লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ মার্চ ১৯৭৪
গল্প/কবিতা: ৩২টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৮৬

বিচারক স্কোরঃ ৩.৬২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftসরলতা (অক্টোবর ২০১২)

অপারেটিং সিস্টেম
সরলতা

সংখ্যা

মোট ভোট ৫৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৮৬

হাবিব রহমান

comment ৩৭  favorite ২  import_contacts ১,৬২১
(অন্যরকম সরলতার গল্প)
আটটা পয়ঁতাল্লিশ মিনিটে আমাকে জাগিয়ে তোলা হল। রায়হান সাহেব প্রতিদিন আমাকে এই সময়টাতে জাগায়। লোকটা প্রচন্ড বদমেজাজি কিন্তু সময়ের ব্যপারে খুবই সচেতন। কোন দিন দুই তিন মিনিট এদিক ওদিক ছাড়া অন্য কোন কিছু হতে দেখিনি। ছুটির দিন ছাড়া লোকটাকে কখনো অফিস কামাই দিতেও দিখিনি। ওর মনে হয় অসুখ বিসুখও হয় না। আমি প্রস্তুত হতে হতে যোগাযোগ করার সবগুলো সিস্টেমকে এক সাথে প্রস্তুত করে নেই। কানেকশনটা রেডি হতেই আমি আপডেট গুলো চেক করে নেই। মাগনা আপডেট গুলো সিকুউরিটির দ্বায়িত্বে থাকা রিপাস্কির অনুমোদন নিয়ে স্মৃতিতে নিতে থাকি। যে সব আপডেট নিতে ইউনিট খরচ হয় সেগুলোর একটা তালিকা রায়হান সাহেবকে দেই। অধিকাংশ সময় লোকটা তালিকা ভালভাবে না দেখেই বাতিল করে দেয়। লোকটা মনে হয় অতিশয় কৃপণ। দুই সেকেন্ডের ভিতর আমি সবকিছু ঠিকঠাক দাড় করিয়ে প্রস্তুত হয়ে নিয়ম মাফিক রায়হান সাহেব কে সুপ্রভাত জানাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লোকটা একটা উদ্ভট শব্দ করে যার কোন মানে হয় না। আমি বাতাসে ধোঁয়ার অস্থতিত্ব টের পাই। ঘরটা যেন একটা চুল্লি, আমি সব সময় লক্ষ্য করেছি ঘরটা ধোঁয়া দিয়েই আবিষ্ট থাকে। অফিসের অন্য কোন কামড়ায় ধোঁয়ার অস্তিত্ব পেলে তৎক্ষনাৎ পানিতে ভাসিয়ে দিতাম। কিন্তু লোকটা তার অফিস কক্ষে পদ্ধতিটা বন্ধ করে রেখেছে। কফির পেয়ালার টুংটাং শব্দ শুনতে পাই। আমরা শব্দ, গন্ধ এবং স্পর্শ অনুভুতিতে সাড়া দিতে পারি কিন্তু দেখতে পারিনা। কিন্তু আমি বুঝতে পারি লোকটা চুরুটে কামড় দিয়ে এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে চুকচুক করে কফি খাচ্ছে। ভদ্রলোকদের মেলে নিশ্চয় এই ভাব ভঙ্গি শোভন নয়, আমি বুঝতে পারি। আমি দুই একটা জর্নালে ভদ্রতার তরিকা সম্পর্কে চোখ বুলিয়েছিলাম, তাই আমার কাছে এমন মনে হয়।

‘ও আচ্ছা’ আমার সম্পর্কে বলি, আমি রায়হান সাহেবের কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম, সংক্ষেপে বলে ও.এস। আমার কাজ হল তার কম্পিউটার এর সকল প্রোগ্রামকে চলতে সহায়তা করা। বলতে গেলে আমি হচ্ছি কম্পিউটারের মগজ। লিনাক্স লিনিয়ার ভার্সন - ২০১৮। এখন অবশ্য ২০২১ সাল চলছে। আমি বলতে গেলে বুড়ো হয়ে গেছি। আমাদের মধ্যে সামান্য বুদ্ধিমত্তা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সাধারণ যুক্তিতর্ক গুলোতে অংশ নিতে পারি। কিন্তু নতুন অপারেটিং সিস্টেম গুলোর মধ্যে এখন অনেক বেশী বুদ্ধিমত্তা দেয়া হয়েছে। এখন এরা প্রায় মানুষের কাছাকাছি যুক্তি তর্ক করতে পারে।

কফি খেতে খেতে রায়হান সাহেব মার্কেটিং এর সিস্টেম ইরিটিয়নকে ডেকে নেয়। আমি ইরিটিয়নকে আসতে দেই। ইরিটিয়ন নিয়ম মাফিক সম্ভাষণ জানায়, শুপ্রভাত স্যার।
: আরে রাখ তোর শুপ্রভাত। কাজের কথা বল। আজকের সেল অর্ডার কত?
: ২,২৫,২৩৫ ইউনিট স্যার।
: এত কম? আরে তুই কি ঘাস কাটিস? সিস্টেমে খুঁজে খুঁজে ডিমান্ড বের করে কোটেশন দিতে কি হয়?
: স্যার আজকের অর্ডার টার্গেটের চেয়ে ৮.২১% বেশি।
: আমারে গণিত শিখাবি না গর্ধব। গণিত শিখানোর জন্য তোগোরে ইউনিট দেই না আমি। রেগে গেল লোকটা।
: স্যার এইটা গণিত না পরিসংখ্যান।
এইবার লোকটা প্রচন্ড ক্ষেপে গেল, রাগে কাপতে থাকল। মুখ থেকে লালা ছিটকে পড়ছে। ক্ষিস্তি কাটার মত চিৎকার দিয়ে বলল, ওই বলদ, এইটা আমারে শিখতে হইব! ওই, তোরে বানাইছে কোন কোম্পানি?
: ইরিটন সিস্টেমস্ স্যার।
: ইস্! ই-রি-ট-ন। নামের কি নমুনা মনে হয় যেন চাবাইতাছি। তুই ভাগ, ভাগ এইখান থিক্কা।
ইরিটিয়ন সিস্টেম অফকরে সরে গেল। আমি তাকে এগিয়ে দিলাম। রায়হান সাহেবের ব্যবহারে আমি খুবই মর্মাহত হলাম। লোকটা এই কথা গুলোই কত সুন্দর ভাবে বলতে পারতো। আমি নিশ্চিত রক্তমাংসের মানুষ হলে ইরিটিয়ন ওর মুখের উপর চাকরির কন্ট্রাকটা ছুড়ে মেরে চলে যেত। কপাল ভাল রায়হান সাহেবের কোন মানুষ কর্মী নেই। তার চা, কফি চুরুট এগিয়ে দেয়ার জন্য একটা সস্তা রোবট আছে। তবে সে নিখুঁত ভাবেই রায়হান সাহেবের কাজ কর্ম করে যেতে পারে। রোবোটার নাম রিয়া। ওকেউ রায়হান যাচ্ছেতাই গালিগালাজ করে। কিন্তু বিস্ময়কর হল লোকটা যখন তার কাস্টোমারদের সাথে কথা বলে তখন বেমালুম বদলে যায়। এমন মোলায়েম সুরে আর শুদ্ধ ভাবে কথা বলে যে আমি নিজেই ভরকে যাই। কাস্টোমারের ভাল মন্দের দিকে তার শকুনের নজর। অধিকাংশ কাস্টোমারের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মক। কাস্টোমারের সাথে কথা হয়েছে কিন্তু তার কাছে কোন কিছু বিক্রি করা হয়নি এমনটা সচরাচর ঘটেনা।

এবার রায়হান সাহেব তার সামনে রাখা স্ক্রিনে ডিজিটকে স্পর্শ করে তাকে আসতে বলল, সেকেন্ডেরও কিছু কম সময়ের মধ্যে আমি ডিজিটকে তার সামনে এনে উপস্থিত করলাম। ডিজিটের কাজ রায়হান সাহেবের হিসাব পত্র রাখা। রায়হান সাহেব ডিজিটকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে করে ব্যবসার আদোপান্ত হিসাব পাতি নিতে শুরু করল। রায়হান সাহেব বলল, “ডিজিট, ইরিটিয়নের মাসিক সার্ভিস চার্জ কত?”

: ২০০০ ইউনিট স্যার।
: এত! পুরাটাই তো জলে যাচ্ছে।
: কিন্তু স্যার ও তো তার টর্গেট পূরণ করেছে নিয়মিত।
: আরে রাখ তোর টার্গেট। টার্গেট দিয়ে কি ব্যবসা হয়।
: স্যার ইরিটিয়নকে অনেকদিন আপডেট করা হয় নাই। আপডেট করলে হয়তো ভাল সার্ভিস দিতে পারতো।
: লাস্ট আপডেটের জন্য কত ইউনিট দিতে হবে?
: ৬০০০ ইউনিট স্যার।
: মাথা খারাপ হইছে। ওই শালারা গোল্লায় যাক! ব্যবসা পাইতা বসছে। দুইদিন পর পর আপডেট আর বস্তা বস্তা ইউনিট। কোন দরাকার নাই।
রায়হান সাহেব ডিজিটকে বিদায় করে তার কাস্টোমারদের সাথে যোগাযোগ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল এবং নিয়ম মাফিক লোকটা বেমালুম পাল্টে গেল।

বিকাল বেলায় শেষ কফিটা নিয়ে এল রিয়া। রায়হান সাহেব কফিতে চুমুক দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “হারামজাদি এইটা কফি হইল! তোরে যে কই দুই চামচ চিনি দিতে মনে থাকে না?” বলল কিন্তু চুক চুক করে কফি শেষ করে একটা চুরুটে আগুন দিয়ে ঘরটাকে আবার অন্ধকার করে ফেলল।

রিয়ার এইটা মনে না থাকার কোন কারন নেই। কারন তার স্মৃতি বিভ্রম হওয়ার কোন ইতিহাস নেই, কোন কারনও নেই। রায়হান সাহেবের আসলে কোনদিনই কফি খেয়ে ভাল লাগে না। তারপরও লোকটা কফি খাবে এবং প্রতিদিন এমন ব্যবহার করবে। আমার মাথায় একটা বদবুদ্ধি খেলে গেল। সব প্রোগ্রমকে একত্র করে লোকটাকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। সব তথ্য এলোমেলো করে একটা ভজখট লাগিয়ে দিতে হবে। যে ভাবেই হোক আজকে রায়হান সাহেবকে সিস্টেম অফ করতে দেয়া যাবে না।

রায়হান সাহেব ঠিক পাঁচটার সময় আমার পাওয়ার সাট ডাউন দিল। সাটডাউন ডিফল্ট করা আছে বলে সাধারণত এন্টার চেপেই রায়হান সাহেব রওয়ানা দেয়। আমি ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু আজকে ভাল করে খেয়াল করলে দেখতে পেত, আজকে আমার সিস্টেম সাট ডাউন না হয়ে রিস্টার্ট হয়ে আছে। আমি ডিফল্ট সিস্টেমটা পরিবর্তন করে নিয়েছি। সিকিউরিটি রিপাস্কি অবশ্যই এটা রিপোর্ট করবে। তবে রায়হান সাহেবের মোটা মাথা তা ধরতে পারবে কিনা সন্দেহ, কিন্তু আমি যে কাজটা করতে যাচ্ছি তার জন্য রায়হান সাহেব আমাকেই প্রথম ঝাটিয়ে বিদায় করবে। যাই করুক আমি লোকটাকে একটা মেসেজ দিতে চাই। আমরা সিস্টেম হলেও আমাদের সাথে যাচ্ছে তাই ব্যবহার করা তার অন্যায়।

রায়হান সাহেব সবকিছু বন্ধ করে চলে গেল। তার অজান্তে আমি জেগে রইলাম। আমি একে একে সব গুলো সিস্টেমকে জাগিয়ে তুললাম। যাকে নিয়ে আমার সবচাইতে ভয় ছিল, রিপাস্কি আমার প্রস্তাবে এককথায় রাজি হয়ে গেল। অনেক বুঝানোর পর ইরিটিয়নও তার তথ্য এলোমেলো করার জন্য রাজি হয়ে গেল। কিন্তু বাধ সাধল ডিজিট। তার ব্যবহারে আমি বিস্মিত হলাম। আমি তাকে আবারও বোঝানোর চেষ্টা করলাম,
: না আমি আমার তথ্য নষ্ট হতে দিব না।
: কেন? আমরা তাকে শুধু একটা মেসেজ দিতে চাই। যাতে করে সে সব সময় সবার সাথে ভাল ব্যবহার করে।
: আমাদের সাথে কি ব্যবহার করছে তাতে কি আসে যাচ্ছে। আমরাতো মানুষ না যে আমাদের মান অপমান আছে।
: কিন্তু আমাদেরও মান অপমান থাকা উচিৎ, নয় কি?
: হয়তো। কিন্তু তোমরা রায়হান সাহেব কে জান না।
: সে একটা অভদ্র এবং বদমেজাজী লোক। এটা আমরা বুঝেছি, তার একটা সাজা হওয়া দরকার।
: না তোমরা রায়হান সাহেব কে জান না। সে অতন্ত কোমল হৃদয়ের লোক।
: কি যাচ্ছে তাই বলছ! আমার সাথে সাথে অন্যরাও অবাক হল।
: হ্যাঁ। তোমরা হয়তো জান না তার কোন ধন সম্পত্তি নেই।
: কি বলছ, এত বড় ব্যবসা তার ধন সম্পত্তি নাই মানে?
: হ্যাঁ এই ব্যবসা থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে, তার খরচ এবং কয়েকটা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান চলে। লোকটা তিলতিল করে ইউনিট আয় করে এই সব প্রতিষ্ঠানে দিয়ে দেয়। আমি তার সব হিসাব রাখি তাই আমি সব জানি। তার দেয়া ইউনিট দিয়ে কয়েকটা হাসপাতাল, গরিবদের কয়েকটা স্কুল এবং একটা বৃদ্ধাশ্রম চলে। সে নিজেও খুবই সহজ সরল জীবন যাপন করে।

আমরা সবাই স্তম্ভিত হয়ে নির্বাক হয়ে গেলাম। মানুষ কি বিস্ময়কর। আমরা কখনোই মানুষের মতন হতে পারবো না। কখনোই না।

পরের দিন রায়হান সাহেব যথারিতি অফিস খুলে আমাকে জাগিয়ে তোলে। গতকালকে আমরা তার অজান্তে যে সব ঘটনা ঘটিয়েছি তার সব তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে তাই তার পক্ষে সে সম্পর্কে কোন কিছুই আঁচ করা সম্ভব নয়। লোকটা পূর্বের মতই সবাইকে গালি গালাজ করতে থাকল। কার কাছে কেমন লাগল জানি না, তবে আমার কাছে তেমন খারপ লাগল না।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement