পিতার সব ভালোবাসা তুচ্ছ হয়ে যায়,তাঁর একটা জোরালো ধমকে। কিন্তু পিতা যখন বুঝতে পারে সে যে ভাবমূর্তি সন্তানের কাছে তৈরি করেছে। তাতে সন্তান তাঁর কাছ থেকে অনেক খানি দূরে সরে যাচ্ছে। পিতার সাথে সন্তানের সম্পর্কটা হওয়া উচিত বন্ধুত্বপূর্ণ। সন্তানকে শাসন দিয়ে নয়। বরং আদর দিয়েই শিক্ষা দিলে সন্তানের শেখার ইচ্ছা প্রগাঢ় হয়। তাইবলে যে সন্তানকে একেবারেই শাসন করা যাবে না তাও কিন্তু না। শাসনটাও হওয়া চাই আদর দিয়েই। একজন সন্তান প্রকৃতির সাথে বাবাদের স্বভাবের অনেক মিল খুঁজে পায়। বাবা যখন শাসন করেন-তখন গ্রীষ্মের মত আগুন ঝরা গরম উত্তাপ। আবার যখন আদর করেন-যেন বসন্তের পরশ মাখিয়ে দেন। আবার যখন কোন কারণে বকাবকি করেন -তখন যেন দুচোখে ঝরঝর বর্ষা ঝরে! সন্তান যেন একজন পিতার মাঝে প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। বাবারা এমনই হয়।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ১১১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - বাবারা এমনই হয় (জুন ২০১৯)

প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি
বাবারা এমনই হয়

সংখ্যা

সেলিনা ইসলাম

comment ২  favorite ০  import_contacts ৭৩
আমাদের ভাইবোনের বয়সের মাঝে প্রায় চার পাঁচ বছরের ব্যবধান। আমি সবার ছোট। আমার বয়স তখন ছয় সাত বছর হবে। সেই তখনকার একটা ঘটনা। এই ঘটনাগুলো জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার চেয়ে যেন একটু বেশিই মধুর। তাই হয়ত হাজারও স্মৃতির মলাটে বুকের মাঝে চাপা থেকেও জ্বলজ্বল করে আলো ছড়ায়। ব্যস্ত জীবনের অলস সময়ে অতীতের সময়গুলোতে ফিরে যেতে ভীষণ ইচ্ছে হয়। মনের অলিন্দে বসে ইচ্ছে ডানায় ভর করে আজও তাই,উড়ে যাই সেই সোনালি দিনগুলোতে...

আমাদের বাসায় ভাতঘুম ছিল মায়ের বেঁধে দেয়া রেওয়াজের মাঝে প্রধান একটি। যা সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি। কারণটা হল আব্বা নিজে এই সময়টাতে বিশ্রাম নেন। তাই বলে যে ঘুমাতেই হবে এমন কিন্তু নয়। ঘুম না এলে বা ঘুমাতে না চাইলে,খুব নীরবে হাতের লেখা বা হোমওয়ার্ক করতে পারো। চাইলে চুপচাপ পুতুল খেলতে পারো। মোটকথা কোন শব্দ ছাড়া আর সবকিছুই করা যাবে। আর তাই এই সময়টায় মা নিজে আমাদেরকে কাছে কাছে রাখতেন। যেন কোন ধরণের কোন শব্দ করে আব্বার বিশ্রামটুকু নষ্ট না হয়ে যায়।

আব্বা ছিলেন ভীষণ রাগী। একেবারে বলা যায় মিলিটারিদের মত মেজাজ। সত্যি বলতে মিলিটারিদের মেজাজ কেমন হয় তা আমার জানা নেই! তবে তাদের মেজাজ মর্জি সম্পর্কে যতটুকু শুনেছি, তাতেই গলা শুকিয়ে খড়খড়ে কাঠ! মাঝে মাঝে মাকে আমার বোনেরা বলত "মা আব্বা কী মিলিটারিতে ছিল?" মা হাসতেন। আমাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি বকা খেয়েছে আমাদের একমাত্র ভাই। আমাকে আব্বা কোনদিনই বকা দেন নি। কারণ বকা খাবার মত কোন কাজ তখনও করিনি। আমাদেরকে মা-ই সব সময় বলতেন- "এইটা করবা না,তোমার আব্বা কিন্তু মেরে তক্তা বানিয়ে দেবে!" আবার বলতেন- "অমক অমক জায়গায় যাবা না।তোমার আব্বা জানলে খবর করে দেবে! চামড়া তুলে লবণ দিয়ে দেবে!" আব্বা আরও কত কী যে করবে সেসবও বলতেন।মোটকথা আব্বা অপছন্দ করে এমন কিছুই করা যাবে না। আব্বা না ডাকলে কেউ ধারে কাছে আসতে পারবে না। মায়ের এইসব কথায় আমরা ভীষণ ভয়ে ভয়ে থাকতাম। আব্বা ঘরে যতক্ষণ থাকতেন-আমাদের বাসায় একটা পিন পতনের শব্দ হত না! কারো হাসি আসলেও হাসত না! আব্বা বাইরে থেকে যতবার ঘরে ফিরতেন-ততবার বাড়ির কাছাকাছি এসে বা উঠানে এসে খুব জোরে কাশি দিতেন। এই কাশি দেবার আগে এতো জোরে গলা খাঁকারি দিতেন যে,তা শুনেই যে যেখানেই থাকুক সে আত্মীয় স্বজন যেই হোক অথবা আমরা ভাইবোন! একমাত্র মা ছাড়া সবাই যে যেদিকে পারত ছুটে আড়ালে চলে যেত। মা নিজের ঘোমটা ঠিক করে নিতেন। আব্বার সামনাসামনি কেউ পড়তে চাইত না। মা নিজেই বেড়াতে আসা মেহমানদের কথা আব্বাকে জানাতেন। মায়ের কণ্ঠও ছিল সেইরকম মিহি! কেমন আস্তে আস্তে কথা বলতেন! মা আসলে আব্বাকে অনেক বেশিই সম্মান দিতেন।

মাকে কোনদিন আব্বার সাথে উঁচু স্বরে এবং তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে আমরা দেখিনি! আব্বাকেও "এই এইটা হয়নি কেন! ঐটা করনি কেন? তরকারিতে লবণ কম কেন? ঝাল কী বাসায় আর আছে না সবটুকু তরকারিতে দিয়ে দিয়েছ! ভাত কেন আজকে এতো জাউ জাউ রান্না করছ? কাজের সময়ে মন কই ছিল?" ইত্যাদি মায়ের এমন কোন দোষ ধরতেও দেখিনি! কোনদিন চড়া কণ্ঠে হুকুম করে কথা বলতে শুনিনি! দেখিনি তাঁদেরকে কোন দিন ঝগড়া করতেও। সত্যি বলতে বাবা মা যে ঝগড়া করে এইটাই জানতাম না। যদি কখনো মেহমান এসেছে বাসায়। আব্বাকে সব সময় দেখেছি বিশ্রাম না নিয়েই আগে আত্মীয় স্বজনদের সাথে তিনি নিজে গিয়ে দেখা করতেন। আব্বার যুক্তি ছিল "আমার বাড়িতে এসেছে মেহমান। আমারই তাঁদের খোঁজ খবর করা দরকার।" পুরুষ আত্মীয়দের নিয়ে বাবা খেতে বসতেন। কিন্তু খাবার সময়ে কাউকেই কথা বলতে দিতেন না। নিজেও কোন কথা বলতেন না। শুধু মাঝে মাঝে চোখের ইশারায় ভাইকে কারো কারো প্লেটে খাবার তুলে দিতে বলতেন। যদিও পর্দার আড়াল থেকে মা সার্চলাইটের মত দুইটা চোখ নিয়ে দেখতেন সব ঠিক আছে কিনা। মহিলা আত্মীয়সহ তাঁদের বাচ্চাদের নিয়ে মা এবং আমরা বোনেরা খেতে বসতাম। আব্বাকে কোনদিন দেখিনি কোন আত্মীয় স্বজন সামনে পড়লে খারাপ ব্যবহার করেছেন। আসলে আব্বার কাশি শুনে আমাদের সবার হুড়াহুড়ি দেখে স্বজনরাও ছুটে আড়ালে চলে যেত! বিশেষ করে মেয়েরা। এই অভ্যাস সবার হয়ে গিয়েছিল। এটাকে আমরা ভাইবোন আব্বাকে ভয় করা ভাবলেও,অন্যরা বলত বাড়ির বড়কে সম্মান দেয়া।

যাইহোক, এবার ঘটনাটা বলি-কথায় আছে "যেখানে গেলে বাঘের ভয় সেইখানেতে রাত পোহায়!"তো একদিন আমাদের বাসায় এমনই এক ঘটনা ঘটে গেল। ভাইবোন খাওয়া শেষ করে বারান্দায় চৌকিতে বসে আব্বা মিলিটারিতে ছিল? নাকি ছিল না এই নিয়ে তর্ক! সবাই তর্কের মাঝে এতোটাই মনোনিবেশ করেছি যে সেদিন আব্বার কাশি কেউ শুনতে পায়নি। মাকে একই প্রশ্ন করে করে বিরক্ত করছে আরেকজন-
-"মা আব্বা কী মিলিটারিতে ছিল?"এই প্রশ্ন করে মেজোবোন পিছন ফিরতেই "হাঁ" হয়ে গেল! একেবারে নড়াচড়া করতে ভুলে গেছে। মনে হল তার পায়ে শিকড় গজিয়ে মেঝে ভেদ করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক মজবুত ঢালাই দিয়ে কেউ বেঁধে দিয়েছে! ভয়ে তার চোখ দুটো কোটর থেকে বের হয়ে এই বুঝি মেঝেতে "টুঅং টুঅং"করে লাফাতে লাফাতে নিজের ঘোরে ঢুকবে! কারণ পিছনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং আব্বা। অথচ এই একটু আগেই মেজোবোন আমাদের অন্য ভাইবোনকে বড়াই করে বলেছে "আমি আব্বাকে ভয় পাই না! এই জন্য আব্বা আমাকে অনেক আদর করে। আর তোরা ভয় পাস বলে আব্বা তোদেরকে আদরও করে না হিঃ হিঃ!"এভাবেই মজা নিয়েছে।
-"এখন কোথায় যাবা বাছাধন পিতলার ঘুঘু!" মনে মনে কথাটা বললাম। ভয়ে মায়ের একেবারে আঁচল ঘেঁষে কাপড়ের আড়ালে চলে গেলাম! ততক্ষণে ভাই বড়বু সবাই ফুড়ুৎ...! যে যেখানে পারে ছুটে পালিয়েছে! কাঁপতে কাঁপতে মনে মনে "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনায যোয়ালেমিন!" পড়তে লাগলাম। আল্লা এইবার রক্ষা কর। কালকেই পাঁচজন ভিক্ষুককে নিজে হাতে ভিক্ষা দেব! দোয়া ইউনুস পড়েই যাচ্ছি! কারণ বকা খেলে সবাই খাবে। শাস্তি পেলে চারজনকেই সাঁজা দেবে! আব্বা দেখেছে সবাই এখানেই ছিল! নিশ্চয় তিনি কোন অজুহাত শুনবেন না। কিন্তু আব্বা দেখি কিছুই বলছে না! ঝড় আসার আগে যেমন আকাশ ঘন মেঘ করে,বাতাস থমকে দেয়! সেই সময়ে পরিস্থিতিটা ছিল ঠিক তেমনি থমথমে! বুঝে নিলাম এখনই আব্বার গর্জন শোনা যাবে। হঠাৎ মা বললেন-"কীরে মেঘা দাঁড়িয়ে রইলি কেন? যা তোর বুবু ডাকছে!" মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকা মেঘা মায়ের কথায় যেন সংবিৎ ফিরে পেলো। এক ছুটে চলে গেল পাশের ঘরে। আব্বা এবার ডাকলেন "মেঘা...!" মায়ের কড়া হুকুম "একবারের বেশি যেন কোনদিন কাউকে ডাকা না লাগে!" কী হতে যাচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছি না। আব্বার হাতে দেখি বেশ বড় একটা চটের ব্যাগ! "ব্যাগে নিশ্চয় লাঠি লুকানো আছে!" মায়ের আচল ধরে তাঁর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছি। আমি যেন তাঁর হৃদয়ের "ধাক ধাক" ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছি।যে ঝড়ের বেগে মেঘা ছুটে গিয়েছিল। সেই বেগে আর ফিরে আসছে না! সময় যত গড়িয়ে যাচ্ছে নিজেই ভয়ে হাই তুলছি! না জানি কত ঘুম পাচ্ছে। নড়ারও শক্তি নেই। আস্তে করে পা টিপে টিপে চৌকিতে উঠে বালিশে মাথা দিয়ে চোখ বুজে পড়ে রইলাম। মনে মনে বললাম-"মেঘা আজকে কম করেও একশো পাতা হাতের লেখার সাঁজা পাবে! বাব্বা আমি কিছু করিনি!" মাঝে মাঝে চোখ পিটপিট করে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করছি।

ঘর থেকে মেঘা না,বের হয়ে এলো একমাত্র ভাই রফি! আব্বা বললেন- "যাক নবাবজাদা দেখি ঘরেই আছেন। ভাবলাম আপনি ঘরে নাই!" ভাই কিছুই বলল না। মা চোখের ইশারা দিয়ে ভাইকে ভিতরে যেতে বললেন। ভাই দেখি আরও এগিয়ে আব্বার কাছে গেলেন। ব্যাগটা হাতে নিতেই আব্বা বললেন-"না না ধরবে না।" আমি শিওর হয়ে গেলাম আব্বা লাঠি নিয়ে আসছে। স্লো মশানে হেঁটে সামনে এলো মেঘা। আমার চোখে চোখ পড়তেই আমি চোখ খুলে "ফিক" করে হেসে দিলাম! যার অর্থ "এখন বুঝবা টুনটুনি কেমন লাগে!" সে-ও দেখি অর্ধেক জিভ বের করে হাত উঁচু করে আমাকে চড় দেখায়। আব্বা মেঘার দিকে তাকিয়ে বললেন-
-"হ্যাঁ বল তোমার মাকে কী জিজ্ঞাসা করছিলে?" মেঘা তোতলাতে লাগল! বলল-
-"ইয়ে আব্বা মানে!" আব্বা এবার একটু জোরেই বললেন-
-"সত্য বলতে ভয় পাচ্ছ কেন ?" আব্বার এই জোরে কথা বলাটাও আমাদের কাছে ধমক মনে হয়। মেঘা ঢোক গিলছে শুধু। তারপর বলল-
- "না মানে আমার ক্লাসের স্যার যার যার আব্বাকে নিয়ে রচনা লিখতে বলেছে। তাই মাকে জিজ্ঞাসা করছিলাম...!" এইটুকু শুনে আব্বা মিটিমিটি হাসলেন। এই হাসির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। এতে যেন ভয়টা আরও বেড়ে যায়! এর অর্থ হল আব্বা মিথ্যেটা ধরে ফেলেছে! "দ্বিধা...!" আব্বা বড়বোনকেও ডাক দিলেন। এতক্ষণ দরজার আড়ালে ছিল দ্বিধা। আব্বা ডাকতেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাইরে এলো। আজ আব্বা দ্বিধা,মেঘাকে কেন ডাকলেন বুঝতেছি না। তা দেখে আমি আর নেই। গভীর ঘুমে গাঢ় নিঃশ্বাস নিয়ে নাক ডাকছি! আব্বা দ্বিধাকে একটা ঝুড়ি আনতে বললেন। ঝুড়ির ভিতর চটের ব্যাগে যা আছে তাই বের করতে বললেন। রফি মেঘা আর দ্বিধা মিলে একে একে বের করল আম,লিচু আর জামরুল। আব্বা বললেন-"মেঘা মিথ্যে বলে তাই ওকে সব ফল থেকে একটা করে কম দেবে!"এতে সবাই খুশি হলেও মেঘা খুশি হতে পারলো না। আব্বা মেঘার মাথার চুলে হাত দিয়ে নেড়ে চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। মৃদ্যু ধমক দিয়ে বলল-
-"আর মিথ্যে বলবে না ঠিক আছে?" মেঘা মাথা বামদিকে কাঁত করে "হ্যাঁ"সম্মতি দিল। মুখে বলল-
-"ঠিক আছে!" আব্বা এবার বলে উঠলো-
-"তারমানে তুমি মিথ্যে বলেছো?" মেঘা হাত উঁচু করে দুটো আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলে-
-"এই এট্টু!" আব্বা হেসে ভিতরে গেলেন। মা নিজে হাতে আমাদের সবাইকে জ্যৈষ্ঠ মাসের মিষ্টি ফলগুলি ধুয়ে খেতে দিলেন।

এরপর আব্বা খাওয়া শেষ করে ভাতঘুম দিলেন। মেঘা ক্লাসের বইয়ের আড়ালে গল্পের বই পড়ছে। এইটা আমি জানি। একটু বড় হতেই এই চালাকিটা আমিও শিখে গিয়েছিলাম ওর কাছ থেকে। মা অথবা আব্বা যদি দেখে গল্প বই পড়ছে? মা একটা থাপ্পড় দিয়ে বই কেড়ে নিয়ে ওখানেই শেষ করবেন। কিন্তু আব্বা! তিনি কম করে হলেও আধা ঘণ্টা রোদে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবে! তারপর কম করে হলেও কুড়ি পাতা "আমি এঁর গল্পের বই পরব না!" লিখতে হবে। তাঁদের ধারণা একবার গল্প বই পড়ার নেশা হয়ে গেলে ক্লাসের পড়ার প্রতি আর আগ্রহ থাকবে না। গল্পের বই পড়ে ছেলে মেয়ে বাড়তি অনেক খারাপ কিছু জেনে যায়। যদিও তাঁদের সে ধারণা অনেকটাই সত্যি হতে দেখেছি মেঘার বেলায়। সে নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে এক একটা বই পড়ে শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্যকোন দিকে খেয়াল দিত না। এভাবেই ও ম্যাগাজিন আর গল্পের বই পড়ে। আর আমাদের মা দেখছে "আহা মেয়ে আমার কত লেখাপড়া করছে!" মা চুপচাপ বসে একটা নকশি কাঁথায় ফুল তুলছে। আশেপাশে রফির খেলার সঙ্গীরা উঁকিঝুঁকি মারছে। "কুউউহু! কুউউহু!" করে কোকিলও ডেকেছে কয়েকবার। সবই ওর বন্ধুরা করছে। আম্মা বললেন-"কীরে জ্যৈষ্ঠ মাসেও আজকাল কোকিল ডাকে?"সবাই দম বন্ধ করে কিছুক্ষণ হেসে নিলো।
মাঝে মাঝে তো কুকুর বিড়ালের ডাকও বেড়ে যায়! মনে পড়লো একবার আব্বার ঘুম ভেঙ্গে গেলে বারান্দায় এসে চেয়ারে বসে বলেছিল-"আজকাল বাড়ির আশে পাশে কুকুর বিড়াল একটু বেশিই ডাকাডাকি শুরু করছে!" কথাটা বলেই ভাইয়ের দিকে তাকালো। আমরাও ভাইয়ের দিকে তাকালাম। আব্বা আবার বললেন "কীরে রফি তুই বাইন মাছের মত মোড়াচ্ছিস কেন?" ও আসলে ভয়ে ছিল না জানি আব্বা আজকে ওকে আচ্ছা করে বকে দেবে। বন্ধুরা আশে পাশেই আছে। ওরা সবকিছু শুনছে বাঁ নজরে রাখছে। ওকে ওরা ভীষণ খোঁচা দিয়ে কথা বলে। আজ আবার কোকিলের ডাক শুনে আব্বার ঘুম না ভেঙে যায়! কথাটা ভাবতে ভাবতে তাকিয়ে দেখি রফি একটু পরপর দুহাত তুলে আকাশের দিকে মুখ করে বিড়বিড় করে বলছে -
"হে আল্লা আসরের আযান দাও!" মা খুশিতে বাকবাকুম। ফিসফিস করে বললেন-
-"কেন বাবা? আব্বার সাথে নামাজ পড়তে মসজিদে যাবা?"
-'মা তোমার ছেলেকে এই বুঝেছো? আসরের আযান দিলে আব্বা উঠে বের হয়ে যাবে মসজিদে। আর উনি যাবেন মাঠে খেলতে! এইজন্য তার এই মোনাজাত!' মনে মনে কথাটা বলতে বলতে উঠে বসলাম। ভাই বুঝতে পারলো আমি কী বীরত্ব দেখাতে চাইছি! সে বলে উঠলো-
-"চুপ মীর জাফর! মুখ খুললে আমিও আব্বাকে বলে দেব তুই কী করেছিস!" মীর জাফর! ইতিহাসে বেঈমানের খাতায় যে কজন বিশ্বাস ঘাতকের নাম স্বর্ণাক্ষরে জ্বলজ্বল করছে মীর জাফর তাদের মাঝে একজন! যিনি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সাথে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নিয়েও চরম বেঈমানি করেছিলেন। আমরা ভাইবোন প্রায়ই আব্বার কাছে ইতিহাসের নানা ধরণের কাহিনী শুনতাম। এই কাহিনী আব্বা দুদিন আগে শুনিয়েছে। কিন্তু আমি কিছুই বুঝিনি। ইতিহাস সহজে মাথায় ঢুকে না! আব্বা কাহিনী শেষ করে যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল "এতক্ষণ যা বললাম তাকি তুমি বুঝেছো?" আমি না বুঝেও মাথা একদিকে কাত করে "হ্যাঁ" সম্মতি দিয়েছিলাম। আব্বা চলে যেতেই ভাই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল-

-"বল তো মীরজাফর কে?" সামনে বেত হাতে ভাইকে তখন ক্লাস ওয়ানের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বদরাগি সুমিত স্যারকে দেখতে পেলাম! কিন্তু একটু পর দেখি চেহারাটা একদম আব্বার মত! আমি আমতা আমতা করছি। অমনি খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে দিয়ে ভাই বলে-"তুই আব্বাকে মিথ্যে বললি কেন? আমি আব্বাকে বলে দিচ্ছি...!" ব্যস্ত হয়ে বললাম-
-"আমি কিন্তু আব্বাকে মুখে কিছু বলি নাই!"
-"তুই বেঈমান মিথ্যেবাদী! শুধু মিথ্যে বলিস।"এইজন্য ভাই আমাকে মীরজাফর নাম দিয়েছে। মীর জাফর আর রাজাকার-এই দুটো শব্দ বললে মাথায় আগুণ উঠে যায়! আব্বা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রাজাকারেরা কীভাবে মেলিটারিদের সহযোগিতা করেছে। কীভাবে আমাদের মহল্লার হিন্দুদের বাড়িগুলো নিজেদের করে নিয়েছেন। কীভাবে মিলিটারিদের ক্যাম্পে মানুষের গরু ছাগল হাস মুরগি জড় করে নিয়ে খাইয়েছেন! অথচ এই রাজাকারেরা যদি মিলিটারিদের সহযোগিতা না করত,তাহলে নয় মাসের যুদ্ধ আরও আগেই শেষ হয়ে যেত। বেঁচে যেত আরও কিছু বীরবাঙালি। নারীর মর্যাদাও রক্ষা পেত। ভাই আমাকে কিনা সেইসব পাষণ্ড স্বার্থপর রাজাকারদের সাথে তুলনা করছে! রাগে মনে হচ্ছে ভাইয়ের মাথার চুল টেনে সব ছিঁড়ে দেই! ছোট হলে হবে কী? এতো রাগের মাঝে ভুলিনি যে আব্বা বাসায় এবং ঘুম। ভুলিনি আব্বা পাশের রুমে আছে। আর তাই মৃদ্যু রাগ দেখিয়ে ভাইয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে একটা মুখ ঝামটি দিয়ে বললাম-"তুই মীরজাফর,তুই রাজাকার!"

রফি কিন্তু বেমালুম ভুলে গেছে আব্বা বাসায় আছে! একদিকে বন্ধুরা ডাকছে। আরেকদিকে আমাকে বিরক্ত করছে! আর তাই আমার কথা শেষ হতেই অমনি হাতে তুলে নিলো নারিকেলের ডগা আর দড়ি দিয়ে বানানো রাইফেল। যা দিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ খেলা করতাম। আব্বা নিজেই কীভাবে মুক্তিসেনাদের বন্দুক চালানোর ট্রেনিং দিয়েছিল! কেমন করে রাজাকারেরা আব্বাকে ধরে আটকিয়ে রেখেছিল। এবং তাঁর মুক্তিসেনা বন্ধুরা কীভাবে রীতিমত গুলাগুলি করে তাঁকে ছাড়িয়ে এনেছিল! সেসব গল্পও আব্বার কাছেই শুনেছি। রফি ঠিক মুক্তি সেনাদের মত মাথায় গামছা বেঁধে চৌকির উপর লাফ দিয়ে উঠে! চৌকি "কচমচ ক,কচমচ ক!"শব্দ তোলে! রফি লেফট রাইট,লেফট রাইট মার্চ করার মত দুই পা "ধাপ ধাপ" শব্দ করে আমার দিকে রাইফেল তাক করে! মুখে "ঠা ঠা"শব্দ করে আমাকে গুলি করতে লাগল। সেই দিকে তাকিয়ে আমি মরে গেছি এমন করে শুয়ে পড়লাম। মা এমন আকস্মিক ঘটনায় কিছু বলার আগেই রফি খিঁচে দিল ভোঁ দৌড়...! কিছু বুঝার আগেই "ঠাস" করে একটা শব্দ। আমার বাম গালটা মরিচ লাগার মত জ্বলে উঠলো! চোখের ভিতর ঝিলিক মেরে আগুণের ফুলকি দেখতে পেলাম। মাথাটা চক্কর দিচ্ছে! কী হল? বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় নিলো তারপর "ভ্যাএএএ..." করে বেশ জোরে কেঁদে ফেললাম। আম্মা সাথে সাথে হাতের সেলাই ফেলে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আস্তে করে আব্বাকে বললেন- "ওকে কেন মারলেন? শব্দ তো আপনার ছেলে করছিল!"এই প্রথম আব্বা আমাকে মেরেছেন। চোখে যেন সাতটা সমুদ্র তৈরি হয়েছে। কারো চড়ে এতোটা ব্যথা লাগতে পারে? কোনদিন ভাবতে পারিনি। কিছুক্ষণ যেতেই আমার গায়ে জ্বর উঠে গেছে!

আজ রফির ভাগ্যে কী আছে তাই ভেবে আমরা ভয়ে ভিতরে ভীতরে কাঁপছি! আব্বাকে দেখলাম পায়চারি করতে। নিজেই নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আরেক হাতের তালুতে "ধাম ধাম" করে মারছে! একবার ঘরে একবার বারান্দায় এসে হাঁটাহাঁটি করছেন। আমি মায়ের কোলে শুয়ে শাড়ির ভীতর থেকে সেসব দেখছি। মনের ভিতর কেন জানিনা আব্বার প্রতি ভীষণ রাগ জন্মালো! জীবনে কোনদিন আর আব্বার কাছে যাব না। আব্বার গল্প শুনব না। এইসব ভেবে মনে মনে রাগ দেখালাম। আবার ভীষণ ভয়ও লাগছে ভেবে আব্বার ভালোবাসা আদর থেকে আমি বঞ্চিত হব! নিশ্চয় আব্বা আর কোনদিন আমাকে আদর করবে না,কাছে ডাকবে না! দেখি কেন জানি আব্বা ভীষণ ছটফট করছেন।

সেদিন সন্ধ্যার পর লোড শেডিং হতেই সবাই বারান্দার সেই চৌকিতে গিয়ে বসলাম। আকাশে পূর্ণ চাঁদ! জ্যোৎস্নার আলোয় ভেসে যাচ্ছে বাড়ির উঠোন,পেয়ারা গাছ! গাছের কাছে এসে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়ালো! আমরা সবাই একসাথে বারান্দার চৌকিতে কেউ শুয়ে কেউ বসে আছে। ধুঁয়া উড়ে যাবার মত মেঘ উড়ে উড়ে চাঁদকে মাঝে মাঝেই আড়াল করছে! আমি মায়ের কোলে মাথা রেখে আকাশের চাঁদ দেখছি। "আমি স্বপ্নে দেখলাম মধুবালার মুখ রে!" মা গীত গেয়ে গেয়ে "মধুবালা"গল্প শুনাচ্ছেন।এমন সময় দ্বিধা ছায়ামূর্তিকে দেখে বলে উঠে-কে অখানে? অমনি কারেন্ট চলে আসে! সবাই তাকিয়ে দেখি আব্বা...! এই সময়ে! তিনি হঠাৎ-ই এলেন। কোন কাশিও দিলেন না। সাধারণত এই সময়ে কখনো বাসায়ও আসেন না। আব্বাকে দেখে সবাই একেবারের পাঁথরের মত হয়ে গেলাম। রফির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে! সে ততক্ষণে চৌকির নিচে লুকিয়ে গেছে! মেঘা আর দ্বিধা সবাই ছুটে আড়ালে যেতে চাইল। আব্বা বললেন-"কেউ যাবে না,সবাই থাকো।" আব্বা সোজা এসে আমাকে কোলে নিলেন। একটা গ্লাসে করে মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে পানি পড়া এনেছেন। "আভা মামনি এদিকে আসো!" আমাকে কাছে টেনে নিলেন। নিজে হাতে পানি খাইয়ে দিলেন! বড় একটা প্যাকেট আমার হাতে রেখে,কপালে চুমু দিয়ে বললেন-"সবাইকে নিয়ে ভাগ করে খাও মা!" মউ মউ শিঙ্গাড়া আর মোগলাইয়ের ঘ্রাণে ভেসে যাচ্ছে বাতাস। ভাইকে কান ধরে টেনে চৌকির নিচ থেকে বের করলেন। বললেন-
-"কী রে লেখাপড়া নাই? গায়ে রক্ত কি বেশি হয়ে গেছে যে মশারে খাওয়াতে চৌকির নিচে গেছিস?"
-"আ...আ...আব্বা ব্যথা পাচ্ছি তো!"রফি ককিয়ে উঠল। আব্বা কান ছেড়ে দিয়ে বললেন-
-"দুষ্টুমিতে তো চ্যাম্পিয়ান! তা লেখাপড়া নাই...? যাও পড়তে বসো। আজকে যা যা করছ এই নিয়ে দশ পৃষ্ঠা লিখে দেখাও!" রফি কান ডলতে ডলতে বিড়বিড় করে কীসব বলে ঘরের ভিতরে চলে গেল।

আব্বা এবার মায়ের দিকে ফিরে বললেন-"রাহি আমাকে নিয়ে বাচ্চাদের আর ভয় দেখিও না। আমার বাচ্চারা আমার কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। ওরা মনে করে আমি ওদেরকে ভালোবাসি না। শুধু শাসন করি। কিন্তু আমি ওদের শাসন করি যতটা,ভালোবাসি তার থেকে অনেক বেশি। সেইটা ওরা বুঝতেছে না। ভয় নিয়েই আছে!"
-"আপনি এভাবে কেন দেখছেন?" মা মিনমিন করে কথাটা বলে। আব্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন-
-"একবার ভেবে দেখেছো? মেয়ে কতটা ভয় পেয়েছে? আমার একটা চড়ে মেয়ের গায়ে জ্বর এসে গেছে! আমি এত পরিশ্রম করি ওদের জন্য। অথচ ওরা কী কষ্ট করছে? এই আমার জন্য নিঃশ্বাস...উফঃ একবার ভাবো! আমি যতক্ষণ বাসায় থাকছি ওরা নিজেদের দম বন্ধ করে যার যার মত করে থাকছে! আমি বাসায় না থাকলেই যেন ওরা অনেক ভালো থাকে,আনন্দে থাকে! ওদের যেন নিজেদের বাসায়ই কোন স্বাধীনতা নেই! এ কেমন কথা? আমি চাই না ওরা আমাকে ভয় পাক। আমি চাই ওরা আমাকে ভালবাসুক,সম্মান করে আমার কথা মেনে চলুক!" অল্পভাষী গম্ভীর আচ্ছাদনে থাকা মানুষটাকে এভাবে কোনদিন এতোগুলো কথা বলতে আমরা শুনিনি! আমার কষ্ট আব্বাকে অনেকখানি ছুঁয়ে গেছে। এই প্রথম অন্যরকম একজন আব্বাকে দেখতে পেলাম। আব্বাকে আমাকে তাঁর বুকের সাথে আঁকড়ে ধরলেন। বললেন-"আমাকে ভয় পাবে না ঠিক আছে মা?"কথাটা বলে কপালে চুমু দিতেই যেন আমি ঝরনার মত খলখলিয়ে হাসতে লাগলাম। আমার এমন হাসি বোধহয় আব্বা এই প্রথম দেখছেন।আমাকে বললেন "মা ছেলেকে আদর করে দাও!" বলে নিজের কপাল বাড়িয়ে ধরলেন। আমিও খুশিতে আব্বার কপালে আদর করে দিতেই দেখি আব্বার চোখ ছলছল করছে! এই প্রথম দেখতে পেলাম শক্ত বরফে মোড়া হিমালয় সন্তানের পরম ছোঁয়ায় দ্রবীভূত হচ্ছে। "আপনিই তো ছেলে মেয়েকে বকাঝকা করেন! কেমন গম্ভীর হয়ে থাকেন। ওয়ান থেকে চুন খসলেই হাতে লাঠি তুলে নেন! এঁর এখন সব দোষ আমার উপর চাপিয়ে দিলেন!" মা ইচ্ছা করলে এভাবে আব্বাকে বলতে পারতেন। কিন্তু তিনি-ও বেশ অবাক হলেন আব্বার এই পরিবর্তনে! বুদ্ধিমতী নারীর মতই চুপ করে রইলেন। আর কিছুই বললেন না।

তারপর থেকে আব্বা আমাকে আর কোনদিন মার তো দূরে থাক,বকাও দেয়নি। ভাইবোনের মাঝে সবচেয়ে আমিই আব্বাকে বেশি ভয় পেতাম। আর সেই আমাকেই ভয় কাটাবার জন্য আব্বা বেশি বেশি সময় দিতে লাগলেন। অন্যায় করলে বুঝিয়ে বলতেন। আদর দিয়ে ভুল ধরিয়ে সঠিকটা শিখিয়ে দিতেন। আগে যেইটা ভয়ে ভয়ে শিখতে গিয়ে ভুলে যেতাম। আব্বা আদর দিয়ে বুঝিয়ে দিলে,সেই একই পড়া বুঝতে অনেক সহজ হয়ে যেত। না বুঝলেও সত্যটাই বলতাম যে, না আব্বা বুঝিনি। মেঘাও আর কোনদিন মিথ্যে বলেনি। জানে আব্বা ধরে ফেলবে। আব্বা মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে অনেক ঘোরাঘুরি করতেন। হলে গিয়ে ছবি দেখতেন। প্রিয় খাবারগুলো দু'জনে খেতাম। আব্বা তাঁর জীবনের বহু ঘটনা আমার সাথে শেয়ার করে গেছেন।যে আব্বা ছিল আমার কাছে সবচেয়ে আতঙ্কের! সেই আব্বা একসময় হয়ে উঠলেন আমার সবচেয়ে অভয়ারণ্য!

আব্বা যেদিন স্ট্রোক করেছেন সেদিনও জুম্মার নামাজ পড়ে আমাদের জন্য কটকটি,তিলের খাজা,আর বাতাসা এনে দিয়েছিলেন। যা তিনি প্রতি জুম্মার দিনে করতেন। জুম্মারদিনে আব্বাকে আরও একটা কাজ করতে দেখতাম-নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে মহল্লার মুরুব্বীদের সাথে মহল্লার যুবক যুবতি কিশোর কিশোরী কেমন লেখা পড়ছে?কে কী করছে? কারো নজরে কারো ছেলে মেয়েকে খারাপ কিছু পড়েছে কিনা! এসব নিয়ে আলাপ করতেন।অনেক সময় নিজের সন্তানদের খারাপ কিছু নিজেদের নজরে আসে না। কিন্তু প্রতিবেশীর নজরে ঠিকই আসে। যেমন-একবার মিজান সাহেবকে আব্বা জিজ্ঞাসা করলেন-
"কী খবর মিজান সাহেব ছেলের পড়াশুনা কেমন চলছে?"মিজান সাহেব লজ্জায় কিছু না বললেও মুরুব্বীরা বুঝে নিল। তাদের মাঝে কেউ একজন বলল -"আমি তো মিজান সাহেবের ছেলেকে দেখলাম স্কুলের সময়ে সার্কিট হাউজ ময়দানে কতগুলো বাজে ছেলেদের সাথে ক্রিকেট খেলছে!" আরেকজন বলল-"সেদিন দেখলাম টং-এর দোকানের সামনে দাঁড়ায় ধুমছে সিগারেট টানতেছে!"সাথে সাথে সবাই মিলে মিজান সাহেবকে পরামর্শ দিলেন ছেলেকে সঠিক পথে আনার। প্রয়োজনে যত রকম সহযোগিতা তা সবাই করবে বলে আশ্বাস দিলেন। দেখা যেত ঐ সময়ে ছেলেটিকে খারাপ সঙ্গ থেকে সরিয়ে লেখা পড়ায় মনোনিবেশ করাতে গ্রামে মামা অথবা দাদা বাড়িতে পাঠিয়ে দেখা হত।

আব্বাকে দেখেছি মহল্লায় কোন অন্যায় হলে তা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে সাথে সাথে প্রতিবাদ করেছে। এতে করে যে অন্যায় করত সে এঁর কোন অন্যায় কিছু করার সাহস পেত না! দেখেছি কীভাবে নিজেদের মহল্লা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা যায়। কীভাবে ড্রেনগুলো অপরিষ্কার হলে বা মশার ওষুধ দিতে পৌরসভা দেরি করলে কী করতে হবে! তিনি মহল্লার দুই একজনকে সাথে নিয়ে পৌরসভার মেয়র অথবা কমিশনারের কাছে চলে যেতেন। ছোট ছোট নালাগুলো,ড্রেনগুলো নিজেরাই পালাক্রমে পরিষ্কার করতেন। যুবকদেরকে বলতেন পুকুরের শ্যাওলাগুলো পরিষ্কার করতে। তারা আনন্দ নিয়ে সবাই মিলে পরিষ্কার করে মশার বংশ ধ্বংস করে দিতেন। কার পুকুর তা দেখতেন না। এভাবেই নিজেদের মহল্লাকে সুন্দর রেখে প্রতিটা সন্তানকে নিজের সন্তানের মত জেনে তাদেরকে সঠিক পথ দেখাতেন।

মৌসুমের প্রথম ফল,প্রথম ফুল। প্রথম উঠা যে কোন খাবার! প্রথম হওয়া প্রদর্শনী,অথবা মেলায় নিয়ে যাওয়া! এই ছোট ছোট সুখগুলোর সাথে সাথে আব্বা আমাদের সঙ্গ দিতেন। আর সেসব কিছু পেয়ে,আমরা প্রজাপতির মত উড়ে বেড়াতাম। এখন আব্বা নেই...। খুব করে বুঝতে পারি- সন্তান ও পরিবারের জন্য কোন কোন আব্বা হয়তবা ধানভর্তি ধানের গোলা। পুকুর ভর্তি মাছ। গোয়াল ভরা গরু। অথবা ব্যাংকের ভোল্টভরা অর্থ খনি নয়। কিন্তু আব্বা মাথার উপর বিশাল এক বটের ছায়া! একজন সন্তানের জন্য পরম বন্ধু,পথ নির্দেশক,নিটোল প্রশান্তির স্বর্গরাজ্য। যা পৃথিবীতে আর কেউ হয় না,হতে পারে না।

সেই শৈশবে লাগানো বীজটা শত শত দিনের পরেও আজও ফুল ফোঁটায়! সেসব ফুলের সৌরভে বারবার মন ভারি হয়ে আসে। বর্তমান সময়ের "বাবা দিবস" এই কষ্টটা আরও বাড়িয়ে দেয়। আমাদের সময়ে কেন এই দিবস ছিল না? তাহলে কিছু না হোক একটা ছোট্ট ফুল তোলা কাপড়ের রুমাল নিয়ে আব্বাকে উপহার দিতে পারতাম। আর বলতাম"আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি আব্বা!" যা কোনদিন বলা হয়নি! "বাবা দিবস"-এ হৃদয় খুঁড়ে দেখতে গিয়ে আব্বাকে ভীষণভাবে অনুভব করলাম। হাজারো সাংসারিক ঝামেলায় যা মনে হলে সব ক্লান্তি মুছে যায়! অবচেতন মন বার বার বলে উঠে-"ইস আর একবার যদি আব্বাকে পেতাম,ঠিক সেই সময়ের মত করে!" আমার চারপাশ ঘিরে ধরে কস্তূরীর সুবাস! দুচোখ ভরা মহাসমুদ্র নিয়ে হাতদুটো করুণাময়ের কাছে তুলি-'রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সগিরা"-“হে আল্লাহ, তুমি আমাদের পিতামাতার প্রতি সেরকম রহমত কর,যেরকম তারা আমাদের শৈশবে আমাদেরকে করেছেন।”

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement