সাদা ক্যানভাসে নীলচে সবুজ রঙের আচড় দিতে দিতে অন্যমনস্ক হয়ে জানালার বাইরে তাকালো অত্রি.. তার পেন্টহাউস প্রায় আকাশের কাছাকাছি। দূর বহুদূর পর্যন্ত অনায়াসে চলে যায় দৃষ্টি.. জানালার ওপারে বাস্তবতার লেশমাত্র নেই, শুধু স্বপ্ন আর স্বপ্ন! আকাশ এখন মেঘাচ্ছন্ন.. বৃষ্টি আসবে বোধহয়। দূরে সমুদ্রের সাথে আকাশ মিলেমিশে একাকার.. যাকে লোকে ভালোবেসে বলে দিগন্ত। সেই ছোট্টবেলা থেকে সে দেখে আসছে দিগন্তের রঙ নীলচে সবুজ.. টারকোয়াজ ক্রেয়ন দিয়ে ড্রয়িং খাতায় দিগন্তরেখা আঁকতো সবাই। অত্রি মা কে প্রশ্ন করতো, দিগন্ত কেন ওই একটা রঙ দিয়েই আঁকতে হবে? সাত রঙেও তো দিগন্ত আঁকতে পারে সে! মা হেসে বলতো, দিগন্ত ওই নীলচে সবুজ রঙেরই হয় বোকা মেয়ে! মা যখন আচমকা হারিয়ে গেলো, সে খুঁজতে গেলেই বাবা তাকে বারান্দায় নিয়ে যেতো.. আর বলতো, দূরের ঐ দিগন্তে আছে মা, এইতো কদিন পরেই চলে আসবে। কিন্তু না.. আর কখনো আসেনি তার মা। পরে সে জেনেছে মা দিগন্তে যায়নি, মারা গিয়েছে। তবে অত্রি দিগন্তে যে কাউকে হারিয়ে ফেলেনি তা নয়। সে দিগন্তে বিসর্জন দিয়েছে তার বাবা কে...
এখন আর এসব নিয়ে ভাবে না অত্রি। তবে এখনও তার প্রিয় রঙ নীলচে সবুজ.. দিগন্তের রঙ।
এইমুহূর্তে অবশ্য দিগন্তে কোন রঙ নেই, মেঘলা আকাশ মানেই সাদাকালো ক্যানভাস.. তার ফেলে আসা জীবনের মতো। তবে এখন তার জীবন অন্যরকম.. এই জীবনে সাতরঙ আছে, কবিতা আর রঙতুলি আছে, সাফল্য আর স্বাধীনতা আছে। অত্রির নিজের দিগন্ত এখন আবারও রঙিন.. কারন আর সবকিছুর সাথে সাথে তার আছে নীলচে সবুজ ভালোবাসা।
অত্রির হঠাত্‍ মনে পড়ে গেলো তার বাবার কথা.. সেই আগেকার ছোট্টবেলার বাবা, যার পরিচয় ছিল শুধুই তার নিজের বাবা। তার বাবা রাজনীতিবিদ.. এটুকুই জানতো সে, তার মানে যে কি তাও সে ভাবেনি তখনও। যখন একটু একটু করে বুঝতে শিখলো রাজনীতি কি.. তখনই তার নিজের আদর্শের সাথে সংঘর্ষ বাঁধলো বাবার আদর্শের। তার বাবা রাজনীতির উঁচু পর্যায়ের নেতা, যার কথায় এবং টাকায় উঠে আর বসে সহস্র লোকজন। কিন্তু তার কাজে এসবের প্রভাব পড়েনা.. রাজনীতি করে নিজের জীবনে সাফল্য আনলেও দেশের বা এলাকার জন্য কিছুই করা হয়নি তার। তাই অত্রির সাথে তার বাবার সম্পর্ক তর্কবিতর্কের বেড়াজাল বুনে একটু একটু করে বিষিয়ে যেতে লাগলো। তারপরেও কেটে যাচ্ছিলো দিনরাত্তির.. সব ওলোটপালোট হয়ে গেলো একদিন।
দেশে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা.. তার বাবাও তাই ব্যস্ত ভীষণ! অত্রি বাইরে যেতে গিয়ে কি যেন নেবে বলে বাড়িতে ফিরতেই দেখে একগাদা নিম্নশ্রেনীর লোকজন বসার ঘরে.. সে দোতলায় তার ঘরে গিয়েও বাবার গলা শুনে বাইরে বেরিয়ে আসলো। শুনতে পেলো তার বাবা বলছে, হরতাল সফল করতে হলে কিছু বাস ট্রাক তো জ্বালাতেই হবে। এতে অল্পকিছু মানুষ মরলে কি করা যাবে! অত্রি তার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। সেদিন রাতে বাবার সাথে তুমুল ঝগড়া হলো তার.. একপর্যায়ে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে খালার বাসায় গিয়ে উঠলো অত্রি। সারাটা রাত অস্থিরতা আর মুঠো মুঠো দুঃস্বপ্ন। পরদিন পেপারে কয়েকটা বাসে পেট্রোল বোমা আর পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোকে দেখে মরে যেতে ইচ্ছে করলো তার। সেইদিন থেকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করলো অত্রি, ভূলে যাবে সে তার নিজের পরিচয়.. ভূলে যাবে ওই নোংরা মানুষটা তার বাবা। ভূলেও গেলো সে.. একেবারেই মুছে ফেললো অতীতের সবকিছু। কাজ করতে লাগলো দেশের মানুষের জন্য.. সে এবং আরো অসংখ্য তরুন তরুনী মিলে। তারা সবাই বুঝতে পেরেছিলো দেশের এই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে হাল ধরতে হবে তাদেরকেই। এমনই এক উন্নয়ন কর্মকান্ডে পরিচয় হলো সেই মানুষটার সাথে..
যার জন্য এতদিন অপেক্ষা করছিলো অত্রি এবং সারাদেশের মানুষ। মানুষটা রাজনীতি বুঝতে চায় না.. চায় শুধু দেশ কে বুঝতে। তার দুচোখে অপার স্বপ্ন.. দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। সেই মানুষটার জীবনের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেললো অত্রি.. আর সেই মানুষটা নিজেকে আর অত্রিকে জড়িয়ে ফেললো দেশের সাথে।
বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে.. সাদাকালো প্রকৃতির জলখেলা। অথচ অত্রির ক্যানভাসের প্রকৃতিতে শুধু রঙ আর রঙ.. নীলচে সবুজ দিগন্তে জ্বলজ্বল করছে আগামীর সূর্য। দূরে কোথাও বিদ্যুত্‍ চমকালো বিকট শব্দে। অত্রি ভয়ে চমকে উঠলো। ঠিক তখনি তার পেছনে দাড়িয়ে কাঁধে হাত রাখলো সেই মানুষটা.. দীঘলদেহী আত্মবিশ্বাসী এক স্বপ্নপ্রিয় দেশপ্রেমিক, যার হাতে একটু একটু করে গড়ে উঠছে নতুন এক দেশ.. যে দেশে শুধুই উন্নয়ন আর অনাবিল প্রশান্তি। অত্রির হৃদয়ে এখন পরম নির্ভরতা.. সে জানে এই মানুষটার হাত ধরে সে নিজে এবং তার দেশের মানুষ একদিন ঠিক পৌছে যাবে সাফল্য এবং ভালোবাসার নীলচে সবুজ দিগন্তে.....