টানতে সুস্থ-সবল মানুষটার শরীরে রোগের বাসা বেঁধেছে। এখন আর পেরে উঠতে পারছেন না তিনি। ভালো কলেজে পড়তে হলে প্রচুর টাকা দরকার। টাকাটা মাকেই জোগাড় করতে হবে। মার কষ্টের কথা চিন্তা করেই ভালো ছাত্র হওয়া স্বত্ত্বেও সাদিক নাম করা কোনো কলেজে লেখাপড়া করতে পারেনি। মফস্বলের অখ্যাত কলেজ থেকে কোনো মতে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে সে। একদিন আনিকা তাদের বাড়ীতে বেড়াতে এলো। কাজ শেষে বাড়ীতে এলো সাদিক। দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলো সে। বিশ্রাম নিয়ে বাড়ী থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে সে। এমন সময় আনিকার সাথে দেখা। আনিকাদের দোতলা বাড়ীর সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে সে। আফটার নুন বা দুপুরের পর বাড়ীতে লোকজন খুব কমই থাকে। বাড়ীর ছোট ছেলেরা মাঠে খেলতে যায়। যারা খেলতে যায় না তারা খাবার সেরে ঘুমিয়ে পড়ে। আনিকাদের বাড়ীর সামনে কেউ নেই। নিরিবিলি রোদেলা সুষ্ক দুপুর। আনিকা খুব ভালো করেই জানে সাদিক গায়ে পড়ে কারো সাথে কথা বলে না। তাই সে সাদিককে ডাক দিয়ে বললো ভাইয়া কেমন আছেন? জবাবে সাদিক বললো হ্যা ভালো আছি। সাদিক কথা একটু বাড়িয়ে বললো আনিকা তুমি কেমন আছ? সে বললো হ্যা ভাইয়া ভালো আছি। বিয়ের পর আনিকার শারীরিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সে ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। বিয়ের পর দ্রুত সন্তান হবার কারণে শরীরে কিছুটা নারীত্বের ভাব এসেছে মাত্র। শুনেছি আনিকা খুব সুখে আছে। তার শশুর বাড়ী দোতলা ইমারত। গ্রামে থেকে আনিকা শহরের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। টাকা-পয়সা, গহনা-গাটি কোনো কিছুরই অভাব নেই তার। শুধু তার স্বামী বিদেশ থাকে। এ যা সমস্যা। আনিকা যেহেতু গায়ে পড়ে সাদিকের সাথে কথা বলা শুরু করেছে তাই সেও আনিকার সংসারের কূশলাদি জানতে চাইলো। সাদিক বললো তোমার সাহেব কেমন আছে। জবাবে আনিকা বললো হ্যা আপনাদের জামাই ভালোই আছে। আপনার কি খবর? আপনি দেখি সে আগের মতো রয়েই গেছেন। বিয়ে-শাদী করবেন না? বয়স তো কম হলো না। হ্যা ছেলে যখন হয়েছি-বিয়ে তো করতেই হবে। ছোট বোনটার বিয়ে হলো কিছুদিন হলো মাত্র। তাছাড়া আমার এখনও তেমন ভালো চাকরি-বাকরির ব্যবস্থা হলো না। সেদিন ভাবি জিজ্ঞেস করলো আমার কোন পছন্দ আছে কি না। আনিকা বললো ভাবিকে কি বললেন? সাদিক বললো না তেমন কিছু বলিনি। বলেছি তাদের সাথে মানিয়ে চলতে এমন পাত্রী দেখতে। আনিকা বললো কেন, কিছু বললেন না কেন? সাদিক বললো কিছু বলে কি লাভ? যাকে পছন্দ করতাম এবং মনে মনে ভালোবাসতাম তাকে তো পাব না। সে তো এখন অন্যের জীবন সঙ্গী। সাদিক ভাইয়া জানতে পারি কে সে সৌভাগ্যবতী? যে কিনা সাদিক ভাইয়ের মতো শীলা পাথরের মতো শক্ত মনের মানুষের মনে জায়গা করে নিল? সাদিক বললো না এসব বলে কি লাভ? ভাগ্য বিড়ম্বিত জীবনে দুঃখের পরিধি আরো বাড়বে। বরং তোমার কথা বলো। শুনেছি তুমি তো খুব সুখে আছো। কিন্তু তোমার শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হলো না কেন? আগের মতো হ্যাংলা-পাতলাই রয়ে গেছো। এখনকার মেয়েরা দেখি বিয়ের পর বেশ স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠে। তোমার ছেলে-মেয়েরা কাছে আসলেই বুঝা যায় তুমি সন্তানের মা হয়েছো। আমার কথা বাদ দেন। আপনার কথা শুনতে চাই। আমার কথা আর কি শুনবে তুমি? আমার মতো ছন্নছাড়া মানুষের কথা কি কেউ শুনতে চায়? বললে না তো কাকে আপনার পছন্দ ছিলো এবং তাকে ভালোবাসতেন? সাদিক বললো সে আর কি বলবো? আসলে আমি তাকে শুধু মনে-মনে ভালোবাসতাম। কখনো সামনা সামনি বলা হয়নি। তাকে ভালোবাসার স্বপ্নের জালে জড়িয়ে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতাম শুধু। সাহস করে বলা হয়নি আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি যে কাপুরুষ বা সাহসহীন ছিলাম তা নয়। নিজের সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে সচেতন ছিলাম। তাই ভালোবাসার মানুষের সামনে যাবার সাহস হয়নি। এখানে আরো একটা ব্যাপার আছে, ভালোবাসার কথা বলে যদি তার কাছে প্রত্যাখ্যাত হতাম তাহলে আমি সইতে পারতাম না। এ জন্যই হাজারো কষ্টের মাঝে এ কষ্টটাও বুকে ধারণ করে বেঁচে আছি। আনিকা বললো কেন বললেন না আপনি তাকে ভালোবাসেন। আপনি কি ফেলনা নাকি। আপনার মতো ছেলে এ যুগে কয়জন আছে। টাকাই কি সব? ভালো মানুষের কি কোনো মূল্য নেই। সাদিক বললো আনিকা তুমি যেভাবে ভাবো সবাইতো সেরকম ভাবে না। আনিকা বললো সাদিক ভাই যদি কিছু মনে না করেন আপনার প্রিয় মানুষটির নাম জানতে পারি কি? সাদিক চাইছিলো প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে ফেলতে। কিন্তু অনিকা বার-বার সাদিক কাকে ভালোবাসতো তার নাম জানতে চায়। সাদিক বললো অতীতের এসব ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করে মন খারাপ করে কি লাভ? আনিকা বললো অতীত স্মৃতি ভুলে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। আপনার সিরিয়াস আপত্তি না থাকলে আমি শুনতে চাই। সাদিক বললো সত্যিই তুমি শুনতে চাও? আনিকা বললো জ্বি, অবশ্যই শুনতে চাই। আমার পছন্দের মানুষ সে আর কেউ নয়। এ মূহুর্তে আমার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে। সাদিক ভাই সত্যিই তাই? সাদিক বললো আমি তো মিথ্যা কথা বলি না। সাদিকের মুখ থেকে এ কথা শুনে কিছুক্ষণ থ খেয়ে রইলো সে। মুখে কোনো কথা নেই। অনেকক্ষণ পর সে বললো এ কথা বলার জন্য এতগুলো বছর সময় লাগলো কেন? সময়মত কেন বলতে পারলেন না? বলেছি তো আমার নিজের সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে আমি সচেতন। তোমাকে পছন্দ করতাম। মনে-মনে ভালোবাসতাম ঠিকই তোমার চলাফেরা ও পারিবারিক অবস্থার কথা চিন্তা করে কখনো বলা হয়নি। মাঝে-মাঝে ভাবতাম আনিকাকে ভালোবাসি এ কথা তাকে বলে ফেলি। পরে আবার ভাবতাম কিভাবে তাকে ভালোবাসার কথা বলি। আমার ভালো একটা চাকরি নেই-ব্যবসা নেই। স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়নি। দূর্বল মন নিয়ে ভালোবাসার মানুষের সামনে দাঁড়ানো যায় না। যেদিন তোমাকে নববধূ রূপে সাজানো হলো-সেদিনই মনে হয়েছিল আমি তোমাকে প্রচন্ড ভালোবাসি। সেদিনই তোমাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখেছিলাম। মনে-মনে বলেছিলাম আনিকা আসলেই তুমি খুব সুন্দর। তোমাকে আল্লাহ নিজ হাতেই সৃষ্টি করেছেন। তোমার আসল রূপ-সৌন্দর্য সেদিনই আগ্রহ ভরে দেখেছিলাম। তোমাকে দেখেছি আর নিজের অসহায়ত্বকে ধিক্কার দিয়েছি। তুমি যখন তোমার বরের পাশে বসে গাড়ীতে করে চলে যাচ্ছিলে তখন খুব বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম। সেদিনই বুঝেছিলাম আমি তোমাকে কতো ভালোবাসি। সাদিকের মুখে এ কথা শুনার পর আনিকার চোখ থেকে অশ্র“ ঝড়ছে। সে তা লুকাতে চাইলো। সাদিক বললো আনিকা আমার কথা শুনে তুমি কষ্ট পাবে জানলে কথাটা তোমাকে বলতাম না। সরি, আনিকা আই এ্যাম ভেরি সরি। সাদিক বললো আনিকা আমি কাউকে সান্ত¡না দিতে পারি না। কারো কান্না মুখ দেখলে আমার আমার একদম ভালো লাগে না। এই মূহুর্তে তোমার কান্না আমার একদম সহ্য হচ্ছে না। প্লিজ তুমি কাঁদবে না। একথা বলে অনিকার মাথায় হাত রাখলো। আনিকা বললো সাদিক ভাইয়া কেন তুমি সময়মত নিজের মনের কথা বললে না? মনের কথা মনে গেঁথে রেখে একাই কষ্ট পাচ্ছ। নিজের একান্ত কিছু কথা কারো না কারো সাথে শেয়ার করতে হয়। তুমি এসবে নেই। নিজের কষ্ট বুকে নিয়ে জ্বলে-পুরে ছারখার হয়ে যাবে। তবুও কাউকে কিছু বলবে না। আনিকা বললো আজ আর না বলে বলে পারছি না। আমিও আপনাকে ভালোবাসতাম। শুধু আপনার মুখের একটা কথা শুনার অপেক্ষায় থাকতাম। কিন্তু কথাটা আর শুনা হয়নি। শেষে মা-বাবার পছন্দে আসল ঠিকানায় চলে গেলাম। কাঁদো-কাঁদো কণ্ঠে আনিকা বললো মানুষের জীবন এমন কেন? আপনি আমাকে ভালোবাসতেন আমাকে বললেন না। আমিও আপনাকে ভালোবাসতাম। কিন্তু আমিতো মেয়ে মানুষ। মেয়েরা নিজের ভালোবাসার কথা সহজে মুখ ফুঁঠে বলতে পারে না। কিন্তু আপনি পুরুষ মানুষ আপনি বললেন না। সাদিক বললো সবই অদৃষ্টের লিখন। এটা তুমি আমি কেউ খন্ডাতে পারবো না। আমি তোমার সব চাহিদা পুরণ করতে পারতাম না। তাছাড়া আমার অভাবের জীবনে তোমাকে মানাতো না। দুঃখ-কষ্ট কি জিনিস তা তুমি জানো না। সুখ-আনন্দ, ঐশ্চর্য্যরে মধ্যে তুমি বড় হয়েছো। তুমি আমার জীবনে এসে দুঃখ-কষ্ট সইতে পারতে না। শুধু ভালোবাসা দিয়ে জীবন চলে না। জীবন ধারনের জন্য অর্থেরও দরকার। বৃটিশ নাট্যকার উইলিয়াম শেকস্পীয়ার বলেছেন, “অভাব যখন দোরগোড়ায় প্রবেশ করে ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়”। বাবার সংসারেও সুখে ছিলে এবং স্বামীর ঘরে গিয়েও সুখে আছো বলে বুঝতে পারছো না কষ্ট বা দুঃখের কি কঠিন যাতনা। আনিকা বললো টাকা-পয়সা, অলঙ্কারে জড়িয়ে থাকলেই সেটাকে সুখ বলে না। যে সুখে আছি সেটা সুখ নয়। নিজের ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে কিছুই নেই। আমার বর আমাকে বিশ্বাস করতে চায় না। বিদেশ থেকে ফোন করার পর সাথে সাথে আমাকে না পেলে খুব বকাবকি করে। আনিকার কথার জবাবে সাদিক বললো স্বাধীনতা আপেক্ষিক ব্যাপার। মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতা বলতে কিছুই নেই। ফরাসী দার্শনিক বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, “Man born free but every where he is chained” “মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মে তবে সর্বক্ষেত্রে সে শৃঙ্খলিত”। তোমার স্বামী বেচারা বিদেশে থাকে। দেশের বাইরে থাকলে এমনিতেই মানুষের নানারকম চিন্তা-টেনশন হয়। তোমাকে হয়তো তিনি বেশি ভালোবাসে তাই বিদেশ থেকে ফোন করে তোমাকে না পেলে তার খারাপ লাগে। এই জন্যই তোমাকে বকাবকি করে হয়তো। শুনেছি তোমার বর লোকটা খারাপ না। তাছাড়া সে নাকি ৬-৭ মাসের মাথায় বাড়ীতে আসে। অনেক বিদেশ প্রবাসী বিয়ে করে বউকে ফেলে বিদেশ চলে যায়। ৫-৭ বছর কোনো খোঁজ থাকে না। সেক্ষেত্রে তুমি অনেক ভাগ্যবতী। তাছাড়া সঠিক সময়ে তোমার দু’টো সন্তান হয়েছে। তাদের আদর-যতত্ন, দেখাশুনা ও লেখাপড়া শিখিয়ে তোমার সময় কেটে যাবে। একথা বলে আনিকার সামনে থেকে চলে এলো সাদিক। হাচতে হাটতে চলে এলো বাজারে। বাজারের অডিও দোকানে বেজে উঠলো “স্বপ্না তো ফির স্বপ্না হোতা হ্যায়, সাচ ইয়ে কব আপনা হোতা হ্যায়”। “স্বপ্ন আবার স্বপ্ন হয়, এই সত্য কখন আপন হবে”। গানটা প্রখ্যাত গীতিকার ফয়েজ আনোয়ারের লেখা। গানের এই অংশ শুনে হেটে চলে সাদিক। সামনের দিকে এগুতে থাকে সে। ফাল্গুনের বিকেলে হালকা রোদের ছটা গায়ে লাগে তার। বাজারের বড় আম গাছটার ঢালে বসে থাকা একটা কোকিল সুরেলা কণ্ঠে কুহু-কুহু করে আওয়াজ দিয়ে উঠে।