লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫
গল্প/কবিতা: ৬৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৯৫

বিচারক স্কোরঃ ৩.১৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftক্ষোভ (জানুয়ারী ২০১৪)

তুষারঢাকা পথ
ক্ষোভ

সংখ্যা

মোট ভোট ১৮ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৯৫

রীতা রায় মিঠু

comment ১৭  favorite ১  import_contacts ১,৩৪২
গত তিনদিন ধরে পারমিতা একপ্রকার ঘরবন্দী হয়ে আছে, ক্রমাগত তুষারপাতের ফলে তুষার জমে জমে ওদের বাড়ীর সামনের অংশে বরফের ছোট খাটো পাহাড় তৈরী হয়েছে। জ্যোতি নিউইয়র্কে নেই, চারদিনের এক সেমিনারে ক্যালিফোর্নিয়া গেছে, ফিরবে আগামী পরশুদিন। পারমিতাকে আজ ঘর থেকে একবটিবারের জন্য হলেও বেরোতে হবে। আর কিছু নাহোক, বাড়ীর সামনের পথ থেকে জমে থাকা তুষার সরিয়ে দিতে হবে। পাশের বাড়ীর স্যান্ডি ফোন করেছিল, মেজাজ খারাপ, ওর বোনের বিরুদ্ধে কোন এক বুড়ী নাকি মামলা করেছে। বোনের বাড়ীর সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় সেই বুড়ী নাকি পা পিছলে পড়ে গেছে, তাই দোষ হয়েছে স্যান্ডির বোনের। স্যান্ডীর বোন কেন তার বাড়ীর সামনের রাস্তা থেকে বরফ কোদাল দিয়ে চেঁছে পরিষ্কার করেনি। স্যান্ডি সেই বুড়ীর উপর রাগে গজগজ করলো কতক্ষণ। স্যান্ডির ফোন পাওয়ার পরেই পারমিতার টনক নড়লো। বাড়ীর সামনের রাস্তাটুকু পরিষ্কার করতে হবে, বলা তো যায়না। কে আবার কখন পা মচকে পড়ে যাবে, হাতকড়া পড়বে পারমিতার হাতে। বিনা দোষে জেলের বার্গার খেতে হবে।
ডিসেম্বারের শীতে পারমিতা পারতপক্ষে ঘর থেকে বের হয়না। এত ঠান্ডা ওর সহ্য হয়না। তুষারপাত দেখতে ভালো লাগে, কিন্তু দুই হাত উঁচু হয়ে জমে উঠা তুষার পরিষ্কার করতে অনেক কষ্ট হয়। সিটি কাউন্সিলের দায়িত্ব মূল রাস্তা পরিষ্কার করা, কারো বাড়ীঘর পরিষ্কার করা ওদের দায়িত্ব নয়। আবাসিক এলাকার বাসিব্দাদের নিজ দায়িত্বে বাড়ীর আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হয়। কারো বাড়ীর সামনের পথ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে কোন পথচারী যদি পা পিছলে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙ্গে, তার চিকিৎসা খরচ সেই বাড়ীর মালিককে বহন করতে হয়। এটাই নিয়ম। এইজন্যই তুষারপাত শুরু হলে বাড়ীর কর্তাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে, প্রাকৃতিক দৃশ্য তো দেখা হয়না, প্রকৃতিকে তখন সুন্দরও লাগেনা, শত্রু মনে হয়। শীতের আমেজ গায়ে মেখে কাঁথা মুড়ি দিয়ে গরম কফির মাগে চুমুক দেবো আর শীত উপভোগ করবো, সে উপায় নেই। ভারী পার্কা গায়ে জড়িয়ে, হাতে মোটা গ্লাভস পড়ে, গলায় মাফলার জড়িয়ে, ভারী জুতা পায়ে দিয়ে শাবল হাতে যদি রাস্তা পরিষ্কার করতে কার ভাল লাগে!
বাড়ীর কর্ত্রী বা কর্তা, কারো মনেই নিরবচ্ছিন্ন সুখ থাকেনা। বাচ্চারা অবশ্য মহাখুশী হয়, তুষার বল বানায়, তুষার মানব বানায়, এ ওর গায়ে তুষার বল ছুঁড়ে মারে, গাড়ীর টায়ারের সাথে দড়ি বেঁধে টানা গাড়ী বানিয়ে তুষার ঢাকা পথে একজন আরেকজনকে টেনে নিয়ে যায়। সবার স্কুল ছুটি থাকে, ওদের তখন আনন্দই আনন্দ। তিন বছর আগেও জমে থাকা তুষার দিইয়ে জ্যোতি আর গুড্ডি স্নোম্যান বানাতো, রেইন ডিয়ার বানাতো, টায়ারের গাড়ি বানিয়ে গুড্ডিকে সেই গাড়ীতে করে টেনে নিয়ে যেতো। এখন গুড্ডি বড় হয়ে যাচ্ছে, দাদারাও কেউ বাড়ী থাকেনা, মেয়েটার সাথে আহ্লাদ করার কেউ নেই। গুড্ডিও খুব চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে। এখন আর স্নোম্যান বানাতে চায়না।
পারমিতাদের প্রতিবেশী সব বাড়ীর আশপাশ পরিষ্কার আছে, পারমিতাদের বাড়ীও পরিষ্কার থাকে, এবার জ্যোতি বাড়ীতে নেই বলে পারমিতাকে শাবল হাতে বের হতে হচ্ছে। মোটা জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে দুই হাতে ভারী গ্লাভস পড়ে পারমিতা বাইরে বের হতেই ঠান্ডা হাড় কাঁপানো শীতে দাঁতে দাঁত লেগে ঠকঠক আওয়াজ হতে লাগলো। হঠাৎ করে ওর কান্না পেয়ে গেলো। এত কষ্ট করছে কেন ও, কার জন্য করছে? দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে কত জমজমাট সংসার ছিল ওদের, দুই ছেলেই এখন কতদূরে থাকে, বছরে একবার দেখা হয়, কখনও হয়না। শুধু গুড্ডিকে নিয়ে এত বড় বাড়ীতে থাকা, জ্যোতিও আগের মত নেই। সংসারের বাঁধন আলগা হয়ে যাচ্ছে। এবছর ক্রীসমাসে দুই ছেলের একজনও বাড়ী আসছেনা, জ্যোতি জানে পারমিতার ঠান্ডা সহ্য হয়না, ও বরফ পরিষ্কার করতেও পারেনা। এমন কোন ইমপর্ট্যান্ট সেমিনার ছিলনা এবার, না গেলেও চলতো, তবুও জ্যোতি গেলো, একবারও ভাবলোনা পারমিতার কষ্টের কথা।।

ফ্রিজিং টেমপারেচারে পারমিতার চোখের জল গালেই জমে গেলো। ওর খুব কষ্ট হচ্ছিল, কিছুটা অভিমানও। আজকের কষ্টটা অন্যরকম, কারও সাথে শেয়ার করার মত নয়, এমনকি মানসীর সাথেও না। স্বামী-সন্তান তার একান্ত আপনার মানুষ, তাদের সম্পর্কে এতটুকু ভুল বুঝার অবকাশ রাখতে চায়না ও, তবে ওদের ব্যবহারে মাঝে মাঝে অনেক কষ্ট পায়, কষ্টগুলো অন্তরে চেপে রাখে। দুই ছেলেই জানে, তাদের মা তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে, তবুও ওরা এলোনা। দুই হাত উঁচু হয়ে জমে থাকা স্নো পরিষ্কার করা খুবই পরিশ্রমের কাজ, ছেলে দুটো একবার ফোন করেও জানতে চাইলোনা, মায়ের দিন কেমন কাটছে। যাক গিয়ে, ওরা না খবর না নিলেও পারিজাত ঠিকই খবর নেয়। প্রতিদিন একবার মাসীকে ফোন করবেই, ক্রীসমাসের ছুটি কাটাতে কালকেই ও আসছে। ওর এক বন্ধুর গাড়ীতে করে আসছে, পারিজাত এলেই পারমিতার মন খারাপ কেটে যাবে। গুড্ডিও খুব খুশী হবে।
পারিজাতের কথা মনে হলেই মেহেদীর কথা মনে পড়ে যায়। ছেলেটা কি বেঁচেই আছে, নাকি ওকে মেরেই ফেলেছে, কে জানে। সেদিন পারমিতা ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে কিছু অচেনা বন্ধুদের আনফ্রেন্ড করছিল, মেহেদী হাসান খানের নামটা দেখেই ও কেমন যেনো আনমনা হয়ে গেছিল। পারমিতার ছেলে, পারমিতাকে ‘মাম্মি’ ডাকতো, কোথায় হারিয়ে গেছে মেহেদী, মেহেদীর একাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেটেড হয়ে আছে, পাকিস্তানের কোন অন্ধকার কারাগারে ছেলেটা পচছে, ওকে মেরে ফেলেনি তো? বুকটা এমন ফাঁকা লাগছিলো, মেহেদীর মত আধুনিক, ব্রাইট ছেলেদের বর্তমান পাকিস্তান সরকার সহ্য করতে পারেনা। ক্লাস নেয়ার সময় কি এমন কথা সে বলেছিল কে জানে, মৌলবাদী ছাত্র ছাত্রীরা ওর বিরুদ্ধে মিছিল করলো, ওকে জেলে নিয়ে গেলো। সকলের সাথে ওর সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়া হলো।
পারিজাতের বন্ধু ছিল মেহেদী, পারিজাতকে ছোট বোনের মত দেখতো, বলেছিল যে একাত্তরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তান যা যা করেছিল, তার সবটুকুই ছিল অন্যায়, যদিও তখন তার জন্ম হয়নি, তবুও পাকিস্তানের হয়ে সে প্রতিটি বাংলাদেশীর কাছে ক্ষমা চায়, বর্তমান পাকিস্তানের শাসকদের প্রতিও তার ক্ষোভের শেষ নেই। সে এবং তার পরিবার মোটেও ধর্মান্ধ নয়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন নয়, প্রতিহিংসাপরায়ন নয়, যুদ্ধবাজ নয়, মেহেদি নিজে একজন কবি, যে হাতে কবিতা লেখা হয়, সে হাত কখনও তরবারী স্পর্শ করেনা, ডাক্তারী পড়তে পড়তে মেহেদী আর্ট ফিল্ম বানানোর দিকে ঝুঁকে পড়েছিল, ডাক্তারী পড়া ছেড়ে দিয়ে ইংরেজী সাহিত্য এবং থিয়েটারের উপর বিশেষ কোর্স নিতে আমেরিকান সরকার থেকে এক বছরের স্কলারশীপ পেয়েই আমেরিকা এসেছিলো, তখন পারিজাতের সাথে পরিচয় হয়, পারমিতার সাথে ফোনে কথা হয়, পারমিতাকে ‘মাম্মি’ ডেকেছিল, কোর্স শেষ করে নিজ দেশে ফিরে যায়, পারমিতাকে বলেছিল, সে আবার আসবে, মাম্মিকে দেখার জন্য হলেও আসবে। পাকিস্তান ফিরে গিয়ে ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার হিসেবে চাকুরী পায়, ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার পায়, প্রতিটি সাফল্যের সংবাদ পারমিতাকে জানাতো আর বলতো, খুব শীঘ্র সে মাম্মির সাথে দেখা করতে আসবে। তার মধ্যেই ঘটে গেলো ঘটনা, ক্লাসে পড়ানোর সময় কোন এক ফাঁকে সে ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কিছু বলেছিল, ছাত্র ছাত্রীদের প্রায় সকলেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে, মেহেদীকে ঘিরে ফেলে, আইনশৃংখলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা হয়, হারিয়ে যায় মেহেদী। ছেলেটাকে হয়তো মেরেই ফেলেছে, এ পর্যন্ত ভাবতেই পারমিতা শক্ত হয়ে গেলো। হাতের শাবল আর চলছেনা, খুব বেশী ঠান্ডা লাগছে, শরীর কাঁপছে। বুঝতে পারছেনা শরীরের এই কাঁপুনীর কতটুকু শীতের ঠান্ডায় আর কতখানি পাকিস্তানী বর্বরদের উপর রাগে। অসহায় ক্ষোভে-দুঃখে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করছে।



পারমিতা ঘরে ফিরে এলো, চোখের জলের ধারা দু গালে জমে গিয়ে কেমন যেনো ছুঁচ ফুটাচ্ছে। এমন কখনও হয়না, আসলে নানা কারণে পারমিতার মন ভালো নেই। দেহটা পড়ে আছে আমেরিকাতে, মন পড়ে আছে বাংলাদেশে। ইদানিং সংসারের কাজে মন দিতে পারেনা, রান্না বান্নাও আগের মত জুতসই হয়না। অতিথি আপ্যায়ন কমে গেছে, এতে জ্যোতি বেশ বিরক্ত। পারমিতার সাথে প্রায়ই সে ঝেঁঝে উঠে, পারমিতা অবশ্য চুপ করে থাকে, কোন উত্তর দেয়না, তাই দুজনের মধ্যে কথাও খুব কম হয়। জ্যোতির ব্যবহারে এই পরিবর্তন পারমিতা বুঝতে পারে, কিন্তু সংসারে মনোযোগ দিতে পারেনা।
সেদিন পুটুস বলল, “ মা, এবার ক্রীসমাস ব্রেকে হাওয়াই ঘুরে আসি”।
অভ্যাসমতই পারমিতা বকে উঠলো, “ কি বললি, ক্রীসমাসের ছুটিতে নিজের বাড়ী না এসে হাওয়াই বেড়াতে যাবি? কেন?”
“ লাভ কি? তুমি তো নাকি সারাদিন রাত কম্পিউটারে বসে থাকো, রান্না-বান্নাও করোনা, গুড্ডির প্রতিও নাকি তোমার কোন মনোযোগ নেই”
“গুড্ডির প্রতি মনোযোগ দেয়া কি শুধু আমার কর্তব্য? এতই যদি বুঝিস তাহলে ছোট বোনটাকে দেখতে না এসে আনন্দ ভ্রমনে যাচ্ছিস কেন?”
“ মা, রাগ করোনা, তুমি এখানে বসে থেকে কি করতে পারছো দেশের জন্য, রাত জেগে জেগে তোমার শরীর স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাচ্ছে, প্রায়ই নাকি মাথা ব্যথা হয়, খাওয়া-দাওয়াও করোনা, ফেসবুকে বসে এই হাওয়া যুদ্ধ করে লাভ কি হচ্ছে বলোতো। বাপির সাথে মাঝে মাঝে কথা হয়, বাপি কিন্তু তোমার কান্ড কারখানায় খুব বিরক্ত।“
“ বাপির কথা বাদ দে, বাপির যত্ন করিনা তাই বাপি বিরক্ত, তুই কেন বিরক্ত? আমি কি তোর কোন কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি নাকি তোর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছি? আমি দেশের কথা ভাবি কারণ দেশে এখনও আমার বাপ-মা, ভাই-বোন রয়ে গেছে, তোদের বাপ-বেটাদের কেউ তাদের খোঁজ খবর রাখিসনা, তার জন্য তো আমি তোদের উপর রাগ করিনা, কোন নালিশ করিনা, আমি আমার মত থাকি, ফেসবুকে লেখালেখি করে কোন কাজ হয় না কে বললো? এই যে তোরা বাপ-বেটাতে আমার উপর রেগে আছিস, তুই বাড়ী না এসে বিশ্ব ভ্রমনে যাচ্ছিস, তোর বাপি আমাকে আর গুড্ডিকে এত বড় বাড়ীতে একা রেখে ক্যালিফোর্ণিয়া যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে বুঝিনা ভেবেছিস! আমাকে শাস্তি দিচ্ছে, ভদ্রলোকী শাস্তি। আমি একা থাকতে ভয় পাই জেনেও সে সেমিনারে যোগ দিতে চলে যাচ্ছে, তাহলে ফেসবুকে লেখালেখি করায় কাজ তো হচ্ছে। যাক গিয়ে, ক্রীসমাস ব্রেকে বাড়ী আসতে হবেনা, ঘুরে আয় হাওয়াই, পারিজাত আসবে, ওকে নিয়ে মনে হয় ভালোই কাটবে ক্রীসমাস।

-তা তো কাটবেই, মাসী –বোনঝি মিলে রাজনীতি করবে। পারিজাত তো তোমার মতই হয়েছে, সারাক্ষণ ফেসবুকে ড্যাম পলিটিক্স নিয়ে কচকচানি করে। ওকে বলেছি, লেখাপড়া বাদ দিয়ে পলিটিক্স নিয়ে প্যাঁচাল পারলে দেবো ওকে আনফ্রেন্ড করে।

-শুধু পারিজাত কেন, পারিজাত নাহয় বাংলাদেশ থেকে এসেছে তাই বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায়, কিন্তু তোর মানসী আন্টির মেয়ে তাপসী? ও তো য়ামেরিকায় জন্ম, আমেরিকায় বেড়ে উঠেছে, ও কি করে এমন রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠলো! শুধু কি রাজনীতি সচেতন, দেশের জন্য ওর কি টান! এই যে আমার সাথেই ও বাংলাদেশ যাচ্ছে, বলতো কেন? যাচ্ছে ‘কেয়ার’এর অধীনে কাজ করতে। তোর বাপির মত তাপসীর ড্যাডিও তাপসীকে দেশে যেতে দিতে চাইছেনা, মানসীর সাথে দিনরাত ঝগড়া করছে, কই, তাপসী তো একটুও বিচলিত হচ্ছেনা! ঠিকই দেশে যাচ্ছে।

-ঠিক আছে মা, এগুলো শুনতে ভালো লাগছেনা। তোমার ভালোর জন্যই তোমাকে এভাবে বলি, তুমি বুঝতে পারোনা। অযথা রাগ করো আমাদের সাথে। তুমি নিজে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছো, সাথে তাপসীয়ার পারিজাতকে জুটিয়ে নিয়েছো, এটা কি ঠিক হচ্ছে? ওরা কত ছোট, তার উপর ইয়াং মেয়ে, বাংলাদেশে যখন যাবে, কেউ যদি ওদের কোন ক্ষতি করে, তখন কি হবে? তুমি বা তোমার ফেসবুক বন্ধুরা কি পারবে ওদেরকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে?
-পুটুস, এবার ফোন রেখে দে, আমার মাথা ব্যথা করছে, তোদের যার যেভাবে খুশী চল, আমি কখনও বাধা দেবোনা। ঠিক মত খাওয়া-দাওয়া করিস, আমার স্বাস্থ্য নিয়ে ভাববার কিছু নেই।




কাল দুপুরের মধ্যেই পারিজাত এসে পৌঁছাবে, গত পরশুদিন ওদের সেমেস্টার শেষ হলো। নতুন বছর নতুন সেমেস্টার শুরু হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকবে, সামার ভ্যাকেশানে দেশে যাবে। গত মার্চের স্প্রিং ব্রেকে মেয়েটা এখানে এসেছিল, তখন মানসীর ছেলে মানস এসেছিল, খুব ভালো সময় কেটেছে সবাই মিলে। এত মাস পর আবার ক্রীসমাস ব্রেকে পারিজাত আসছে। মাঝে একবার পারমিতা ভার্জিনিয়া গেছিল, ওর কলেজের বন্ধু কেয়ার সাথে দেখা করতে। ভার্জিনিয়া টেক ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে পারিজাতের সাথেও দেখা করে এসেছে। এদেশে পূজো বা ঈদের ছুটি বলে তো কিছু নেই, ক্রীসমাসের ছুটিতেই সব আনন্দ পুষিয়ে নিতে হয়।


তাপসীটা চলে এলে ভালো হতো। পারমিতা, পারিজাত , তাপসী তিন পাগলের মেলা বসতো। এমনটি ভাবতেই পারমিতার হাসি পেয়ে গেলো। পাগলই তো, পুটুসের রাগ করার কারণ আছে, মেহেদীর খোঁজ না পেয়ে পারিজাত এখানকার বিভিন্ন সিনেটরদের কাছে চিঠি পাঠাতে শুরু করেছে মেহেদীর খোঁজ জানতে তাঁরা যেনো পাকিস্তান সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই সমস্ত কথা সে ফেসবুক স্ট্যাটাসেও লিখেছে, তাইতেই পুটুস এবং জ্যোতি এত বিরক্ত হয়েছে। জ্যোতি তো পাকিস্তানের নামই শুনতে পারেনা, মেহেদীর সাথে পারিজাতের বন্ধুত্বে জ্যোতি ভীষণ রাগ করেছিল। পরে মেহেদীর গ্রেফতার হওয়ার সংবাদ শুনে বলেছিল,

“বলেছিলাম, পাকিস্তানীরা বর্বর, দেখলে তো, এরা একজন অধ্যাপককে পর্যন্ত সম্মান করেনা, ছাত্র ছাত্রীরা বিজ্ঞান শেখার পরিবর্তে জেহাদ করতে শিখছে, যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা একজন মেধাবী শিক্ষককে সম্মান করতে জানেনা, সে দেশের পরিণতি যে কি হয়, তা আজকের পাকিস্তানের দিকে তাকালেই বুঝা যায়”।

পাকিস্তানীদের ব্যাপারে জ্যোতি কখনও কমপ্রোমাইজ করেনা, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী জ্যোতিদের গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে, জ্যোতির তিন কাকা, বুড়ো দাদুকে দুই চোখ বেঁধে সকলের সাথে দাঁড় করিয়ে গুলী করেছিল, জ্যোতির বাবার মৃত্যুর পর এই তিন কাকা ছিল জ্যোতির একমাত্র আশ্রয়, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন পাকিস্তানীকে সে ক্ষমা করতে পারবেনা।

ইদানিং জ্যোতির সাথে পলিটিক্স নিয়ে পারমিতা কোন কথা বলেনা। ওর বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, কাজেই পাকিস্তানের ব্যাপারে পারমিতারও কোন দূর্বলতা নেই, তারপরেও পারমিতা জ্যোতির মত কঠিন নয়, হয়তো এমনও হতে পারে, রাজাকার-আলবদররা পারমিতাদের বাড়ীঘর লুটপাট করে জ্বালিয়ে দিলেও পারমিতার বাবাকে হত্যা করতে পারেনি, কিন্তু জ্যোতির দাদু এবং কাকাদের পাকিস্তানীরা হত্যা করেছে বলে পাকিস্তানীদের ব্যাপারে ওর রাগ অনেক বেশী। ঠিক রাজাকার-আলবদরদের ব্যাপারে পারমিতা যেমন অনমনীয়। সেই শহীদ জননী যখন যুদ্ধপরাধী বিচারের দাবীতে আন্দোলন শুরু করলেন, তখন থেকেই পারমিতা এই আন্দোলনের সাথে জড়িত। ওর কথা পরিষ্কার, পাকিস্তান আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল, যুদ্ধ করেছিল, কাজেই তারা নির্বিচারে বাঙ্গালী নিধন করেছিল। যুদ্ধের ময়দানে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে নিধন করে, এটাই যুদ্ধের নিষ্ঠুর নিয়ম। কিন্তু রাজাকার-আলবদররাতো আমাদেরই জাত ভাই ছিল, এক ভাষায় কথা বলা মানুষ, একই মায়ের সন্তান হয়ে ওরা কি করে পারলো পাকিস্তানীদের সাথে হাত মেলাতে? কি করে পারলো নিজের দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে? মাঝে মাঝেই পারমিতা ভাবে, রাজাকারগুলো কত বড় ক্ষতি করেছে দেশটার, আহারে! শত শত বুদ্ধিজীবী হত্যা করে জাতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। এদেরকে ক্ষমা করার প্রশ্নই আসেনা, রাগে শরীর কাঁপে, একেকবার ইচ্ছে করে, এইসব বেঈমানদের রাস্তার মধ্যে দাঁড় করিয়ে ----- থাক, বাকীটুকু আর বলার দরকার নেই।

সেদিন তাপসী ফোন করেছিল, ১৫ই ডিসেম্বারের রাতে। পারমিতার কাছ থেকে জানতে চাইছিল,
“মাসী, Tomorrow afternoon 4:31 সময়ে তো দেশে সবাই “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গাইবে, আমরা তখন কি করতে পারি? আমাদের এখানে তো তখন অনেক রাত থাকবে”।
তাপসীর মুখে এমন বাংলা শুনতে খুব ভালো লাগে। মানসী সবসময় বকাবকি করে ঠিক করে বাংলা বলার জন্য। পারমিতা হাসে, পারমিতার কাছে মনে হয়, বলুক নাহয় এভাবেই, অসুবিধা কি, এর নাম হবে ‘প্রবাসী বাংলা’। যাই হোক, পারমিতা বলেছিল,

“ তাপু মামনি, তুমি দেশকে অনেক ভালোবাসো তা আমি জানি, ঘুম ভাঙ্গলে টিভি অন করে দিইয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে সবার সাথে “য়ামার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” গেয়ো, তাহলে বাকী জীবন তোমার মনে থাকবে, এমন একটি অভূতপূর্ব মুহূর্তে তুমিও যোগ দিয়েছিলে। আর যদি ঘুম না ভাঙ্গে, তাহলে দিনের যে কোন সময় তুমি গানটির প্রথম দুই লাইন গেয়ে ফেলো, তাতেও চলবে।
-মাসী, আমি জেগেই থাকবো। আচ্ছা, ৪টা ৩১ মিনিট সময়ে কেন গাইতে হবে?
-১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বার বিকেল ৪টা বেজে ৩১ মিনিটে পাকিস্তানী বাহিনী বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কমান্ডারদের কাছে আত্মসমপর্ণ করেছিলো, তাই তো এই মুহূর্তটিকেই বেছে নেয়া হয়েছে।
-মাসী, তুমি কি জেগে থাকবে? আচ্ছা, পারিজাত দিদি কি জেগে থাকবে?
-হ্যাঁ সোনা, আমি জেগে থাকবো, আমি টিভির সামনেই থাকবো, আমি গাইবো তো। পারিজাতের সাথে আমার কথা হয়নি, তবে হয়তো জেগে থাকবে। আচ্ছা, তোর ড্যাডি তোকে রাত জাগতে দেবে?
-ড্যাডি তো ঘুমিয়ে থাকবে, মা জেগে থাকবে জানি, দাদাভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে আমার, ও বলেছে গান গাইবার সময় ছবি তুলে রাখতে, পরে ফেসবুকে দিয়ে দিতে। তাহলে সবাই জানবে যে আমেরিকাতেও আমরা ‘আমার সোনার বাংলা’ গেয়েছি।

১৬ই ডিসেম্বার বাংলাদেশ সময় দুপুর দেড়টার দিকে যখন বিশ্বের দীর্ঘতম মানব পতাকা তৈরী করা হলো, পারমিতা জানলো, পতাকার লাল সূর্য্য তৈরী করেছে আট হাজার সেনা সদস্য, ওর দুই চোখ লাল সূর্য্যের মাঝে কর্ণেল ভাইকে খুঁজে ফিরছিল। সারা রাত জেগে থেকে নিউ ইয়র্ক সময় ভোর ৫টা ৩১ মিনিটে টিভির সামনে দাঁড়িয়ে যখন বাংলাদেশের সকলের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে “ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গাইছিলো, দুই চোখ বেয়ে তখন জলের ধারা নেমেছে। সে কান্নায় আনন্দ ছিল, বিজয়ের বার্তা ছিল, আর ছিল মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি অশ্রু ভেজা সম্মান। জাতীয় সঙ্গীত শেষ হতে না হতেই তাপসীর টেক্সট মেসেজ,
“ মাসী, গো অন ফেসবুক, দেখো কি করেছি”।

পারমিতা এক কাপ গরম চা খেলো, তারপর ফেসবুকে ঢুকলো। দেখে তাপসী তিনটি ছবি আপলোড করেছে, একটিতে মানসী, আরেকটিতে তাপসী এবং তৃতীয়টিতে মানস, সকলেই এক হাত বুকের বাম পাশে ছুঁইয়ে মাথা উঁচু করে গাইছে। পারমিতার বুকের কোথাও খুব সূক্ষ্ম ব্যথা অনুভূত হলো, জ্যোতি নাহয় এইসকল ব্যাপারে উৎসাহ দেখায়না, কিন্তু দেশের ব্যাপারে ছেলে দুটোও এমন নির্লিপ্ত হলো কি করে? মায়ের দিক ওরা কিছুই পায়নি। সেদিন পারমিতার খুব অপমান লেগেছিল, খুব সূক্ষ্ম ঈর্ষাবোধ তৈরী হয়েছিল মনের এক কোণে, মানসীর ছেলে-মেয়ে দুটোই খুব ভালো হয়েছে। পারমিতার ছেলেরাও খুব ভালো, তবে ওরা অনেক বেশী আমেরিকান হয়ে গেছে।

সকাল সাতটার দিকে তাপসী ফোন করেছে,
“ মাসী, আমি আমার ছবিটা ব্লগার’স অ্যাক্টিভিটিতে পোস্ট করেছিলাম, ক্যাপশান লিখেছিলাম, যারা ভাবে বিদেশে থাকলে দেশকে ভালোবাসা যায়না, এই পিকচারটা তাদের জন্য পোস্ট করলাম। অনেকে ‘লাইক’ দিয়েছে, কিন্তু একজন কমেন্ট করেছে, “ তুমি কেমন দেশপ্রেমিক সেটা তোমার প্রোফাইল দেখে বুঝা যায়। তুমি বাংলা মায়ের কলঙ্ক’। কলঙ্ক কথার মানে কি? খারাপ কিছু?
-কেন, এমন কথা লিখলো কেন? তোর প্রোফাইলে কি আছে যে তোকে এমন কথা লিখলো? আমাকে লিঙ্ক দে, ঐ রাজাকারের নাতিকে একটা শিক্ষা দিয়ে দেব।
-আমি সাথে সাথে ব্লক করে দিয়েছি।
-ভাল করেছিস, কলঙ্ক মানে কালো দাগ। এটা নিয়ে মাথা খারাপ করিসনা। কাদের মোল্লার ফাঁসী হয়েছে তো, তাই ওরা একটু ক্ষেপে গেছে। ছবিতে তোকে আমেরিকান ড্রেসে দেখেছে, তাইতেই বলেছে এই কথা।
-হা হা হা! আমি আমেরিকায় থাকি, আমেরিকান ড্রেস পড়বোনা তো কি শাড়ী পড়ে ক্লাসে যাব? আমেরিকান ড্রেস পড়ে কি বাংলাদেশকে ভালোবাসা যায়না? এটা কেমন কথা হলো?
-রাগিসনা মা, সবার কথা ধরতে নেই। একজন খারাপ মন্তব্য করেছে, কিন্তু তিনশ জন তোর এই চেষ্টাকে ‘লাইক’ করেছে। মা’কে বলেছিস? মা’কে বলিসনা কিন্তু, মা যা মাথা গরম, সেই ছেলের চৌদ্দ গুষ্টিকে খুঁজে বের করে শায়েস্তা করবে।
-সেটাই ঠিক হবে মাসী, কাউকে আহ্লাদ দেয়া ভাল কাজ নয়। রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে, আমাকে বলেছে বাংলাদেশের কলঙ্ক, কত বড় সাহস, আর আমিই কিনা ড্যাডির সাথে ফাইট করে তবেই বাংলাদেশে যাচ্ছি।



গত সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা সারা দেশে আবারও যে তুঘলকী কান্ড শুরু করেছে, পারমিতার মাথা গরম হতে শুরু করেছে। তুহীনের দেখা স্বপ্নের সাথে মিলে যাচ্ছে সবকিছু। দুই মাস আগেও যেভাবে চলন্ত বাসে পেট্রল ছুঁড়ে দিয়ে বাসের নিরীহ যাত্রীদের পুড়িয়ে মেরেছে, রেললাইনের ফিস প্লেট তুলে ফেলে ট্রেনকে লাইনচ্যুত করেছে, অবরোধের নামে রাস্তা ব্লক করার জন্য যেভাবে বিশাল বড় বড় গাছগুলোকে কেটে ফেলেছে, এখনও তাই চলছে। এরমধ্যে ঘটে গেছে চরম উত্তেজনাকর ঘটনা, যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার বিচারের রায় কার্যকর হতে না হতে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে কাদের মোল্লার জন্য শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। ক্রিকেটার ইমরান খান যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠেছে, বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে, পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে ফেলছে। জ্যোতির সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলার মুখ নেই। আগে পারমিতা বলতো, পাকিস্তানের সকলেই তো আর খারাপ নয়, ভালো মানুষও তো আছে। মেহেদী কি খারাপ মানুষ? সেই মেহেদীকেই ওরা গায়েব করে দিয়েছে, মেহেদীর পরিবারকে কোথাও সরিয়ে দেয়া হয়েছে, এমন একটি দেশের পক্ষ নিয়ে কথা বললে জ্যোতিই একদিন ওকে ছেড়ে চলে যাবে, এমনই রাগ পাকিস্তানের উপর।

আর এদিকে পারমিতার তো মাথা গরম, সারা দেশজুড়ে জামাতীদের তান্ডবে দেশ প্রায় অচল হয়ে গেছে। সাতক্ষীরাতে তো যাচ্ছে তাই অবস্থা! বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড থেকে সাতক্ষীরাকে ওরা আলাদা করে ফেলেছে, সেখানে ঠিক একাত্তরের স্টাইলে জামাতীরা সাধারণ মানুষকে খুন করছে। পারমিতার খুব অসহায় লাগে, টিভি অন করলেই মানুষের বিলাপ, আগুনে পোড়া শরীর, আগুনে পুড়ে মৃত্যু, সব মিলিয়ে নারকীয় অবস্থা। বাংলাদেশটাকে এভাবে পুরোপুরি ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কিছু অমানুষ, কিছু দূর্বৃত্ত? জানুয়ারীতে ও দেশে যাবে, প্লেনের টিকেট কাটা হয়ে গেছে, মা-বাবা দুজনেই ওকে দুই হাত জোড় করে মিনতি করছে, টিকিট ক্যানসেল করে দেয়ার জন্য। জ্যোতিও বলছে টিকিট ক্যানসেল করতে, পারমিতা গোঁ ধরে আছে টিকিট ক্যানসেল করবেনা, দেশে যাবেই যাবে। এই নিয়েই জ্যোতির সাথে মতবিরোধ, এই রাগেই জ্যোতি ফালতু কারণ দেখিয়ে ক্যালিফোর্ণিয়া গিয়ে বসে আছে, মানসী ফোন করেছিল গত পরশু, তাপসীকে দেশে পাঠাতে চাইছেনা, দেশের এই অবস্থায় পারমিতাই বা কোন ভরসায় তাপসীকে সাথে করে নিয়ে যাবে? পারমিতা হেরে যাচ্ছে। তাপসীর কাছে হেরে যাচ্ছে, তাপসীকে কথা দিয়েছিল বাংলাদেশে নিয়ে যাবে, সাথে নিয়ে ঘুরবে, সিলেট, চিটাগাং, কুয়াকাটা, কক্সবাজার যাবে। দেশে যেতে দিচ্ছেনা শুনে তাপসী নাকি খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, মানসী ফোন করে পারমিতার কাছে অনুরোধ করেছে, পারমিতা যেন তাপসীকে বাস্তবতা বুঝিয়ে বলে।

শুকনো নরম কাপড়ে পারমিতা চোখের জল মুছে ফেললো, সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ও যাবে, তাপসীকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মানাতে চেষ্টা করবে। জ্যোতি বা পুটুস ,পুকুনকে কিছুই বলবেনা, ওদের প্রতি একরাশ অভিমান, ক্ষোভ, দুঃখ জমা করে রেখে যাবে এই বিশাল বাড়ীর প্রতিটি কক্ষে। দেশের জন্য টান থাকা যদি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, এই অপরাধে যদি স্বামী-পুত্রদের কাছ থেকে এমন ব্যবহার পাওনা হয়, তাহলে আর কিসের সংসার, দেশের কন্যা দেশেই ফিরে যাওয়া ভালো, সেখানে আর কেউ না থাক, মা-বাবা তো আছেন! দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার সাথে সাথে মন ভালো হয়ে গেলো, নিজেকে আর পরাজিত মনে হচ্ছেনা, তুষার ঢাকা বাইরের পথটুকু পরিষ্কার করতে আর বেশী কষ্ট হবেনা। এক কাপ চা খেয়ে আবার শাবল হাতে বের হবে পারমিতা, ঠান্ডা হয়ে জমে থাকা বরফের স্তুপ শাবলের একেক কোপে পরিষ্কার করে ফেলবে। বাঁচতে হবে, আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতেও হবে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • এফ, আই , জুয়েল
    এফ, আই , জুয়েল # হ্যা---দিদি । এবারো বেশ খানিকটা বড় হয়ে গেছে । তবে গল্পের থীম , ধারাবাহিকতা ও গতি অনেক চম?কার । আপনি নিজস্ব একটা ষ্টাইল সৃষ্টি করে ফেলেছেন । এই লেখাগুলো দিয়ে আগামীতে বই বের করলেও করা যেতে পারে । == ধন্যবাদ ।।
    প্রত্যুত্তর . ১২ জানুয়ারী, ২০১৪
  • মামুন ম. আজিজ
    মামুন ম. আজিজ রীতাদি আপনার এই এটা একটা বৈশিষ্ট্য---কেমন?....এই যে সমসমায়কি ঘটনাগুলো কম্পাইল করে গল্পে প্রথিত করার বিষয়....যেন কোন পত্রিকার নিয়মিত গল্প কলাম......বেশ।
    প্রত্যুত্তর . ১৩ জানুয়ারী, ২০১৪
  • ঐশিকা বসু
    ঐশিকা বসু ভাল লাগল। বিশেষতঃ শেষটা। শুভেচ্ছা রইল।
    প্রত্যুত্তর . ১৩ জানুয়ারী, ২০১৪
  • কবিরুল ইসলাম কঙ্ক
    কবিরুল ইসলাম কঙ্ক ভালো লাগলো। পত্রিকা http://pratichchhabi.blogspot.in/ দেখুন ।
    প্রত্যুত্তর . ১৫ জানুয়ারী, ২০১৪
  • সুমন
    সুমন আপনার লেখার চরিত্রগুলো বেশ চেনা জানা হয়ে উঠছে অথচ সমসাময়িকতা ধারন করায় একঘেয়ে হচ্ছে না। এটাই আপনার লেখাগুলোর সবচে বড় গুণ। ভাল লাগা জানবেন।
    প্রত্যুত্তর . ১৮ জানুয়ারী, ২০১৪
  • M Shafiul Islam
    M Shafiul Islam রীতা রায় মিঠুর লেখা বরাবরই ভালো লাগে । এই লেখাটি অনবদ্য ।শেষ প্যারাটি অসাধারণ ।
    প্রত্যুত্তর . ১৮ জানুয়ারী, ২০১৪
  • মোঃ মহিউদ্দীন সান্‌তু
    মোঃ মহিউদ্দীন সান্‌তু আপনর লেখা থেকে বরাবরই শিক্ষানিয় বিষয় পাওয়া যায়। তাই লেখাগুলো খুব ভালো লাগে। এটাও তার ব্যাতিক্রম নয়।
    প্রত্যুত্তর . ১৯ জানুয়ারী, ২০১৪
  • ছন্দদীপ বেরা
    ছন্দদীপ বেরা অর্ধেকটা আজ আর বাকীটা পরে পড়ব । ভাল লেগেছে ।
    প্রত্যুত্তর . ১৯ জানুয়ারী, ২০১৪
  • আল জাবিরী
    আল জাবিরী অসাদারন ................
    প্রত্যুত্তর . ২৭ জানুয়ারী, ২০১৪
  • সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
    সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী অসাধারণ অপূর্ব একটি লেখা পড়লাম। খুবই ভালো লাগলো।
    প্রত্যুত্তর . ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

advertisement