তিনমাস ধরে লকডাউন চলছে! রাতদিন সব এলোমেলো হয়ে গেছে এক করোনা ভাইরাসের থাবায়! সারাবিশ্বে কয়েক লক্ষ মানুষ এই করোনা ভাইরাস গিলে খেয়েছে! না,কোন যুদ্ধ না! কোন গোলাবারুদও না। এক অদৃশ্য ভাইরাস আজরাইল বেশে এই মানুষগুলোকে ওপারে নিয়ে গেছে। কত পরিচিত মুখ ছবি হয়ে ফেসবুকের হোমপেজে এসে কষ্ট বাড়িয়েছে! চারদিকের মৃত্যু সংবাদ আর মানুষের অভাব আমাদেরকে অনেকখানি শক্তও করে দিয়েছে। প্রথম প্রথম ভয় পেলেও এখন অনেকটাই কঠিন হতে বাধ্য হয়েছে! আমিও তাঁদের মত হয়ে গেছি! এখন চোখের পানি যেন শুকিয়ে গেছে! পাঁশের ফ্ল্যাটে কী হচ্ছে সে খবরও কেউ রাখছি না! না মন কঠিন হয়েছে সে কারণে নয়-করোনা ভাইরাসের সাথে যেন দেখা না হয় সেই ভয়ে। যেটুকু খোঁজ খবর জানা তা সোশ্যাল মাধ্যম ফেসবুকেই জানছি।



কিন্তু শেখানেও ইদানীং খুব কম যাওয়া হচ্ছে! এই ফেসবুকে এতো এতো অভাব অনটনের খারাপ খবর আর লাশের ছবি যে, সুস্থ্য থাকাটা আরও বেশি কঠিন করে তুলছে। ঘুম নেই চোখে। খেতে গেলে হাজারো অভুক্ত মানুষের করুন চোখের পাতায় মুখ ভেসে উঠে! যাই খাই বা যাই করি,মনে হয় ঠিক করছি না! কিন্তু বেঁচে তো থাকতে হবে। সবকিছুই যেন বাঁচার জন্যই করা। কারো সাথে ফোনেও এখন কথা বলতে ইচ্ছে হয় না। কেউ বলে না,তাই আমিও বলি না। সবারই ভাবখানা-"ফেসবুকে তো স্ট্যাটাস দিতে দেখছি। সুতরাং আছে যেমনই হোক।বেঁচেই তো আছে!" আগে খোঁজ খবর নিলেও ইদানীং একেবারেই নেয়া হয় না! কতদিন কারো মুখ দেখি না। বেশ হাঁপিয়ে উঠেছি।



এই মহামারির কালে সকাল হয় দুপুরে! নিয়ম করে বাজার করা, সময় মত অফিসে যাওয়া! কোনকিছুরই কোন তাড়া নেই। আর তাই প্রতিদিনের মত আজ বারোটার দিকে ঘুম থেকে উঠে বেশ সময় নিয়ে নাস্তা খেলাম! তারপর আয়েশ করে মোবাইল ফোনটা নিয়ে চা পানে বসলাম। চায়ে চুমুক দিতে দিতে অনেকদিন পর ফেসবুকের দরজা খুললাম মানে লগইন করলাম। হুড়মুড় করে নোটিফিকেশনের উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে দেখি আমার পাশের ফ্ল্যাটের শীলুভাবি ফেসবুকে স্ট্যাটাস ট্যাগ দিয়েছে।"আমার মা আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছে! (স্যাড ফেস ইমো)" স্ট্যাটাস পড়ে আমি তো ভীষণ খুব খুশি। সেই স্ট্যাটাসে আমি ছাড়াও শীলুভাবির নিকটাত্মীয় কয়েকজন লাভ রিয়েক্ট ইমো দিলাম। মন্তব্যের ঘরে লিখলাম-

-"খুব ভালো হয়ছে ভাবি। খালাম্মা এবার আত্মীয় স্বজন নিয়ে থাকতে পারবে।"

আমার কমেন্টের কোন উত্তর না দিয়ে ভাবি স্যাড ফেস ইমো দিলেন।

-"গিয়া দেখ তোমার মা এখন হাওয়া হাওয়া ই গান গায়তেছে। চার দেয়ালের বন্দী জীবন থাইকা বাঁইচা গেছে!" মিনুভাবির এই মন্তব্যতেও শীলুভাবির স্যাড ফেস ইমো। সেখানে অনেকেই মন্তব্য করেছে। শীলুভাবি শুধু স্যাড ফেস ইমো দিয়েই শেষ। যাইহোক ভাবির জন্য খারাপ লাগলো। আজ প্রায় দুই বছর ধরে উনার মা দেশ থেকে এসে প্রবাসে মেয়ের কাছে ছিল। দেশে যাবে লকডাউনের জন্য যেতে পারেনি। দেশের মত করে সুন্দর সুখে থাকা কী এই বিভূঁইয়ে হয়? তাও একজন বয়স্ক মানুষের জন্য!



প্রবাসে আমাদের সংসারের কাজ করে স্বামী সন্তানের দেখাশুনা করে সময় কেটে যায়। কিন্তু সবচেয়ে কষ্ট হয় বৃদ্ধ যারা দেশ থেকে আসে তাঁদের। দেশের মত এখানে কারো কাজের লোক নেই। ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও নেই গল্প করার সময়। আগে যেমন ফোনে ফোনে গল্প,গসিপ করা হত। এখন তাও হয় না। আগে ফোনে এতোটাই যোগাযোগ করা হত যে,ফোন নাম্বার একেবারে মুখস্ত থাকত। ইস্মার্ট ফোনের কল্যাণে ফোন নাম্বার কারোরই মনে থাকে না। কিন্তু ইদানীং কাজের ফাঁকে ফাঁকে,অথবা নিজের মত করে কিছুটা সময় বের করে,সবাই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেবার মত সময় ঠিকই বের করে নেই। যাকেই জিজ্ঞাসা করা হোক না কেন সবাই বলবে "অনেক ব্যস্ত।!" অথচ প্রতি ক্ষণে ক্ষণে একটা করে স্ট্যাটাস ফেসবুকে প্রসব করে চাই। লকডাউনের কল্যাণে সেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত থাকার প্রবণতা আগের থেকে অনেক বেড়েছে!



যাইহোক,বেশ কিছুদিন পরে লকডাউন শিথিল হয়েছে। সুসংবাদ হল প্রাণের বাংলাদেশ ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে সারা বিশ্বকে বিশাল এক কাঁচকলা দেখিয়ে দিলো! ইউরোপ অ্যামেরিকা চায়না সব একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ভ্যাকসিনের তথ্য কেনার জন্য! খবর বেরিয়েছে"আশেপাশের দেশগুলো দেশের গবেষণা কেন্দ্রের ইন্টারনেট হ্যাক করে তথ্য চুরি করতে যেয়ে বিশাল ধরা খেয়েছে!" এখন তো রীতিমত সাইবার যুদ্ধ শুরু করেছে! লালসবুজের কাছে এক মুহূর্তের জন্য নাকি দাঁড়াতে পারেনি বেক্কলগুলা! এতো সস্তা হাঃহ...! এদিকে নাকি অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে ধামকি দিয়ে বলেছে

-"দেখো শেখের বেটি পাঁচ মিলিয়ন ডলারে রফাদফা কর! ভ্যাকসিন না! সোজা তথ্য দেও নাইলে কিন্তু..."শেখের বেটিও কম যায় না

- "পাঁচ মিলিয়ন ক্যান ট্রিলিয়ন দিলেও তথ্য দেব না। ভ্যাকসিন নিলে লাইনে দাঁড়ান পাঁচ মাস পরে পাবেন!" খট্যাস করে লাইন কেটে দিয়েছে! শেষে দেখি ক্যামনে ক্যামনে সেই ভ্যাকসিন আবার পনেরো দিনেই অ্যামেরিকায় আসছে! যাক বাবা লকডাউন শিথিল করছে। আমার জামাই তো দেখি সারাক্ষণ বিবিসি,সিএনএন-টিভি চ্যানেল খুলে বসে থাকে। আর দশ মিনিট পরপর "জেবা চা দাও। কফি দাও!" এই মহামারিতে এই লোকটার জন্য না জানি চা কফি আর চিনির আকাল দেখা দেয়! কত যে বকা দিচ্ছি কিন্তু কে শোনে কার কথা! করোনা এই মানুষটাকে মনে হয় কানে গণ্ডারের পর্দা দিয়েছে। আগে একটু কিছু বললেই একেবারে গরম তেলে পানি পড়ার মত "ছ্যাঁত" করে উঠত-"চা কফি চিনি কী যৌতুকের যে কিপটাদের মত আঙুলের ডগায় করে দেবা?" বলেই বাইরে চলে যেত কুরুক্ষেত্র এড়াতে! অথচ এই লকডাউনে যাই বলি না কেন হেসে হজম করছে! না বাবা না! তাই বলে যেন ভাবনায়ও না আসে যে লকডাউন জনমের মত থেকে যাক! আর আমি গালভরা দুকথা শুনিয়ে যাই। এর চেয়ে চা কফি যত খুশি খাক তবু এই লকডাউন দূর হোক! করোনা ফরোনা সব থেকে মুক্তি পাক মানুষ! অন্য নারীদের মত স্বামীকে কথা শুনাতে,না বাবা না-এএতোটা স্বার্থপর হতে পারব না বলে দিলাম।



তারপর একদিন দেখি শীলুভাবির হাসবেন্ড হাবিব ভাই "বাসায় মিলাদ" এই নামে ফেসবুকে ইভেন্ট খুলেছে! বিল্ডিঙের সবাইকে এবং বন্ধু বান্ধব স্বজন যারা এই প্রবাসে আছে। তাঁদের সবাইকেই দাওয়াত দিয়েছে। ড্রেস কোড দিয়েছে কালো।মাস্ক বাধ্যতামূলক। আর একটা পরিবার থেকে একজন আসতে পারবে। এই জায়গায়টা কেমন যেন একটু অপমানিত লাগলো। ঘরের বাচ্চাদের রেখে স্বামীকে রেখে স্ত্রী? না কী স্ত্রীকে রেখে স্বামী যাবে? দেখি গোয়িং ক্লিক করেছে প্রায় সবাই-ই। আর তাই ভদ্রতার খাতিরে মনের উপর পাহাড় বসিয়ে,ঠোঁটটাকে কান পর্যন্ত বাঁকা করে আমিও ক্লিক করলাম গোয়িং। পরে অবশ্য হাবিব ভাই নিজেই দরজার কাছে এসে বলে গেলেন-"ভাবি আপনাদের কিন্তু সবাইকেই আসতে হবে। আপনারা হলেন আমার প্রতিবেশী! একজন এলে কিন্তু হবে না!" এক নিমেষে সব পাহার পর্বত নিজে থেকেই হাওয়ায় মিলে গেলো।



দুদিন পরে সকাল থেকে মিলাদে যাবার প্রস্তুতি নিলাম। সাড়ে চারমাস পরে পার্টি! হোক তা মিলাদের-পার্টি সাজুগুজু, হাঃ হাঃ হিঃ হিঃ হৈ হুল্লোড় কত আনন্দ! যেন ইদ ইদ লাগছে! এবারের ঈদটাও ভীষণ পানসে ভাবে গেছে! নিজে রান্না করে নিজে খাঁও...! মেজাজটাই খারাপ ছিল! যাইহোক, আমি কালো বেশ কয়েকটা শাড়ি বের করে পড়ে গেলাম মহাবিপদে। কোন শাড়িটা পরব মোটেই ডিসিশন নিতে পারছি না। একবার ভাবলাম ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়ে বন্ধু স্বজনদের জিজ্ঞাসা করি। পরে ভাবলাম সবাই দেখে যাবে আর পরে আমার থেকেও সুন্দর শাড়ি কাপড় পরে আসবে। মেয়েকে বললাম-

-মা দেখ না মামনি কোন শাড়িটা পরে যাবে?

-ইনি মিনি মাইনি মো,ক্যাচ এ টাইগার বাই দ্যা টো,ইফ হি হলারস লেট হিম গো, ইনি মিনি মাইনি মো - মেয়ে প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে এভাবেই করে গেলো। শেষ মেষ মন খুঁতখুঁত করে একটা পরে ফেললাম। যেহেতু মিলাদ পার্টি তাই হালকা সাজগোজের উপর দিয়ে চালিয়ে দিলাম। খালি হাতে যাবো না বলে মিষ্টি বানিয়ে নিয়ে গেলাম।

পার্টিতে গিয়ে দেখি আগর বাতির ঘ্রাণ।মেয়েরা এক রুমে বসা। সেখানে যেয়ে বসতেই মিনুভাবি এসে হাজির।

-আরে ভাবি এই মরামরা সাজ কেন আপনার!

-কী বলেন ভাবি! মনে মনে কষে একটা গালি দিলাম-'পাজি মহিলা কত সুন্দর একটা কাতান পরলাম। আর উনি মরা মরা দেখে!' মুখে হাসি নিয়ে এদিক ওদিক তাকাই শীলুভাবিকে খুঁজি। মিনুভাবি ঠোঁট ফুলিয়ে বলে-

-জানেন ভাবি আমার এই শাড়িটা সেইবার যখন বোম্বে গেলাম! বারো শো ডলার দিয়ে কিনে এনেছিলাম। আপনার ভাই না একটা আস্ত খ্যাত...!

-কী বলেন ভাবি!

-আরে ভাবি আমারে সে বলে মিলাদে যাবা এতো সুন্দর চকমকে শাড়ি পরে? বলেন ভাবি খ্যাত না হলে কী কেউ এসব বলে? পার্টি তো পার্টিই তাই না...!

-হ্যাঁ ভাবি...!

-আমি একটা জিনিষ খেয়াল করছি ভাবি। আমি কথা বলছি কিন্তু আপনি তো খেয়াল করে শুনছেন না। আপনি তো কাকে যেন খুঁজছেন। এইটা কিন্তু ভীষণ অপমানকর বলে দিলাম ভাবি। আমি এসব একদম লাইক করি না।

-না না ভাবি প্লিজ এভাবে বলবেন না। আমি শুনেছি আপনি কী বলেছেন। আসলে শীলুভাবিকে দেখছি না তো তাই।

-কেন শীলুভাবিকে দিয়ে কী করবেন? কথাটা বলেই আমার হাতের দিকে তাকিয়ে মিষ্টির বাটিটি নিয়ে নিলো।

-আচ্ছা আপনি মিষ্টি বানিয়ে এনেছেন? ঢং কত... মিলাদে কেউ এসব আনে নাকি? আমি কিছু আনিনি।



আমি উনাকে কিছু না বলে শীলুভাবিকে দেখে হেঁটে গেলাম। ভাবিকে দেখে ক্যামন যেন লাগলো। চোখ মুখ ফোলা ফোলা। মা চলে গেছে বলে এতো কান্নাকাটি! অথচ এখানে কী কষ্টে ছিলেন। ঠাণ্ডায় সকালে বুড়া মানুষ বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে যেত। শাড়ি পরে তার উপর ওভার কোট পরা। পায়ে মুজা আছে কিন্তু স্যান্ডেল পায়। প্রায়ই আমার জন্য গেইটে দাঁড়ায় থাকতেন। আমি আমার বাচ্চাদের সাথে শীলুভাবির বাচ্চাদের নিয়ে যেতাম। কিন্তু মাঝে মাঝে আগেই চলে যেতাম। সকালে কারো বাসায় কলিং বেল দেয়া অশোভন তাই আর ডাকা হত না। ভালোই হয়েছে দেশে চলে গেছে। শীলুভাবিকে বললাম-

-আরে ভাবি ক্যামন আছেন?

-এই তো ভাবি আর থাকা...মা আমাদের ছেড়ে...। বলেই কেঁদে কেটে একাকার।

-ন্যাকা ন্যাকা কথা কেন বলেন...। অনেক কানছেন এখন আর কাইন্দেন না তো! যার মাল যেইখানে থাকনের সেখানেই নিয়া গেছে।

মিনুভাবি যে কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পাইনি। উনার কথা শুনে ভীষণ রাগ হল। কিন্তু আবারও কিছু বলতে পারলাম না।

-কী আর করবেন ভাবি আমাদের সবাইকেই তো একদিন যেতে হবে।

শম্পার কথা শুনে আমার যেন কেমন কেমন লাগলো। কথাটার মাঝে কী যেন ছিল! মনের ভীতরে "ধাক ধাক ধাক"হাতুড়ি পেটানোর শব্দ! 'কী বলে এরা?'

আমার মাথার ভীতর কেমন যেন চক্কর দিচ্ছে! কয়েকদিন আগেই খালাম্মা আমাকে দেখে বলেছিল-

-মা তুমি ভালো মিষ্টি বানাও! কতদিন মিষ্টি খাই না!

-কেন খালাম্মা? শীলু তো বলে ও প্রায়ই মিষ্টি কেনে আলাদীন থেকে!

-আর কইও না মা ! বাসায় তো কেউ আমারে মিষ্টি খাওয়া তো দূরে থাক,মিষ্টি দেখতেও দেয় না। ফ্রিজে তালা আটকায় রাখে। যেমন মাইয়া তেমন তার জামাই!

কথা শুনে বলেছিলাম-ঠিক আছে খালাম্মা নেক্সটাইম মিষ্টি বানিয়ে আপনাকে বাসায় এনে নিজে হাতে আমি আপনার মুখে তুলে খাওয়াবো!

উনি খুব খুশি হয়েছিলেন। ভেবেছিলাম সুগারফ্রি মিষ্টি করে খাওয়াবো। কিন্তু উনি তো এই লকডাউনের ভীতর দেশ থেকে সরকার যে প্লেন পাঠিয়েছে তাতেই চলে গেছেন! উনি না জানিয়েই চলে গেছেন! প্রথমে ভীষণ রাগ হল-"একবার কী বলে যেতে পারতেন না!" আবার ভাবলাম হয়তো আমাদের কথা ভেবেই দেখা করেনি! আমাদের ফ্লোরে একটা আফ্রিকান ফ্যামিলি থাকে। তাঁদের পাঁচ আর সাত বছরের দুইটা বাচ্চা। নিউজে দেখেছিলাম মহিলার হাজবেন্ড ফ্ল্যাটেই মারা গেছে। দুইদিন সেই লাশ নিয়ে মহিলা আর দুই বাচ্চা ঘরের ভীতর থেকেছে! এতো লাশ রাখার জায়গাও নেই...! করোনার ভয়ে আমরা কেউ তো যাইনি সেই পরিবারের খোঁজ নিতে! কতটা কষ্ট আর ভয়ে কেটেছে ঐ পরিবারের সময়- তা কেবল ওরাই জানে! আমরা তো স্বার্থপর ছিলামই! কিন্তু করোনা ভাইরাস আমাদেরকে আরও বেশি স্বার্থপর করে দিয়েছে। অথচ এই মহামারিতে সবাই কষ্টে আছে! সুতরাং আমাদের তো আরও বেশি মানবিক হয়ে একজন আরেকজনের পাশে থেকে একতায় এই মহামারির সময়টাকে জয় করতে পারি! পারি একে অন্যের মানসিক সাপোর্ট হতে।



বারবার মনে হচ্ছে- কেন আমি একবারও খালাম্মার খোঁজ নিলাম না! কেন দূর থেকে হলেও আমরা আফ্রিকান ফ্যামিলির পাঁশে থাকলাম না! নিজেকে ভীষণ অপরাধী লাগছে! উফঃ আর কোন পরিবার যেন নিজেদেরকে এভাবে একা অসহায় না ভাবে! আর কোন খালাম্মা যেন বিদায় না নিয়ে দূরে চলে না যায়! আমরা সবাই সবার খোঁজ নেব! এ কেমন স্বার্থপরতা? এ কেমন মনুষ্যত্ব যদি মানুষ হয়ে মানুষের পাশে না দাঁড়াই! এমন ভুল,না না এটা পাপ করেছি। এমন পাপ আর কোনদিন করব না! কেন যেন আমার ভীষণ কষ্ট বাড়ছে! এমন দিন ক্ষণ যেন আর না আসে! প্রত্যয়ের সাথে হঠাৎ জামিল ভাইয়ের স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি ভেসে এলো-



এই শহরের ধুলিকনায় লাশের পাহাড় জমতে শুরু করেছে

খুব শীঘ্র রাজত্ব করবে শকুনেরা,

বাতাসে ভেসে বেড়াবে কড়া দুর্গন্ধ

তারই আমন্ত্রণে জড় হবে হাজারো চিল শকুন!



ট্রেনের পাশে কন্কালসার মা কাত হয়ে শুয়ে

অপলক দেখে যায় তার অবুঝ শিশুর নীরব কান্না

আগত শকুনেরা মাংসল দেহ চায়

ওদেরও রুচি আছে স্বাদ বোঝে-



শুধু ইট পাথরে ঢাকা শকুন গুলোর

উল্লাস শোনা যায়-শহরের বিলাসিতায়!



আমি ভাবছি খালাম্মা হয়ত ভীষণ ভয় পেয়েছিল। হয়ত সে ভেবেছিল নিউইয়র্কের যে অবস্থা,তাতে দেশে গেলে এই করোনা ভাইরাস থেকে সে বেঁচে যাবে! সে যাবার সময়ে হয়ত আমাকে বলে যেতে চেয়েছে কিন্তু শীলু ভাবি আসতে দেয়নি! "দেশে ভ্যাকসিন কী আরও কিছুদিন আগে আবিষ্কার করতে পারত না!" কথাটা ভাবতেই বুকের বাম পাশটা ভীষণ ভারি হয়ে বুকে চেপে বসছে।

জামিল ভাই যত কষ্টে কবিতা লিখেছে তারথেকেও নিশ্চয় প্রতিটা শব্দ পাঠে বেশি কষ্ট পাচ্ছে ! পুরো কবিতাটা আমার মাথায় না ঢুকলেও শেষের কয়টা লাইন সমস্ত শরীরকে শিথিল করে দেবার জন্য যথেষ্ট! আশেপাশে অভাবগ্রস্ত মানুষ রেখে কীভাবে আমরা নিজেদেরকে বিলাসিতার চাদরে ঢেকে আনন্দোৎসব করি? আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বরফের মত কঠিন হয়েছিলাম গত কয়েকটা মাস-আজ শীলু ভাবিকে দেখে সে বরফ গলতে শুরু করেছে। ঝাপসা হয়ে আসে চারদিক! সমস্ত ভাবনাকে পণ্ড করে দিলো একটা ভাবনাই-"হাঁয় মৃত্যু! কত ভয় পাই তোকে! অথচ তুই ঠিকই সাথে সাথে ঘুরে বেড়াস! আর তোকে ভয় করে স্বার্থপর হবো না! কেউ যেন না হয় সেই কামনা সব সময় করে যাবো! অনাহারী মানুষকে এড়িয়ে এভাবে কেউ যেন একা ভালো থেকে আনন্দ না করে। ইনশাআল্লাহ সবাই মিলেই এই সময়টাকে জোয় করব!" কথাগুলো ভাবতেই একটা বাতাস আমাকে জড়িয়ে ধরলো! মনে হল খালাম্মা আমার আশেপাশেই আছে!

থরথর করে কেঁপে "ফুউউস" করে নিঃশ্বাস ছেড়ে ডুকরে কেঁদে উঠলাম! কেউ একজন আমাকে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিলো।