সন্তান বেচার গল্প

ক্ষুধা সংখ্যা

নাজমুল হাসান নিরো
  • ৭১
  • 0
(০)
"যাউরাডা আবার আইচে।" রাগে গজগজ করতে করতে খুপরি ঘরে ঢোকে খালেদা বানু।
"কি হইচে এত চেঁচাস ক্যান?" জিজ্ঞেস করে বিছানায় পড়ে থাকা স্বামী লাল চাঁন।

এর পূর্বের ঘটনাটা বলে নেওয়া যাক।

একে একে ছয়-ছয়টি সন্তান জন্ম দেবার পর যখন সপ্তম কন্যাসন্তানটি জন্ম দিল খালেদা বানু তখন সবাই-ই বিস্মিত কন্যার মুখ খানা দেখে। এমনকি খালেদা বানু নিজেও। বাচ্চাটাকে প্রথম দেখেই সকলে এক কথাই বলে "ও মা, মাইয়্যাডা যে এক্কেরে পরীর লাহান।" মেয়েটি যেমন পেয়েছে তার বাপের গায়ের রং তেমনি পেয়েছে তার মায়ের মুখের সুন্দর ছাঁচটি।
রোদে-বৃষ্টিতে বিশ বছর ধরে রিঙ্া চালিয়ে লাল চাঁনের গায়ের রং পুড়ে মেঙ্কিান কাউবয়দের মত হয়ে গেলেও তার আসল গায়ের রংটি কিন্তু একদম ধবধবে ফর্সা। আর সেই ফর্সা গায়ের রংটি জেনেটিকভাবে পুরোপুরিই পেয়েছে মেয়েটি। কারণ জেনেটিক প্রোফাইলে কখনো মেলানিনের ছাপ পড়ে না। আর খালেদা বানুর গায়ের রংটা শ্যামলা হলেও মুখশ্রীটা অনেক সুন্দর। মেয়েটি কেমন করে যেন সেটাও কৌশলে ধরে নিয়েছে। এমন নয় যে খালেদা বানুর সব ছেলে-মেয়েই খুব সুন্দর। কিন্তু ব্যাপারটা যেন এমনই যে, প্রকৃতি দিন দিন ধরে সন্তানের পর সন্তান পরম্পরায় বাপ-মা দু' জনেরই রূপ আর রং ফোঁটায় ফোঁটায় জড়ো করছিল আর সব জমানো শেষ হলে এই কন্যা শিশুটিকে তার সব ঢেলে দিয়েছে।
এক কথায় মেয়েটি খুবই সুন্দর।

এটা যদি রবী ঠাকুরের গল্প লেখার সময়কার গল্প হত তাহলে হয়ত বলা যেত "শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে সাত-সাতটা সন্তান ঘরে এসেছে।" কিন্তু এখানে, এই সময়ের এই রায়ের বাজার বস্তির প্রেক্ষাপটে ব্যাপারটা অনেক ভিন্ন। এখানে ক্ষুধারা পিলপিল করে ঘুরে বেড়ায়, এক ক্ষুধা আরেক ক্ষুধার সাথে নিয়ত দাঙ্গা লাগে নিজের ভাগ এবং ভোগটা আগে পাবার জন্য। মানুষগুলোকে নিজের পেটের দায় মেটাতেই কঠোর খাটুনি খাটতে হয়। সেখানে সাত-সাতটা সন্তানের পেট সামাল দিতে গিয়ে রীতিমত বিদ্ধস্ত হওয়ার মত অবস্থা খালেদা বানুর।

সংসারটা এখনকার চাইতে অনেক ভালই চলছিল যখন লাল চাঁন দৈনিক রিঙ্া চালাত। দিন গেলেই সে আড়াই শ- তিন শ টাকা ঘরে আনতে পারত। আহামরি কিছু খেতে না পারলেও দু' বেলা দু' মুঠো ভাত অন্তত সে ছেলেপুলেদের মুখে তুলে দিতে পারত। লাল চাঁন হঠাৎ এক দিন রিঙ্া চালাতে গিয়ে এ্যাঙ্েিডন্ট করে বসে। কৃত্তিকা, ধনিষ্ঠা আর শতভিষা নক্ষত্রের গোলমেলে সে দিন বোধহয় শনি অথবা রাহু গ্রহ তার খুব কাছাকাছি এসে পড়েছিল। আর তাদের উত্তাপ লেগেই হঠাৎ এ্যাঙ্েিডন্ট করে বসে লাল চাঁন এবং একটা পা ভেঙ্গে যায়।

আর এর পরই সাতটা সন্তান ঘরে নিয়ে এক কঠিন জীবন-যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় খালেদা বানুর। তিন-তিনটা বাড়িতে বুয়ার কাজ করে খালেদা বানু কিভাবে এ সংসার-যুদ্ধ পাড়ি দিচ্ছে তার ফিরিস্তি না হয় না-ই বা দিলাম।
মূল কথায় আসি।
এই অতিরিক্ত সুন্দর মেয়ে-শিশুটিকে নিয়ে খালেদা বানুর নতুন এক যন্ত্রনার সৃষ্টি হয়েছে।
কিছু দিন আগে বস্তিতে এক জন পরিচালক এসেছিল দল-বল নিয়ে। নাটকের শু্যটিং করার জন্য। মেয়েটিকে চোখে পড়ে যায় তার। নাটক সিনেমায় বাচ্চা শিশুর দরকার পড়ে অহরহ। অনেক সময় সুন্দর দেখে বাচ্চা ম্যানেজ করা অনেক কঠিনই হয়ে যায়। বড় লোকেরা তাদের কচি বাচ্চা এসব কাজে দিতে চায় না। তাই তিনি ফিরে গিয়েই লোক পাঠিয়ে দিয়েছেন বাচ্চাটিকে কিনে নেয়ার জন্য। ক' দিন ধরেই তার চামচা আজরফ আলী বস্তিতে এসে খালেদা বানুর কাছে পিড়েপিড়ি করছিল বাচ্চাটাকে নেয়ার জন্য। বলছে নগদ বার হাজার টাকা দেবে সে বাচ্চাটাকে একবারে দিয়ে দিলে। খালেদা বানুর এক কথা, বাচ্চাটাকে দেবে না সে। কয়েক বার করে মানা করে দিয়েছে তাকে এখানে আসতে। কিন্তু আজরফ আলীর শরমিন্দা বলতে কিছু নেই। সে বারবার আসে আর বিরক্ত করে খালেদা বানুকে। আজ সে বিরক্তের একেবারে চরমে পেঁৗছে গেছে। মুখে যা আসছে তাই করে গালি দিতে শুরু করেছে আজরফ আলীকে।

(১)
বাইরে দাঁড়িয়ে মনে মনে মৃদু হাসে আজরফ আলী। বগুড়া থেকে উঠে আসা ধুরন্ধর লোক সে। বিশ বছর ধরে এফ.ডি.সি.তে দালালির কাজ করে সে। এমন দৃশ্য তার কাছে নতুন নয়। বহু বার দেখেছে সে এমন পরিস্থিতি। বর্ষনের আগে যতই তর্জন-গর্জন হোক না কেন; শেষ পর্যন্ত এটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা সে জানে। তাই যতই হম্বিতম্বি হোক, ঘাবড়ায় না সে; ভাবান্তরও হয় না তার। সে জানে বাচ্চাটাকে সে ঠিকই বগলদাবা করবে, আর এও জানে বাচ্চাটা ঠিকই এফ.ডি.সি.তে যাবে, আজ অভিনয় করবে নায়ক-নায়িকার সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানের ভূমিকায় আর অদূর ভবিষ্যতে এই বাচ্চাই হয়ত সিনেমার নায়ক বা নায়িকার বোনের চরিত্রে কোন ধর্ষণদৃশ্যে অভিনয় করবে।

ভেতর থেকে খালেদা বানুর উত্তেজিত গলা শোনা যায়।
"এইড্যা তুমি কী অলুক্ষুইন্যা কথা কও!"
"থাম, থাম; আমি কইতাচি।"
"তাই বইল্যা এইড্যা তুমি কী কও, আমার ছাওয়াল বেশি দেইখ্যা আমার মাইয়্যাডারে আমি বেইচ্যা দিমু?"
"দ্যাখ, মাথা গরম করিস না। বিষয়ডা আবার চিন্তা কইরা দ্যাখ।" ধীরে ধীরে বলে লাল চাঁন। খালি পেটে বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে সে এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী হয়ে পড়েছে।
"এতগুলান পোলাপাইনরে আমরা ঠিকমত খাওনও দিতে পারি না। অতগুলান ট্যাহা এক সাথে হাতে আইলে পোলাপাইনগুলারে অন্তত দুই বেলা খাওন দেয়া যাইবো। ট্যাহাগুলান পাইলে আমার পায়ের যদি একটা চিকিৎসা করন যায় তাইলে আমি আবার রিসকা চালাবার পারুম। তাইলে তর আর এত কষ্ট করন লাগবো না। বাকী পোলাপাইনের মুখের দিকে চাইয়্যা অগর ভালার জন্যে তরে একটু শক্ত হওনই লাগবো। তাছাড়া আমাগোর মাইয়্যাডা অগর কাছে গেলে ভালাই থাকবো।"
"না না, অরা আমার মাইয়্যাডারে নিয়া গিয়া কোথায় রাখবো কী করবো তার কোন ঠিক-ঠিকানা আচে?"
"তুই যেইডা চিন্তা করতাচস হেইডা ঠিক না। তুই মাইয়্যাডারে তো ঠিকমত বুকের দুধই খাওয়াইতে পারস না। অগর কাছে গেলে মাইয়্যাডা ভালা ভালা খাওন পাইবো। ভালা জায়গায় থাকবো। তোর এহানকার চাইতে মাইয়্যা অনেক ভালা থাকব। বিষয়ডা চিন্তা কর, অরে দিলে তোর ওই মাইয়্যা তো ভালা থাকবোই; এই পোলাপাইনগুলারও ভালা হইবো।"

"মা তুমি ছোটডারে অগর কাছে দিয়া দ্যাও মা। ওই ট্যাহা দিয়া আমারে একটা রিসকা কিন্যা দিও। আমিও রিসকা চালামু।" যোগ করে বড় ছেলে জামির।

থপ করে মেঝেতে বসে পড়ে খালেদা বানু। উদভ্রান্তের মত হয়ে পড়ে। অনেকগুলো চিন্তার ঝড় বইতে থাকে তার মাথায়। এক দিকে তার ছয়টি সন্তান, এক দিকে সংসার, বিছানায় পঙ্গু স্বামী আর আরেক দিকে তার চান্দের লাহান মাইয়্যাডা। এক দিকে তার নাড়ি ছেঁড়া ধন, আরেক দিকে বার হাজার টাকার সেই ভাল থাকার প্রলোভন। চিন্তাগুলো দুলতে থাকে তার। একটু করে হালতে থাকে এক দিকে। অবশেষে বাস্তববাদী ভাবনারই জয় হয়।

বাকী সন্তানগুলোকে ভাল রাখার প্রলোভনে, সংসারটা একটু ভাল করার আশায় আর পঙ্গু স্বামীর চিকিৎসার চিন্তায় খালেদা বানু বাধ্য হয়ে নিরব সম্মতি দিয়ে ফেলে। তার চান্দের লাহান মাইয়্যাডা চোখের জল মুছতে মুছতে তুলে দেয় আজরফ আলীর হাতে।

(২)
শেষ পর্যন্ত আজরফ আলী সফল। বাচ্চাটাকে সে ঠিকই বগলদাবা করেছে। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে সে ধীরে ধীরে বাইরে যাবার জন্য পা বাড়ায়।
পেছনে নগদ বার হাজার টাকা হাতে নিয়ে খালেদা বানু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পর পর নাকের সর্দি শাড়িতে মুছছে। হঠাৎ মাথা তুলে তাকায় আজরফ আলীর গমন পথের দিকে। দেখে আজরফ আলীর ঘাড়ের উপর দিয়ে টুলুটুলু চোখে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে তার চান্দের লাহান মাইয়্যাডা।
হঠাৎ কী করে যেন প্রচন্ড একটা অনুতাপ অনুভব করে খালেদা বানু। এ অনুতাপ এক জন কিশোরের টানবাজারে গিয়ে প্রথম কৌমার্য্য হারানোর অনুতাপের তুল্য নয়। খালেদা বানুও এক জন মা। তার সেই মাতৃত্বটা যেন উদ্ভিদের মত মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। কারণ মাতৃত্ব-মায়া জিনিসটার উৎপত্তি হল পিটুইটারিতে আর সেটা বসবাস করে সব মায়েরই সাব-কনসাস মাইন্ডে। কোন মায়েরই ক্ষমতা নেই তাকে উপেক্ষা করার।

একছুটে আজরফ আলীর সামনে গিয়ে দাঁড়ায় খালেদা বানু। ছুঁড়ে মারে বার হাজার টাকা আজরফ আলীর মুখে। ছোঁ মেরে কেড়ে নেয় তার বুকের ধনকে। বুকে জড়িয়ে ধরে ভেজাতে থাকে চোখের জলে, নাকের জলে।

উৎসর্গ: এই গল্পটি আমি উৎসর্গ করলাম আমাদের গল্পকবিতার নতুন চাচ্চু তিন্তিলিকে(মামুন ম. আজিজ ভাইয়ের মেয়ে) এবং ইফতেখারকে (প্রজ্ঞা দির ছেলে)। অবশ্য কিছুটা স্বার্থের জন্য, বড় হয়ে যেন ও এই সব সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর জন্য অনেক কিছু করে সেই আশায়।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
মোঃ শামছুল আরেফিন সংসারে যত অভাব আর দারিদ্রতাই থাকুক না কেন। মা তো মা'ই। সমস্ত পৃথিবীর বিনিময়েও তার সন্তানকে বিক্রি করতে পারেন না তিনি। খুবই ভাল লেগেছে।
খন্দকার নাহিদ হোসেন নিরো ভাই, ভাবছিলাম আবার একটা করুন গল্প পড়তে হবে ...... তো শেষমেশ লেখকের আশাবাদী মন দেখে ভালো লাগলো। আর লেখা বরাবর এর মতোই অনেক ভালো। ও চাকরি পেলে জানায়েন কিন্তু। ভালো থাকুন।
বিন আরফান. উত্তর পেয়েছি সে জন্য ধন্যবাদ. গল্পটি পড়ে অনেক কিছুই শিক্ষার আছে শিখেছিও বটে. চালিয়ে যান.
মুহাম্মাদ মিজানুর রহমান একছুটে আজরফ আলীর সামনে গিয়ে দাঁড়ায় খালেদা বানু। ছুঁড়ে মারে বার হাজার টাকা আজরফ আলীর মুখে। ছোঁ মেরে কেড়ে নেয় তার বুকের ধনকে। বুকে জড়িয়ে ধরে ভেজাতে থাকে চোখের জলে, নাকের জলে। ........ চাঁপা নিঃশাস ছেড়ে বাঁচলাম, আরেকটু হলেই আমি আপনার ঘাড়ে কটা মাথা দেখতে যেতাম....অসাধারণ.....
M.A.HALIM খুব ভালো লাগলো। শুভ কামনা বন্ধুর জন্য।
Akther Hossain (আকাশ) নিজের সন্তান হাজার টাকার চেয় দামী !
ওবাইদুল হক আসাধারন করে লিখলেন ।
ড. জায়েদ বিন জাকির শাওন কয়েকদফা গল্পটা পড়তে গিয়েছি কখনও শেষ করতে পারি না ঠিক মত. চোখের সামনে ঝাপসা দেখতে থাকি মনিটরটা. চোখে পানি চলে আসে আর আপনার গল্পের চরিত্র গুলাকে মনে হয় যেন জীবন্ত হয়ে আমার সামনে চলে এসেছে.
নাজমুল হাসান নিরো @F.I. JEWEL ভাই - আপনি যে মাপের লেখক জুয়েল ভাই, তাতে আপনার ওটুকু মন্তব্যই আমার জন্য যথেষ্ট।

২৪ জানুয়ারী - ২০১১ গল্প/কবিতা: ২ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "কষ্ট”
কবিতার বিষয় "কষ্ট”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২১