লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ৮টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftমে দিবস (মে ২০১৩)

গ্যাদা
মে দিবস

সংখ্যা

মোল্লা সালেহ

comment ১  favorite ০  import_contacts ৪৩৮
গ্যাদা একগ্লাস পানি খিলাতে পারবু ?
আশে পাশে তাকিয়ে দেখলাম ‘গ্যাদা’ বলে সম্বোধন করার মত কেউ নাই। বুঝলাম আমাকেই বলছে। কাছে গিয়ে বললাম , কি কন ?
লোকটি বলল , “এক গ্লাস পানি লিয়া আয়তো বাপ। খুব পানি ঠিসা লাইগছে। ”
আজ হাটবার। চৈত্রের দুপুর। হাটের উত্তর পাশে যে আড়চলা ঘর আছে তার ভিতর জনা কয়েক লোক বসে আছে। পাকা মেঝের ইপর শুয়ে আছে অথবা কেউ কেউ বিড়ি টানছে আর খোশগল্প করছে। এরা সবাই হাটুরে। দূরের গ্রাম হতে এসেছে। হাট লাগতে দেরী আছে তাই আয়েশ করে সময় কাটাচ্ছে। এখানে যারা আসে তাদের বেশীর ভাগই আমার পরিচিত। চড়া থেকে ফিরে গর“গুলো বটতলায় বেধে গাও জুরাতে প্রায় দুপুরে এখানে এসে বসি। হাটুরেদের ছোটখাটো আরুন্তি শোনা আমার কাছে মামুলি ব্যাপার। লোকটাকে পানি খাওয়ালাম। লোকটাকে হাটুরে ঠাওর করা মুশকিল। আবার মুসাফিরও মনে হলনা। চাঁদর দিয়ে বাধা পোটলার বাহিরে কাঁচির ডাঁট বেড়িয়ে আছে। বুঝলাম লোকটা বিদেশ করে। বাড়ী হয়ত আশে পাশে কোথাও হবে। একটু দূরেই বসে ছিলাম। লোকটা হাত দিয়ে ইশারা করে আমাকে কাছে যেতে বলল। একটু এগিয়ে গেলাম। আমাকে জিজ্ঞেস করল , তোর বাপের নাম কি রে ?
লোকটার প্রশ্ন শুনে একটু বিরক্তই হলাম। লোকটি যে আমাদের গ্রামের কাউকে না চেনারই কথা। বাপের নাম বললে তো আর ক্ষতি নাই। বলরাম আমার বাপের নাম তুফান পরামানিক।
লোকটি ভুর“ কুচকিয়ে বলল , কোন তুফান ? লাঙ্গল বয় যে ঐ তুফান। আমি বললাম , হ।
“দেখচু তুই তুফানের ছাওয়াল । খাড়াই কত বড় হয়া গেছু।”
লোকটির চোখে মুখে বিস্ময়। আমাকে দেখেই লোকটির চোখ কপালে উঠেছে। তাই ইচ্ছা করেই আমার বড় ভাইদের ব্যাপার চেপে গেলাম। লোকটি তার অতীত হাতড়ে যে সব কথা বললেন , তাতে বুঝলাম লোকটি আমার বাবাকে ভাল করেই চেনে। একসাথে চড়ায় কাজ করেছে। ছোটবেলা থেকে আমাদের গ্রামের ব্যাপারীদের বাড়ীতে কাজ করত। ব্যাপারীরা তাদের জমি চাষের জন্য আমার বাবার লাঙ্গল জোয়ালের উপর দ্বায়িত্ব ছেড়ে দিত। সেই থেকে তাদের মধ্যে পরিচয়। এবং সমবয়সী হওয়ার কারণে উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
লোকটি দীর্ঘ নি:শ্বাস ছেড়ে বলল , “ এসব কত দিন আগের কথ। এর মধ্যে কত কিছু হয়া গ্যালো। ”
লোকটার এত কথা শোনার পরও জানতে পারলাম না তার বাড়ী কোথায়। জিজ্ঞেস করলাম, কাকা আপনার বাড়ী কোনে? বিরক্তির সুরে বলল , “ ক্যারে ব্যাটা তুই এতক্ষনে কি কইস ! আমার বাড়ী খুটিগাছা। উলিপুরের মানুষ হয়া তুই আমাক চিনিষ না ?
ব্যাপারটা সত্যিই লজ্জার। পাশের গ্রামের লোক চিনি না। কত মানুষই তো চিনি। কিন্তু যাকে কখনও দেখি নাই , যার কথা কোনদিন শুনি নাই তাকে চিনব কি করে ? অনেক কিছুই জানতে ইচ্ছা করছিল। অনেক কিছু জানি না -এই অপরাধে বার কয়েক ধমক খায়ার পর কোন কিছূ আর জানতে ইচ্ছা করছিলনা। তবে একটার বিষয় চেপে রাখতে পরলাম না। বেচারা এই বয়সেও বিদেশ করে কেন ? লোকটা বাবার সমবয়সী। বাবাকে মাঠে যেতে দেইনা। অনেক আগেই আমি হাল চাষের দ্বায়িত্ব নিয়ে নিয়েছি। সে শুধু বাড়ীর টুকটাক কাজ দেখে। মুখ ফসকে লোকটাকে জিজ্ঞেস করে ফেললাম , “ আপনার কি কোন ছাওয়াল নাই যে এই বয়সেও বিদেশ করেন ? ভেবেছিলাম লোকটা হয়ত রাগ করবে। হেসে উত্তর দিল , তোর বাপকেই জিজ্ঞেস করিস ?

রাতে খাবার সময় আব্বাকে লোকটার কথা জিজ্ঞেস করলাম। দু’ চার কথা বলতেই আব্বা বলল , “ ও তুই গেদুর কথা কচ্ছু ? তা তুই তাক দেখলু কোনে ? ওর তো দেখাই পাওয়া যায়না। সারা বছর বিদেশ করে। বছরে দু’ একবার এলাকায় আসে। ” আরো কিছু জিজ্ঞেস করায় আব্বা বলল , “ আগে খায়া দ্যায়া ওঠ। ”
চৈত্রের দিনের বেলাতে যেমন গরম , রাতের বেলাতেও ভ্যাপসা গরম। সবাই পাটি বিছিয়ে উঠোনে বসে থাকি। মাঝে মাঝে কখনও বাতাস বয়। তারপরও টিনের ঘড়ের চেয়ে খোলা আকাশের নীচে অনেকটা আরাম পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে ঘুমে যখন গা ঢুলতে থাকে তখন সবাই উঠে শুতে যায়। তার আগ পর্যন্ত চলে নানা রকম গল্প। গেদু আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। আব্বা তার গল্পই করলেন।
গেদুর জন্ম খুটিগাছা গ্রামে। জন্মের চার পাঁচ বছর পর তার বাবা মায়ের বনিবনা না হওয়ায় ছাড়াছাড়ি হয়। তার মা তাকে নিয়ে যেতে চাইলেও তার বাবা জোর করে নিজের কাছে রাখে। বাবার যতেœই বড় হতে থাকে। এক সময় তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে ঘরজামাই হয়ে অন্য গ্রামে চলে যায়। গেদু ততদিনে বড় হয়ে গেছে। টুকটাক কাজ পারে। ব্যাপারীদের বাড়ীতে কাজে লেগে যায়। প্রথমে কাজ করত ভাতের বিনিময়ে। তারপর ধীরে ধীরে বড় হয়েছে আর মাসে মাসে মাইনে বেড়েছে। গেদু প্রয়োজনীয় সব কিছু ব্যাপারী বাড়ী থেকেই পেত। তাই তাকে তেমন টাকা খরচ করতে হতনা। সে টাকা জমাতে থাকে। যৌবনে পা রাখতেই তার কিছু সম্বল হয়। ব্যাপারী বাড়ীর কাজ ছেড়ে দিয়ে সে বাপর পুরানো ভিটায় বসে। অনেক দিন সে অন্যের বাড়ীতে খেটেছে। এবার সে নিজে কিছু করতে চায়। সংসারী হতে চায়। নানা রকম স্বপ্ন দোল খায় তার চোখে। ভাবী গোছের মহিলারা বলে , গেদু তো অনেক কামাই করলো এবার একটা বিয়ে করুক। কথাটা প্রতিবেশী মুর“ব্বী চাচারা এড়াতে পারেনা। শুর“ হয় বউ দেখা। মিলেও যায়। চেনা শোনা গ্রামেরই মেয়ে। অভিভাবকদের কথা চালাচালিতে বিয়ের দিনক্ষন ঠিক হয়। ছোটখাট আয়োজনে বিয়ের কাজও সম্পন্ন হয়। কিন্তু বিয়েই যেন তার জীবনে কাল হয়ে দেখা দেয়। তাকে সংসারী থেকে সন্যাসী করে তোলে। গেদু নতুন বউকে নিয়ে বাসরঘরে ঘুমিয়ে ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে সে যেন পাথর হয়ে যায়। তার নতুন বউ ঘড়ে নাই। কথা বসে থাকে না। জানা যায় গ্রামের এক ছেলের সাথে ভোর রাতে পালিয়ে গেছে। গেদুর পৃথিবী যেন উল্টাপাল্টা হয়ে যায়। পরে আর সংসারে মন বসাতে পারেনি। কয়েক মাসের ভিতর তার সম্বল শেষ হযে আসে। তারপর পেটের তাগিদে বেড়িয়ে পড়ে বিদেশ করতে।
রাত অনেক হয়েছে। চাঁদ উঠতে শুর“ করেছে। সবাই যার যার ঘরে শুতে গেছে। আমি এখনও বসে বসে গেদুর কথা ভাবছি। উঠোনের একপাশে গোয়ালঘর। গোয়ালঘরের দেয়ালের সাথে লাঙ্গল জোয়াল ঝুলে আছে। উঠে দেয়ালের কাছে এলাম। নতুন লাঙ্গলের ফালের উপর চাদের আলো পড়ছে। মাটির ঘর্ষনে চকচকে ফাল আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। পাশেই ঝুলানো গেদুর পুরানো লাঙ্গল। বাবা ধার এনেছিল। ফেরত দেয়া হয়নি। অনেকদিন হল ওটা আর ব্যাবহার করা হয়না। ওটার উপর এতটাই মরিচা পড়েছে যে ওটাকে আর লোহা মনেই হচ্ছে না।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement