লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ অক্টোবর ২০১৯
গল্প/কবিতা: ৫৭টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

২০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftশীত (জানুয়ারী ২০১২)

শীতের মজা গ্রামে।
শীত

সংখ্যা

মোট ভোট ২০

মোহাম্মদ ওয়াহিদ হুসাইন

comment ১৩  favorite ২  import_contacts ১,০১৭
মেজাজটা ভাল নেই আনুর, আর পৌষমাসের মাঝামাঝি সময়ে ভোর নয়টায়- যদিও তার বাপের বক্তব্য, দুপুর নয়টা- থলে হাতে, নিজেরসহ পরিবারের গুষ্টির পিন্ডির উপকরণ জোগাড়ের জন্য সিকিমাইল দুরের বাজারে যেতে হলে মেজাজ মন শরীর কোনটাই ভাল থাকার কথা নয়, অন্তত তারমত একটা ছেলের। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা এতটাই ভাল যে, তার বাবা চারজন কর্মচারী শুধুমাত্র এইজন্য রেখেদিতে পারে, যেন তার চার হাতপা ধরে ঝুলিয়ে বাজারে বা শহরের অপর প্রান্তের গোহাটায় নিয়ে যাওয়া যায় আর সেখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব হতেপারে, তারপরেও এর কোন আর্থিক প্রতিক্রীয়া তাদের সংসারে দেখতে পাওয়া যাবেনা।
সে একটা ঘরকুনো ছেলে, তার একটা কারণ হয়ত এটাই, তার পরিবারের বাকি চারজনের সাথে সে অনর্গল কথা বলে যেতে পারলেও এর বাইরে সামান্য কয়েকজন ছাড়া আর কারো সাথে কথা বলতে গেলে তার জিভে আর স্বরযন্ত্রে প্যাঁচ খেয়ে যায়।
মা ঘরে ঢুকলে সে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে তেঁতোমুখে মায়ের হাত থেকে বাজারের থলে আর টাকা নিল, মা একটাও শব্দ উচ্চারণ না করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখে আর মাথায় হাত বুলিয়েদিয়ে নিজের কাজে ফিরেগেল। আনু পা বাড়াতে গিয়েও থমকে দাড়লো- পনের বছর পর তার মনে প্রথমবারেরমত ঝিলিক দিয়ে উঠল, বাড়ির কোন কোনাটাতে তার মন পড়ে থাকে, আর তার কারণ কী।
মেজাজ খারাপ হলেও সে বাপের উপর বিরক্ত হয়নি, কারণ, সে ভালই জানে, একান্ত অসুবিধায় না পড়লে তাকে কখনই কোন কাজ করতে বলা হয়না। তার বাবা ছোটখাটো হালকা পাতলা আর দেখতে দুর্বল ধরণের একজন মানুষ, মনেহয় যেন জোরে হাওয়া বইলে সে উড়ে যাবে, কিন্তু সে বেশ শক্ত সমর্থ আর সবসময়ই কোন না কোন কাজ নিয়ে আছে। নিশ্চয় সে এখন কোন একটা কাজে ব্যস্ত, আর বাজারের জন্য সময়মত রান্না না হলে তার ছোটভাই আর বোন কষ্ট পাবে। একজন কাজের বুয়া ছাড়া এই বাড়িতে কোন কাজের লোক রাখা হয়নি। প্রয়োজন হলে চুক্তিতে শ্রমিক আনা হয়, এতটুকুই।
তাদের বাড়ির পূর্ব দিকের সীমানার সাথেই কাশেম সাহেবের জমি। পূর্ব পশ্চিমে লম্বা আয়তাকার প্রায় তিন বিঘা, জমির প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় দুটো পুকুর থাকার কারণে মনে হয় যেন তেপান্তর, কিন্তু এই শর্টকাটের তেপান্তর পার হওয়ার ইচ্ছা না করলে তাকে সিকিমাইলের দ্বিগুণ পথ পাড়ি দিতে হবে। সেক্ষেত্রে পশ্চিম দিকের রাস্তাদিয়ে বের হয়ে পুরো এলাকাটা ঘুরে বাজারে পৌছাতে হবে। গ্রামের ছেলে হলেও প্রথম প্রথম এই পরের জমির উপরদিয়ে যাওয়া আসা করাটা তার নিজের কাছে কেমন যেন একটু বিব্রতকর বলে মনে হত, নিজেদের পুরোটা জমি আটফুট উঁচু পাঁচিলদিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, শর্টকাটের জন্য তারা একটা পীঁপড়েকেও এর উপর দিয়ে যেতেদিতে রাযী নয়। কিন্তু তার বাবার সমান বা একটু বেশি বয়সের যে মানুষটা ছোটচেকের লুংগি সাদা হাফহাতা গেঞ্জি আর মাথায় লাল গামছা জড়িয়ে বসেবসে শব্জীবাগানের মাটির মুখে খোঁচামেরে চলেছে সে তার তিন বিঘার একপ্রান্ত থেকে আপর প্রান্ত পর্যন্ত প্রতিবেশীর পাঁচিল থেকে শব্জীবাগানের বিঘাখানিক বেড়াটাকে ছয় ফুটেরমত দূরে সরিয়ে রেখেছে। এতে তার ‘ছ্য়ফুটো’ খাটনি কমছে সেটা ঠিক, কিন্তু রান্নাঘরে মালও তো সেই অনুপাতে কম যাচ্ছে, না কি? তা ছাড়া, এক প্লাস আধা ইজিকল্টু দেড় বিঘে বাঁশের চটার বেড়ার জন্য খরচ আর মেহন্নতও কম হয়নি তার। আনুলদের তুলনায় তাদের আর্থিক আবস্থা খুবই খারাপ, তারপরও ভদ্রলোক এই ক্ষতিটা কোন চাপ ছাড়াই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। অথচ এমনভাবে মুখ নিচু করে কাজ করে যায়, যেন সে বেগুনের চারা লাগানর জন্য সংসদভবনের সামনের রাস্তাটাকে ফুটো করে চলেছে, যেটা করার সময় তাকে কেউ চিনে ফেলাটা তারজন্য একটা লজ্জার ব্যাপার। কাজেই আনুকে যখন জমির মালিক দেখতে পাচ্ছেনা তখন আর বিব্রত হতে যাওয়া কেন?
আর একটু এগিয়ে বাড়ির আড়ালটা পার হওয়ার পর সে দেখতেপেল, সামনের দিকের বাগানেরমত জায়গাটায় কাশেম সাহেবেব্র সেজছেলে অপু ঘাসের উপরে একটা মাদুর বিছিয়ে সূর্যের দিকে পিছন ফিরে উবু হয়ে বসে খুব মনযোগের সাথে বই পড়ছে। তাকে এটা বলে দিতে হবেনা যে, সেটা একটা গল্পের বই। হতভাগাটা পরীক্ষার সময়ও এটাই করে থাকে। আর সে নিজে সারা জীবনে গল্পের বই পড়েছে গোটা পাঁচেক, যার কোনটা অর্ধেক, কোনটা সিকি আর কোনটা ...। তার পড়ার এক মাত্র বিষয় হচ্ছে পাঠ্য পুস্তক, এর বাইরের কিছু হতে পারেনা। এই ছেলেটা তার সমবয়সী সেটা ঠিক আছে, সহপাঠি সেটাও ঠিক আছে, কিন্তু বন্ধু? তার কাছে ব্যাপারটা কেমন যেন ভূতুড়ে আর আবাস্তব বলে মনে হয়, কিন্তু সেটাই কড়া ধরণের বাস্তব। ওদিক থেকে কখনই কোন প্রস্তাব আসেনি, সে নিজেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল আর এখন এটার জন্য সে গর্বিত।
সে আর একপা সামনে বাড়াতেই অপু মুখ তুলে তাকাল। ‘একটু দাড়া, আমিও যাব।’ দ্বিতীয় আর কোন কথা না বলে আনুকে হতভম্ব অবস্তায় দাড় করিয়ে রেখে বই আর মাদুর তুলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির ভিতরে ঢুকল। অপুর ভাব দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন আগেই অপুকে নিজের এই বাজারে যাওয়ার কথাটা জানিয়ে রেখেছিল!সে বেড়ায় একটা হাত রেখে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে নানান কথা ভাবতে লাগল। শহরের ভিতরের এই মাটির বাড়িটার দিকে তাকিয়ে তার নিজের গ্রামের বাড়িটার কথা মনে পড়েগেল, আর সাথেসাথেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, হতচ্ছাড়াটা রাযী হলেই তারা দুজনে আজ গ্রামেরবাড়িতে যাবে। আগামীকাল স্কুল বন্ধ, আজকের দিনের যতটা হাতে থাকে আর রাতটা কাটিয়ে কাল দিন বা রাতের যেকোন সময় ফিরে এলেই হবে।
আনুদের পরিবারটা ছাড়া তাদের জ্ঞাতিগুষ্টির বাকি সবাই গ্রামেই পড়েআছে, হয়ত এই কারণেই তার বাবার কাছে, নিজের ছেলেমেয়েদের কেউ গ্রামে যেতে চাচ্ছে, এরচেয়ে আনন্দের সংবাদ আর কিছু হতে পারেনা। কাজেই, অনুমতির জন্য কোন চিন্তানেই। অপু? সে যদি মনে করে, যাওয়া যেতে পারে তাহলে কারো কোন অনুমতির তোয়াক্কা না করেই সাইকেলটা টানতে টানতে ঘর থেকে বের হয়ে আসবে। কেউ তার যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইল শুধু বলবে, একটু যাচ্ছি। ব্যাস, এতটুকুই, আর কোন ব্যাখ্যা নয়। একমাত্র শক্তি প্রয়োগ ছাড়া যুক্তি তর্ক অনুনয় ভয় দেখানো কোন কিছু দিয়ে তাকে আটকে রাখা যাবেনা। কিন্তু সে যদি মনে করে, নিজের বা বাড়ির কোন কাজের জন্য তার থাকা দরকার, তাহলে তাকে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হবেনা। সেক্ষেত্রে আনুর নিজের একপাও বাড়ানোর ইচ্ছা থাকবেনা।
অপুদের গলিটা থেকে বের হয়ে বাম দিকে ঘুরতেই দেখতে পেল, ওদিক থেকে তাদের আর এক বন্ধু কালাম হেলেদুলে এগিয়ে আসছে, সে বাঁহাতের ঝুলিয়ে রাখা কাগজের ঠোঙা থেকে কিছু বের করছে আর খাচ্ছে। ঠোঙার আকার দেখে মনে হচ্ছে বাড়ির সবার জব্য কিছু কিনে নিজেই খেতেখেতে যাচ্ছে। ও ঐ রকমই, একটু পেটুক, কিন্তু হাসিখুশি মিশুক ধরণের।
‘খা,’ কাছে হতেই ডানহাত সামনে বাড়িয়ে ধরে বলল।
অপু ভাবল, বেচারা বাড়ির জন্য যাকিছু হোক নিয়ে যাচ্ছে, নিজে খেয়ে তো কমিয়েছেই, এতে ভাগ বসিয়ে আর কমানো উচিত হবেনা, কিন্তু আনু সাথেসাথেই থাবাদিয়ে সেটাকে নিয়ে উঁকিদিয়ে ভিতরটা দেখল, ঠোঙাটার নিচের দিকে মুঠো খানেক চানাচুর পড়ে আছে, আর সেটার গায়ে ভাল রকমের একটা ফাটল। সে বাজারের থলেটা বগলে চেপে ধরে ডানহাতের তালুতে সবটুকু ঢেলে নিয়ে অপুর দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল, ‘খা।’
অপু সামান্য একটু তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কালামের দিকে তাকাল।
‘বাড়ির জন্য একপোয়া কিনেছিলাম,’ সে লজ্জিত ভঙিতে বলল। ‘ঠোঙাটা ফেটেগেছিল, আমি খেয়াল করিনি, অর্ধেকটা পড়েগেল। ভাবলাম, আমিই খেয়ে শেষ করি, সামনের দোকান থেকে আবার কিনে নিলেই হবে।’
‘সেই দোকান থেকে আরো আধাপোয়া কিনে বড় একটা ঠোঙায় ভরে নিয়েগেলেই পারতিস।’ অপু বলল।
‘ধুর,’ কালাম বলল। ‘আবার ফিরে যাব নাকি?’
