এক
মেয়েটা পা ঝুলিয়ে গাছের ডালে বসে আছে।
গেরস্ত বাড়ীর বৈঠক ঘরের গোড়া ঘেসে গজিয়ে উঠা লিকলিকে পেয়ারা গাছ। ওটার একমাত্র পোক্ত ডালটি ধনুকের মত বাঁকা হয়ে বাড়ীর সামনে দিয়ে চলে যাওয়া পথের উপর উঠে গেছে। মেয়েটি বাঁকানো ডালটির ঠিক মাঝখানে বসে পরম আনন্দে দোল খাচ্ছে। ভারসাম্য রক্ষার জন্য দু'হাত দিয়ে উভয় দিকের ডাল শক্ত করে ধরে আছে। পরনে গাড় নীলচে শাড়ী। হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে একটা নীল পরী আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে শরীর দোলাচ্ছে।

মেটো পথের চড়াই উৎড়াই পেড়িয়ে সবে মাত্র বাঁক ঘুরেছে এমনি সময় দৃশ্যটা দেখতে পেল সে। মাত্র ক'দিন হলো ট্রান্সফার হয়ে এদিকটায় এসেছে। একটা নামকরা ঔষধ কোম্পানীর এরিয়া ম্যানেজার। এপথে আজই প্রথম আসা। স্বাভাবিকভাবেই এরকম একটা দৃশ্য তাকে কিছুটা হলেও থমকে দিল। ফলে যা হবার তাই হলো। হাতের নীচে হ্যান্ডেল ফাঁকি দিয়ে দিক পরিবর্তন করে অন্যমুখি হলো। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাচকলা দেখিয়ে তার মোটরবাইক পথ ছেড়ে এগিয়ে গেল পাশের মাজা পুকুরে। ঘটনাটা ঘটবার ঠিক পূর্ব মুহুর্তে তার চোখ আটকে গেল মেয়েটার পরনের শাড়ীটার দিকে। ওটা উঠে আছে হাঁটু অব্দি। ফাঁক গলে বেড়িয়ে আছে এক জোড়া মেদহীন সুন্দর পা। একবুক পানির ভেতর পড়ে গিয়েও তার অনেক তৃষ্ণা পেল। বাতাসে তখন ভেসে বেড়াচ্ছে মেয়েটার খিলখিল হাসির রিনিঝিনি শব্দ।


আইজক্যা তোরে ফতুর না কইরা ছাড়ছি না। এক পা আগে বাড়িয়ে দেহটা টানটান করলো মিনা। তার নজর পুকুর পাড়ের ঢালে নিরীহ ভঙ্গীতে শুয়ে থাকা চাড়াটার (মাটির ভাঙ্গা কলসের টুকরো) উপর। ওটা সমবয়সী পাড়াতো খেলার সাথী রহিমের। ওর হাত ভর্তি একগাঁদা তাস (আসলে এগুলো সব সিগেরেটের ফেলে দেওয়া পুরনো প্যাকেট । খেলার প্রয়োজনে মাঝখানে ছিড়ে দুই'ভাগ করা হয়েছে)। তার নিক্ষিপ্ত চাড়াটা ওটার পাশে ফেলতে পারলেই সে হয়ে যাবে ওই সবগুলো তাসের মালিক।

ডান হাতটা বাঁকিয়ে কোমরের কাছে নিয়ে এল মিনা। চাড়াটা সবে ছুড়তে যাবে এমনি সময় চিৎকার দিয়ে উঠলো রহিম। ওই মিনা, তোর পাও কাটলি কেমনে ? কথাটা বলেই এক লাফে চলে এল মিনার কাছে। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে মিনাও তাকালো নিজের পায়ের দিকে। অবাক হয়ে খেয়াল করলো তার ডান উরু বেয়ে রক্তের একটা সরু ধারা নীচে নেমে গেছে। অদ্ভুত তো ! কাঁটলো কখন ? আনমনে নিজেকেই প্রশ্ন করলো। উৎস খোঁজতে যেয়ে রীতিমত ভয় পেয়ে গেল। সহসা হাতের চাড়া ফেলে দিয়ে সামনে দাঁড়ানো রহীমের বুকে জোড়সে একটা ধাক্কা মেরে ছুট লাগালো বাড়ীর দিকে। হতভম্ব রহীম কিছুই বুঝতে না পেরে পড়িমরি করে তার পিছু নিল। কিন্তু সে নাগাল পাবার আগেই মিনা পেঁৗছে গেল বৈঠক ঘরের বাহির দরজায়। রহিমের মুখের উপর দরজা আটকিয়ে সে এক লাফে চলে গেল অপর পাশের জানালার ধারে। এক টানে পরণের হাফপ্যান্টটা নামিয়ে আনলো নীচে। জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া আলোয় দেখলো সবুজ রঙা প্যান্টের নিচের দিকটা ভিজে কালচে হয়ে আছে। আপনা থেকেই তার হাত চলে গেল দু'উরুর সন্ধিস্থলে। আবিস্কার করলো রক্তের একটা থকথকে প্রলেপ সেঁটে আছে তার নিম্নাঙ্গে। ঘটনাটা ঠাহর করে ভয়ের একটা অস্ফুট চিৎকার বেড়িয়ে এল তার কন্ঠ চিড়ে।


আইজ থাইক্যা তুমি আর ছোড না। মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে মেয়েকে সাহস যোগালো মিনার মা। এইডা অইলো মাইয়াগো বড় হওয়ার লক্ষণ। কাজেই আইজ থাইক্যা তোমায় আমগো মত শাড়ী পরন লাগবো। এই বলে মেয়েকে বয়ঃসন্ধির বিষয়টা সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিল। সেই সঙ্গে যোগ করলো, তোমার অহন থাইক্যা আর বাইরে খেলতে যাওন যাইবো না। তুমি এহন খালি ঘরে থাকবা, আর আমায় গেরস্থালী কামে সাহায্য করবা।

বয়ঃসন্ধির ব্যপারটা তেমন জোড়ালো ভাবে না বুঝলেও এটুকু বুঝলো মিনা, সে এখন সত্যিই বড় হয়েছে। আয়নায় দেখেছে, শাড়ীতে তাকে এখন বড় মেয়ের মতই লাগে। মায়ের কথামত এখন আর সে বাইরে যায় না। এদিকে শাড়ী পড়ে আর যাই হোক দৌড়-ঝাঁপ করা যায় না। তাই অনিচ্ছে স্বত্তেও তাকে খেলাধুলার কথাও ভুলে যেতে হয়েছে। তবে সেদিন রহীমকে ফতুর করতে না পারার দুখঃটা তাকে প্রায়শঃ তাড়িয়ে বেড়ায়।

ইতোমধ্যে মিনার স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আড়াল থেকে বাবা-মাকে বলতে শুনেছে, গেরস্ত বাড়ীর কোন ভালো ছেলে পেলে তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে। কথাটা তাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। একে তো তার বাইরে যাওয়া বন্ধ। তার উপর বিয়ে হয়ে গেলে তাকে তো এই বাড়ীও ছেড়ে যেতে হবে। এখন তো আর যাই হোক অন্তঃত বাড়ীর আশ-পাশ ঘুরে বেড়াতে পারে। উুঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখে নিতে পারে সময়বয়সী বন্ধুদের। কিন্তু, বিয়ের পর তো আর সেটি করবার জো থাকবে না। ইশ্শ্ কেন যে বড় হতে গেল। আর বড় হলো বলেই না তাকে এখন শাড়ী পরে থাকতে হচ্ছে। দূর থেকে রহিমদের খেলতে দেখে বুকটা কেমন করে উঠে ওর। মাঝে মাঝে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে বাড়ীর সামনের পেয়ারা গাছটির দিকে। কতদিন গাছে চড়া হয় না। আচ্ছা শাড়ী পড়েও কি গাছে চড়া যায় না। ভাবনাটা মনে ধরলো ওর। কি মনে করে শাড়ীটা গুটিয়ে হাঁটু অব্দি তুলে একটা গিট্টু দিলো। তারপর তরতর করে উঠে গেল গাছের মগডোলে। ভারী আনন্দ হলো তার। সেই আনন্দে সে গাছের ডালে বসে পা ঝুলিয়ে দোল খেতে লাগলো।


কি থেকে কি হলো কিছুই বুঝতে পারলো না রহীম। শুধু দেখলো সেদিনের পর থেকে মিনা হাওয়া। তারপর হঠাৎ একদিন শুনলো ওর বিয়ে। ছেলে এক নামকরা ঔষধ কোম্পানীর বড় অফিসার।



দুই
জুলফিকার সাহেব প্রচন্ড ব্যস্ত মানুষ। একটা নামকরা ঔষধ কোম্পানীর সেলস্ ম্যানেজার তিনি। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম আর স্বীয় মেধায় সামান্য চাকুরীজীবি থেকে তিনি আজকের অবস্থানে এসে পেঁৗছেছেন। আর তাই তার ধ্যান-জ্ঞান বলতে শুধুই কাজ আর কাজ। কাজের প্রয়োজনেই তাকে অফিসে ভীষন ব্যাস্ত থাকতে হয়। ছুটে বেড়াতে হয় দেশের সর্বত্র। আর তাই স্ত্রীকে সময় দেওয়া হয়না তার। তাই বলে স্ত্রীকে তিনি ভালবাসেন না, এ কথা বলা যাবে না। বরং স্ত্রীর চাহিদার কথা ভেবে তার পক্ষে যতটুকু সম্ভব সব'ই করেছেন। চলাফেরার জন্য লেটেস্ট মডেলের গাড়ী কিনে দিয়েছেন। যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন উচ্চবিত্ত মহিলাদের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে। মোটকথা তার স্ত্রী যেন কখনোই স্বামীর অভাবে লোনলী ফিল না করে, তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা তিনি করেছেন। মিসেস জুলফিকারেরও তার স্বামীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। পার্টি, ক্লাব আর সেমিনার নিয়ে বেশ আনন্দেই কেটে যাচ্ছে তার জীবন। একমাত্র সন্তান ছেলে, তাকেও বিদেশে রেখে পড়াচ্ছেন। অসামান্য রূপসী মহিলা তিনি। নিয়োমিত যত্ন নেওয়ায় দেহের আকর্ষনীয় ভাব বজায় রয়েছে পুরো মাত্রায়। আধুনিক পোশাকের আড়ালে ঢেকে রাখা তার অনিন্দ্য দেহ-সৌষ্টব যে কোন পরুষের মাথা ঘুরিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট।


রাতের নিশুতি ভেদ করে এক ঝলক আলো এসে আছড়ে পড়লো বিশালকায় লোহার গেটের উপর। তন্দ্রালু চোখে গেট খোলে দিল দাঁড়োয়ান। লেটেষ্ট মডেলের গাড়িটা সাঁই করে সেধিয়ে গেল এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের লনে। ঘরঘর শব্দে বন্ধ হয়ে গেল গেট। লিফটের সামনে গাড়ি থামাতেই পিছনের দরজা খোলে বেড়িয়ে এলেন মিসেস জুলফিকার। পরনে স্কিন টাইট জিনস্ ও ফতুয়া। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে হালকা দুলে উঠলেন।
না আজ একটু বেশী খাওয়া হয়ে গেছে। আনমনে বিড়বিড় করলেন তিনি।
ড্রাইভার এগিয়ে এল। ম্যাডাম একা যেতে পারবেন ?
ও, হঁ্যা। আধবোজা চোখে তাকালেন তিনি। এক পা এগোতে গিয়ে আবারো দোলে উঠলেন। দৌড়ে সামনে চলে এলো ড্রাইভার। তাকে ধরে তাল সামলালেন। তুমি বরঞ্চ আমায় একটু উপরে পেঁৗছে দিয়ে আসো।
ঠিক আছে ম্যাডাম। মিসেস জুলফিকারের কোমরে হাত রাখলো সে।


পুরো আকাশটা রঙধনুর সাজে সেজে আছে। একেকটা রঙ আসলে একেক বর্ণা শাড়ী। সবগুলো শাড়ী বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। আর তাই আকাশটাকে বর্ণীল মনে হচ্ছে। সহসা শাড়ীগুলো এক এক করে খসে যেতে লাগলো। প্রথমে বেগুনী। তারপর নীল। এরপর আসমানী। এভাবে সবুজ, হলুদ, কমলা এবং সবশেষে লাল। একসময় দেখা গেল পুরো আকাশটাই বর্ণহীন হয়ে গেছে। আর তখনি ঘুম ভেঙ্গে গেল তার।


ঘুম ভেঙ্গে যাবার পর নিজেকে বেডরুমের বিছানায় আবিস্কার করলেন মিসেস জুলফিকার। অবাক হয়ে খেয়াল করলেন, তার সারা শরীরে একটা সুতোও নেই। সম্পূর্ন নগ্ন হয়ে শুয়ে আছেন তিনি। নিজেকে এই অবস্থায় আবিস্কার করে বেশ অবাক হলেন। গত রাতের কথা মনে করার চেষ্টা করলেন। কালকের পার্টিতে একটু বেশীমাত্রায় ড্রিংক করে ফেলেছিলেন। সচারাচর এমন হয় না। কিন্তু গতকালকের ব্যাপারটা ছিল ভিন্ন। অফিসিয়াল টু্যরে ক'দিন যাবৎ তার স্বামী বাইরে থাকায় দ্রুত বাসায় ফেরার তাগিদ ছিল না। ফলে কালকের পার্টিতে অনেক রাত পর্যন্ত সময় কাটানোতে ড্রিংকের পরিমানটাও বেশী হয়ে গিয়েছিল। তাই বাসায় ফিরেছিলেন প্রায় মাতাল অবস্থায়। নিজের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আচমকা সব মনে পড়ে গেল তার। তিনি হাঁটতে পারছিলেন না বলে ড্রাইভারের সাহায্য চেয়েছিলেন। সেই সুযোগে ড্রাইভার তাকে জড়িয়ে ধরে লিফটে উঠেছিল। তারপর তার বেডরুমে এসে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। তবে কি সেই সুযোগ বুঝে ....... ! ও এজন্যই বুঝি তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন, তার আকাশটা রঙধনুতে ছেয়ে আছে। এখন বুঝতে পারছেন পুরো ব্যাপারটাই ছিল তার উপর ঘটে যাওয়া সেসময়কার ঘটনার আবছা চিত্র, যা তিনি আধো চেতনায় স্বপ্ন ভেবেছেন।

উফ্ আর ভাবতে পারছেন না। নিজের প্রতি তার ভিষন ঘেন্না হতে লাগলো। বিছানার চারপাশে ছড়িয়ে আছে তার গতরাতের ব্যবহৃত পোষাক। ফতুয়া, জিন্স ও অন্তর্বাস। অকস্মাৎ কি যে হলো তার, দৌড়ে গেলেন অয়ারড্রবের দিকে। একের পর এক খোলতে লাগলেন ড্রয়ারগুলো। টেনে হিচরে মেঝেয় ফেলতে লাগলেন ভেতরের সব কাপড়-চোপড়। হাতরে ফিরতে খোঁজতে লাগলেন বিশেষ একটা কাপড়। একসময় পেয়েও গেলেন তা। একটা শাড়ী, যা পরে আজ থেকে বহুদিন আগে তিনি জুলফিকার সাহেবের বউ হয়ে এসেছিলেন। আবার সেই জুলফিকার সাহেবের ইচ্ছেতেই একদিন শাড়ী তুলে রেখে গায়ে জড়িয়ে ছিলেন তথাকথিত আধুনিক সব পোশাক। নিজের সবগুলো শাড়ী ঘর থেকে থেকে ঝেটিয়ে বিদেয় করলেও কি মনে করে এটা রেখে দিয়েছিলেন। সেদিনের সেই অনাদরে অবহেলায় ফেলে রাখা শাড়ীটাকেই আজ তার কেন যেন খুব মূল্যবান মনে হলো। দ'ুহাতের খামচিতে মেঝে থেকে তুলে নিলেন ওটাকে। অনেক দিন পর ফিরে পাওয়া অতীব দুর্লভ কোন সামগ্রী যেন। শাড়ীটাকে বুকে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন মিসেস জুলফিকার ওরফে মিনা।