লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ১১১টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭৪

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উপলব্ধি (এপ্রিল ২০১৬)

লাগল চোখে ভোরের আলো
উপলব্ধি

সংখ্যা

মোট ভোট ২৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭৪

সেলিনা ইসলাম

comment ১৪  favorite ০  import_contacts ৮৯১
দীপ আর দারা সমবয়সী চাচাতো ভাই। দীপ শহরে থেকে পড়াশুনা শেষ করে এখন খুব ভাল একটা চাকুরী করছে। অথচ দারা মাত্র ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে! সে গ্রামে দাদার রেখে যাওয়া সম্পত্তি আগলে রেখে,বাবার সাথে সাথে জমি চাষ করে। কিন্তু ওর বাবা মরে গেলে সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে তার উপর। আর তারই ধারবাহিকতায় প্রতি বছর যে পরিমাণ ফসল সে জমিতে ফলায়? তার অর্ধেক শহরে চাচার বাড়িতে পৌঁছে দেবার দায়িত্বও পালন করে। দাদার রেখে যাওয়া সম্পত্তি দেখাশুনা আর মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে করতে ওর নিজের আর সংসার করা হয়ে উঠেনি। মা অনেকবার বলা স্বত্বেও করি করি করে,বিয়েটা ওর আর করা হয়নি।

গতকাল দারা মাকে নিয়ে শহরে এসেছে। আজ দীপের জন্য মেয়ে দেখা হবে।এবং পছন্দ হলে আংটি পরানো হবে। প্রথম দেখাতেই মেয়েটাকে দীপের অনেক পছন্দ হয়েছে। মেয়ের নাম শুচি। দেখতে বেশ সুন্দরী আর, মনের দিক থেকেও সে অনেক ভাল একটা মেয়ে। শহরে জন্ম নেয়া,লেখাপড়া জানা কোন মেয়ে যে,এতটা আন্তরিক হতে পারে তা দারা'র জানা ছিল না। মেয়েটা প্রথম দিনই ওকে আর ওর মাকে অনেক আপন করে নিয়েছে। শুচিকে প্রথম দেখাতেই মনের মাঝে কেমন যেন করে উঠে দারার। সে মনে মনে ভাবে মাকে বলবে ঠিক এমন একটা মেয়েকে সে জীবন সঙ্গী করতে চায়।

বিয়ের দিন তারিখও ঠিক হয়ে যায়। তাই দারা আর গ্রামে যেতে পারল না। চাচার কড়া আদেশ একেবারে ভাইয়ের বউ ঘরে এনে দিয়ে তারপর গ্রামে যেতে হবে। দশদিনের মধ্যে বিয়ে! দীপ আর শুচি দারাকে সঙ্গে নিয়ে সারা দিন শপিং মলে মলে ঘুরে ঘুরে,পছন্দের কেনাকাটা করে। বাকী সময় দীপ আর শুচি,দুজনে ফোনে হাসা হাসি আর গল্প করে। দারা বুঝে উঠতে পারেনা শপিং করতে কেন ওরা তাকে সাথে সাথে রাখে। দীপের সাথে সামান্য কথা হলেও শুচির সাথে কথা বলতে খুব লজ্জা লাগে তার। কিন্তু মেয়েটা ঠিকই ওকে কথা বলিয়ে ছাড়ে। শুচি বিভিন্ন জিনিষে ওর মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে বেছে বেছে কেনাকাটা করে। দারার একেবারেই মনে হচ্ছে না শহুরে আর গ্রামের মানুষের মাঝে যে বিভেদ সে নিজে মনে করত? তা শুচি বা দীপের মাঝে আছে! তবুও একটা অজানা সংকোচ যেন জোঁকের মত ওর শরীরে লেগে আছে! সারাক্ষণ সেই জোঁক ওকে ঘাবড়ে দিয়ে ঘাম ঝরাচ্ছে!

চাচার আদেশে কিছুটা আনন্দ নিয়েই গায়ে হলুদের আগের দিন ওরা তিনজন মিলে অলংকার কিনতে যায়। কিন্তু সে আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না! কেনাকাটা শেষ করে যখন ওরা ড্রাইভারের জন্য অপেক্ষা করছে ঠিক তখনই! তখনই ঘটে যায় অসম্ভব,অনাকাঙ্ক্ষিত এক দুর্ঘটনা! যে দুর্ঘটনা জীবনের প্রতিটা আনন্দ কেড়ে নিয়ে অন্ধকারে ঢেকে দেয় আলোকিত জীবন।

গাড়ির অপেক্ষায় ওরা তিনজন গল্প করছে আর হাসছে। এতগুলো অলংকার সাথে আছে ভেবে,ড্রাইভারকে ফোন দিয়ে গাড়ি শপিং মার্কেটের সামনে আনতে বলে। ঠিক ওদের থেকে কয়েক হাত দূরেই মার্কেটের তিনজন সিকিউরিটি গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। এর মাঝেই আচমকা চার পাঁচ জন সন্ত্রাসী এসে পিস্তল ধরে গয়নাগুলো কেঁড়ে নিতে চায়। ওরা কোন রকম ঝামেলা না করে সেগুলো দিয়েও দেয়। কিন্তু এতো ভিড়ের মাঝে কপালে অস্ত্র ঠেকিয়ে সবকিছু নিয়ে যেতে যেতে সন্ত্রাসীরা থমকে যায় শুচির দিকে তাকিয়ে! একটা শিকারি জানোয়ার যেমন শিকার সামনে দেখলে নেশাতুর চোখ নিয়ে একহাত জিভ বের করে লালা ঝরায়! ঠিক তেমনি শিকারি জন্তুর মত ওরা ক'জন লোলুপ দৃষ্টি মেলে দেখে শুচিকে। দারা ভেবেছিল যে ওদের বাঁধা হবে দীপ। কিন্তু তা যখন হল না! তখন ওদের বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় সে নিজেই। কিন্তু সে বাঁধাকে তুচ্ছ করে টেনে হিঁচড়ে শুচিকে নিয়ে ওরা ঢুকে যায় একটা দোকানের মাঝে। দারা অবাক বিস্ময়ে দেখে সেই দোকানে কত মানুষ তাদের সবাইকে পিস্তলের নড়াচড়া দেখে বের হয়ে আসে! এমন কী দোকানের মালিক কর্মচারী সবাই! দারা তাকিয়ে দেখে দীপ হাত উঁচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে দর্শকের ভূমিকায়। ওর যে কী হয়! সে পিস্তলের তোয়াক্কা না করে ওদের পিছনে পিছনে দোকানের সামনে আসে! একজনকে ধরেও ফেলে আর ঠিক তখনই একটা বুলেট এসে ওর বাম পাঁশের পেটে লেগে বের হয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে! চোখ দুটো অনেক চেষ্টায়ও আর খুলে রাখতে পারেনা! রাজ্যের ঘুম চোখের পাল্লা দুটো বন্ধ করতে করতে,দেখতে পায় খরখর শব্দ করে দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায়। এক সময় এ্যাম্বুলেন্স এসে দারাকে হসপিটালে নিয়ে যায়। পুলিশ দোকানের ঝাঁপ খুলে শুচিকে মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় পেলেও,অন্য কাউকেই সেখানে পাওয়া যায় না! দেখা যায় দোকানের পিছনের দরজাটা খোলা।

শুচি ভয়ে থরথর করে কেঁপে যায়...! ওকে দেখে মনে হয়-কোন সুন্দর ফুলে ভরা গাছকে প্রচণ্ড ঝড়, তার তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড করে ভেঙে দিয়েছে সব ডালপালা! পুলিশ এবং দর্শনার্থীদের দেখে ভয়ার্ত হরিণীর মত ছটফট করে শুচির দুচোখ! ক্লান্ত দুহাতে উলঙ্গ দেহটাকে যতদূর পারা যায় ঢাকার চেষ্টা করে! পিশাচদের ছুড়ে ফেলা ছেড়া কাপড় দূরে পড়ে আছে! ক্লিক ক্লিক ফ্ল্যাশ লাইটের আলো এসে আতঙ্কিত,দুর্বল চোখে বাড়ে ভয়।
- মা... মাগো...! ছোট্ট বাচ্চা মেয়ের মত ফুঁপিয়ে কাঁদে সে। কেউ একজন এসে একটা ওড়না ওর দিকে ছুড়ে মারে। থরথর করে কেঁপে যায় ভয়ে আতঙ্কিত মেয়েটা। পুলিশ,এম্বুলেন্স,সাংবাদিক আর কৌতূহলী মানুষের ভিড়ে নিজেকে একেবারে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে চায় সে। ব্যথায় ককিয়ে উঠে সারা দেহ। ধরাধরি করে স্ট্রেচারে তুলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে! দুদিন পরে যে মেয়ের হাত মেহেদির রঙে লাল হবে? সেই মেয়ের সারা দেহমন জুড়ে কলঙ্কের দাগ! যে দাগ কেমন করে মুছা যায় তা কারোরই জানা নেই!

দারা'র জ্ঞান ফিরতেই প্রথমেই শুচির কথা জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু কেউ কিছুই বলে না। অস্থির হয়ে উঠে সে। মনে মনে ধরে নেয় শুচি বোধ হয় আর নেই...! মনের জমিনে তোলপাড় তোলে কালবৈশাখী ঝড়! দুদিনে অনেক খানি সুস্থ মনে হয় নিজেকে। আশে পাশে কাউকে না দেখতে পেয়ে ছুটে যায় রিসেপশনে। শুচির কথা জিজ্ঞাসা করতেই সবাই যেন কেমন হয়ে যায়! মুখ টিপে টিপে হাসে। যা দেখে ওর মাথার ভীতরে আগুণ টগবগ করে উঠে! নিজেকে অনেক কষ্টে সংযত করে আবার জিজ্ঞাসা করে। এবার নিজের কথা বলার টোন নিজের কাছেই অপরিচিত লাগে তার! একজন নার্স হাত দিয়ে পাশের কেবিন দেখিয়ে দেয়। দারা ক্ষত জায়গাটা চেপে ধরে ছুটে যায় সেই কেবিনের দিকে। খুব আশা করেছিল দীপ আর শুচিকে একসাথে দেখতে পাবে। মনে মনে ভেবেই রেখেছিল দূর থেকে দেখে সরে আসবে। কিন্তু একী!? জানালা দিয়ে দেখে বিছানায় নিস্তেজ আধশোয়া হয়ে আছে অন্য এক মেয়ে! তাকে দেখে কোনভাবেই যেন চেনা যাচ্ছে না! শান্ত দুটি চোখে আতঙ্ক আর ঘোলা পানির আস্তরণ! সারা মুখে,নাকে ঠোঁটে হিংস্র জন্তুর নিষ্ঠুর আঁচড়। কমলা লেবুর মত সেই গোলাপি ঠোঁটে এখন দগদগে ঘা! সারা কপাল জুড়ে এবড়ো থেবড়ো রাজ্যের বিরক্তির ছাপ! দেখে মনেই হয়না এই মেয়ে গান গায়তে পারত কোন এক জ্যোৎস্না ঝরা রাতে! ভালবাসার মিষ্টি সুবাসে রাঙিয়েছিল কোন যুবকের মন! বড় নিষ্ঠুর এ সময়।
-দারা তুমি কেমন আছো বাবা? কারো হাতের শীতল স্পর্শে চমকে তাকায় পিছনে।
- খালাম্মা আপনি? কেমন আ...ছেন? শুচি... ! গলা দিয়ে কোন শব্দই বের হচ্ছে না আর। কে যেন শক্ত হাতে চেপে ধরেছে গলাটা! হাজারো জড়তা জড়িয়ে ধরে ওকে যেন পাঁথরের মত শক্ত করে দিয়েছে।
-আমার শুচি'র এ কী হল? দুই দুজন পুরুষ সাথে থাকতে আমার শুচি'র...!
আর দাঁড়াতে পারলনা দারা। কানে বাজে “দুই দুজন পুরুষ সাথে থাকতে আমার শুচি'র...!” কেন সে বেঁচে গেল সেদিন? কেন তার মরণ হলনা? পানির বাঁধ ভেঙ্গে যখন সারা জমির ফসল ভেসে যেতে চায়,তখন তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে বাঁধে মাটি কেটে কেটে সারা গ্রামের জমির ফসল সে বহুবার বাঁচিয়েছে! আবার যখন কষ্টে ফলানো সারা বছরের পাকা ফসল লোভী চেয়ারম্যানের লোক রাতের অন্ধকারে কেটে নিয়ে যেতে চায়? তখন সে নিজেই সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়েছে হায়েনার বুকে! তাহলে আজ কেন সে শহরের পিশাচদের হাত থেকে শুচিকে বাঁচাতে পারল না? বাঁধাটা আসলে কোথায় ছিল?
মনে পড়ে সেদিন দীপ বারবার ওকে চোখের ইশারায় পিশাচদের সাথে কিছু না করতে বলছিল। সে ধরে নিয়েছিল হয়ত দীপ নিজেই কিছু করবে। হাজার হোক এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে। সেই জীবন সঙ্গীকে বাঁচাতে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে বুকে আগলে নেবে শুচিকে। কিন্তু তা যখন হয়নি তখন সে নিজেই তো শুচিকে ওদের আক্রমণ থেকে দূরে রাখতে ঝাঁপ দিয়েছিল! কিন্তু একটা ছোট্ট বুলেট...! মনে মনে ভাবে"আমি তো চেষ্টা করেছিলাম!" কথাটা ভাবতেই এবার খানিকটা শান্তি অনুভব করে।
-নে জুতোটা পায়ে দিয়ে নে...! মায়ের কথায় ভাবনার তার ছিঁড়ে যায়। তড়িৎ জিজ্ঞাসা করে-
-মা দীপ কোথায়? দীপের প্রসঙ্গ আসতেই মায়ের কপালে বিরক্তের চিহ্ন স্পষ্ট হয়।
- বাসায় চল... আজ তোকে নিয়ে বাসায় যাব। কাল ভোরের ট্রেনে আমরা আমাদের গ্রামে চলে যাব। শহরে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
-মা দীপের এখন সুচি'র পাশে থাকা উচিৎ,মেয়েটা ভেঙে পড়েছে। এই সময়ে ওর পাশে দীপকে দরকার...!
মা বেশ গম্ভীর স্বরে বললেন -
-বিয়েটা আর হচ্ছে না। দীপ এই মেয়েকে বিয়ে করবে না...ওদেরকে বলে দিয়েছে!
দপ করে চোখের সামনে সারা পৃথিবীর আলো নিভে যায়...। বসে পড়ে দারা -

- বিয়েটা আর হচ্ছে না মানে কী! মা দীপ ভুল করছে ...একবার মেয়েটার কথা...।
-তোর কাছে অনুরোধ বাসায় গিয়ে এই ব্যপারে তুই একটা কথাও বলবি না দারা।
কথাটা কে বলেছে সেদিকে তাকাতেই দেখে চাচা।
-কিন্তু চাচা এতে শুচির কী অপরাধ? ও কী দোষ...! চাচা হাত উঁচু করে থামিয়ে দেয় দারাকে। যা দারা'র কাছে খুব খারাপ লাগে। তবুও বিনয়ের সাথে বলে-
-মাফ করবেন চাচা এই অন্যায়কে আমি সমর্থন দিতে পারব না।
- তোমার সমর্থন অসমর্থনে কিছু যায় আসেনা। যে বিয়ে করবে সেই দীপ নিজেই বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছে।
-আমি দীপের সাথে কথা বলব
- লাভ হবে না...তোমার চাচী এই বিষয়ে কোন কথা বাসায় আলোচনা হোক তা চাননা,তাই আমিও চাই তুমি এ ব্যাপারে...।
- মাফ করবেন চাচা শুচির সাথে এ অন্যায় আমি হতে দেব না। আজ যদি বিয়ের পরে ঘটনাটি ঘটত তাহলে কী...!
- তখনও সবাই তাকে ধর্ষিতাই বলত এবং এখন যা ঘটেছে তখন এর থেকে বড় কিছু ঘটত...ডিভোর্স!
-আজ আপনার মেয়ের সাথে এমনটা হলে কী...!
ঘরের ভীতরে যেন বজ্রপাত হয়-
-তুমি তোমার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ দারা! ভুলে যেওনা আমি তোমার চাচা! একটু থেমে বললেন-মানুষ ঠিকই বলে অল্প শিক্ষা ভয়ন...! হন হন করে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। মা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে-
- আমার কসম বাবা তুই কাউকেই এ নিয়া কিছু বলবি না...! চল গ্রামে চলে যাই...।
-না মা শুচিকে এভাবে ফেলে আমি যেতে পারব না।

দারা বাসায় যাবার আগে শুচিকে দেখতে চাইলো। কিন্তু সে আগেই রিলিজ হয়ে বাসায় চলে গেছে। সত্যি সত্যিই সে বাসায় গিয়ে শুচিকে নিয়ে কাউকে কিছুই বলল না। দেখে দীপ টিভি দেখছে আর কতগুলো মেয়ের ছবি দেখছে মায়ের সাথে। দারাকে দেখে হেসে দিয়ে কেমন আছে জিজ্ঞাসা করল। দারা ঘৃণা নিয়ে বলল সে ভালো আছে। পরের দিন মা অনেক জোরাজুরি করল গ্রামে যেতে কিন্তু সে কিছুতেই গেল না। এদিকে আর শহরে থাকা মায়ের পক্ষে সম্ভব নয়। গ্রামে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে তাহলে। তাই দারা মাকে বাসে তুলে দিয়ে আসে। মাকে কথা দেয় সে খুব শীঘ্র গ্রামে চলে আসবে...।

এবার দারা শুচিদের বাসায় যায়। কিন্তু শুচি ওর সাথে দেখা না করে একটা চিরকুট লিখে জানায়-সে যেন আর কোনদিন এই বাসায় না আসে। দশদিন হয়ে গেল দারা শুচি'র সাথে দেখা করতে গিয়েও বারবার ফিরে এলো। ওদিকে দীপ কাল মেয়ে দেখতে যাবে। দারাকে সাথে নিয়ে যেতে চায়। দারা সুযোগ পেয়ে মাকে দেয়া কসম ভুলে দীপকে শুচির কথা বলে। আর তা শুনে দীপ ভীষণ ক্ষেপে যায়। বলে-
-ও মেয়ে আমাদের ফ্যামিলিতে বউ হবার যোগ্য নয়...এটা তোমাকে বুঝতে হবে। সমাজে আমাদের একটা স্ট্যাটাস আছে।
কথাটা শুনে দারার রাগ বেড়ে যায়। বলে-
-আচ্ছা স্ট্যাটাস তোমাদের আছে,ওর নেই?
-ছিল কিন্তু এখন নেই...। দীপের নির্লিপ্ত জবাব।
-আমি যদি বলি তুমিই মেয়েটাকে গুণ্ডা লাগিয়ে এই কাজ করেছ তাহলে?
কথাটা শুনে দীপ ঘাবড়ে যায়...ব্যস্ত হয়ে বলে-
-এ সবের অর্থ কী? আমি কেন এই কাজ করব? আমি তো ওকে পছন্দ করেছিলাম!
-একদম সত্যি...পছন্দ করেছিলে ভালবাসনি! অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে দুজনে সমান অপরাধী!
-দুই একবার দেখা,কথা আর ঘোরাঘুরি করলেই কী ভালবাসা হয়ে যায়? আর আমি অপরাধী কীভাবে হলাম? আমি পিস্তলের সামনে বুক পেতে দেব হেসে হেসে? যেমন তোমার মত গাইয়া, বোকারা দেয়?
রাগে দারা'র শরীর কাঁপছে!
- দুই একবার দেখা হলে না! প্রথম দেখাতেই ভালবাসা হয়। আর সেই ভালবাসার জোরেই ভালবাসার মানুষকে রক্ষা করতে সব বাঁধা ভেঙ্গে বুক পেতে দেয়া যায়! এইটা তোমার মত শহুরে শিক্ষিতরা বুঝবে না। তোমাদের যে হৃদয়টা না? ওটা ইট পাথুরে ঘরে থাকতে থকতে ওদের মতই কঠিন হয়ে গেছে! তোমরা আর মানুষ নেই...পাথুরে মুর্তি...!

ও কথাটা বলে হনহন করে বাসা থেকে বের হয়ে সোজা চলে যায় শুচিদের বাসায়। আজ কাউকে কিছু না বলে কারো সাথে কথা না বলে সোজা ঢুকে যায় শুচির ঘরে। শুচির মুখোমুখি এসে থমকে যায় দারা! দুজন দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। শুচি কিছু বুঝে উঠার আগেই দারা হু হু করে কেঁদে যায়। যা দেখে শুচির কী যে হয়!? আজ দারাকে বসতে বলে। দারা বসতে বসতে বলে যায়-
-গ্রামের মানুষ কী মানুষ না...!?
শুচি কিছুই বলে না। সে যেন সবকিছুই জানে...! উদাস হয়ে জানালা দিয়ে দূরে তাকিয়ে থাকে। এভাবেই অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকে দুজনেই। কিছুক্ষণ পর শুচির কানে ভেসে আসে-
- যেদিন প্রথম দেখলাম অনেক ভালবেসে ফেলেছিলাম। কাউকে ভালবাসলে নাকি বুকের মাঝে একটা ব্যথা অনুভূত হয়। আমার সমস্ত বুক জুড়ে সেদিন সেই ব্যথা অনুভব করেছি। কিন্তু যখন বাস্তবতা নিয়ে ভেবেছি তখন দেখি সে অন্য কারো। ভেবেছি আমি গ্রামের মুর্খ,চাষি ঘরের ছেলে। ধনী শহুরে মানুষদের ভাষায় গাইয়া,ক্ষেত! আমাদের যে ভালবাসতে নেই...! এবার তাকায় শুচির চোখের দিকে। শুচি জানে দারা কী বলতে চায়ছে। সে জানে সেই প্রথম দিন থেকেই। সে প্রথম চাউনিতেই ধরেছিল এই সহজ সরল গ্রামের ছেলেটির মাঝে অন্য কোন পরশ আছে। যে পরশে সমুদ্রের নির্মলতা আর সবুজের স্নিগ্ধ সুবাস আছে। আছে মুক্তির অনাবিল আনন্দ! কিন্তু দীপকে সে জীবন সঙ্গী হিসাবে পছন্দ করেছিল। দীপের সাথে এত কথা হয়েছে কদিনে যে দীপকে সে অনেক বেশি ভালবেসে ফেলেছিল। দীপ বেশ কয়েকবার ফোনে ওকে বলেছেও "আই লাভ ইউ শুচি...প্লিজ আমাকে ছেড়ে কোনদিন যাবে না। আমি আর তুমি মিলে ভালবাসার ঘর বাঁধব!" শুচি হেসে বলেছিল-"তুমি ঘর বাঁধার কথা ভাবছ?" কথাটা শুনে দীপ ভড়কে গিয়েছিল। আমতা আমতা করে বলেছিল- "তাহলে আমাকে বিয়ে করছ কেন?" আবার ঝর্ণার মত খলখল হাসি দিয়ে বলেছিল শুচি-"কারণ আমি ভালবাসার ঘর নয়, ভালবাসার স্বর্গ নীড় গড়তে চেয়েছি যে!"
কথাটায় সেদিন দুজনেই অনেক হেসেছিল। কথাগুলো মনে পড়তেই বুকের ভীতরে হুহু করে উঠে। স্রোতের ঢেউ উঠে আসতে চায় চোখে! কিন্তু চোখে এখন আর পানি নেই শুচির। দীর্ঘশ্বাসটা চেপে রেখে,এবার ধীরে ধীরে দারা'র পাশে গিয়ে বসে। শান্ত ধীর কণ্ঠে বলে-
-দারা তুমি গ্রামে চলে যাও...ওখানে তুমি অনেক ভালো থাকবে।
-আর তুমি?
সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে শুচি বলে- এই চার দেয়ালই আমার একমাত্র ঠিকানা। আমার মা বাবা আমাকে অনেক বুঝিয়েছে। তুমি প্রতিদিন এসে অনেক বুঝিয়েছ। আমি আড়াল থেকে সব শুনেছি। কিন্তু কলঙ্কের যে দাগ লেগেছে গায়ে তা কোন দিন মুছবে না!
-চাঁদেরও কলঙ্ক আছে। তাই বলে কি সে জ্যোৎস্না দেয়া ছেড়ে দিয়েছে?
- এসব বইয়ের কথা বাস্তবে চলেনা ।
-আজ তুমি কিছু না করেও চার দেয়ালে বন্দী থাকতে চাইছো!? আর যাদের বন্দী থাকার কথা তারা জামিন নিয়ে ঘুরে ঘুরে হয়ত নতুন শিকারের খোঁজে আছে। আর যার কথা ছিল হায়েনার ছোবল থেকে তোমাকে রক্ষা করার? সে সুন্দরীদের দেখে দেখে বেছে নিচ্ছে সঙ্গী! অন্যায় করেও সবাই সবার জীবনকে নিয়ে সুন্দর সুন্দর সময় কাটাচ্ছে! আর তুমি কিছু না করেও আহত পাখি হয়ে বন্দী থাকতে চায়ছো!? এতে করে কার কি আসে যাবে বল?
-জানি কারো কোন আসে যাবে না। কিন্তু এই মুখ আমি কাউকে দেখাতে পারবো না।
-দুঃখ কষ্ট জীবনে আসবে তাই বলে কি জীবন থমকে যাবে? নাকি সেই দুঃখ কষ্টকে জয় করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে?
সুখ দুঃখ সব নিজের কাছে -যদি ভাব তুমি সুখী তাহলে তুমি সুখী। আর যদি ভাব তুমি দুঃখী? তাহলে তোমাকে কেউ সুখী করতে পারবে না।
এবার পরিবেশটা হয় অন্য রকম। থমথমে ভাব। কারো মুখে কোন কথা নেই। এমন সময় ঘরে ঢোকে শুচির মা-
-বাবা চা খেয়ে যেও, তোমার মা ভাল আছে তো?
দারা বুঝতে পারে উনি আড়াল থেকে সব কিছুই শুনেছেন। কেন যেন কিছুই আর ভালো লাগে না। মন আর এখানে থাকতে চায়ছে না। ছুটে যাবার জন্য কেমন একটা অস্থিরতা অনুভব করে। ছটফট করতে করতে বলে-
-খালাম্মা আমি কাল সকালে গ্রামে চলে যাচ্ছি। দোয়া করবেন আর শুচিকে...।
শুচি উঠে বারান্দায় চলে যায়। দারার কেন যেন আর কথা বলতে ইচ্ছে হয় না। ঘর থেকে বের হয়ে আসে। মনে মনে ভাবে "জীবনটা আর আগের মত হবে না। একটা বোঝা বুকের মাঝে পাকাপোক্তভাবে বসেছে।" ভেজা চোখে খুঁজে চলে শুচিকে কিন্তু কোথাও তার দেখা মেলে না।

পরেরদিন খুব ভোরে একটা রিকশা নিয়ে বাস স্ট্যান্ডে আসে দারা। জীবনে প্রথম এত মানুষের ভিড়েও জনশূন্য মনে হয়! মনে হয় এই পৃথিবীর বুকে সে একা! আজ বাতাসের মৃদ্যু দোলাও তাকে ফেলে দেবে মাটিতে! বুকের ভীতরটা খাঁ খাঁ খালি জমি! রোঁদে পোড়া খড়খড়ে ধানি জমির মত,তেষ্টায় শুকিয়ে গেছে ঠোঁট...। সে ধীরে ধীরে গিয়ে বসে নিজের নির্ধারিত আসনে। পাশের সীটে কে বসেছে? সেদিকে তাকিয়ে দেখার ইচ্ছে হলনা একবারও। গাড়ীটা চলা শুরু করতেই মনের গহীন থেকে জলের ঢেউ এসে দুচোখে ঢল নামায়। দুহাতে মুখ ঢেকে আপন মনে বলে উঠে..."হেরে গেলাম আমি তোমার কাছে,আমার ভালবাসার কাছে...এই বেহায়া সমাজের কাছে! আমি হেরে গেলাম শুচি!” কথাটা শেষ হতেই কারো হাতের স্পর্শে চোখ তুলে তাকায়! শীতল একটা পরশ এসে দোলা দেয় ওর মনে! এক মুহূর্তেই সব দুঃখ কষ্ট নিমিষেই উড়ে যায় সোনালী হাওয়ায়! পাশে বসা মেয়েটা এবার বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে ঠোঁট উল্টে বলে-"আরও একবার বাঁচার সাধ হয় দারা!” কথাটা শেষ হতেই ভেজা চোখে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা পানি পড়ে। এবার দারা খুব শক্ত করে ধরে পাশে বসা শুচির হাত।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • ইমরানুল হক বেলাল
    ইমরানুল হক বেলাল বর্তমান পরিস্থিতি চলমান বাস্তবতা নিয়ে একটি সত্য গল্প।
    শুচির ব্যাপারে দীপের এই আচরণটা ভয়ানক অন্যায় অবিচার করা করা হয়েছে।
    যার সাথে বিয়ের কথা বার্তা পাকা হয়ে গেছে এমনকী আংটি ও পরা হয়ে গেছে ।
    সেই মেয়েটিকে তার চোখের সামনে ধর্ষিতা হতে দেখে ও দীপ দর্শকের ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৮ এপ্রিল, ২০১৬
  • এস, এম, ইমদাদুল  ইসলাম
    এস, এম, ইমদাদুল ইসলাম এরকম ঘটনার বাস্তবতা সাধারণতঃ একটা নেতিবাচক পরিণতিতে উপনীত হতে দেখা যায় । ঠিক সেরকম ভয়ানক নতিবাচক পরিণতি থেকে এত সুন্দর একটা ইতিবাচক শান্তিময় আবহতে উপনীত করে লেখক অনেক বড় একটা সামাজিক কমিটমেন্ট এর উদাহরণ সৃষ্ট করেছেন । সাধুবাদ জানাই । অনেক ভাল লাগল ।
    প্রত্যুত্তর . ৯ এপ্রিল, ২০১৬
  • মোজাম্মেল  কবির
    মোজাম্মেল কবির গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নাটকীয়তা... সমাজের ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের মনুষকে তুলে ধরেছেন। উঠে এসেছে শহুরে জীবনের অন্যায় ও আপোষের চিত্র সাথে গ্রামীন সরলতা। যদিও বাস্তবে গ্রাম্য সরলতা আর আগের মতো নেই... ভালো থাকুন আপা। শুভ কামনা রইলো। সাথে ভোট।
    প্রত্যুত্তর . ১১ এপ্রিল, ২০১৬
    • সেলিনা ইসলাম গ্রামের মাঝে এখনও কিছু সরল মানুষ যেমন আছে তেমনি শহরেও কিছু ভালো মানুষ ভাই। আমার কাছে মনে হয় এখনো ভালো মানুষের সংখ্যা বেশি বলেই মানুষ এখনো বাঁচার স্বপ্ন দেখে। অনেক ধন্যবাদ সময় দিয়ে পড়ে মন্তব্য করার জন্য। শুভকামনা নিরন্তর।
      প্রত্যুত্তর . ১৪ এপ্রিল, ২০১৬
  • ফাহমিদা   বারী
    ফাহমিদা বারী আমারও মনে হয়েছে, গল্পটাতে নাটকীয়তার উপস্থিতি অনেক বেশি। ভালো লেগেছে। আরো ভালো ভালো গল্প পাবো আপনার কাছে, এই প্রত্যাশা রাখছি।
    প্রত্যুত্তর . ১২ এপ্রিল, ২০১৬
    • সেলিনা ইসলাম জীবন মানেই নাটকীয়তা আপা...আর আমাদের সমাজে কিছু কিছু ব্যাপার নিয়ে তো হর হামেশায় নাটক হচ্ছে তাই না? ধন্যবাদ পড়ে সুন্দর মন্তব্য করার জন্য। নিরন্তর শুভকামনা।
      প্রত্যুত্তর . ১৪ এপ্রিল, ২০১৬
  • ফেরদৌস  আলম
    ফেরদৌস আলম অনেক ভালো একটি গল্প !
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ১৫ এপ্রিল, ২০১৬
  • Helal Al-din
    Helal Al-din আপনার গল্পে বর্তমান সমাজের অলিখিত রুপকল্পের বিস্তর আনাগোনা,
    নোংরা ভালবাসার অবমাননা আর প্রকৃত ভালবাসার সম্মাননা।
    আপনার প্রতি রইলো সুস্বাস্থ্য ও শুভকামনা।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ১৬ এপ্রিল, ২০১৬
  • এশরার লতিফ
    এশরার লতিফ ভালো লাগলো গল্পটি , অনেকটা চলচিত্রের কাহিনীর মত. অনেক শুভেচ্ছা.
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ১৭ এপ্রিল, ২০১৬
  • মোহাঃ ফখরুল আলম
    মোহাঃ ফখরুল আলম ভাল লেগেছে। ভোট দিতে মন চায়। আমার কবিতা পড়ার আমন্ত্রণ রইল।
    প্রত্যুত্তর . ২২ এপ্রিল, ২০১৬
  • রেজওয়ানা আলী তনিমা
    রেজওয়ানা আলী তনিমা ভালো লাগলো যদিও জীবন রূপকথা না, তবুও গল্পে মাঝে মাঝে অবাস্তব সুন্দর সমাপ্তি দেখতে ভালো লাগে। অজস্র শুভেচ্ছা।
    প্রত্যুত্তর . ২৫ এপ্রিল, ২০১৬
  • নাজমুস সাকিব রহমান
    নাজমুস সাকিব রহমান চমৎকার লেখনী, আশা করছি আরও ভাল ভাল লেখা ওঠে আসবে আপনার হাত ধরে। শুভেচ্ছা নেবেন।
    প্রত্যুত্তর . ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

advertisement