লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ ডিসেম্বর ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ১০টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

৪৮

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগর্ব (অক্টোবর ২০১১)

পাইলট
গর্ব

সংখ্যা

মোট ভোট ৪৮

আমির হামজা

comment ৩২  favorite ২  import_contacts ৮৪৬
দেশের আকাশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন একটা বিমান বোঁ বোঁ শব্দ করে উড়ে যায়। আমার দেশের বিমান দেখতে না পাওয়া মানুষগুলো ছুটে এসে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখগুলেকে একদম আকাশের পানে ছুড়ে মারে। কদাচিৎ একটু বিন্দুর মত কিছু দেখা যায় আবার তাও মিলিয়ে যায়। কত উদগ্রীব এই গরীব দেশের মানুষগুলো। শত কর্মব্যস্ততা ম্লান হয়ে যায় এই একটি বিমানের শব্দে। তারা প্রতিদিনই এই নিয়ে ঢের আলোচনা করে থাকে। এই বিমান তাদের কাছে স্বপ্নের মত। স্বপ্নের দুয়ারে তারা নানা স্বপ্ন রচনা করে।
দূরে বালুর চর। নদী বা সাগর কিছুই নেই এখানে। তবে একটা নদী আছে। নাম গোমতী। আঞ্চলিক নাম। এখানকার মানুষ এই নামেই তাকেই চেনে। সেই নদীটাও চর থেকে পাঁচ মাইল দূরে। কিন্তু চরটা রয়ে আছে সুদূরে। অনুমান করা যায় এখানেও এক সময় নদীটার প্রবাহ ছিল। সে কতকাল আগের তা এখানকার মানুষরা জানে না। কোন ভূ-তাত্ত্বিক এখানে আসে না। হয়তো আসলেও তারা টের পায় না এবং বুঝে না কি করে। এই গ্রামের মানুষ গুলোর কাছে সব শহুরে মানুষ একরকম। তারা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।
বালুর চরে থোকে থোকে সবুজ ঘাস। সেই ঘাসগুলো উঠিয়ে একস্থানে জমা করছে আলভী ও অনন্ত। আলভী খসরু মিয়ার ছেলে। খসরু মিয়া বেশ সৌখিন মানুষ। শহরে গিয়েছিল একবার। সেখান থেকেই 'আলভী' নামটি ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিল এবং ভেবেছিল তার ছেলে হলে নাম রাখবে আলভী। কিন্তু ছেলে হয়নি। হয়েছিল মেয়ে। নাম রেখেছিল মিলা। পরবর্তীতে শহুরে নাম রাখার ইচ্ছা তার পূর্ণ হয়েছে। তার আরও ইচ্ছা আছে। ছেলে-মেয়েকে সে লেখা পড়া শিখাবে, অনেক বড় মানুষ বানাবে। আকাশে যে বিমান ওড়ে, সেই বিমান একদিন তার ছেলে চালাবে। খসরু মিয়ার স্বপ্ন অনেক বড় ও বিশাল।
বালু থেকে ঘাসগুলো উঠিয়ে আলভী ও অনন্ত সেখানে এক একবার এক একটা ছবি আঁকছে আর মুছে দিচ্ছে। বিমান দু'টা যখন কয়েকবার এসে চক্কর মেরে গেল তখন তারা সেই দিকেই তাকিয়ে ছিল। তাদের মনেও কৌতহুল আছে। এটা কিভাবে ওড়ে? কে চালায়? আরও কত কি? এরকম ভাবতে ভাবতে আলভী এক সময় বালুর মধ্যে বিমানের একটা ছবি আঁকল। ছবিটা বিমানের না হলেও বিমানের মত হয়েছিল।
মানুষের এক একটা চিন্তা, চেতনা, কর্মফল তাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় তা আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। যখন কারও ছোট কালের চিন্তা ভবিষ্যতের কর্মে রূপান্তরিত হয়, তখন আমরা সহসাই বলি ছেলেটি এমন যে হবে তা আগে থেকেই বুঝা গিয়েছিল। আর সেই চিন্তা চেতনার সাথে যদি ভবিষ্যতের রূপরেখার মিল না খায় তখন আমরা সবকিছু উল্টে দেই। অর্থাৎ এর দ্বারা কিছুই হবে না তা আগে থেকেই বুঝা গিয়েছিল। যা হবার তা হবেই। তারপরও "Morning shows the day" কথাটিকে একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না।

(২)

পনের বছর পর।
কুমিল্লার হাওয়া বদলেছে। সেই পনেরো বছর আগের কুমিল্লা এখন আর নেই। এই সময়ের মাঝে ব্যাপক একটা পরিবর্তন হয়েছে। আগে ফাঁকা যে মাঠগুলো ছিল এখন আর নেই, চতুর্দিকে শুধু বিল্ডিং। মানুষ নিরাপত্তার একটা স্থায়ী আবাস খুঁজছে। পৃথিবী কি অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে? তা না হলে শত শত বছর ধরে যে মাঠ-বিল সব খালি ছিল আজ তা পূরণ হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু খুপরির মত বিল্ডিং হয়ে যাচ্ছে। মানুষ খোলা আকাশের নিচে থাকতে ভয় পায়। হয়তো মানুষের জীবনযাত্রাও অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে। তাই নিজেকে লুকবার জন্য এই শক্ত প্রসাদ তৈরিতে সবাই ব্যস্ত হয়ে লেগেছে। এমন কি করছে মানুষ?
নিজেকে লুকিয়ে রাখার মাঝে কি শান্তি আছে? অবশ্যই না। যে অপরাধী সেই তো নিজেকে লুকিয়ে রাখবে। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা নিজেও সকল সৃষ্টির মাঝে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। তবে মানুষের কেন এই লুকোচুরির খেলা।
জীবনের এক একটা অধ্যায় আসে একদম ক্লান্ত পাখায় ভর করে ধেয়ে যায় পৃথিবীতে নিস্তরঙ্গভাবে। বিরামহীন তার চলা কিন্তু জীবনের আস্বাদন যেন খুঁজে পায় না। শহুরে প্রায় প্রত্যেকটি জীবনই এখন দালান ইট কাঠের মত শক্ত হয়ে গেছে। তাতে সাজানো ঐশ্বর্য আছে শুধু নেই একটি সজীব ও সতেজ প্রাণ। এই প্রাণের মোহে প্রত্যেকেই দৌড়ে বেড়ায় কিন্তু তা গোধূলি লগ্নের শেষ সময়।

কে?
কোন সাড়া শব্দ নেই। দরজায় শুধু একটি শব্দ। মিলার দরজা খুলতে ভয় লাগে। যদিও প্রতিদিন একই ঘটনা। রাত সাড়ে বারটার সময় তৌসিফ আসবে।দরজায় নক করবে হালকা ভাবে। তারপর দরজা খুলতেই কোন রকম হেটে গিয়ে শুয়ে পড়বে বিছানায়। আর কোন কথা থাকবে না। শুনশান নীরবতা অনুভব হবে চারিদিকে। এক সময় রাতের নীরবতা ও আঁধার দুইই কেটে যাবে।
তারপরও আজ রাতে একটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল মিলার বুক। সে ধীর পায়ে হেটে গেল দরজার কাছে। কতকিছুই তো ভাববার আছে। সব ভাবনা কি বলে কয়ে আসে? এমনিতেই তার জন্ম, আবার এমনিতেই তার মৃত্যু। মাঝখানের সময়টাকে ভাবিয়ে যায় এক দুশ্চিন্তার ঢেউয়ের সাগরে। তারপরও সাহস করে দরজা খুলেই ফেলল মিলা।কিন্তু আজ সে সত্যই ভীত হয়ে গেল।
"কি হয়েছে তোমার?"
কোন কথা নেই। সামনের দিকে এগিয়ে গেল তৌসিফ। পুরোটা পথ যেতে পারল না। কার্পেটের মাঝে দেহটাকে এলিয়ে দিল। মিলা চেষ্টা করল তাকে আগলে রাখার। কিন্তু পারল না। এক ভারী শরীর তার উপর আজ মদ্যপান করছে। মদের বিশ্রী গন্ধে নাক মুখ গুলিয়ে যাচ্ছে।
মেঝেতেই শুয়ে রাখল তাকে। রাতের নিস্তব্ধতা বেড়েই চলছে। একদম শিশুর মত শুয়ে আছে তৌসিফ। আজ রাতে মিলা ঘুমবে না। সারা রাত বসে থাকবে তার পাশে। কি জানি কখন ঘুম ভেঙ্গে যায়- ঘুম ভাঙ্গলেই হয়তো পাগলের মত তাকে খুঁজবে।
হঠাৎ করেই তৌসিফ প্রলাপ বকতে শুরু করল। "কি করেছি আমি_কেন তুমি এমন করলে_বল?_বল?_কেন এমন করলে?"
মিলা ঝাপটে ধরল তৌসিফকে। "কি হয়েছে তোমার?এই যে আমি। ভয় পেয় না।"
তৌসিফের চেতনা যেন সেই প্রলাপের ঘোরেই আছে। আবোল তাবোল বকেই চলছে।
"তোমায় কি আমি কম ভালবেসেছি_ তবে কেন এমন করলে?_তোমার জন্য আমি সব ছেড়ে দিতে পারি_তবুও তুমি ফিরে এসো তানিয়া।"
মিলা ছিটকে গেল তৌসিফের বুক থেকে। রাতের পর রাত জেগে থেকে যে মানুষটাকে একটু একটু করে ভালবেসে আসছে। যে মানুষটার জন্য সে এতকিছু আর সে কি না! গুমরে কেঁদে উঠল মিলা। বাঁধভাঙ্গা জোয়ার। বৃক্ষের ঝরে যাওয়া পত্রের মত এক একটি অশ্রু বিন্দু ঝরছে তো ঝরছেই। বুকের যে চাপা আর্তনাদ তা যেন ক্রমে বেড়েই চলছে। কাকে বলবে? কাকে বোঝাবে সে? বৈবাহিক জীবনের যে স্বপ্ন সে দেখেছিল কিশোরী প্রাণে তা যেন আজ কাঁচের মত খণ্ড খণ্ড হয়ে ভেঙ্গে পড়ছে। বহু চেষ্টা করেছে ধরে রাখতে। সবই যেন বৃথা। তবে কিসের মোহে সে তৌসিফকে বিয়ে করল? কেনই বা তার বাবা তাকে এখানে সঁপে দিল? শুধুই কি টাকা? আর কিছু নয়? সে কি পেয়েছে এই বিবাহিত এক বছরে? একটি নারী কি চায় তার স্বামীর কাছে? কিন্তু পায়নি। এই টাকা তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী যে বস্তু সেটাই দিতে পারেনি। সুখ।

রাত্রির দ্বি-প্রহর পেরিয়েছে। চোখের পানি চোখেই শুকাচ্ছে। পাশে একটি নিস্তেজ, অর্ধ চেতন প্রাণ পরে আছে। সকল কিছু ছাপিয়ে তার শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি দারুণভাবে টানছে। রাতের আঁধার যেন সকল কিছুকে আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে। এখানে থাকার যে বিতৃষ্ণা, অবদাহনতা, তার বৈবাহিক জীবনের অবজ্ঞতা সবই যেন আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়ে ক্রমশ মনের বাঁধনে চির ধরিয়ে দিচ্ছে। না, এখানে সে থাকবেনা। চলে যাবে বহুদূর, বহুপাছে। হয়তো শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিতে।

(৩)

দেশের পরিস্থিতি ভাল নয়। সব কিছু কেমন এলোমেলো মনে হয়। মানুষের ছুটাছুটি বেড়ে গেছে। গ্রামেও আজকাল শহুরে ছাপ পড়তে শুরু করেছে। পড়বেই না কেন? শহুরে মানুষগুলো যে ছুটে ছুটে আসছে গ্রামে। তারা কি সব আলোচনা করে। এই নিয়ে লেগে রয়েছে মিটিং দরবার আরও কত কি? গ্রামের কুকুর, বিড়াল, কাক_পক্ষীগুলোও যেন কেমন হয়ে গেছে। অনর্থক চেঁচামেচি করে। বোধ হয় খাবারের অভাব। মানুষেরই খাবার জুটছে না তাদের জুটবে কোথেকে? বড়ই অসহায় এই প্রাণীগুলো। এইসব ভাবে খসরু মিয়া। তার ভাবনাতেও এখন পরিবর্তন এসেছে।
কত সুন্দর ও নিটোল জীবন ছিল আগের। বাল্যকালে কাঁচা ধানের ক্ষেতের আইল দিয়ে খসরু মিয়া যখন দৌড়ে বেড়াত, বাতাসেনর হিল্লোল বয়ে যেতে সমস্ত হাওড় বেয়ে। যেন মনে হত এ সবুজের এক মহাসাগর। এক ঋতুতে কাঁচা ধানের হুম হুম গন্ধ অপর ঋতুতে পাকা ধানের হামুর হামুর গন্ধ। এভাবেই লেগে থাকত বছরের প্রতিটা সময়। নতুন ধানের ভাত ও নদী-নালার খালবিলের যে টাটকা মাছ ছিল তা কিঞ্চিত হলেও আজ কমেছে।তারচেয়েও বড় কথা দেশের সম্পদ নাকি আর দেশে থাকছে না।সব নাকি চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। এমনই তো শুনেছে খসরু মিয়া। এই সমস্ত কারণেই নাকি দেশে চলছে এতো গণ্ডগোল, আন্দোলন। এতো কিছু খসরু মিয়া জানত না। তাঁর ছেলে আলভী বড় পাশ করে বের হয়েছে। সেই বলেছে তাকে এসব।
ভাগ্যাকাশে সূর্য উদিত হয়। যে স্বপ্ন খসরু মিয়া দেখেছিল তাই আজ পূরণ হতে চলছে। তার ছেলে আলভী পশ্চিম পাকিস্তান যাচ্ছে পাইলট হিসাবে যোগ দিতে। এতদিন যে হঠাৎ হঠাৎ বিনাগুলো আকাশে দেখা যেত তাতে আজ তার ছেলেও থাকবে। বোঁ বোঁ করে উড়ে চলে যাবে আকাশের এ প্রান্তর থেকে ও প্রান্তর। খসরু মিয়া গর্ব করে বলবে, "ঐ বিমানটা কে চালাচ্ছে জান? আমার ছেলে! আমার ছেলে আলভী।"
৫২'র ভাষা আন্দোলন, ৬৯'এর গণ অভ্যুত্থান, ৭০'এর নির্বাচন প্রত্যেকটি বিষয় নিয়েই চলছে টান টান সমর্পক। বাঙ্গালির ন্যায্য অধিকারকে তারা বঞ্চিত করে আসছে সুদীর্ঘকাল থেকে। কালের সাক্ষী ও সময়ের দাবী এক পর্যায়ে বিচ্ছিন্নতাকে অনিবার্য করে দেয়। কিন্তু সেই বিচ্ছিন্নতাকে চিরতরে মূলোৎপাটন করার লক্ষে ২৫শে মার্চ রাতে পাস্তিানিরা ঘুমন্ত বাঙ্গালির উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় স্বাধীনতার যুদ্ধ।
যুদ্ধ চলছে। দেশের আকাশে এখন আর দুবীক্ষ নাই।প্রতিদিন অসংখ্য বিমান, হেলিকপ্টার আসছে।বোমা ফালছে ধ্বংস করছে দেশের সম্পদ। প্রতিদিনই মরছে হাজার হাজার মানুষ।অথচ পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব কোন বিমান নেই বল্লেই চলে। এক প্রকার নিরস্ত্রভাবেই তারা যুদ্ধ শুরু করে। এই ব্যাপারটি আঘাত হানে আলভীর মনে। সে নিজে পূর্ব পাকিস্তারে ছেলে হয়েও পড়ে রয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। দেশের প্রতি কি তার কোন কর্তব্য নেই। দেশের শৈশব স্মৃতি আজও তার চোখে ভাসে অথচ আজকের পরিস্থিতির সাথে তার কোন মিল নেই।যেন দিনে দিনে একটি ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হচ্ছে। শিউরে উঠে আলভী কিন্তু কি-ই বা করার আছে তার। শেষ পর্যন্ত একটি কঠিন সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সে। পশ্চিম পাকিস্তানের একটি সামরিক বিমান অপহরণ করল সে। বিমানটি নিয়ে সোজা চলে গেল পূর্ব পাকিস্তানে। সেখানে সে প্রত্যেকটি পাকিস্তানি ক্যাম্পের ওপর বোমা নিক্ষেপ শুরু করল। কিন্তু হঠাৎ পাকিস্তানি সৈন্যের একটি গুলি এসে লাগল তার বিমানে। সঙ্গে সঙ্গে বিমানটি ক্রেশ করল। আর শেষ হয়ে গেল দেশের জন্য যুদ্ধ করা প্রথম বিমানটি। সাথে সাথে শেষ হয়ে গেল এমন একটি সাহসী প্রাণ।

(৪)

আজ ১৬ই ডিসেম্বর। দিকে দিকে ভেসে আসছে জয় বাংলা। জয় বাংলা। দেশ স্বাধীন হয়েছে। সমস্ত মানুষ ঘর ছেড়ে বের হয়েছে। এতদিন অনাহারে অর্ধাহারে থাকা মানুষগুলো প্রাণের দাবীতে রাস্তায় রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে। তাদের দেহে জোর নেই, হাড়ে জোর নেই, মাংসে জোর নেই। জোর আছে মনে। সেই দাবিতে কঙ্কালসার শরীরে আদের জোয়ার ভেসে যাচ্ছে দূর পথে। প্রত্যেকেরই দুঃখ আছে মনে। ভাই হারা, মা হারা, বাবা হারা, স্ত্রী হারা, সন্তান হারা, স্বামী হারা কত দুঃখই জমে আছে। তারপরও তারা কিসের আনন্দে ভেসে বেড়াচ্ছে? সে যে দেশময়ী মাতৃ-মায়ার মাকে ফিরে পাবার আনন্দ। এর জন্য তো কত বাবা, ভাই শহীদ হয়েছেন, কত নারী হয়েছে ধর্ষিত। আজ যে বড় আনন্দের দিন। সেই আনন্দে খসরু মিয়ার চোখেও জল। সমস্ত আনন্দ, খুশি, কান্না, দুঃখ-বেদনা সবই মিশে আছে তার চোখের জলে। আজ এই বড় আনন্দের দিনে তার ছেলেটা নেই। ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠে বৃদ্ধ। একদিকে পাওয়া, আর একদিকে না পাওয়া। এই বৃদ্ধ বয়সে হিসেবর খাতাটা খুললে বড় একাকীত্ব বোধ হয় এতদিনের সঙ্গী তার স্ত্রী সেও নেই। ছেলে নেই, স্বপ্নগুলোও নেই।এ সমস্তই পাথরচাপা দেয় বৃদ্ধকে।
ঠাণ্ডা হাতের পরশ পায় খসরু মিয়া। বাবার হাত ধরে মিলা বলে, ''চল বাবা রাস্তায় যাই। আমরাও সেই আনন্দের মিছিলে যোগ দেই।'' বয়স ও বৃদ্ধের ভারে নুয়ে যাওয়া বৃদ্ধ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বাবে এই মেয়েটা তার বড়ই শান্ত। সমাজের আর আট দশটা মেয়ের মত নয় সেও লাঞ্ছিতা ও স্বামী পরিত্যক্তা। যেমনি এই বৃদ্ধ বাবার প্রতি তার কোন অভিমান নেই, তেমনি সে নিজের বিয়োগ ভাজন জীবনের হেতুতে মূর্ছা যাবার পাত্রীও নয়। মেয়ের এই মনোবলে সাহস জাগে তার।
চল মা।
চলো বাবা।
হাঁ রে আলভী তো শহীদ হয়েছে ?
হাঁ বাবা।
সে শহীদের মর্যাদা পাবে তো!
অবশ্যই পাবে বাবা।
তোর কি তোর ভাইয়ের কথা মনে পড়ে ?
কেন পড়বেনা !
তোর কি দুঃখ হয় ?
হয়, কিন্তু গর্বও হয়।
হাঁ রে আমারও এখন গর্ব হচ্ছে। এমন ছেলে কয়টা আছে বল ?
জী বাবা।
চল আমরা এই মিছিলটায় মিশে যাই।
চলো বাবা। আর সবার সঙ্গে বৃদ্ধ খসরু মিয়াও চিৎকার করে বলে উঠে "জয় বাংলা" !!!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • আশা
    আশা আলভীদের নিয়ে মা যেমন গর্বিত, তেমনি মায়ের সকল সন্তানও। আপনার গল্পটি ভালো।
    প্রত্যুত্তর . ২৩ অক্টোবর, ২০১১
  • মুহাম্মাদ মিজানুর রহমান
    মুহাম্মাদ মিজানুর রহমান অভিভূত, বাকহারা হয়ে আমি আর কি বলতে পারি এই গল্পটি সম্পর্কে ? .......অসাধারণ.......
    প্রত্যুত্তর . ২৩ অক্টোবর, ২০১১
  • সূর্য
    সূর্য স্বাধীনতাপূর্ব এবং পরবর্তি বছর গুলোয় "জয় বাংলা' ই তো ছিল আমাদরে জাগরণের হাতিয়ার। কেমন করে যেন এটা ছিনতাই হয়ে গেল জিন্দাবাদের কাছে .............. গল্পের আবেগটুকু মন ছুয়েছে।
    প্রত্যুত্তর . ২৩ অক্টোবর, ২০১১
  • প্রজাপতি মন
    প্রজাপতি মন সুন্দর গল্প। গর্বিত সন্তানের গর্বিত বাবা!
    প্রত্যুত্তর . ২৩ অক্টোবর, ২০১১
  • নিলাঞ্জনা নীল
    নিলাঞ্জনা নীল অনেক সুন্দর একটি লেখা............
    প্রত্যুত্তর . ২৭ অক্টোবর, ২০১১
  • খোরশেদুল আলম
    খোরশেদুল আলম সুন্দর বর্ণনায় ভালো লাগলো গল্প।
    প্রত্যুত্তর . ২৮ অক্টোবর, ২০১১
  • মনির খলজি
    মনির খলজি বড় আফসোস লাগে যখন "জয় বাংলা" স্লোগানটিকে আমরা একপেশী ভারতীয় দালালী হিসেবে চিন্হিত করি, অথচ এটি একটি এদেশের মানুষের মহাজাগরনির শক্তি যার হাত ধরে এদেশের মহাপুরুষের দ্বারা সূচিত হয় মুক্তি স্বাধীনতা ....মুক্তিযুদ্ধ চেতনা নিয়ে লিখা সুন্দর একটা গল্প ....ভালো লা...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ২৮ অক্টোবর, ২০১১
  • খন্দকার নাহিদ হোসেন
    খন্দকার নাহিদ হোসেন বেশ লাগলো লেখা। বর্ণনা ভঙ্গি খুব সুন্দর।
    প্রত্যুত্তর . ৩১ অক্টোবর, ২০১১
  • আনিসুর রহমান মানিক
    আনিসুর রহমান মানিক অনেক ভালো লাগলো...
    প্রত্যুত্তর . ৩১ অক্টোবর, ২০১১
  • আমির হামজা
    আমির হামজা সবাই কে ধন্যবাদ । আসলে সময়ের কারণে এই সাইেট বসা হয় না । পরীক্ষা সামনে । সময়ের কারণে "গ্রাম বাংলা" বিষয়ের উপর লেখা দিতে পারি নি । ভাল থাকবেন সবাই । সবচেয়ে বেশী খারাপ লাগছে কারোও লেখা পড়ার সুযোগ হচ্ছে না ।
    প্রত্যুত্তর . ৬ নভেম্বর, ২০১১

advertisement