“ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু” রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত এই গানের লাইনে ক্লান্তির কাছে আত্মসমর্পণের সুর সহজেই অনুমেয়। কিন্তু কিছু কিছু পথ চলা কখনও ক্লান্তির কাছে হার মানেনা। আমি এক মায়ের কথা বলছি, যার পথ চলা আর প্রতীক্ষা দুটোই এখন সমার্থক হয়ে দেখা দিয়েছে জীবনে। ছেলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য সরকারি বৃত্তিতে অস্ট্রেলিয়া পড়াশোনা করছে। আর মা তার ছেলের পথ চেয়ে অপেক্ষাতে আছে, ছেলে কবে ফিরে আসবে। এ অপেক্ষাতে কোন ক্লান্তি নেই, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর , এমন কি যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করতে পারে সে, তার ছেলের জন্য। কিছু কিছু প্রতীক্ষার অবসান মানুষের জীবনে আনন্দের ঝর্না ধারা বইয়ে দেয় যেমন মাতৃত্ব , দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মা যখন তার সন্তানকে পৃথিবীর প্রথম আলো দেখায়, তখন মাতৃ হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে ভালবাসা,মমতা আর মাতৃত্বের অহংকারে। একথা বহুল প্রচলিত নারীর পরিপূর্ণতা তার মাতৃত্বে। সত্যিই তাই মাতৃত্বের স্বাদ প্রত্যেক নারীর জন্য বহু আকাঙ্ক্ষিত। ”ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে” এ কথা যেমন সত্য তেমনি একথা ও সত্য যে ঘুমিয়ে আছে শিশুর মাতা সব শিশুর অন্তরে। পুতুল খেলার ছলে, পুতুলের মা হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়েই হয়তো সে মাতৃত্বেও আকাঙ্ক্ষা প্রথম প্রকাশ পায়।

সৈকতের মা ছিল এক মধ্যবর্তী পরিবারের মেয়ে। স্থানীয় কলেজ থেকে ডিগ্রী পাস করার পর , বাবা-মা দেখে শুনে এক ব্যংকার ছেলের সাথে তার বিয়ে দেন। ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে চাকরী করে। কাজেই বিয়ের পর স্বাভাবিক ভাবেই তাকে স্বামীর সংগে ঢাকায় সেটেল্ড হতে হলো। বিয়ের পর কিছু দিন যেতে না যেতেই প্রচণ্ড নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্ব পেয়ে বসলো তাকে। স্বামী সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অফিস করে, সময় যেন আর কিছুতেই কাটেনা। সারা দিন বাসায় একা একা কাটতো ।
এমনি ভাবে কিছুদিন কাটার পর গর্ভে আসলো তার সন্তান। শুরু হল তার অপেক্ষা কবে ভূমিষ্ঠ হবে তার সন্তান, কবে পৃথিবীর আলো দেখবে সে। একদিন অবসান হলো সে অপেক্ষার, সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে উপভোগ করলো মাতৃত্বের পরিপূর্ণতা। ফুট ফুটে একটি ছেলে সন্তান তার কোল জুড়ে এলো। সে যেন এরই জন্য যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করছিল। তার নিঃসঙ্গতা অনেকটাই কেটে গেল কিন্তু শুরু হলো আবার অপেক্ষা, সে অপেক্ষা ধাপে ধাপে। একটার অবসান হয় অন্যটা শুরু হয়। যেমন প্রথম নাম করন নিয়ে, কি নাম রাখবে ছেলের তা যেন আর স্থির করতে পারেনা, শেষে অনেক ভেবে চিন্তে ছেলের নাম রাখা হল সৈকত। মায়ের সমস্ত চিন্তা তখন তার সন্তান কে নিয়ে, কবে হামাগুড়ি দিতে শিখবে তার ছেলে, কবে এক পা দু পা করে হাটতে শিখবে। একদিন হয়তো এ অপেক্ষার অবসান হয় কিন্তু শুরু হয় আবার নতুন অপেক্ষা। কখন তার ছেলের মুখে আধো আধো সুরে মা ডাক শুনবে। আজও সেদিনটির কথা স্পষ্ট মনে আছে তার। তখন সৈকত কোন শব্দই বলতে পারতোনা। হঠাৎ তার মুখে মা ডাক শুনে সে এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিল যে, সংগে সংগে সে তার স্বামীকে অফিসে ফোন করে জানিয়ে ছিল, শুধু স্বামীকেই বা কেন তার সমস্ত আত্মীয় স্বজন সবাই কে জানিয়েছিল সে খবর। এরপর শুরু হয় আবার আরেক অপেক্ষা কখন আরো বড় হবে তার ছেলে। কখন হবে তার বর্ণ পরিচয়,
প্রথম যে দিন সৈকত ক জাতীয় কিছু একটা লিখেছিল সেদিন কি আনন্দই না হয়েছিল তার, সবাইকে ডেকে-ডেকে দেখিয়েছিল। তারপরে স্কুলে ভর্তি করার জন্য অপেক্ষা। এর পর থেকে তার আর একা মনে হয়নি কখনও, সৈকতের সাথে কেটে যেত তার সারাটা দিন সারাটা ক্ষণ। সৈকত যখন স্কুলে ভর্তি হলো, তখন মায়ের কর্মব্যস্ততা আরও বেড়ে গেল। সকাল হলে ছেলের খাবার বানানো, ছেলের স্কুলের টিফিন বানানো,তারপর ছেলেকে নিয়ে স্কুলে যাওয়া। ছেলে যতক্ষণ স্কুলে থাকতো সে ও স্কুলের সামনে ততক্ষণ অপেক্ষা করতো চার-–পাঁচ বছর এভাবেই কেটেছে। ওকে একা ছাড়তে চাইতনা। কেবলি মায়ের মনে হত ছেলে তার একটুও বড় হয়নি সে এখনও অনেক ছোট। সৈকত যখন ক্লাস সেভেন এ উঠলো , তখন সে তার মাকে বলতো মা তুমি যে আমাকে স্কুলে এগিয়ে দিয়ে সারাদিন স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাক, তার আর দরকার নেই মা, তোমার কত কষ্ট হয়। আমি এখন বড় হয়েছি। তুমি শুধু আমাকে স্কুলে এগিয়ে দিবে, আবার স্কুল ছুটি হলে নিয়ে যাবে। মুখে সেদিন ছেলেকে বলেছিল, না তুমি একটুও বড় হওনি তুমি এখনও অনেক ছোট। কিন্তু মনে মনে খুব খুশী হয়েছিল এই ভেবে যে, ছেলে তার কষ্ট বুঝতে শিখেছে।
এর পর কেটে গেল আরও কয়েকবছর, ছেলের এস,এস,সি পরিক্ষার বছর, মায়ের চিন্তার আর শেষ ছিলনা, শেষ পর্যন্ত সব চিন্তার অবসান ঘটিয়ে ছেলে খুবই ভাল রেজাল্ট করলো। এরপর এইচ,এস,সি তেও যথারীতি ভাল রেজাল্ট করলো। তারপর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের পালা, মা শুধু বলতো আমার ছেলেকে আমি বেশি দুরে পড়াশুনা করতে পাঠাবোনা। আমার কাছে কাছে রেখে পড়াশুনা করাবো, ওকে ছেড়ে আমি একদিনও থাকতে পারবোনা। কিন্তু মানুষ ভাবে এক হয় আর এক,হঠাৎ অস্ট্রেলিয়া সরকারের একটা বৃত্তির আওতায় সৈকতের অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সুযোগ এসে গেল। মা কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না , একপ্রকারে খাওয়া দাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিলো। শেষপর্যন্ত সৈকতের বাবা তার মাকে বুঝাতে সমর্থ হলেন যে, সৈকত যদি এই সুযোগ হাতছাড়া করে তাহলে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে। ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মা বুকে পাষাণ চাপা দিলো । সৈকত অস্ট্রেলিয়া চলে গেল । আবার শুরু হলো তার একাকীত্ব শুরু হল প্রতীক্ষা ছেলে কবে ফিরে আসবে। বুকের ভিতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যেত, তার পরেও ছেলের সাথে বিভিন্ন স্মৃতিময় দিনগুলি মনে করে সময় পার করে দিত। একথা পেতে সান্ত্বনা পেতো যে, চার বছর তো দেখতে দেখতে কেটে যাবে, ছেলে ফিরে আসলে আর তো তার কাছ ছাড়া হবেনা।
এর পর কেটে গেল আরও কিছু দিন, চার বছর হতে আর মাত্র তিন মাস বাকি তখনই ঘটে গেল বড় রকম দুর্ঘটনা। সৈকতের বাবা হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে পৃথিবীর মায়া কাটালেন। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সবকিছু তছনছ হয়ে গেল । সৈকত জরুরি ভিতিত্তে দেশে ফিরে আসল। গ্রামের বাড়িতে তার বাবার দাফন সম্পন্ন হল। সৈকতকে কাছে পাওয়ার পর যতটা আনন্দ করার কথা ছিলো তার মায়ের, সব কিছুই মাটি হয়ে গেলো। সৈকতের ছুটি শেষ হয়ে আসলো। মা লক্ষ্য করলো ছেলের মধ্যে কেমন একটা গাম্ভীর্য ভাব চলে এসেছে, কেমন যেন সেই চঞ্চলতা আর নেই। মায়ের কেমন যেন কষ্ট লাগছিলো। কিন্তু মায়ের জন্য যে এর চেয়ে বড় কষ্ট অপেক্ষা করছিলো তা ঘুণাক্ষরেও মা জানতে পারেনি। সৈকত তার মাকে জানাল যে অস্ট্রেলিয়া পড়াশুনার করার সময় সেখানে একটি মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে। মেয়েটি বাড়ি বাংলাদেশেই ছিলো কিন্তু এখন সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া থাকে। মেয়েটিকে সে বিয়ে করে অস্ট্রেলিয়ায় সেটেল্ড হতে চায়। তাই পড়াশুনার পরেও সে হয়তো আর ফিরবেনা। একথা শুনে মায়ের দু‘চোখ বেয়ে অশ্রু“ নেমে এলো। মায়ের সে অশ্রু“ যেনো কিছুতেই আর বাঁধ মানেনা। সৈকত তার মাকে বলল মা, তুমি কাঁদছ কেন? আমি তো তোমাকেও কিছুদিন পর অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাবো। জবাবে মা বলল, না বাবা আমি তোমার বাবার ভিটা ছেড়ে কোথাও যাবনা। যে কয়দিন বাঁচি ওখানেই থাকবো। আমি তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে বাঁধা দেবনা। যদি পারো দু’ এক বছর পরপর আমাকে একবার এসে দেখে যেও , আমি সারা বছর ধরে তোমার আসার প্রতীক্ষাতে থাকবো, আমরা মায়েরা যুগ যুগ ধরে এইরকম প্রতীক্ষার মাঝেই সুখ খুঁজে নেই । এই প্রতীক্ষায় কোন ক্লান্তি নেই , নেই কোন অবসাদ, আছে শুধু স্নেহের ঝর্না ধারা হইতে উৎসারিত মায়ের মমতা মাখানো আশীর্বাদ।