দেখতে দেখতে বছরটা কেটে গেল। জীবন থেকে আরও একটা বছর ঝরে গেল। আবদুল মজিদ জানে না তার এই অনিশ্চিত যাত্রার শেষ কোথায়?
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা, মুখ ধোয়া, নাস্তা করা,কাজে বের হওয়া। বিকেলে বাসায় ফিরে প্রাত্যাহিক কাজ-কর্ম সেরে বিছানায় যাওয়া -এটাই কী জীবন? না, তারপরও আছে। বিয়ে-শাদী করা, সন্তানাদি হলে তাদের লালন পালন করা। তারপর জীবন থেকে বিদায় নেয়া। কিন্তু তারপরও খটকা লাগে আবদুল মজিদের মনে। না, শুধু প্রাত্যহিক কিছু কাজকর্ম আর ছক বাঁধা জীবনের ঘেরাটোপে বাঁধা বন্দি মানুষের জীবন, জীবনের নিগূঢ়তম অর্থ বহন করতে পারে না।
বাইশ বছরের আবদুল মজিদের মাথায় কথাটা বাইশ বার পাক খেয়ে ফেরত আসে। কিন্তু কোন সমাধান খুঁজে পায় না সে। আবদুল মজিদের কোন বন্ধু-বান্ধব নেই। সম্ভবত সবকিছু নিয়ে বেশি বেশি ভাবার কারণেই বন্ধু নেই তার। পৃথিবীতে আপন বলতে তার এক বোন আছে গ্রামের বাড়িতে। বছর দুই আগে তার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আবুদল মজিদ ঢাকায় পাড়ী জমায়। শাহজাহান পুর রেল কলোনীর ধারে এক খুপড়ি টিন শেড মেস ঘরে ঠিকানা হয় মজিদের। ছোটখাট একটা দোকানের কর্মচারি হিসাবে একটা চাকরিও জুটে যায় মজিদের। বেতন দুই হাজার পাঁচশত টাকা।
আবদুল মজিদ ভালই জানে তার মনের কথাগুলো সবাই কে বলা মোটেও ঠিক হবে না। কেননা সবাই তো আর তার মতো না। সাধারণত তার বয়সে সবাই হাওয়ায় ভেসে চলে। তাই দোকানে চুপচাপ থাকে সে। মেসে ফিরেও চুপচাপ। বয়সটা অল্প হলেও আবদুল মজিদ ভালই জানে কথা বলার অনেক বিপদ। বুঝে শুনে কথা বলতে না পারলেই বিপদে পড়ে মানুষ। কোথায় কোন কথাটা বলতে হবে এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় উপলদ্ধির বিষয়।
শুক্রবার দোকান ছুটি। কাজ নেই, কর্ম নেই, কোথাও বেড়ানোর জায়গাও নেই তার। মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে ইমামের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যায় মজিদের। তার সাথে কথা বলে বেশ ভাল লাগে মজিদের। তার মতো সামান্য দোকানের কর্মচারির সাথেও বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠে ইমামের। একদিন সুযোগ মতো ইমামের কাছে তার মনের সব কথা খুলে বলে মজিদ।
তার অদ্ভুত কথাগুলো শুনে মোটেও ঘাবড়ায় না ইমাম। বরং বলে, ‘তোমার চিন্তাগুলো খুব সুন্দর। আসলে পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই যে নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছে। অথচ ফিরে যাওয়ার সময় সে মোটেও ফিরে যেতে রাজি হয় না। সাধারণত কাওকে তার অনিচ্ছায় কোথাও পাঠানো হলে সে সেখান থেকে ফিরে আসতে পারলেই বাঁচে। কিন্তু পৃথিবীতে মানুষের ক্ষেত্রেই তার উল্টোটা দেখা যায়। কারণ কী জান, বেশির ভাগ মানুষই জানে না পৃথিবীর এই জীবন আসলে নকল জীবন। আসল জীবন পরকালে। যে এই জীবন কে আসল মনে করবে এই জীবন ই তাকে বিপদে ফেলে দেবে। ভোগ-বিলাস আর সেই সঙ্গে অশান্তি আর দুশ্চিন্তায় ভরে যাবে তার জীবন।’
আবদুল মজিদ মনে মনে বুঝতে পারে ত্যাগেই মানুষের জীবন পূর্ণ হয়। আর তাতেই শান্তি, তাতেই তৃপ্তি।
একদিন এক বন্ধুর সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় মজিদের। বিদ্যুত চমকের মতো অবাক হয় মজিদ। গ্রামের দরিদ্র ছেলে জলিল। হঠাৎ এখানে কী ভাবে এল সে। প্রথমে ভেবেছিল বোধহয় দেখতে ভুল করেছে সে। তারপর সাহস করে কথা বলতেই ভুল ভেঙে গেল তার। জলিল তাকে দেখে কেঁদে ফেলল; বলল, অভাবের সংসারে বাবা হঠাৎ মারা যাওয়ায় দু’ দিন না খেয়েছিল। ছোট দুই ভাই বোন আর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত ঘরে বসে থাকা তার পক্ষে আর সম্ভব হয়নি।
মজিদ তাকে সান্তনা দেয়। বলে, ‘ঢাকা শহরে কেউ কারো দিকে ফিরেও তাকায় না। খোদার একান্ত ইচ্ছা না থাকলে তোমার সাথে আমার দেখা হতো না। তোমার কপাল ভাল, কোন চিন্তা করো না।’
আবদুল মজিদের সাথে জলিল থাকল পুরো একমাস। শেষে একটা গার্মেন্টসে কাজ জুটে গেল তার। ফ্যক্টরির পাশেই একটা ছোট মেসে তার থাকার ব্যবস্থা আর প্রয়োজনীয় কিছু টুকিটাকি জিনিস-পত্র কিনে দিল মজিদ। কেনাকাটা করতে গিয়ে মাসের বেতনের পুরো টাকাটা একদিনেই খরচ হয়ে গেল মজিদের। বাকি মাসটা কীভাবে চলবে তার এখনো জানে না আবদুল মজিদ।
ফুরফুরে মেজাজে মেসে ফিরতে ফিরতে একটা কথাই বার বার তার মনে পড়ল। মসজিদের ইমাম বলেছিল তাকে ভোগে নয় ত্যাগেই শান্তি। তাতেই তৃপ্তি।
আবদুল মজিদ জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছে। তার জীবন পূর্ণতা লাভ করেছে, এখন থেকে সে পরিপূর্ণ জীবন উপভোগ করতে পারবে। কারণ সে এখন জানে বাকি মাসের উপায় তার কোন না কোনভাবে হয়ে যাবে। কিন্তু জলিলের উপকারে লাগার সুযোগ হয়তো আর পাবে না সে।