আজ দিনটা ভারী সুন্দর, তিনদিন একঘেয়ে বৃষ্টি শেষে আজ ঝকঝকে রোদ উঠেছে। বাড়িতেও আজ সাজ সাজ রব। রান্নাঘরে থেকে দিদিভাইয়ের গলার আওয়াজের সাথে থালা বাসনের টুং টাং ঝনঝন আওয়াজ ভেসে আসছে, খুব রান্নাবান্না হবে মনে হয়। বুঝতে পারছি সন্ধ্যের সময় নির্ঘাত দিদিভাইয়ের বন্ধুরা আসবে। এখনও বুঝতে পারছি না আজ কী উৎসব!
দিদিভাইয়ের জন্মদিন তো নয় আজ, তবে কি জামাইবাবুর জন্মদিন না-কি দিদি জামাইবাবুর বিবাহবার্ষিকী? হবে কিছু একটা। সে যে উৎসবই হোক, বাড়িতে অতিথি এলে আমার খুব ভালো লাগে। সারা বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। জম্পেশ খাওয়া দাওয়া তো আছেই, জমজমাট গান বাজনাও চলে। সকলে গান করে, আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি।

বাড়িতে অতিথি এলে দিদিভাইয়ের কাজকর্মের অন্ত থাকে না। একবার রান্নাঘরে যাচ্ছে, একবার ভাঁড়ার ঘরে যাচ্ছে, আরেকবার শোবার ঘরে বিছানা বালিশ গোছাচ্ছে। এর ফাঁকে ফাঁকেই ঘরদোর ঝাড়পোঁছও চলছে। দিদিভাইয়ের ছোটাছুটি দেখে আমার মায়া লাগে।
দেশের সবাই শুধু আমেরিকা আমেরিকা করে, আমেরিকায় কী যে সুখ আছে বুঝতে পারি না। সাধের আমেরিকায় তো দেখি দিদিভাইকে একা হাতে সব কাজ করতে হয়। কাজগুলো একটু এগিয়ে দেয়ার জন্য আজ পর্যন্ত কোনো বিন্তির মা, খেদির মা’কে তো আসতে দেখলাম না। দেশে তো দিদিভাইকে এক গ্লাস জল গড়িয়ে খেতে দেখিনি। হাঁক দিলেই বিন্তির মা জলের গ্লাস নিয়ে হাজির হতো। আর এখানে দেখো, জুতা সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ, রাজার দুলালিকেই সামলাতে হচ্ছে।

আমাদের বয়েস হয়েছে, তার উপর দিনরাত টেবিলের উপর বসে থেকে গায়ে ব্যথা হয়। অবশ্য ঘর দুয়ার গোছানোর সময় আমাদের শরীরটাও একটু ঝাড়পোছ হয়।
দিদি যখন আমাদের গা ঝাড়পোছ করে, ব্যথায় আরামও হয়, আমাদের ধবধবে সাদা মসৃণ ত্বকে লেগে থাকা হালকা ধূলাটুকুও পরিষ্কার হয়ে যায়। অবশ্য আমেরিকায় এই এক সুখ, দরজা জানালা বন্ধ থাকে, বাইরের ধূলোবালি মশা মাছি কিছুই ঘরে ঢুকতে পারে না, আমাদের ত্বকেও ময়লা লাগে না। সাবান সোডা দিয়ে ঘষামাজা ছাড়াই আমাদেরকে ঝকঝকে পরিষ্কার দেখায়।

আমি আবার খুব শৌখিন, সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করি। নিজে নড়াচড়ার ক্ষমতা থাকলে প্রতিদিন নিজেই নিজের ত্বকের যত্ন নিতাম। বেচারা দিদিভাইকে আর এতো ব্যস্ত হতে হতো না।
তবে দিদিভাই খুশিমনেই আমাদের যত্নআত্তি করে। প্রায়ই আমাদের গায়ে হাত বুলায়, আলতো করে নেড়েচেড়ে দেখে! আমাদের গায়ে দিদিভাইয়ের মায়ের হাতের ছোঁয়া আছে তো, তাই হয়তো আমাদের স্পর্শ করে নিজের মা’কে অনুভব করে।

আমাদের ভাগ্যটা ভালো। দিদিভাইয়ের মা যেমনি আমাদের খুব ভালোবাসতো, দিদিভাইও খুব ভালোবাসে। অতিথিদের কাছে আমাদের সম্পর্কে রাজ্যের গল্প করে। শুনতে শুনতে গল্পগুলো আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। আর আমাদের নিয়ে গল্প করার সময় দিদিভাইয়ের মুখ চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। নিজেকে তখন সৌভাগ্যবতী মনে হয়।


দিদিভাই এখন রান্নাঘরে ভীষণ ব্যস্ত। একা হাতেই কুটনো কাটা, বাটনা বাটা, পোলাও বিরিয়ানি মাছ মাংস রসগোল্লা চমচম বানাতে হবে। সন্ধ্যার আগে দম ফেলার ফুরসত পাবে বলে মনে হয় না। অতিথিরা আসার আগে আমিই বরং তোমাদেরকে আমাদের গল্প শোনাই।


অনেক বছর আগের কথা, ছোটবেলায় আমরা ছিলাম ছয় ভাই ছয় বোন। একাত্তর সালে পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, দিদিভাইয়েরা এই যুদ্ধকে বলে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানে, দিদিভাইদের বাড়িতে। দিদিভাই তখন এই এতোটুকুন, ঝাঁকড়া চুল লাল ফ্রক পরা পুতুলের মতো দেখতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিম পাকিস্তানী মিলিটারি্রা পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের উপর হামলে পড়ে। কামান বন্দুক দিয়ে পাখি মারার মতো করেই মানুষ মারতো। তখন পাকবাহিনীর হাত থেকে বাঁচার জন্য দলে দলে মানুষ এখান থেকে সেখানে পালিয়ে যেতো। কেউ যেতো এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে, কখনো ঝোপে জঙ্গলে। প্রচুর মানুষ পালিয়ে ভারতে চলে যায়। দিদিভাইয়ের পরিবারও শহর থেকে পালিয়ে গ্রামে, গ্রাম থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যায়। রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাওয়ার সময় নদীর ঘাটে এক দুর্ঘটনা ঘটে, দুর্ঘটনায় আমার চার ভাই চার বোন মারা যায়। আমরা দুই ভাই দুই বোন কেমন করে যেনো বেঁচে যাই।

আমরা চারজন যমজ ভাইবোনের মতো জুটি বেঁধে থাকি। আমাদের বাবা মা কোথায় থাকে জানি না, বাবা মায়ের নামও জানি না। ছোটোবেলায় দিদিভাইয়ের মায়ের মুখে শুনেছি আমাদের জন্ম জাপানে। জন্মের কিছুদিন পর জাপান থেকে আমরা চলে আসি পূর্ব পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা, ঢাকার নিউমার্কেটের আলো ঝলমলে এক দোকানের শোকেসে আমাদের রাখা হয়েছিলো। কতোদিন শোকেসে ছিলাম তা বলতে পারবো না।

বাহান্ন তেপ্পান্ন বছর আগের কথা। তখনও মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়নি, আজও স্পষ্ট মনে পড়ে, দারুণ সুন্দরী এক নারী কাঁচের দরজা ঠেলে দোকানের ভেতরে ঢুকে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিক দেখছিলো। হঠাৎ করে সবকিছু ছেড়ে সুন্দরীর নজর আটকে যায় আমাদের দিকে। আমরাও তাকিয়ে ছিলাম নারীর মুগ্ধ দৃষ্টির দিকে।

দোকানে প্রতিদিন কতো মানুষ আসতো, এটা কিনতো ওটা কিনতো, আমাদের দিকে কেউ তাকাতোও না, কেউ কাছেও আসতো না। দূর থেকে দেখেই চলে যেতো। কাঁচের দরজা বন্ধ শোকেসে থাকতে থাকতে আমরাও হাঁফিয়ে উঠেছিলাম। কীভাবে বন্ধ খাঁচা থেকে মুক্তি পাবো, সেই আশায় দিন গুনতাম।
সেদিন সুন্দরী নারীর মুগ্ধ দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আমাদের মনে ক্ষীণ আশা জেগেছিলো, হয়তো তিনি আমাদের এই বদ্ধ ঘরের বাইরে নিয়ে যাবেন। আমরা নিশ্চয়ই ঘরের বাইরেটা দেখতে পাবো। প্রভু আমাদের মনের চাওয়া পূরণ করেছেন। সুন্দরী নারী সেই সন্ধ্যাতেই শোকেসের ভেতর থেকে আমাদের তুলে দোকানের বাইরের জগতে নিয়ে আসে।(সেই সুন্দরী নারীটিই দিদিভাইয়ের মা এবং সেদিন থেকে আমারও মা)।


দুই
দেখো কান্ড, এতো কথা বলে যাচ্ছি অথচ আমাদের নামই বলা হয়নি। আমাদের নামগুলো খুব মজার। দুই বোনের জন্য একটাই নাম ‘পেয়ালা’, দুই ভাইয়ের জন্যও একই নাম ‘পিরিচ’। ভাইবোনে মিলে আমরা হলাম পেয়ালা-পিরিচ।

জাপানে জন্ম তো, তাই জাপানিজদের মতোই আমাদের গায়ের রঙ ধবধবে সাদা আর গায়ের ত্বক জাপানিজ মেয়েদের মতো মসৃণ আর ফিনফিনে পাতলা।
ধবধবে সাদা পাতলা ত্বকে কাজল কালো রঙে আঁকা বাঁশঝাড়ের ছবি, মাথার চারপাশে রুপোর জল দিয়ে সরু দাগে ফিতে আঁকা। ঠিক যেনো জাপানিজ পুতুল! আমাদের দুই বোনেরই একটি করে হাত আছে, সেই হাতেও রুপোর জলে আঁকা সরু ফিতে।
জাপানে জন্ম হলেও আমাদের নামটা বাংলা, পেয়ালা পিরিচ। পেয়ালা নামটা যেমন আদুরে, আমরাও ভীষণ আদুরে।

মুক্তিযুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান বিজয়ী হয়েছিলো, পূর্ব পাকিস্তান নাম বদলে স্বাধীন দেশের নাম হলো বাংলাদেশ। একাত্তরের ২৫শে মার্চ পাকবাহিনী কাপুরুষের মতো হামলে পড়লো নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর, পূর্ব পাকিস্তানের সাহসি বাঙালিরা সংগঠিত হয়ে লাঠি বন্দুক দিয়েই পাকবাহিনীকে শায়েস্তা করে একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বার দেশ স্বাধীন করে ফেলে। অবশ্য ভারত বাঙালিদের পাশে দাঁড়িয়েছিলো, মুক্তিযুদ্ধে অনেক সাহায্য করেছিলো। তাই নয় মাসেই বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করেছিলো।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দিদিভাইয়ের মা বাবার সাথে আমরাও ভারত থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসি। দিদিভাইয়ের মায়ের কাছেই ছিলাম, দিদিভাইকে বড়ো হতে দেখলাম, দিদিভাইয়ের বিয়ে হতে দেখলাম। দিদিভাই যখন জামাইবাবুর সাথে আমেরিকা চলে যায়, আলমিরার ভেতর বসে সেটাও দেখেছি। দিদিভাই আমেরিকা চলে যাচ্ছে শুনে মনে মনে কতো ভেবেছি, আমেরিকা না জানি কতো সুন্দর। নইলে দিদিভাই কেনো মা বাবাকে ছেড়ে আমেরিকা চলে গেলো! দিদিভাই আমেরিকা থেকে প্রত্যেক বছর বাংলাদেশে বেড়াতে আসতো, মা বাবার আদুরে মেয়ে তো, বাবা মা’কে না দেখে থাকতে পারতো না।

তেমনই একবার বাংলাদেশে বেড়াতে গেলো, দিদিভাইয়ের মা আলমারি থেকে আমাদের বের করে দিদিভাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে বললো, এই বাঁশঝাড় কাপপ্লেটগুলো তুই আমেরিকা নিয়ে যা।
মায়ের কথা শুনে আমরা ভাইবোন তো হতভম্ব! বুঝতে পারছিলাম না, খুশি হবো নাকি মন খারাপ করবো।
মায়ের ঘরে ছিলাম ভালোই ছিলাম, এখন দিদিভাইয়ের সাথে আমেরিকা চলে গেলে তো মা’কে ছেড়ে যেতে হবে! মায়ের সাথে আর কোনোদিন দেখা হবে না! আবার এটা ভেবে খুশিও হয়েছিলাম দিদিভাইয়ের সাথে গেলে আমেরিকা তো দেখতে পাবো।
আমাদের জন্ম জাপানে, এসেছিলাম পূর্ব পাকিস্তানে, এতোদিন ছিলাম বাংলাদেশে এবার যাবো আমেরিকা! মানুষও তো এক জীবনে এতো দেশ দেখতে পায় না, আর আমরা পেয়ালা পিরিচ হয়ে এতো দেশ দেখছি! সেবারই দিদিভাইয়ের সাথে আমেরিকা চলে এলাম।

আমেরিকা এসে দিদিভাইয়ের লিভিং রুমে কাঁচের ছোটো টেবিলের উপর আমাদের জায়গা হয়েছে। দিদিভাই মনে হয় ইচ্ছে করেই আমাদের এখানে বসিয়েছে। অতিথিরা এসে তো লিভিং রুমেই বসে, আড্ডা দেয়। গল্প করার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের দিকে সকলের চোখ পড়ে। আমাদের রূপ দেখে সকলেই মুগ্ধ হয়, তাতে দিদিভাই খুশি হয়।

কেউ বলে, ও আশা দিদি, তোমার এই কাপ প্লেটের বয়স কতো গো?
দিদিভাই বলে, বাহান্ন বছর।
ওরা বলে, ওমা! বাহান্ন বছর, কী বলছো! এগুলো তো অ্যান্টিক গো! এই ডিজাইনের কাপ প্লেট এখন আর কোথাও পাওয়া যাবে না। এখনো একেবারে নতুন! বাহান্ন বছর পরেও কেমন ঝকঝকে দেখাচ্ছে!

অ্যান্ডি দিদি বলে, জাপানিজ জিনিস তো, ব্যাপারই আলাদা! এখন তো সব মেইড ইন চায়না। আজ কিনো, কাল ভাঙো।

দিয়া ভাবী বলে, জাপানী জিনিস বলেই এতো সুন্দর আর টেকসই। চায়নিজ মাল হলে কি আর পঞ্চাশ বছর পরেও এমন সুন্দর থাকতো? কবেই টোকা লেগে ভেঙে চুরমার হয়ে যেতো!

মোনালিসা বলে, দেখো দেখো কাপ প্লেটের গায়ের ডিজাইনটা! কী অপূর্ব! ধবধবে সাদা গায়ে চকচকে কালো রঙে আঁকা বাঁশঝাড়ের ছবি! কী সুন্দর কী সুন্দর!

অতিথিদের কথা শুনি, আমার বুকে আনন্দের বান ডাকে। জন্মভূমির কথা মনে পড়ে। চুয়ান্ন পঞ্চান্ন বছর আগে মাতৃভূমি ছেড়ে চলে এসেছি। বাবা মায়ের ঠিকানা জানি না, তবুও দিদিভাইদের মুখ থেকে যখনই জাপানের প্রশংসা শুনি, আমার বুক গর্বে ভরে যায়!
সকলেই তো যার যার নিজের দেশের কথা ভাবে, নিজের দেশ নিয়ে গর্ব করে!

এই যে দিদিভাইরা আড্ডা আসরে বসলেই মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, কিভাবে পাক আর্মির সাথে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হলো সেসব নিয়ে গল্প করে, স্বাধীন বাংলাদেশের কথা বলে, আমেরিকায় এতো বছর থেকেও বাংলাদেশ আর ইন্ডিয়ার গল্প করে, বলিউডের গল্প, লেহেঙ্গা বেনারসি, জামদানি টাঙ্গাইল তাঁতের গল্প বলে, তবে আমরাই বা কেনো জাপানের কথা শুনে খুশি হবো না! আমরা পেয়ালা পিরিচ বলে কি আমাদের আবেগ অনুভূতি থাকতে নেই!

দিদিভাইদের একটা জিনিসই আমার মনঃপুত নয়। ওরা বাঙালি হয়েও আমাদের পেয়ালা পিরিচ নামে ডাকে না, কাপ প্লেট বলে! কাপপ্লেট শুনতেই কেমন খটোমটো লাগে, আমাদের রূপের সাথে একটুও যায় না। পেয়ালা পিরিচ নামটা কতো মিষ্টি, তবুও ওরা পেয়ালা পিরিচ বলবে না!

তবে অতিথিরা যখন আমাদের প্রশংসা করে, দিদিভাইয়ের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আমার আর মন খারাপ থাকে না। মনকে সান্ত্বনা দেই, পেয়ালা পিরিচ তো বাংলা নাম, ওটা বাংলাদেশের জন্য। আমেরিকায় পেয়ালা পিরিচ নাম অচল, এখানে কাপ প্লেটই ভালো।

দিদিভাই মুখ উজ্জ্বল করে বলে, “আমার মায়ের খুব প্রিয় ছিলো এই কাপ প্লেট জোড়া! মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে, মানুষ প্রাণ হাতে নিয়ে ছুটছে, আমার মা নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে এই কাপ প্লেটগুলো নিয়ে ছুটেছিলো।

অলকা দিদি বলে, ওমা সে কি! প্রাণের মায়ার চেয়েও কাপ প্লেট বেশি হলো!

দিদিভাই বলে, আমাদের ছোটোবেলায় সবার বাড়িতে গোবদা গাবদা চেহারার ছোট ছোট কাপে চা খাওয়া হতো, কিন্তু আমার মা চা খেতো সিরামিকের তৈরী ডিজাইন করা কাপ প্লেটে। মায়ের পছন্দ খুব ভালো ছিলো, নজরও ছিলো উঁচু। মুক্তিযুদ্ধের আগে অনেক দাম দিয়ে এই বাঁশঝাড় ডিজাইনের ছয় জোড়া কাপ প্লেট কিনেছিলো, গর্ব করে বলতো ‘মেইড ইন জাপান’।

কাপপ্লেটগুলো কেনার কিছুদিন পরেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এতো দাম দিয়ে কেনা কাপে একদিন চা-ও খাওয়া হয়নি। এরমধ্যেই পাক আর্মি শহরে ঢুকে গেছে, নির্বিচারে গোলাগুলি করছে। সবাই তো প্রাণ বাঁচাতে শহরের বাড়িঘর ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকে পাক আর্মি বেছে বেছে হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতো, হিন্দুদের মেরে ফেলতো। গ্রামে গ্রামে গিয়ে হিন্দু খুঁজে বের করে হত্যা করতো। তখন হিন্দুরা শহর ছেড়ে গ্রামে, গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকে ভারতে। কী কঠিন সময় তখন। টাকা পয়সা, সোনাদানা, বই পুস্তক কাপড়চোপর সব বাড়িতে ফেলে এক কাপড়ে মানুষ ছুটছে অজানার ঊদ্দেশ্যে, শুধু মিলিটারির হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে।

আর সকলের মতো আমরাও শহরের বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলাম। প্রথমে গেছি গ্রামে, সেখানে দুই মাস থাকার পর বড়োরা বুঝলেন গ্রামে থাকা আর নিরাপদ নয়। তখন ঠিক হয় আমরাও ভারতে চলে যাবো।

এক কাপড়ে তো আর দেশ ছেড়ে যাওয়া যাবে না! তাই কিছু কাপড়চোপর, দরকারী কাগজপত্র আর ট্রাংকে রেখে আসা সোনা গয়না টাকাপয়সা আনতে মা একদিন গ্রামের এক মুসলমান চাচাকে সাথে নিয়ে শহরের ভাড়াবাড়িতে যায়। ততোদিনে অই বাড়ির অন্য সকল ভাড়াটেরা গ্রামে চলে গেছে, সকলের ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে। পুরো বাড়ি আগলে রেখেছেন বুড়ো মুসলমান বাড়িওয়ালা।
শহরের বাড়িতে পৌঁছে মা দরকারি কাগজপত্র, টাকাপয়সা হাতব্যাগে নিয়েছে, টিনের একটা বালতিতে বিছানার চাদর, ঘরে পরার শাড়ি ব্লাউজের সাথে এই কাপ প্লেটগুলো নিয়েছিলো। সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে, অমনি পাক আর্মি শহরের অই পাড়াতে এসে হানা দিয়েছে। অই পাড়াটা ছিলো হিন্দুপাড়া।

বুড়ো বাড়িওয়ালা ভয় পেয়ে আমার মা’কে একটা পরিত্যক্ত অন্ধকার বেড়ার ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেয়। পাক আর্মি বিশাল বাড়ির ভেতর ঢুকে সব ঘরের দরজায় লাথি মেরে, দরজার তালা টেনে টেনে দেখছিলো, খুঁজছিলো হয়তো তালাবন্ধ ঘরে হিন্দুরা লুকিয়ে আছে কিনা।
এমন ভয়ঙ্কর অবস্থায় মা অই অন্ধকার ঘরে বসে মিলিটারির বুটের আওয়াজ শুনে ভয়ে কাঁপছিলো। একে তো হিন্দু, তার উপর তরুণ বয়সের সুন্দরী, নড়বড়ে বেড়ার দরজায় পাকসেনাদের একটা লাথিই যথেষ্ট! এসব ভেবে মায়ের হার্টফেল হওয়ার দশা।
মায়ের কপাল ভালো ভাঙাচোরা ঘরে কেউ থাকবে না ভেবে আর্মি অই ঘরের দরজা ধরে ঝাঁকুনি দেয়নি।

মিলিটারি যখন চলে গেছে বুড়ো বাড়িওয়ালা কাঁপতে কাঁপতে দরজার তালা খুলে মা’কে বের করে আনে। বাড়িওয়ালা চাচা মা’কে এক গ্লাস জল খাওয়ায় এরপর রওনা করিয়ে দেয়।
এতো কিছু ঘটে যাওয়ার পরেও মা টিনের বালতি হাতছাড়া করেনি। নিজেদের ঘরের দরজায় তালা দেয়ার আগে মিটসেফ ভর্তি শখের সিরামিক ক্রোকারিজগুলোর দিকে একবার তাকিয়েছিলো। একটা বড়ো দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে সবকিছু ওভাবেই ফেলে চলে এসেছিলো।


আমরা যখন গ্রাম ছেড়ে ভারতের পথে যাত্রা করলাম, ভারতে পৌঁছা অবধি সারাপথ বালতিটা মা নিজের হাতেই রেখেছিলো।


দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা কলকাতা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে এলাম। ঘরে ঢুকে দেখা গেলো, ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো, বাবার কাঠের দেরাজ ভাঙা, মায়ের মিটসেফের দরজা ভাঙা, মিটসেফ ফাঁকা। মায়ের শখের ক্রোকারিজের একটাও নেই, মা বুঝে গেলেন সব লুট হয়ে গেছে। এই দৃশ্য দেখে মা খুব কষ্ট পেয়েছিলো। আমি ছোটো ছিলাম, তারপরেও আমি মায়ের মুখের চেহারা দেখে বুঝেছিলাম মায়ের বুক ফেটে যাচ্ছে! ক্রোকারিজগুলো মায়ের খুব শখের ছিলো, সোনা-গয়নার চেয়েও দামী। কে বা কারা ঘরের সব লুটপাট করে নিয়ে গেলো, কিছুই জানা গেলো না।


কী আর করা, দরজা ভাঙা মিটসেফের ভেতর এক কোণায় এই বাঁশঝাড় কাপপ্লেটগুলো রেখে দিয়েছিলো। আজও স্পষ্ট দেখতে পাই, ভাঙা মিটসেফটার কাছে দাঁড়িয়ে প্রায়ই মা চোখের জল মুছতো।

স্বাধীনতার কয়েক মাস পরের ঘটনা। রমজানের ঈদ, বাড়িওয়ালার বাড়ি থেকে আমাদের ঘরে সেমাই জর্দা পাঠিয়েছে। ট্রেতে সাজানো প্লেট দেখে মা তো স্তম্ভিত। মায়ের শোকেস থেকে লুট হয়ে যাওয়া ক্রোকারিজেরই এক সেট প্লেটে ওরা সেমাই পাঠিয়েছে। ধবধবে সাদা প্লেটে সবুজ ধানছড়ার ছবি। এই প্লেটগুলো আমার মায়ের ছাড়া আর কারো নয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে এই প্লেটে আঁকা ধানছড়ার ছবি দেখে আমি ছড়া কাটতাম, “ ধান নদী খাল, এই তিনে বরিশাল”! শখের জিনিস যেনো হারিয়ে না যায় তাই মা নিজের প্রতিটি জিনিসের উল্টোদিকে মার্ক করে রাখতো।
অই ধানছড়া প্লেটের উল্টোদিকে মায়ের দেয়া মার্ক তখনো ছিলো।

আমি তো অনেক ছোটো, কিছুই না বুঝে ছুটে যাচ্ছিলাম বাড়িওয়ালার বাড়িতে। গিয়ে বলতাম, চাচী এই প্লেটগুলি আমাদের। দেখো, আমার মায়ের নাম লেখা আছে প্লেটের উলটো দিকে।
কিন্তু মা পেছন থেকে আমার ফ্রক জাপটে ধরেছে। হাতের কাছে পেয়েও প্লেটগুলো মা ফেরত চেয়ে আনতে দিলো না দেখে আমার খুব জেদ হয়েছিলো। পা দাপিয়ে অনেক কেঁদেছিলাম।

তখন বুঝতে পারিনি কেনো মা আমাকে আটকেছিলো। বড়ো হয়ে বুঝেছি দুটো প্লেটের জন্য মা ওদেরকে বিব্রত করতে চায় নি, লজ্জায় ফেলতে চায় নি। বাড়িওয়ালা ভাড়াটে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়নি।
তাদের সাথে উঠতে বসতে দেখা হতো, কথা হতো অথচ মা মুখ ফুটে কোনোদিন কিছুই বলতে পারেনি।



মা খুব আত্মমর্যাদবোধ সম্পন্ন নারী ছিলেন, অভিমানীও ছিলেন কিছুটা। বিশ্বস্ত মানুষের হাতেই শখের জিনিসের অপমৃত্যু হয়েছে, তাই হয়তো অভিমান করেই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মা আর কোনো শখের জিনিস সংগ্রহ করেনি। এমনকি দরজা ভাঙা মিটসেফটাও আর ঠিক করায়নি। শখের ক্রোকারিজের গুচ্ছ থেকে এই বাঁশঝাড় কাপপ্লেট দুটো বাঁচাতে পেরেছিলো, তাই কাপ প্লেটদুটো মা মুক্তিযুদ্ধের চিহ্ন হিসেবে রেখে দিয়েছিলো।

সর্বস্ব হারিয়ে দামী ক্রোকারিজের প্রতি মায়ের দুর্বলতা আর রইলো না। কাঁচের বাসন নিয়ে ফেরিওয়ালা আসতো, অন্য সকলের মতো মাও ফেরিওয়ালার কাছ থেকে গোবদা গোবদা কাপ প্লেট কিনতো চা কফি খাওয়ার জন্য।


তিন

দিদিভাইয়ের অতিথিদের কারো কারো নজর খুব তীক্ষ্ণ, কেমন করে জানি দেখে ফেলে আমার এক পিরিচ ভাইয়ের শরীরে ফাটা দাগ, আরেক পেয়ালা বোনের হাত ভাঙা! দিদিভাই আমাদের খুঁত যতোই আড়াল রাখুক, অতিথিদের নজরে তা পড়েই যায়। অমনি জিজ্ঞেস করে, আশা দিদি, একটা প্লেট তো ফেটে গেছে, আরেকটা কাপের তো হাতল ভাঙা! কিভাবে ভাঙলো গো?

দিদিভাই সুন্দর করে উত্তর দেয়, হ্যাঁ, ঐ ফাটা দাগ, হাত ভাঙাটুকুই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব। আমরা যখন পাকিস্তানী মিলিটারিদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছিলাম, এক মাঝরাতে একটা ব্রিজের নীচ দিয়ে আমাদের নৌকা এসে থামে কাদামাটির মধ্যে।
মাথার ওপর ব্রিজ, ব্রিজে দিনে রাতে পাকসেনা টহল দেয় যেনো মুক্তিবাহিনী ব্রিজ দখল করতে না পারে। এই ব্রিজের সীমানা পার হতে পারলে তবেই নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া যাবে। মাঝরাতে ব্রীজে পাহারা বদল হয়।
অইজন্যই দালাল মাঝরাতে আমাদের ব্রীজ এলাকা পার করে দিচ্ছিলো। অন্ধকার রাতে চুপেচাপে নৌকা থেকে একে একে সকলেই নামছিলো।
সবার শেষে মা ছিলো। নৌকা থেকে নামার সময় কেমন করে জানি বালতিসহ মা জলকাদার মধ্যে পড়ে যায়, সাথে সাথে চারদিকে কাঁচের বাসন ভাঙার আওয়াজ ওঠে।

মা শহরের মেয়ে, নৌকায় চড়ার অভ্যাস তো ছিলো না। তার উপর এমন অন্ধকারে নৌকা থেকে লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে পা ফসকে পড়ে গেছে! তাইতেইঁ বালতির ভেতরে থাকা কাপ প্লেট ঝনঝন করে ওঠে। এই ঝনঝন আওয়াজে চারদিক জেগে ওঠে, আশেপাশের সকলেই ভয় পেয়ে যায়।
ব্রিজের উপর তখন পাক আর্মির টহল জিপ যাওয়ার কথা, ঝনঝন আওয়াজ হতেই অন্ধকারে সবাই যে যার মতো ছুটে পালাতে থাকে। আর মা পড়ে থাকে কাদাজলে পা আটকে। সেজো মামা আর ছোটো মামা মা’কে ফেলে পালাতে পারেনি। ধরে ধরে কাদা থেকে তুলে দাঁড় করায়। প্রাণের মায়া নয়, মা নাকি তখনও বলছিলো, এতো কষ্ট করেও কাপপ্লেটগুলি বাঁচাতে পারলাম না। মনে হয় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে!

ভাগ্যগুণে পাক আর্মির টহল জিপ এসে পৌঁছানোর আগেই আমরা গ্রাম্য বাজারে পৌঁছে গেছিলাম। সকলে যখন জিরোচ্ছিলো, বাবা তো মায়ের উপর খুবই বিরক্ত, এমনকি দাদু দিদিমাও অসন্তুষ্ট। আর মা তখন বালতির ভেতরে থাকা কাপড়চোপড় উলটে পালটে দেখছিলো কাপপ্লেটগুলো সবই ভেঙে গেছে কিনা! দেখতে পায়, চার জোড়া কাপপ্লেট ভেঙে গেছে, আর বাকী দুই জোড়ার মধ্যে একটা প্লেট ফেটে গেছে, একটা কাপের হাত ভেঙে গেছে।


চার

দিদিভাই একদিন তার বান্ধবীকে বলছিলো, ছোটোবেলা থেকেই আমার খুব নজর ছিলো এই কাপ প্লেটের দিকে। দরজা ভাঙ্গা শোকেসের ভেতর এক কোণে থাকা কাপ-প্লেটের দিকে ভীষণ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। কাপের গায়ে বাঁশঝাড়ের ছবিটা দেখলেই যতীন্দ্রমোহন বাগচির লেখা “ বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ” কবিতার লাইনগুলো মনে পড়তো। কোনো এক কাজলা দিদির জন্য মন কেমন করতো, কল্পনায় আমিই যেনো খুকি হয়ে উঠতাম। কাজলা দিদিকে খুঁজতাম, কাজলাদিদির কথা মনে করে মাঝে মাঝে চোখ জলে ভরে উঠতো।

মা জানতো, এই কাপপ্লেটগুলো আমার খুব প্রিয়।

পনেরো বছর হয়ে গেলো। দেশে বেড়াতে গেছি, ফেরার সময় মা আমার হাতে এই কাপ-প্লেট জোড়া তুলে দিয়ে বললো, “ আমার খুব প্রিয় জিনিস, তোকে দিলাম। তুইই একমাত্র এর মূল্য বুঝবি। সোনা গয়নার চেয়েও দামী। নিছক কাপপ্লেট নয়, ইতিহাসের কয়েকটি ছেঁড়া পাতা। তুই তো অতীত খুঁজতে ভালোবাসিস, ইতিহাস জানতে ভালোবাসিস। এই কাপপ্লেটের গায়ে পরতে পরতে অনেক ইতিহাস লেখা আছে। খুঁজলেই পাবি অনেক না-বলা সত্য।

আমি বলেছিলাম, মা সব সত্যই আমি জানি। না-বলা সত্যগুলো জানে না যারা, অথবা জানতে চায় না, জানালেও মানতে চায় না, তাদের কাছে যদি এই কাপপ্লেটগুলো পাঠানো যেতো!


মা বললো, যত্ন করে নিয়ে যাস আমেরিকা, খুব সাবধানে। টোকাও যেনো না লাগে! টোকা লাগলেই ভেঙে যাবে।
আমি হেসে বলেছিলাম, মা এদের কইমাছের প্রাণ! মুক্তিযুদ্ধের সময় তুমি নৌকা থেকে পড়ে গেছিলে, তাতেও যখন ওরা ভাঙেনি, আর ভাঙবে না! ওরা আমার স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি।

মা বললো, “ আমার বয়স হয়েছে, আর কয় বছর বাঁচবো জানি না। তোকে দেয়ার মতো ধনসম্পদও আমার কিছু নেই। তাই বেঁচে থাকতেই এই কাপ-প্লেট জোড়া তোকে দিতে চাই। আমি যখন থাকবো না, তোরও তখন দেশে আসার আগ্রহ কমে যাবে। ছেলেমেয়ে স্বামী সংসার নিয়ে ব্যস্ততা বেড়ে যাবে। মায়ের কথা ভাববার ফুরসত পাবি না।

কাপ-প্লেটগুলো শোকেসে রেখে দিস। ঘরদুয়ার ঝাড়পোছ করার সময় এই কাপ-প্লেটের দিকে নজর যাবে, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চমকের মতোই মা’কে মনে পড়বে। কাপ-প্লেটের মাঝে আমাকে খুঁজবি, কাপ-প্লেটের গায়ে আলতো করে হাত বুলাবি, আজকের কথা মনে পড়ে যাবে। হয়তো চোখে জল আসবে, কিছুক্ষণের জন্য আনমনা হয়ে যাবি। কাপের গায়ে আমাকে পাবি, প্লেটের গায়ে আমাকে পাবি! এই বাঁশপাতার ছাপে কতো গল্প, কতো স্মৃতি জমা আছে!

এই দরজা ভাঙা মিটসেফের দিকে তাকালে মনে পড়ে যায়, যে বাড়িওয়ালা আমাকে সেদিন পাক আর্মির হাত থেকে রক্ষা করলেন, তাঁর জিম্মাতেই বাড়িঘর, আসবাবপত্র সব দিয়ে গেছিলাম! ফিরে এসে দেখি সব ফাঁকা! এ তো কাপপ্লেট, মুক্তিযুদ্ধে কতো পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছে! একটি দেশ স্বাধীন তো এমনি এমনি হয় না! লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, লক্ষ পরিবার সর্বস্ব হারালে তবেই স্বাধীনতা আসে।

শুধুই কি বাড়িওয়ালার ব্যবহারে আঘাত পেয়েছি, এই কাপপ্লেটের দিকে তাকালেই আমার মনে পড়ে যায়, রাতের অন্ধকারে যখন নৌকা থেকে কাদাজলে পড়ে গেছিলাম, প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে সবাই যার যার মতো দৌড়ে চলে গেছিলো, আমার বাবা মা স্বামীও। শুধু আমার ছোটো দুই ভাই নিজেদের প্রাণের মায়া করেনি, দিদিকে জলকাদা থেকে টেনে তুলেছিলো! বিপদে সবাই ছেড়ে যায় না, কেউ না কেউ পাশে থাকে।

কাপ-প্লেট দুটো তোর কাছে থাকলে তুই আরও অনেক সত্য উপলব্ধি করতে পারবি। একান্তই যদি সত্য খুঁজে দেখার সময় না পাস, তাহলে নাহয় কাপ-প্লেটের দিকে তাকিয়ে আমার কথা ভাববি, শৈশব কৈশোরের স্মৃতি নিয়ে নাড়াচাড়া করবি।
স্মৃতিই তো সব! মানুষ থাকে না, তার স্মৃতি থেকে যায়। আমিও থেকে যাবো তোর কাছে, এই বাঁশঝাড়ের ছবির মাঝে, তোর কল্পনার কাজলা দিদির মতো”।

আমেরিকায় জন্ম, আমেরিকায় বড়ো হতে হতে তোর ছেলেমেয়ে দুটো তো একদিন আমেরিকান হয়ে যাবে, হয়তো শেকড়ের সন্ধান হারিয়ে ফেলবে। এমনটা হতে দিস না। এই কাপ প্লেট দেখিয়ে ওদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের গল্প করবি, তুই যতটুকু জানিস, আমার কাছে যতটুকু শুনেছিস সবই গল্প করবি। ওরা যতোই আমেরিকান হয়ে উঠুক, শেকড় হারাবে না। ওরা জানবে ওদের শেকড় স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে গাঁথা আছে।



[ গল্প বলতে বলতে বিকেল হয়ে গেছে, দিদিভাইয়ের রান্নাবান্না মনে হয় শেষ হয়ে এসেছে। দিদিভাইয়ের মায়ের কথাই ঠিক। মা মারা যাওয়ার পর দিদিভাই আগের মতো ঘন ঘন দেশে যায় না। ঘর সংসার নিয়েই ব্যস্ত, তবে মা’কে একদন্ডের জন্যও ভোলেনি। প্রতিদিন দিদিভাই একবারের জন্য হলেও আমাদের গায়ে হাত বুলায়, কী যেনো ভাবে। মাঝে মাঝে চোখ মোছে। দিদিভাইয়ের চোখে জল দেখলে আমাদের খুব কষ্ট হয়। আবার ভালোও লাগে, তবুও তো দিদিভাই আমাদের মাঝেই তার মায়ের পরশ পায়, তার দেশের গন্ধ পায়।]