‘তুই এখন ভাগ,’ বলে আনু হাটতে শুরু করল। অপু তাকে অনুসরণ করল। ‘কালকে আমাদের স্কুল ছুটি, চল, আমাদের গ্রামের বাড়িতে যাই, যাবি নাকি?’
‘কালকে?’
‘না, আজকে। বাজার করে বাড়িতে দিয়েই আমরা রওয়ানা দেব, কি বলিস?’ থমকে দাড়াল অপু, আনু একপা এগিয়েছিল, থেমে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকাল। ‘কী হল?’
‘তুই বাজারে যা,’ অপু বলল। ‘আমাকে বড়বাজার থেকে মরিচ, বেগুন আর টমেটর চারা নিয়ে আসতে হবে। বাজারও নাহয় সেখান থেকেই করে আনব। সাড়ে এগার-বারটার ভিতরেই ফিরে আসতে পারব, তুই রেডি থাকিস, তোকে যেন একবারের বেশি দু’বার ডাকতে না হয়।’ আনুর মুখ থেকে ‘আচ্ছা’ বের হতে পারার আগেই সে পিছন ফিরে লম্বা পা ফেলে এগিয়ে চলল। একটা বড় রকমের শ্বাস ফেলে আনু তার পথে এগিয়ে যেতে লাগল। সে যা ছেলে, যা বলেছে, একবারের বেশি দুইবার সে ডাকবেনা, চুক্তি বাতিল করে ফিরে চলে আসবে। এটাকে বন্ধু বানানো হয়ত সহজ, কিন্তু সেটা টিকিয়ে রাখাটা একটা কঠিন ব্যাপার। তবে ছোঁড়াটা অবিবেচক নয়।

পৌণে একটায় তারা নদীরঘাটে পৌছাতে পারলেও নদী পারহতে তাদের ঘন্টাখানেকেরমত লেগে গেল। সাইকেলে এখান থেকে তাদের গ্রামের বাড়ি যেতে লাগবে প্রায় তিন ঘণ্টা, শীতকালের ছোট দিন, সন্ধ্যা, এমনকি রাতও হয়েযেতে পারে। তাতে আবশ্য সমস্যার কিছু নেই, সেখানে তার একগাদা মামা-কাকা-খালা আছে, আর তাদের আছে এক রেজিমেন্ট পোলামাইয়া- আনুর কাজিন। আনু তাদের সবগুলোর ভিতরে ‘সবার বড়’, কাজেই তার আংকেল আর আন্টিরা তাকে আলাদা রকমের একটা দাম দিয়ে থাকে।
ঘাটের ঢালু পথ দিয়ে সাইকেল ঠেলে উপরে তুলতে তুলতে আনু আড়চোখে অপুর মুখের দিকে তাকাল, সেটা শুকনো, তারমানে সে গোসল করে পোশাক বদলে এসেছে ঠিকই, কিন্তু তার খাওয়া হয়নি। আনু মনেমনে লজ্জাপেল, তার এটা চিন্তা করা উচিতছিল, দেড়টা দুটোর আগে তাদের রান্না হয়না বলেই বারটার সময় বাজার এনেদিলেও তাকে কোন কথা শুনতে হয়না। কিন্তু এখন তাক্কে কিছু খেতে বলতে গেলে তেড়ে মারতে আসবে; এমনকি সে নিজে খেয়ে আসেনি, তার ক্ষুধা লেগছে এই কথা বলেও চিঁড়ে ভেজানো যাবেনা। আপাতত থাক, ঘন্টাখানেক পরে তাদেরকে প্রধান পথটা থেকে ডানে মোড়নিয়ে একটা মেঠো পথে নামতে হবে, সেই কোনাটায় পথের দু’ধারেই বেশকিছু দোকানপাট আছে, যেখানে চা বিস্কুট রুটিতো পাওয়া যায়ই এমনকি, সিংগাড়া বেগুনি পেয়াজু ইত্যাদিও পাওয়া যায়। সেখানে তাদের যাত্রাবিরতির কথা নয়, কিন্তু ছোটখাট নাটকের সৃষ্টি করে কি সে থেমে যেতে পারবেনা, আর সে থেমে গেলে অপুটা কি আর থামবেনা? কিন্তু নাটকটা হতে হবে একেবারে বাস্তব, কিছু সন্দেহ করলে হয়ত সাইকেল ঘুরিয়ে উল্টো পথে যাত্রা শুরু করে দেবে, হতচ্ছাড়াটাকে কোন বিশ্বাস নাই। পেটে ছুঁচো নাচছে, কিন্তু নিজের গোঁ ছাড়বার কোন চিহ্ন নাই। কিন্তু তাকে আর কিচ্ছু দেখাতে হল না, নাটকই তাকে কিছু একটা দেখিয়ে গেল। একটা ষাঁড়-।
সে ছিল রাস্তার প্রায় মাঝেরদিকে, তার একটু পিছনে ডানদিকে আসছিল অপু, তাদের গতিও খুব একটা কম ছিলনা। সেই গতিতেই সে ডান দিকে ঘুরল, যেটা করা তার উচিত হয়নি, কেননা পথের পাশের একটা বটগাছ আর প্রথম দোকানটার জন্য ডান দিকের পথের ভিতরটা ঠিক মত দেখা যাচ্ছিলনা। সে ডানদিকে সাইকেলের নাক ঢুকিয়ে দিল এটা দেখে আঁতকে ওঠার জন্য যে, তার মাত্র হাত দুয়েক সামনেই বিশাল আকৃতির একটা শিবের বাহন ঠিক তার সোজাসুজি এগিয়ে আসছে। সেটা মুখ উঁচু করে তার কুঁতকুঁতে চোখ দিয়ে সামনের আপদটাকে দেখল, কিন্তু তার তুলনায় টিঙটিঙে প্রতিপক্ষটাকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে একই ভাবে হেলেদুলে এগিয়ে আসতে থাকল। আতঙ্কিত আনু কীভবে যে সেটার নাকের ডগা থেকে নিজের বাহনটাকে ঘুরিয়ে আবার রাস্তায় ফিরিয়ে এনে সেটাকে নিজের নিচে থেকে রাস্তায় পড়েযেতে দিয়ে নিজেকে রাস্তার উপরে বসানোর সুযোগ করেদিল, সেটা সে পরে আনেক চিন্তা করেও বের করতে পারেনি। তারমনে এই চিন্তাটা ছিল, সে যেখানে বসে আছে সেটা ষাঁড়টার চলার পথের সীমানার ভিতরে হতে পারে, কিন্তু ক্লান্তি আর ঘটনার আকস্মিকতায় এমন হতভম্ব হয়ে পড়েছিল যে, সে এমনকি নড়াচড়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিল। সেখানে সমবেত কন্ঠের একটা হাহাকার ধ্বনি উঠল ঠিকই, কিন্তু একটা মানুষও তারদিকে এগিয়ে গেলনা।
অপুও তার সাইকেলটা ডানদিকে ঢুকিয়েছিল, সে ব্রেক চাপতে গিয়েও না চেপে বরং গতি বাড়িয়ে দিয়ে অতটূকু পথের ভিতরেই ষাঁড়টার গা ঘেসে সেটার পেছন ঘুরে অপর পাশদিয়ে আবার রাস্তায় উঠে আনুর পাশে গিয়ে থামল, তারপরে সাইকেলটাকে ঠেলাদিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে আনুকে বাহুধরে তুলে সবচেয়ে কাছের দোকানটার সামনে পেতে রাখা কাঠের বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে সাইকেলদুটোর উদ্ধারের কাজে এগিয়ে চলল। এর পুরোটুকু ঘটেগেল কয়েক সেকেন্ডের ভিতরে।
অপু যখন সেই বিপদজনক ‘ফাটলের’ ভিতরে নিজেকে ঢুকিয়েছিল তখন হহাকারকারীরা অবাক হয়েছিল, কিন্তু সে যখন স্বইচ্ছায় দ্বিতীয় বারেরমত ‘মরণ ফাঁদের’ ভিতরে নিজেকে ঢুকালো তখন তারা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। সেটা অবশ্য অপুর পক্ষেই গেল, তারা সবাক থাকলে হয়ত জানোয়ারটা আণুপ্রেরনা পেয়ে অপুর কিছু একটা করে নিজের সম্মান বাঁচানর চেষ্টা করত। সেটা উন্নত আর সভ্য কোন দেশের মন্ত্রীসভার একজন সদস্যেরমত নিজের চারিপাশের সমস্ত কিছুর প্রতি চরম আবজ্ঞা দেখাতে দেখাতে হেলেদুলে সামনের রাস্তাটা পার হল, তারপর রাস্তার উপরে নিজের পেছনের বেশ কিছুটা আংশ ঝুলিয়ে রেখে একটু থেমে ডানে বামে কয়েকবার তাকিয়ে- যেটা তার রাস্তাটা পার হওয়ার আগে করা উচিতছিল, এই অভ্যাসটাও সেই সমস্ত মন্ত্রীদের চরিত্রের সাথে খাপেখাপে মিল যাচ্ছে, কোন উন্নত-সভ্য গো-রাজ্যে ইনি নিশ্চয় উঁচু দরের কোন মন্ত্রী হবেন- সামনের মাঠে গিয়ে ঢুকল।

সন্ধ্যার একটু পরপরই তারা আনুদের বাড়ির সীমানার পথে এসে পৌছাতে পারল। মাটির পথটা থেকে সামান্য একটু ঢালু হয়ে ডানদিকে সেটা সমকোণে নেমে তাদের বাড়িরদিকে এগিয়ে গেছে। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ গজ দুরেই তাদের বাড়ি দেখা যাচ্ছে, যদিও সাইকেল চালিয়েই তারা বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারত, কিন্তু আনু সেখানেই সাইকেল থামিয়ে নেমে পড়ল, অপুও নামল। শীতের সন্ধ্যায় ঠান্ডা লাগার কথা, কিন্তু এতটা পথ সাইকেল চালিয়ে আসার ধকলে তাদের শরীর বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে।
অপু দুই হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে রেখে মাথা ঘুরিয়ে চারিদিক দেখতে লাগল, সে বেশ আগে একবার আনুর সাথেই এখানে এসেছিল, সেই পুরোন স্মৃতির কিছুটা তার মনে আবার ফিরে আসতে শুরু করল। পথটা মাইল দুয়েক এগিয়ে গিয়ে বিল অঞ্চলে গিয়ে শেষ হয়েছে। পথ বরাবর যতদুর চোখ যায়, চষা ক্ষেত আর চষা ক্ষেত, এতে যে কোন্‌ ধরণের ফসল চাষ করা হতেপারে সেই ব্যাপারে তার কোন ধারণাই নেই। খাঁকি রঙের মাটিতে সবুজের চিহ্ন নেই বললেই চলে। ওবুজ যা কিছু আছে, তা দিগন্তের কাছে থেকে তাদের দু’জনকে একটা বৃত্তর আকারে ঘিরে রেখেছ, আর পথটা যেন একটা ব্যাস, তারা দু’জন দাঁড়িয়ে আছে বৃত্তটার কেন্দ্রে। কাছে দূরে হঠাৎ হঠাৎই কোথাও কোথাও তিন চার বা পাঁচটা তাল বা খেজুরগাছ এক একটা গোছার আকারে দাঁড়িয়ে আছে, যেন নিজেরা কোন গোপন শলা পরামর্শের জন্য তারা ফাঁকা মাঠে জড়ো হয়েছে। প্রায় প্রতিটা খেজুর গাছেই একটা একটা করে ঠিলা ঝুলছে। নারকেল গাছও আছে, কিন্তু প্রতিটাই একাএকা, নিঃসঙ্গ। এদের প্রায় সবগুলোই বেশ কয়েকটা কাঁদি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে; ফুল, কঁচিডাব থেকে শুরু করে একেবারে ঝুনো নারকেল্ পর্যন্ত প্রায় সব রকমেরই আছে।
কুয়াশা। চারিদিকেই মাটির উপর থেকে নানান উচ্চতায় নানান আকারের আর নানান আয়তনের পাৎলা মেঘেরমত কুয়াশা বাতাশে ঝুলে আছে, শহরে এই দৃশ্য দেখতে পাওয়া একটা অসম্ভব ব্যাপার। অপুর কাছে মনে হতে লাগল, সে যেন আজানা কোন এক রাজ্যে এসে পড়েছে। কিন্তু তার শীত করতে শুরু করেছে, দুপুরে রওয়ানা হওয়ার কারণে গরম পোশাকের প্রয়োজনীয়তার কথা তাদের কারো মনে পড়েনি। সে আনুর দিকে তাকাল, যে মুখ উঁচু করে দূরে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবছিল, হঠা ৎ কেন যেন একটু কেঁপে উঠে অপুর দিকে ফিরে তাকাল, তারপর সাইকেলের হ্যান্ডেল ঢালু পথটার দিকে ঘুরিয়ে বলল, ‘চল’।


হরেক কন্ঠের কলতান, কোন একজনের হাতে সাইকেলের ভার ছেড়ে দেওয়া, আনবরত ভাবে পড়তেথাকা টিয়বওয়েলের হালকা গরম পানিতে হাতমুখ ধোওয়া আর কোন একজনের বাড়িয়ে ধরা গামছা দিয়ে সেগুলো মোছা, হারিকেনের আলোয় আলোকিত ঘরে ঢুকে বিছানায় গড়িয়ে পড়া, শরীরটা কোমল একটা কিছুর নিচে চাপা পড়া অনুভব করতে পারা, আর ধীরেধীরে গরম হয়ে ওঠা- অপুর কাছে সমস্ত কিছুই যেন একটা ঘোরের ভিতর দিয়ে ঘটে চলেছে। অপু ঘুমিয়ে পড়ল।
অপু পথটার কোনায় সাইকেলের সিটে দুইহাতের কনুই ঠেকিয়ে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, একটু দূরে আনু মাটিতে বসে হাততালি দিচ্ছে আর খুব হাসছে। ষাঁড়টা অপুর ডানদিক দিয়ে এগিয়ে আসছে, দোকানের মানুষগুলো চিৎকার করছে। ষাঁড়টা অপুর ডান কাঁধে মুখদিয়ে ধাক্কা দিতে লাগল, একবার দু’বার তিনবার- সে ধড়মড় করে উঠে বসল। আনু তার কাঁধে নাড়া দিয়ে ডাকছে।
ঘরের ভিতরে আনু ছাড়াও আরো পাঁচ ছয় জন ছেলে আর তাদের তুলনায় বয়স্ক একজন মানুষ। মেঝেতে হারিকেনের পাশে মাদুর বিছিয়ে খাবার দেওয়া হয়েছে, তাদের দু’জনের জন্য ধোঁওয়া উড়তে থাকা ভাত, মুরগির মাংস, ডাল, দুধ আর একবাটি নরম গুড়।
‘খেয়েনে, তারপর ঘুমা’, আনু নরম ভাবে বলল।
ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বাইরে ত্থেকে হাত মুখ ধুয়ে এসে খেতে বসল দুজনে। সারাদিন অভুক্ত থাকার কারণে খাবারের প্রতিটা কণাই তাদের কাছে অমৃতেরমত মনে হল। তারপর হাতমুখ ধুয়ে খাটে ফিরে আসার সময় তার নযরে পড়ল সেটার নিচে বড়সড় আকারের একটা এলুমিনিয়ামের পাতিল। তার কেন যেন মনে হল, সেটার সেখানে থাকার পিছনে কিছু একটা তাৎপর্য আছে, যদিও সেটা যে কী হতে পারে সেটা তার মাথায় ঢুকলনা। সে বিছানায় উঠে গায়ে লেপ জড়িয়ে বসল।
‘তুই শুয়ে ঘুমা, সময় হলে তোকে ডাকব,’ আনু বলল।
‘তারমানে? তুই ঘুমাবিনা?’
‘ওই গাধা, আমি কি এখানে ঘুমাতে এসেছি?’ আনু কৃত্রিম রাগের সাথে জবাব দিল আর ঘরের বাকি সবাই হেসে উঠল। ‘আমরা এখন খেজুরের রস, নারকেল আর সম্ভবত চালও চুরি করতে যাব,’ আনু বলল। তারপর মাথা ঘুরিয়ে বয়স্ক লোকটার দিকে ফিরে বলল,’কাকা, চাল আনতে পারবা, নাকি সেই কাজ করা লাগবে?’
‘হ্যা, আমার ঠেকা পড়েছে তোর কাকির কাছ থেকে চাল চেয়ে এনে তোদের পায়েস খাওয়ানোর।’ সে হাসতে হাসতে বলল। ‘আমি পাহারায় থাকব, দুইজন গিয়ে কাজ সেরে আসবি।’
অপুর মুখ দেখে আনু বুঝতে পারল, এটা তার ভাল লাগেনি। ‘দেখ, এসব পায়েস-টায়েস চুরি করে না করলে মজা পাওয়া যায় না। এখানকার সমস্ত কিছুই আমাদের নিজেদের, আর সবাই জানে আজ রাতে আমরা কী করব। আমরা একটু মজা করব, তাতে সবারই সম্মতি আছে।’ তারপর খাটের নিচে থেকে পাতিলটা টেনে বের করতে করতে বলল, ‘তুই ঘুমা।’
অপু লেপ থেকে নিজেকে বের করতে করতে বলল, ‘আমিও যাচ্ছি, চল।’
আনু হেসে ফেলল, ‘তুই একটা সাধু ছেলে, তুই চুরি করতে যাবি?’ ঘরের সবাই হেসে উঠল।
‘তুই আর সাধু থাকতে দিলি কোথায়?’ অপু বলল। ‘তাছাড়া গৃহস্থ যদি চোর ধরতে এসে তোদের না পেয়ে আপরিচিত আমাকে চোর মনে করে ঠ্যাঙানি শুরু করে, তখন ঠ্যাকাতে আসবে কে?’
এবার সেখানে সমবেত আট্টহাসির তুফান উঠল।হাসতে হাসতে আনুর দুই চোখের কোনে পানির ফোঁটা জমে হেরিকেনের আলোয় হীরকেরমত দ্যুতি ছড়াতে লাগল।
কিন্তু জবাব দিল আনুর কাকা,‘তোমার চেহারা আমাদের কতজন দেখেছে আমরা সেটা জানিনা, কিন্তু এটা সবাই জানি, সবাই জানে যে, এই ঘরে একটা ছেলে আছে, যে সবার কাছে আনুর সমান প্রিয়।’ তার কণ্ঠস্বরে কি একটু গর্বের আভাস? অপু মুখ নিচু করল।

শীতের মজা গ্রামে।

মেজাজটা ভাল নেই আনুর, আর পৌষমাসের মাঝামাঝি সময়ে ভোর নয়টায়- যদিও তার বাপের বক্তব্য, দুপুর নয়টা- থলে হাতে, নিজেরসহ পরিবারের গুষ্টির পিন্ডির উপকরণ জোগাড়ের জন্য সিকিমাইল দুরের বাজারে যেতে হলে মেজাজ মন শরীর কোনটাই ভাল থাকার কথা নয়, অন্তত তারমত একটা ছেলের। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা এতটাই ভাল যে, তার বাবা চারজন কর্মচারী শুধুমাত্র এইজন্য রেখেদিতে পারে, যেন তার চার হাতপা ধরে ঝুলিয়ে বাজারে বা শহরের অপর প্রান্তের গোহাটায় নিয়ে যাওয়া যায় আর সেখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব হতেপারে, তারপরেও এর কোন আর্থিক প্রতিক্রীয়া তাদের সংসারে দেখতে পাওয়া যাবেনা।
সে একটা ঘরকুনো ছেলে, তার একটা কারণ হয়ত এটাই, তার পরিবারের বাকি চারজনের সাথে সে অনর্গল কথা বলে যেতে পারলেও এর বাইরে সামান্য কয়েকজন ছাড়া আর কারো সাথে কথা বলতে গেলে তার জিভে আর স্বরযন্ত্রে প্যাঁচ খেয়ে যায়।
মা ঘরে ঢুকলে সে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে তেঁতোমুখে মায়ের হাত থেকে বাজারের থলে আর টাকা নিল, মা একটাও শব্দ উচ্চারণ না করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখে আর মাথায় হাত বুলিয়েদিয়ে নিজের কাজে ফিরেগেল। আনু পা বাড়াতে গিয়েও থমকে দাড়লো- পনের বছর পর তার মনে প্রথমবারেরমত ঝিলিক দিয়ে উঠল, বাড়ির কোন কোনাটাতে তার মন পড়ে থাকে, আর তার কারণ কী।
মেজাজ খারাপ হলেও সে বাপের উপর বিরক্ত হয়নি, কারণ, সে ভালই জানে, একান্ত অসুবিধায় না পড়লে তাকে কখনই কোন কাজ করতে বলা হয়না। তার বাবা ছোটখাটো হালকা পাতলা আর দেখতে দুর্বল ধরণের একজন মানুষ, মনেহয় যেন জোরে হাওয়া বইলে সে উড়ে যাবে, কিন্তু সে বেশ শক্ত সমর্থ আর সবসময়ই কোন না কোন কাজ নিয়ে আছে। নিশ্চয় সে এখন কোন একটা কাজে ব্যস্ত, আর বাজারের জন্য সময়মত রান্না না হলে তার ছোটভাই আর বোন কষ্ট পাবে। একজন কাজের বুয়া ছাড়া এই বাড়িতে কোন কাজের লোক রাখা হয়নি। প্রয়োজন হলে চুক্তিতে শ্রমিক আনা হয়, এতটুকুই।
তাদের বাড়ির পূর্ব দিকের সীমানার সাথেই কাশেম সাহেবের জমি। পূর্ব পশ্চিমে লম্বা আয়তাকার প্রায় তিন বিঘা, জমির প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় দুটো পুকুর থাকার কারণে মনে হয় যেন তেপান্তর, কিন্তু এই শর্টকাটের তেপান্তর পার হওয়ার ইচ্ছা না করলে তাকে সিকিমাইলের দ্বিগুণ পথ পাড়ি দিতে হবে। সেক্ষেত্রে পশ্চিম দিকের রাস্তাদিয়ে বের হয়ে পুরো এলাকাটা ঘুরে বাজারে পৌছাতে হবে। গ্রামের ছেলে হলেও প্রথম প্রথম এই পরের জমির উপরদিয়ে যাওয়া আসা করাটা তার নিজের কাছে কেমন যেন একটু বিব্রতকর বলে মনে হত, নিজেদের পুরোটা জমি আটফুট উঁচু পাঁচিলদিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, শর্টকাটের জন্য তারা একটা পীঁপড়েকেও এর উপর দিয়ে যেতেদিতে রাযী নয়। কিন্তু তার বাবার সমান বা একটু বেশি বয়সের যে মানুষটা ছোটচেকের লুংগি সাদা হাফহাতা গেঞ্জি আর মাথায় লাল গামছা জড়িয়ে বসেবসে শব্জীবাগানের মাটির মুখে খোঁচামেরে চলেছে সে তার তিন বিঘার একপ্রান্ত থেকে আপর প্রান্ত পর্যন্ত প্রতিবেশীর পাঁচিল থেকে শব্জীবাগানের বিঘাখানিক বেড়াটাকে ছয় ফুটেরমত দূরে সরিয়ে রেখেছে। এতে তার ‘ছ্য়ফুটো’ খাটনি কমছে সেটা ঠিক, কিন্তু রান্নাঘরে মালও তো সেই অনুপাতে কম যাচ্ছে, না কি? তা ছাড়া, এক প্লাস আধা ইজিকল্টু দেড় বিঘে বাঁশের চটার বেড়ার জন্য খরচ আর মেহন্নতও কম হয়নি তার। আনুলদের তুলনায় তাদের আর্থিক আবস্থা খুবই খারাপ, তারপরও ভদ্রলোক এই ক্ষতিটা কোন চাপ ছাড়াই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। অথচ এমনভাবে মুখ নিচু করে কাজ করে যায়, যেন সে বেগুনের চারা লাগানর জন্য সংসদভবনের সামনের রাস্তাটাকে ফুটো করে চলেছে, যেটা করার সময় তাকে কেউ চিনে ফেলাটা তারজন্য একটা লজ্জার ব্যাপার। কাজেই আনুকে যখন জমির মালিক দেখতে পাচ্ছেনা তখন আর বিব্রত হতে যাওয়া কেন?
আর একটু এগিয়ে বাড়ির আড়ালটা পার হওয়ার পর সে দেখতেপেল, সামনের দিকের বাগানেরমত জায়গাটায় কাশেম সাহেবেব্র সেজছেলে অপু ঘাসের উপরে একটা মাদুর বিছিয়ে সূর্যের দিকে পিছন ফিরে উবু হয়ে বসে খুব মনযোগের সাথে বই পড়ছে। তাকে এটা বলে দিতে হবেনা যে, সেটা একটা গল্পের বই। হতভাগাটা পরীক্ষার সময়ও এটাই করে থাকে। আর সে নিজে সারা জীবনে গল্পের বই পড়েছে গোটা পাঁচেক, যার কোনটা অর্ধেক, কোনটা সিকি আর কোনটা ...। তার পড়ার এক মাত্র বিষয় হচ্ছে পাঠ্য পুস্তক, এর বাইরের কিছু হতে পারেনা। এই ছেলেটা তার সমবয়সী সেটা ঠিক আছে, সহপাঠি সেটাও ঠিক আছে, কিন্তু বন্ধু? তার কাছে ব্যাপারটা কেমন যেন ভূতুড়ে আর আবাস্তব বলে মনে হয়, কিন্তু সেটাই কড়া ধরণের বাস্তব। ওদিক থেকে কখনই কোন প্রস্তাব আসেনি, সে নিজেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল আর এখন এটার জন্য সে গর্বিত।
সে আর একপা সামনে বাড়াতেই অপু মুখ তুলে তাকাল। ‘একটু দাড়া, আমিও যাব।’ দ্বিতীয় আর কোন কথা না বলে আনুকে হতভম্ব অবস্তায় দাড় করিয়ে রেখে বই আর মাদুর তুলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির ভিতরে ঢুকল। অপুর ভাব দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন আগেই অপুকে নিজের এই বাজারে যাওয়ার কথাটা জানিয়ে রেখেছিল!সে বেড়ায় একটা হাত রেখে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে নানান কথা ভাবতে লাগল। শহরের ভিতরের এই মাটির বাড়িটার দিকে তাকিয়ে তার নিজের গ্রামের বাড়িটার কথা মনে পড়েগেল, আর সাথেসাথেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, হতচ্ছাড়াটা রাযী হলেই তারা দুজনে আজ গ্রামেরবাড়িতে যাবে। আগামীকাল স্কুল বন্ধ, আজকের দিনের যতটা হাতে থাকে আর রাতটা কাটিয়ে কাল দিন বা রাতের যেকোন সময় ফিরে এলেই হবে।
আনুদের পরিবারটা ছাড়া তাদের জ্ঞাতিগুষ্টির বাকি সবাই গ্রামেই পড়েআছে, হয়ত এই কারণেই তার বাবার কাছে, নিজের ছেলেমেয়েদের কেউ গ্রামে যেতে চাচ্ছে, এরচেয়ে আনন্দের সংবাদ আর কিছু হতে পারেনা। কাজেই, অনুমতির জন্য কোন চিন্তানেই। অপু? সে যদি মনে করে, যাওয়া যেতে পারে তাহলে কারো কোন অনুমতির তোয়াক্কা না করেই সাইকেলটা টানতে টানতে ঘর থেকে বের হয়ে আসবে। কেউ তার যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইল শুধু বলবে, একটু যাচ্ছি। ব্যাস, এতটুকুই, আর কোন ব্যাখ্যা নয়। একমাত্র শক্তি প্রয়োগ ছাড়া যুক্তি তর্ক অনুনয় ভয় দেখানো কোন কিছু দিয়ে তাকে আটকে রাখা যাবেনা। কিন্তু সে যদি মনে করে, নিজের বা বাড়ির কোন কাজের জন্য তার থাকা দরকার, তাহলে তাকে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হবেনা। সেক্ষেত্রে আনুর নিজের একপাও বাড়ানোর ইচ্ছা থাকবেনা।
অপুদের গলিটা থেকে বের হয়ে বাম দিকে ঘুরতেই দেখতে পেল, ওদিক থেকে তাদের আর এক বন্ধু কালাম হেলেদুলে এগিয়ে আসছে, সে বাঁহাতের ঝুলিয়ে রাখা কাগজের ঠোঙা থেকে কিছু বের করছে আর খাচ্ছে। ঠোঙার আকার দেখে মনে হচ্ছে বাড়ির সবার জব্য কিছু কিনে নিজেই খেতেখেতে যাচ্ছে। ও ঐ রকমই, একটু পেটুক, কিন্তু হাসিখুশি মিশুক ধরণের।
‘খা,’ কাছে হতেই ডানহাত সামনে বাড়িয়ে ধরে বলল।
অপু ভাবল, বেচারা বাড়ির জন্য যাকিছু হোক নিয়ে যাচ্ছে, নিজে খেয়ে তো কমিয়েছেই, এতে ভাগ বসিয়ে আর কমানো উচিত হবেনা, কিন্তু আনু সাথেসাথেই থাবাদিয়ে সেটাকে নিয়ে উঁকিদিয়ে ভিতরটা দেখল, ঠোঙাটার নিচের দিকে মুঠো খানেক চানাচুর পড়ে আছে, আর সেটার গায়ে ভাল রকমের একটা ফাটল। সে বাজারের থলেটা বগলে চেপে ধরে ডানহাতের তালুতে সবটুকু ঢেলে নিয়ে অপুর দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল, ‘খা।’
অপু সামান্য একটু তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কালামের দিকে তাকাল।
‘বাড়ির জন্য একপোয়া কিনেছিলাম,’ সে লজ্জিত ভঙিতে বলল। ‘ঠোঙাটা ফেটেগেছিল, আমি খেয়াল করিনি, অর্ধেকটা পড়েগেল। ভাবলাম, আমিই খেয়ে শেষ করি, সামনের দোকান থেকে আবার কিনে নিলেই হবে।’
‘সেই দোকান থেকে আরো আধাপোয়া কিনে বড় একটা ঠোঙায় ভরে নিয়েগেলেই পারতিস।’ অপু বলল।
‘ধুর,’ কালাম বলল। ‘আবার ফিরে যাব নাকি?’
‘তুই এখন ভাগ,’ বলে আনু হাটতে শুরু করল। অপু তাকে অনুসরণ করল। ‘কালকে আমাদের স্কুল ছুটি, চল, আমাদের গ্রামের বাড়িতে যাই, যাবি নাকি?’
‘কালকে?’
‘না, আজকে। বাজার করে বাড়িতে দিয়েই আমরা রওয়ানা দেব, কি বলিস?’ থমকে দাড়াল অপু, আনু একপা এগিয়েছিল, থেমে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকাল। ‘কী হল?’
‘তুই বাজারে যা,’ অপু বলল। ‘আমাকে বড়বাজার থেকে মরিচ, বেগুন আর টমেটর চারা নিয়ে আসতে হবে। বাজারও নাহয় সেখান থেকেই করে আনব। সাড়ে এগার-বারটার ভিতরেই ফিরে আসতে পারব, তুই রেডি থাকিস, তোকে যেন একবারের বেশি দু’বার ডাকতে না হয়।’ আনুর মুখ থেকে ‘আচ্ছা’ বের হতে পারার আগেই সে পিছন ফিরে লম্বা পা ফেলে এগিয়ে চলল। একটা বড় রকমের শ্বাস ফেলে আনু তার পথে এগিয়ে যেতে লাগল। সে যা ছেলে, যা বলেছে, একবারের বেশি দুইবার সে ডাকবেনা, চুক্তি বাতিল করে ফিরে চলে আসবে। এটাকে বন্ধু বানানো হয়ত সহজ, কিন্তু সেটা টিকিয়ে রাখাটা একটা কঠিন ব্যাপার। তবে ছোঁড়াটা অবিবেচক নয়।

পৌণে একটায় তারা নদীরঘাটে পৌছাতে পারলেও নদী পারহতে তাদের ঘন্টাখানেকেরমত লেগে গেল। সাইকেলে এখান থেকে তাদের গ্রামের বাড়ি যেতে লাগবে প্রায় তিন ঘণ্টা, শীতকালের ছোট দিন, সন্ধ্যা, এমনকি রাতও হয়েযেতে পারে। তাতে আবশ্য সমস্যার কিছু নেই, সেখানে তার একগাদা মামা-কাকা-খালা আছে, আর তাদের আছে এক রেজিমেন্ট পোলামাইয়া- আনুর কাজিন। আনু তাদের সবগুলোর ভিতরে ‘সবার বড়’, কাজেই তার আংকেল আর আন্টিরা তাকে আলাদা রকমের একটা দাম দিয়ে থাকে।
ঘাটের ঢালু পথ দিয়ে সাইকেল ঠেলে উপরে তুলতে তুলতে আনু আড়চোখে অপুর মুখের দিকে তাকাল, সেটা শুকনো, তারমানে সে গোসল করে পোশাক বদলে এসেছে ঠিকই, কিন্তু তার খাওয়া হয়নি। আনু মনেমনে লজ্জাপেল, তার এটা চিন্তা করা উচিতছিল, দেড়টা দুটোর আগে তাদের রান্না হয়না বলেই বারটার সময় বাজার এনেদিলেও তাকে কোন কথা শুনতে হয়না। কিন্তু এখন তাক্কে কিছু খেতে বলতে গেলে তেড়ে মারতে আসবে; এমনকি সে নিজে খেয়ে আসেনি, তার ক্ষুধা লেগছে এই কথা বলেও চিঁড়ে ভেজানো যাবেনা। আপাতত থাক, ঘন্টাখানেক পরে তাদেরকে প্রধান পথটা থেকে ডানে মোড়নিয়ে একটা মেঠো পথে নামতে হবে, সেই কোনাটায় পথের দু’ধারেই বেশকিছু দোকানপাট আছে, যেখানে চা বিস্কুট রুটিতো পাওয়া যায়ই এমনকি, সিংগাড়া বেগুনি পেয়াজু ইত্যাদিও পাওয়া যায়। সেখানে তাদের যাত্রাবিরতির কথা নয়, কিন্তু ছোটখাট নাটকের সৃষ্টি করে কি সে থেমে যেতে পারবেনা, আর সে থেমে গেলে অপুটা কি আর থামবেনা? কিন্তু নাটকটা হতে হবে একেবারে বাস্তব, কিছু সন্দেহ করলে হয়ত সাইকেল ঘুরিয়ে উল্টো পথে যাত্রা শুরু করে দেবে, হতচ্ছাড়াটাকে কোন বিশ্বাস নাই। পেটে ছুঁচো নাচছে, কিন্তু নিজের গোঁ ছাড়বার কোন চিহ্ন নাই। কিন্তু তাকে আর কিচ্ছু দেখাতে হল না, নাটকই তাকে কিছু একটা দেখিয়ে গেল। একটা ষাঁড়-।
সে ছিল রাস্তার প্রায় মাঝেরদিকে, তার একটু পিছনে ডানদিকে আসছিল অপু, তাদের গতিও খুব একটা কম ছিলনা। সেই গতিতেই সে ডান দিকে ঘুরল, যেটা করা তার উচিত হয়নি, কেননা পথের পাশের একটা বটগাছ আর প্রথম দোকানটার জন্য ডান দিকের পথের ভিতরটা ঠিক মত দেখা যাচ্ছিলনা। সে ডানদিকে সাইকেলের নাক ঢুকিয়ে দিল এটা দেখে আঁতকে ওঠার জন্য যে, তার মাত্র হাত দুয়েক সামনেই বিশাল আকৃতির একটা শিবের বাহন ঠিক তার সোজাসুজি এগিয়ে আসছে। সেটা মুখ উঁচু করে তার কুঁতকুঁতে চোখ দিয়ে সামনের আপদটাকে দেখল, কিন্তু তার তুলনায় টিঙটিঙে প্রতিপক্ষটাকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে একই ভাবে হেলেদুলে এগিয়ে আসতে থাকল। আতঙ্কিত আনু কীভবে যে সেটার নাকের ডগা থেকে নিজের বাহনটাকে ঘুরিয়ে আবার রাস্তায় ফিরিয়ে এনে সেটাকে নিজের নিচে থেকে রাস্তায় পড়েযেতে দিয়ে নিজেকে রাস্তার উপরে বসানোর সুযোগ করেদি

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement