চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাচ্ছিলেন হক সাহেব। সহসা শেষ পৃষ্ঠার এক কোণায় ঠাই পাওয়া একটা খবর তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তড়িৎ হাতের কাপটা নামিয়ে রাখলেন টেবিলে। হাতের কাঁপুনিতে কিছুটা চা ছলকে উঠলো । ছিটকে এসে এক ফোঁটা চা আছড়ে পড়ল পত্রিকার পাতায়। দুই হাতে কাগজটাকে টেবিলে ঠেসে ধরে হাত দিয়ে ডলে ডলে চায়ের ফোঁটা'টাকে মুছার ব্যর্থ প্রয়াস চালালেন। একই সঙ্গে মুখ গুজে দিলেন খবরটার উপর। পড়তে পড়তে চোখের কোণ ভিজে উঠলো তার। পড়া শেষ হলে আস্তে করে গা এলিয়ে দিলেন চেয়ারের ব্যাক রেষ্টে। চোখ মুঁদলেন। টের পেলেন বুকের ভেতর একটা অনাবিল সুখের ঢেউ ক্রমশঃ ফুলে ফেঁপে উঠছে। বেশ ক্ষাণিকক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে নিরবে কাঁদলেন। একসময় চোখ খুললেন। হাত বাড়িয়ে টিস্যু টেনে নিয়ে চোখ মুছলেন। নিজেকে এখন কিছুটা সুস্থির মনে হলো। তখনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। না এভাবে আর দূরে থাকা নয়। যা হয় হবে, তবু আজ যেতেই হবে। বিরূপ পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ করে অনেকটা অযত্ন অবহেলায় বেড়ে উঠা একটা গাছ সময়ের আবর্তে আজ পূর্নতা পেয়েছে। এখন যদি সঠিক পরিচর্যা না পায়, তবে তা ফলবতী হবার আগেই মরে যাবে। তিনি তা কিছুতেই হতে দিতে পারেন না। কারণ গাছটার বীজ যে তার হাতেই রোপিত।

আহমেদুল হক সাহেব। বয়স পয়ত্রিশের কাছাকাছি। যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চাকুরীর সুবাদে সাড়া বাংলাদেশ চষে বেড়ান। আজ ঢাকা, তো কাল চট্টগ্রাম, পরশু সিলেট। এই হল তার কাজের ধরন। বাংলাদেশের হেন কোন জায়গা নেই, যেখানে তার পদধুলি পড়েনি। কিন্তু, কাকতলীয়ভাবে হলেও সত্য যে, ময়মনসিংহ জেলার উপকন্ঠে খুবই পরিচিত একটা জায়গা তিনি প্রায়শঃ এড়িয়ে চলেন। আসলে এই জায়গাটকে কেন জানি তিনি খুবই ভয় পান। অদৃশ্যের কি লিলা, সেই জায়গাটাই আজ তাকে বড় বেশী টানছে। পত্রিকার পাতায় ছোট্ট একটা খবর তার সাথে এই জায়গাটার একটা অভিনব যোগসূত্র ঘটিয়ে দিয়েছে, যা আজ আর তিনি এড়াতে পাড়ছেন না।

সিদ্ধান্ত যেহেতু নেওয়া হয়েই গেছে, তবে আর দেরী করার কোন মানে হয়না। কলিং বেল চেপে পিয়নকে ডাকলেন। ড্রাইভারকে গাড়ী বের করার কথা বলে বাসায় একটা ফোন করলেন। স্ত্রীকে জানিয়ে দিলেন, একটা বিশেষ কাজে ময়মনসিংহ যাচ্ছেন। হাতের পেপারটা ভাজ করে একটা লেদার পাউচে ভরে নিলেন । তারপর শশব্যস্তভাবে বেড়িয়ে গেলেন রুম থেকে।

** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** **

সালাম ইমাম সাহেব।

ওয়ালাইকুম সালাম বশীর মিয়া। আস, ভিতরে আস। এর কথাই তোমারে কইছিলাম।

ইমাম সাহেবের রুমের ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে মসজিদের বারান্দায় দাঁড়ানো ছেলেটাকে দেখলেন বশীর মিয়া। লিকলিকে চেহারা। হাতের ব্যাগটাকে হাঁটুর কাছে চেপে ধরে মাথা নিচু করে আছে।

নাম কি তোমার বাজান ? ছেলেটার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিল বশীর মিয়া।

মুকুল। অনেকটা জড়সড় হয়ে উত্তর দিল ছেলেটা।

বড় বালা পোলা। আমার দূর সম্পর্কের বইনের ছেলে। সাত কূলে কেই নাই। হের নানির কাছেই মানূষ। অনেক কষ্ট কইরা আমাগো গেরামের স্কুলেরথন মেট্রিক পাশ করছে। মাথাডা খুব বালা, তাই ফাস্ট ডিভিশান পাইছে। অহন শহরে আইছে কলেজে পড়ার লাইগ্যা । কিন্তু থাহনের জায়গা নাই। তাই তোমার এহানে দিলাম। তোমার কোন অসুবিধা হইলে কইও। টানা কথা বলে গেলেন ইমাম সাহেব।

না, না, আমার কোন অসুবিদা নাই। একজন বিদ্বান মানুষ আমার ঘরে থাকব, এইডা তো আমার গর্বের বিষয়। আমি খুব খুশী হইছি হেরে আমার এহানে থাকবার দিছেন দেইখ্যা। বশীর মিয়ার দু\'চোখে আনন্দ উপচে পড়চে।

সেই সন্ধ্যাতেই বশীর মিয়ার বাড়িতে এসে উঠল মুকুল। শুরু হলো তার লজিং জীবন। কলেজ জীবনের বাইরে তার আর কোন কাজ নেই, এমনকি একটু-আধটু বাজার সদাই করাতেও তাকে ডাকা হয় না। বৈঠক ঘরে থাকার সুবাদে, এই বাড়ীর ভেতরের মানুষ-জন সম্পর্কে তেমন কোন আভাসই তার কানে আসে না। তবে ইমাম সাহেব মানে তার মামার কাছে আগেই শুনেছিল, তার গৃহকর্তা মোটেও অবস্থাপন্ন নয়। নিজের এক ফালি জমি ছাড়া তেমন কিছু নেই। ওতে বছরে দুই'বার যা ফসল আসে তাতে জীবন চালানো কষ্টই বঠে। তাই মাঝে মাঝেই তাকে পরের জমিতেও গতর খাটাতে হয়। তবে পরিবারে এক ছেলে ও এক মেয়ে ছাড়া আর কেই নেই বলেই মাত্র তিনটি মুখের অন্ন যোগাতে বশীর মিয়ার তেমন কোন কষ্ট হয় না। বড় মেয়েটাকে কিশোরী অবস্থায় রেখেই তার স্ত্রী গত হয়েছেন। আপাততঃ এই মেয়েটাকেই ঘর-দূয়ার সামলাতে হচ্ছে । মুকুলের অসহায়ত্বের কথা শুনে বশীর মিয়া নিজেই নাকি তাকে রাখবার আগ্রহ দেখিয়েছে।

কদিনেই টের পেল বশীর মিয়া, ইমাম সাহেব যা বলেছিলেন এই ছেলে তার চেয়েও ঢের বেশী ভাল। আচার-ব্যবহার কিংবা চলাফেরায় এর মত কাউকেই তার চোখে পড়ে না। ঘরে কিই-বা রান্না হয়। কিন্তু, এরপরেও ওর মুখে কোন অভিযোগ নাই। তার যা কাজ, পড়াশোনা ছাড়া আর কোন দিকেই তার মন নেই। তাই বাধ্য হয়েই তার ছয় বছর বয়সী ছেলেটিকেও ওর আশেপাশে ঘেষতে দেয়না, পাছে ছেলেটার পড়াশোনার অসুবিধা হয়। কেননা ততদিনে ওকে নিয়ে তার মনে অন্যরকম একটা স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করে দিয়েছে।

কিন্তু কিশোর বয়সের কৌতুহলকে তো আর দমিয়ে রাখা যায়না। তাই একদিন ওর অবর্তমানে এই বাড়ীর একমাত্র কিশোর ছেলেটি যখন বৈঠক ঘরে ঢুকে তার বই নাড়া-চড়া করতে যেয়ে ধরা পড়ে গেল, তখন নিজেকেই ভীষণ স্বার্থপর মনে হল মুকুলের । তার কেবলি মনে হলো, সে নিজেই এই ছেলেটার শিক্ষার দ্বার রুদ্ধ করে দিয়েছে। সেদিনই সে বশীর মিয়ার কাছে কথাটা পাড়লো।

চাচা, আপনের পোলারে স্কুলে দিতাছেন না কেন?

কি যে, কও বাপ ! হে পড়াশোনা কইরা কি অইবো ? আমি চাষা-ভুষা মানুষ। তাই আমার পোলা তো আমার মতই চাষা হইবো।

আর কথা বাড়ায়নি মুকুল। সে স্পষ্টতঃই বুঝতে পেড়েছে, এই সহজ সরল অশিক্ষিত লোকটাকে শিক্ষার মাহাত্ন্য বুঝানো তার পক্ষে সম্ভব নয়।

তবে সেদিন থেকে সেই কিশোর ছেলেটির সাথে তার একটা গোপন সখ্যতা গড়ে উঠলো। যার ফলশ্রুতিতে সেই ছেলেটির প্রাথমিক পাঠদান হয়ে গেল তার নিত্য কাজের অন্যতম। তবে এ সবকিছুই ঘটতে থাকলো সবার অলক্ষ্যে, যার ব্যাপ্তি কেবলি তার বৈঠক ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলো।

নিভু নিভু অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যেমন করে বড় কোন অগ্নিকান্ডের আভাস জানিয়ে দেয়, তেমনি করে অল্প কদিনেই এই কিশোরের মেধা তাকে জানিয়ে দিল, এই ছেলে উপযুক্ত শিক্ষা পেলে কালে অনেক বড় কেউ হবার সামর্থ্য রাখে। মনে মনে সে বিষয়টা নিয়ে তার বাবার সাথে জোরালো আলোচনার জন্য একটা উপযুক্ত সময় নির্ধারন করে নিল।

অবশেষ যেদিন তার উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল বেরূলো, সেদিনই সে বশীর মিয়ার কাছে সরাসরি দাবীকারে কথাটা তুলল। ততক্ষণে গৃহকর্তাও জেনে গেছেন শিক্ষা মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে। কেননা, তার পরিচিত মুকুল নামের এই ছেলেটি কলেজে এত ভাল ফলাফল করেছে যে, এজন্য নাকি সরকারই তার বাকি জীবনে পড়াশোনার সব দায়িত্ব নিয়ে নেবে। খুব শিগ্গীরই উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে ঢাকা যেতে হবে। বিষয়টা তাকে সত্যিই ভাবালো, কে জানে একদিন হয়ত এই ছেলেটিই কর্তাগোছের কেউ হবে, যাকে নিয়ে সে আরো গর্ববোধ করার প্রয়াস পাবে। তাই সেই মুকুলই যখন তার ছেলের শিক্ষা জীবনের ভবিষ্যত সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য তাকে বুঝাতে সক্ষম হলো, তখন সে আর না করতে পারলো না। পরদিনই নিকটস্থ স্কুলে ছেলেটিকে ভর্তি করে দিতে সম্মত হলো । তবে উল্টো দাবীকারে মুকুলের প্রতি সে একটা আবেদন পেশ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলো না।

বাজান তুমি ঢাকা গেলে কই থাকবা, কি খাইবা জানিনা। তাই আমি কই কি, তুমি আমার মাইয়াডারে বিয়া কইরা সাথে লইয়া যাও।

সেদিন ভোর রাতেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে মুকুল পালালো।

** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** **

সহসা ব্রেক করায় তন্দ্রা ছুটে গেল হক সাহেবের। গাড়ী ইতোমধ্যে ময়মনসিংহ শহরের ভেতরে ঢুকে গেছে। সহসা স্পীডবেকার চলে আসায় ড্রাইভার গিয়ার পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন। একটা ঝিমুনি মতন চলে এসেছিল। গাড়ীর জানালা দিয়ে বাইরে চোখ পড়ায় সেটা কেটে গেল। চাকুরীর খাতিরে অনেক এসেছেন এই শহরে। তবুও আজ সবকিছু ভীষণ অন্যরকম লাগছে। আসলে এদ্দিন চেনা গলিকেও অচেনার ভান করে এড়িয়ে গেছেন। অথচ আজ সেই চেনা গলিকেই অচেনার ভীরে নতুন করে খুঁজতে এসেছেন। কি মনে করে লেদার পাউচ থেকে পত্রিকাটি বের করলেন। ভাজ খুলে সেই বিশেষ খবরটি মেলে দিলেন চোখের সামনে।

"গোবরে পদ্ম ফুল এখনো ফুঁটে"
ময়মনসিংহের এক অজ পাড়াগায়ের দরিদ্র কৃষক পরিবারের ছেলের এম এস সি তে রেকর্ড মার্কস প্রাপ্তি।
খবরে প্রকাশ অত্র শহরের ভাটিকাশুর এলাকার কৃষক বশির মিয়ার একমাত্র ছেলে হালিম ছোট বেলা থেকেই ভীষণ মেধাবী। এস, এস, সি ও উচ্চ মাধ্যমিকেও সে আশাতিত ফলাফল করে। পরবর্তীতে সে উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকায় ছুটাছুটি না করে এই শহরেরই আনন্দ মোহন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। অনার্স পরীক্ষাতেই সে তার সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়। যারই ধারাবাহিকতায় মাস্টার্সে তার রেকর্ড সংখ্যক মার্কস নিয়ে ফলাফল অর্জন। উল্লেখ্য দারিদ্র্যতার সাথে যুদ্ধ করে করেই সে এ পর্যন্ত এসেছে। তার এতদূর আসার পেছনে বাল্যকালের গৃহশিক্ষকের অবদান রয়েছে বলে সে জানায়। ...................।
খবর নিজস্ব সংবাদাদাতার।

খবরটা বারকয়েক পড়লেন। আবারো ভিজে উঠলো চোখের কোণ। কিন্তু এবার আর চোখ মুছলেন না। বরং ঝাপসা চোখেই তিনি ঠিক গলিটা ঠাহর করে নিতে পারলেন। ড্রাইভারকে গাড়ী থামাতে বললেন। তারপর ভাজ করা পত্রিকাটা হাতে নিয়েই গাড়ী থেকে নেমে দাঁড়ালেন। ক্রমাগত দারিদ্র্যতার সাথে যুদ্ধ করে আজকের সফল অবস্থানে আসা একজন গর্বিত মানুষ। দৃঢ় পায়ে তিনি এগিয়ে গেলেন অদূরেই দাঁড়ানো ছাপড়া ঘরটার দিকে। বারান্দায় টুল পেতে বসে থাকা বৃদ্ধ লোকটার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে গেলেন।

সালাম চাচাজী। চিনতে পারছেন ? আমি মুকুল।

উজ্জল হয়ে উঠলো বৃদ্ধের চোখ। কি এক যাদু মন্ত্র বলে তার ন্যুজ দেহ নিমেষেই দাঁড়িয়ে গেল। এক অপার শক্তিতে সে সামনে দাঁড়ানো আগন্তককে বুকে টেনে নিল। দুইজন গর্বিত মানুষের মিলনে অদূরে দাঁড়ানো যুবক হালিমের মুখেও হাঁসি ফোঁটে উঠলো। তার বুকটাও স্ফিত হয়ে উঠছে ক্রমশঃ টের পেল।

আড়াল থেকে বিধাতাও বুঝি হেসে উঠলেন। তবে কে কার দায়ভার মেটালো, তিনিও বোধকরি তা বুঝতে পারলেন না।