প্রচণ্ড বেগে ছুটে যাচ্ছিল নাভিদ এর নতুন ভক্স ওয়াগন । গত মাসেই ২০ পূরণ করলো নাভিদ । গাড়িটা তার বাবার তরফ থেকে জন্মদিনের উপহার । এর আগে ক্যারোলিনা চালাতো সে । ভক্স ওয়াগনটা পাওয়ার পর ওটা এখন গ্যারাজেই পড়ে থাকে । তাদের অনেকগুলো গাড়ি , তারপরও প্রতি বছর একটা করে কেনা হয় । দেশের নামকরা শিল্পপতিদের একজন তার বাবা , মা-ও একজন প্রখ্যাত নারী সংগঠক । বাসায় মানুষ তিন জন – বাবা , মা আর সে । আর তাদের দেখাশোনার জন্য কাজের লোক আছে এগারো জন । তাদের বাংলোর পিছনে এইসব কাজের লোকদের জন্য আলাদা সারভেন্টস কোয়াটার আছে , নাভিদ কখনোই সেখানে যায় নি । কেউ যেতে বারণ করে নি ,তারপরও কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করে সে ।
গাড়িতে রিকি মারটিন এর একটা গান ছাড়ল নাভিদ । রক মিউসিক তার খুব ভাল লাগে । আর ভাল লাগে প্রচণ্ড স্পীডে গাড়ি চালাতে । গাড়ি চালাতে চালাতে সে শহর ছেড়ে অনেক সময়ই গ্রামের দিকে চলে যায় । এটা তার নেশার মত হয়ে গিয়েছে । আজকেও ড্রাইভ শুরু করার অল্প কিছুক্ষণের মাঝেই শহরের ব্যস্ততাকে পিছনে ফেলল সে । এরপর স্পীডোমিটারের কাঁটা প্রায় একশো ছুঁইয়ে ফেলল সে । ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই প্রায় জনবিরল একটা এলাকায় এসে পড়ল সে । আশেপাশে খুব বেশি বাড়িঘর নেই , চারপাশে সবুজ তার পসরা সাজিয়ে বসেছে ।
নাভিদের মনটা তখন এলোমেলো ভাবনায় মশগুল । হটাত দেখল উল্টো দিক থেকে একটা ট্রাক ছুটে আসছে । তার গাড়ির স্পীড তখন একশো অতিক্রম করেছে । সেই অবস্থায় সে গাড়িটা বামে সরানোর চেষ্টা করল । কিন্তু নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না । উল্টে গেল গাড়ি , সামনের আর পিছনের কাঁচ ভেঙ্গে গেল । নাভিদ আর বেশিক্ষণ টিকতে পারল না , কিছুক্ষণের মাঝেই সে জ্ঞান হারাল ।
মাঠে গরু নিয়ে গিয়েছিল কালাম । রাস্তার পাশে নাভিদের বিধ্বস্ত গাড়ি দেখে সে বাসা থেকে তার বাবাকে ডেকে আনে । কালামের বাবা নাভিদকে গাড়ি থেকে অনেক কষ্টে বের করেন । এরপর নিজের কুঁড়েঘরে নিয়ে যান। নাভিদ তখনো অচেতন, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কেটে গিয়ে রক্ত বের হচ্ছে । প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে যা পারলেন,তাই করলেন । গ্রামের ঐ অঞ্চলে কোন হাসপাতালও নেই ।
যাই হোক , কালামের বাবা আর মায়ের সেবাশুশ্রূষার ফলে রাতের বেলা জ্ঞান ফিরল নাভিদের । তার মনে পড়ল সে অ্যাকসিডেন্ট করেছিলো । এরপর যখন শুনল এই পরিবারটির কারণে সে নতুন জীবন পেয়েছে , তখন তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাল । পকেটে হাত দিয়ে দেখল, মোবাইলের অবস্থা করুন । তার মায়ের জন্য অস্থির লাগা শুরু করল । কালামের বাবা তাকে জানালো যে এখান থেকে মাইলখানেক দূরের একটা জায়গা থেকে ফোন করা যায় । কিন্তু নাভিদের শরীরের যে অবস্থা তাতে তার পক্ষে অখানে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব না । তাই তিনি গেলেন নাভিদের বাসায় খবরটা দিতে ।
নাভিদের মা মিসেস হাসান ততোক্ষণে চিন্তায় অস্থির । মিঃ হাসান থানা-পুলিশ করছেন । তাদের সবার ধারণা নাভিদকে কেউ কিডন্যাপ করেছে । এমন সময় মিসেস হাসানের মোবাইল বেজে উঠলো ।
“হ্যালো , নাভিদের আম্মা কইতাসেন? “
“জি , বলছি ।“
“আপনের পোলা আইজকা সক্কাল্বেলা আকসিদেন করসেন । এখন আমার বাড়িতে আসে ।“
“আপনি কি বলছেন এইসব?? আমি আমার ছেলের সাথে কথা বলব ।“
“উনি ত এইখানে নাই । উনি আমার ঘরে শুইয়া আসেন । কালকে আমি তারে আপনার কাসে পউছাইয়া দিমু আফা ।“
“ভাই আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিব !! ও আমার একমাত্র ছেলে । অর যাতে কোন অসুবিধা না হয় । টাকা-পয়সা যা খরচ হবে সব দিয়ে দিব । আপনি অকে একটু আমার কাছে পৌঁছিয়ে দেন ভাই । “
“আফা , আমি আগামিকাল সক্কালেই উনারে নিয়া চইলা আসুম । আফনে কুন চিন্তা কইরেন না ।“
পরদিন সকালবেলায় কালামের বাবা আর কালাম নাভিদকে নিয়ে তাদের বাসার কাছে এল । নাভিদকে সিনজিতে বসিয়ে রেখে কালামের বাবা দারোয়ানের কাছে গিয়ে গেট খোলার জপ্নন বলল । প্রথমেই দারোয়ান তাকে তাড়িয়ে দিতে চায়ল । পরে নাভিদকে দেখে ঢুকতে দিল । সবাইকে না, শুধুমাত্র নাভিদকে । কালাম আর তার বাবা গেটে দারিয়ে রইল , কারন যাকে-তাকে গেটের ভিতরে ঢুকতে দেওয়ার নিষেধ আছে ।
কিছুক্ষণ দারোয়ানের মোবাইলে একটা ফোন এল । সে এক দৌড়ে বাড়ির ভিতরে গেল । কালাম আর তার বাবা তখনো দাঁড়িয়ে । কিছুক্ষণ পর দারোয়ান বের হয়ে এল একটা প্যাকেট নিয়ে । সেটা কালামের বাবার হাতে দিয়ে তাকে চলে যেতে বলল ।
রাস্তায় নেমে প্যাকেটটা খুলল কালামের বাবা , কয়েকটা করকরে ৫০০ টাকার নোট । খুব ইচ্ছে করল তার প্যাকেটটা রাস্তার পাশের নর্দমায় ফেলে দিতে । কিন্তু , সে পারল না.................................... কারণ , আত্মসম্মান ,আত্মমর্যাদা -------এগুলো শহুরে মানুষের কিছু মুখভার করা মুখোশ । ‘ কালামের বাবা’-দের এইসব নিয়ে চিন্তা করলে পেট বা জীবন কোনটাই চলবে না..............................
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
মিজানুর রহমান রানা
আত্মসম্মান ,আত্মমর্যাদা -------এগুলো শহুরে মানুষের কিছু মুখভার করা মুখোশ । ‘ কালামের বাবা’-দের
এইসব নিয়ে চিন্তা করলে পেট বা জীবন কোনটাই চলবে না..................নির্ঘুম রাতের গল্প হলেও আমাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। বেশ ভালো লাগলো।
প্রজাপতি মন
সুন্দর গল্প। শহরের মানুষেরা আসলে এমনই। সবকিছুকেই টাকার মূল্যে হিসাব করে। যারা তার সন্তানের প্রাণ রক্ষা করলো তাদের একবার বাড়ির ভিতরে যাবার অনুমতিটুকুও দিলনা। বড় আশ্চর্য এবং অকৃতজ্ঞ এই শহুরে মানুষ!!
সেলিনা ইসলাম N/A
গ্রামের মানুষগুলো যে মাটির মত নির্ভেজাল ও কতটা আন্তরিক এবং তাদের যে কতটা আত্মসম্মান বোধ আছে তা আপনার এই ছোট্ট গল্পে বেশ সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন । সেই সাথে ধনী ও গরিবের পার্থক্য । মানুষের যত টাকা হয় সে ততটাই অমানবিক হয়ে যায় । বেশ ভাল লাগল আপনার গল্প । শুভকামনা ।
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
বিজ্ঞপ্তি
“ ” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ , থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।