লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৮
গল্প/কবিতা: ২টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঈদ (আগস্ট ২০১৩)

পরিচয়
ঈদ

সংখ্যা

শিকদার নূরুল মোমেন

comment ০  favorite ০  import_contacts ৪৪১
বন্ধের দিনে সকাল সকাল ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছাড়তে পারেনি তনিমা। যখন উঠতে গেছে তখনই শোভন তাকে টেনে ধরেছে। ছাড়তো- গোছল সেরে নাস্তা তৈরি করতে যাবো, আলসেমির কন্ঠে বলে তনিমা। আধোঘুমো চোখে শোভন অনুরোধ করে, আরেকটু শোও না। নাক কুচকায় মেয়েটি, একটু শুলেই তো... আরেকটু আবদার জুড়ে বসবেন। শোভনের মুখে কোনো কথা নেই, এমন পরিস্থিতিতে তাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে আসছে মেয়েটি। ঘুম তাড়িয়ে শোভন পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে উঠে। মেয়েটিও ভেতরে ভেতরে উতলা ভাব অনুভব করে। বিছানার পাশের সাইড টেবিলে রাখা তনিমার সেলফোন বেজে ওঠে। সুরেলা রিংটোনটিও তার কাছে ভীষণ বিরক্তিকর লাগে।
ঘন্টা খানেক পর ফোনসেট ফের বেজে উঠলে চঞ্চলা মেয়েটি কল রিসিভ করে। বান্ধবী মিতার হাস্যজ্জল কণ্ঠ, তোদের বুঝি এখনো সকাল হয়নি?
না, মানে-
মানে মানে করতে হবে না। তোর কথা খুব মনে পরছিল, তাই সাত-সকালে ডির্স্টাব করলাম-
ভোরেই অবশ্য ঘুম ভেঙ্গেছে-
তুই কেমন আছিস, ভাইয়া কেমন আছেন?
আমরা বেশ ভালো আছি। তোদের খবর বল-
খবরতো সব আপনার কাছে, ভালো চাকরি করা ¯^ামীর সোহাগে সোহাগে সময় কাটাচ্ছেন। শ্বশুরের রেখে যাওয়া আলিশাইন বাড়িতে মৌজ-মাস্তি করছেন।
অনার্সে ভর্তি হওয়ার পরের দুই বছর নিয়মিত ক্লাস করেছে, পরী¶া দিয়েছে তনিমা। ফার্স্ট ইয়ার-সেকেন্ড ইয়ারের রেজাল্টও ভালো-, কিন্তু গত দুই বছর ধরে কলেজে যাতায়াত ও ক্লাস করায় সে অনিয়মিত হয়ে গেছে। অনার্স শেষ বর্ষে পড়–য়া মেয়েটি এখন বাবার বাসায় বেড়াতে গেলেই কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুঁ মারতে পারে। তনিমার পুরো জীবন কেটেছে শহরে, দুই বছর আগে বিয়ে হয় শহরতলীর এক জোরদার পরিবারে। ¯^ামী আর শ্বাশুড়িকে নিয়ে তার সংসার, আরো আছে ফুট-ফরমায়েশ খাটার জন্য দুইজন সাহায্যকর্মী।
তনিমা জানতে চায়, দীপন স্যার, জলিল স্যার কেমন আছেন?
ভালো আছেন। কলেজের পরিবেশ-পরিস্থিতি আর আগের মতো নেই। সবখানে দলাদলি, ছাত্র রাজনীতিতে হানাহানি বেড়েই চলছে। ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনাতো আছেই-।
আমি না হয় ক্যাম্পাস ছেড়েছি। তোরাতো আছিস-। তোদের উচিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। তোরা এতো ভয় পাস কেন?
আমরা কি আর তোর মতো এতো সাহসী? তুইতো মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে-।
প্রসঙ্গ বদলায় মিতা, কি করছিলি?
তনিমার মুখে কোন কথা নেই। সে মুড বদলানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। পাশে শোয়া শোভন নিচু কন্ঠে স্ত্রীকে বলে, বলো কি করছিলে। তনিমা ফিক করে হেসে ফেলে, তুই বুঝবি না। বিয়ে হোক, তখনই বুঝবি-।

তনিমা দিনের পুরো সময়টা শাশুড়িকে সময় দেয়। বিধবা শাশুড়িকে সেবা-যতœ করার ক্ষেত্রে কখনো অবহেলা করে না। সারাদিন বউ-শাশুড়ির অনেক গল্প চলে, মাঝেমধ্যে একমাত্র ছেলের বউকে একাত্তর সালের কথা বলে শাশুড়ি। জীবন থেকে নেওয়া এসব গল্প শুনতে আগ্রহ দেখায় তনিমা। সে হাসতে হাসতে বলে, গন্ডগোলের বছরে আমাগো বিরাজ বেপারিরে-। তনিমা শাশুড়িকে সংশোধন করে দেয়, মা ওটা গন্ডগোল ছিলো না। একাত্তরের ওই যুদ্ধ ছিলো আমাদের মুক্তির যুদ্ধ। শাশুড়ি বউয়ের কথায় আমল না দিয়ে বলতে থাকে, বিরাজ বেপারিরে মিলিটারিরা জিজ্ঞেস করে, তুমি হিন্দু না মুসলমান? কালেমা জানো? কালেমা কও-। ভয়ে সে কলেমা বলতে পারে না। সুরা ফাতেমা বলতে বললে মানুষটা কয়, ইন্না নিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহির রাজিয়ুন।
তুমিতো মুসকিল আসানের দোয়া পড়লে! এবার সে মুখ খোলে, আমিতো বিপদেই পরছি। ওই কারণেই বিপদ থেকে মুক্তির দোয়া পড়লাম। তনিমা মনে মনে পাক বাহিনীকে বকা দেয়, শুয়রের বাচ্চারা নয়মাস জ্বালাইয়া মারছে। ওই অপশক্তির দোসরদের জন্যই ¯^াধীন দেশের জনতাও আজ দুই ভাগে বিভক্ত। এই বাড়ি প্রসঙ্গে বলতে যেয়েও বয়স্ক মানুষটি মুখ থেকে কথা ফিরিয়ে নেয়। কয়েকদিন আগে শাশুড়ির বয়েসি কয়েকজন মুরব্বিও বাড়ির বিষয়ে বউকে দেখে কণ্ঠ থামিয়ে দেয়। তাদের এমন আচরণে তনিমার মনে কৌতূহল জন্মে, উনারা কি কিছু গোপন করতে চাইছেন? এতে গোপন করার কি-ই বা থাকতে পারে?
সাপ্তাহিক বন্ধের দুদিন কাটানোর পর রোববারটা যেন কাটতে চায় না। সারাদিন শোভনের মুখখানি তার দুচোখে ভাসে, ¯^ামীর পথ চেয়ে বসে থাকে। অলস সময়ে আলমিরায় শোভনের তাকের র্শাট-প্যান্ট, কাগজ পত্রাদি পরিপাটি করে গোছায়। ড্রয়ারের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থেকে সার্টিফিকেটগুলো গুছিয়ে একটা প্লাস্টিক ফাইলে রাখে। ওখানে রাখা শ্বশুরের মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটটি চোখের সামনে ধরতেই গর্বে বুক প্রসারিত হয়, তার ¯^ামীও একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তাদের যে সন্তান দুনিয়ায় আসবে সে মুক্তিযোদ্ধার বংশধর-। আল্লাহর দরবারে লাখো-কোটি শুকরিয়া আদায় করে তনিমা, আনন্দে তার দুচোখ ছলছল হয়ে ওঠে। পূর্বেই শোভন তাকে জানিয়েছে, বাবার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটটি চাকরি পাওয়ার ¶েত্রে অনেক সহযোগিতা করেছে। নিজেকে একজন পরিপূর্ণ সুখী মানুষ ভাবতে থাকে তনিমা।

তনিমাকে ঢাকায় শ্বশুরের বাসায় রেখে শোভন পরের দিনই কর্মস্থলে ফিরে আসে। মা-বাবা-ছোটবোনের মাঝেও নিজের ভেতরে তীব্র শূণ্যতা অনুভব করে। অস্থির হয়ে শোভনকে ফোন দেয়, এতোদিন এখানে একা থাকতে পারবো না। তুমি আমাকে নিয়ে যাও-। শোভন ব্যস্ততার কথা বলে, এই বৃহস্পতিবারে আসতে পারবো না। ডিসি সাহেব মিটিং ডেকেছেন। শুক্রবারে হাই স্কুল মাঠের প্রোগ্রামে তিন-চারজন মন্ত্রী আসবেন-
কি বলো! আমি এতোদিন এখানে থাকলে মরে যাবো।
কলিংবেল বেজে ওঠে। শোভনের কাছ থেকে বিদায় নেয় তনিমা, এখন রাখছি। আমাকেই দরজা খুলতে হবে। দরজা খুলতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়, তুমি! দরজার ছিটকিনি আটকে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে শোভন।

বউকে সপ্তাহ পরে ফিরে পেয়ে বাড়িটার শূণ্যতা ঘোচে। শাশুড়িসহ কাজের সহযোগি মানুষদ্বয়ও আনন্দিত হয়। মাথা চুলকাতে চুলকাতে ছোট বোন সারথীকে বকে তনিমা, ওর সাথে শুয়ে উকুনে মাথাটা ভরে গেছে। একথা শুনে বাড়ির কাজের লোক দুলালের মা বলে, আমি এই বাড়িতে থাকতে মার মাথার উকুন থাকবো এইডাতো মাইনা নেওয়া যায় না! উকুন আনতে বসে দুলালের মা নিজের গল্প, এই বাড়ির কর্তার গল্প, এই বাড়িটির নানান গল্প শোনায়। বাড়িটা আছিলো সূর্য বাবুর। গন্ডগোলের বছর ওই বাবু এই বাড়ি-ঘর, সহায় সম্পত্তি রাইখ্যা ইনডিয়া চইলা গেছে। কথার আল ধরে তনিমা জানতে চায়, আমার শ্বশুররা এই বাড়িতে আসলো কেমন করে? দুলালের মা নিচু কন্ঠে বলে, ওই সময়ে এই বাড়ির ভাইজান মুসলমানগো সাহায্য করছে। মুসলমানরা হইলো ভাই-ভাই। বাবুরা দেশ ছাড়ার সময় ভাইরে এই বাড়িটা দিয়া গেছে। এত¶ণ ধরে শোনা কথাগুলো তনিমার কানে বাজতে থাকে, শ্বশুরের মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দুচোখে ভাসে। এই বাড়ি সম্পর্কে শাশুড়ি মায়ের তথ্য লুকোচুরির আচরণগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাহলে কি শোভনের বাবা একাত্তরে পাকিস্তানীদের দোসর ছিলো? এই মুহুর্তে আর কিছুই ভাবতে পারছে না, তার মাথা ভোঁ ভোঁ শব্দে ঘুরছে।
তনিমার সন্দেহই ঠিক হয়, তার শ্বশুর একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের বিপ¶ে ছিলো। হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে, পৈতৃক ভাবে পেয়ে তার ¯^ামীও ওই সম্পত্তি ভোগ করছে। এই বাড়িতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া খুব কষ্টকর হয়ে ওঠে। তনিমার কানে বাজে বাবার উপদেশ, মা-রে মেয়েরা ঘরের ল²ী। মা-বাবার যেমন সেবা করছো তে¤িœ আজীবন শ্বশুর-শাশুড়ি-¯^ামীর সেবাযতœ কইরো। একা ঘরে মেয়েটি হাউ মাউ শব্দে কেঁদে ওঠে, বাবা আমার যে এই পরিবেশে দম আটকে আসছে। আমি আর পারছি না-।

¯^ামীর আদরে আদরে সিক্ত হয় তনিমার শরীর, তবে শত চেষ্টায়ও মনের বিরক্তি দমন করতে পারে না। মেয়েটি মুখ বুজে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে-। দাম্পত্য কর্মের পর শরীরে আগের মতো সুখের আলসেমী জড়ো হয় না, শরীর থেকে সব চিহ্ন ধুয়ে ফেলতে দ্রুত যেয়ে ঝর্ণার নিচে দাঁড়ায়। সে প্রতিবাদীও হতে পারে না, কানে বাবার কথাগুলো বাজে।

তনিমা মা হওয়ার সংবাদে দুই বাড়িতেই আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। নিজের কষ্টটা কেবল নিজেই বুঝতে পারে, সে একজন যুদ্ধপরাধীর জাতগোষ্ঠী পেটে ধরেছে। সবকিছু মেনে নিতে কষ্টে তার বুক ফেটে যায়। তাকে প্রতিনিয়ত কাঁদাচ্ছে শূণ্যতার অশ্রæজল, যে কান্না কেউ দেখতে পায় না।

পরিশিষ্ট :
তনিমা-শোভন দম্পতির একমাত্র সন্তান তাহসান দেশের সেরা স্কুলে ভর্তি পরী¶া দিতে যাচ্ছে। ছেলেকে নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে আলমারির সামনে যায় শোভন। সার্টিফিকেটের ফাইলটা তন্ন তন্ন করে কিছু একটা খুঁজছে। ¯^ামীকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে তনিমা, কি খুজছো?
বাবার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট। ওটা জমা দিলে তাহসান ভর্তির ¶েত্রে প্রাইরটি পাবে। শোভনের কথা শুনে ছেলের মা তিরষ্কারের হাসি হাসে, জানোয়ারের জাত আর কত সুযোগ নিবি? সত্য ঘটনাটি জানার পরতো ওটা পুড়িয়ে ফেলেছি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement